(Rustic Cooking 26)
আষাঢ় এসেছে। মানুষের ক্যলেন্ডারের পাতা উলটে গেছে সময়ের হিসেবে। সে হিসেব মেনে কি আর সব কিছু হয়! পৃথিবীর ইচ্ছের দাম দিতে হয় মাঝে মধ্যে। বর্ষার চাষ তাই পিছোতে পিছোতে শ্রাবণে গিয়ে ঠেকেছে। আষাঢ়ের সকাল আজকাল মেঘ বিছিয়ে দিচ্ছে ঠিকই, কিন্তু ওইটুকুই। দুপুরের রোদে চাষি মানুষের দম ফুরিয়ে যাচ্ছে। নদীর বুক যেমন শুকিয়ে যাচ্ছে, তেমনই।
আরও পড়ুন: বনজ কুসুম: পর্ব – [১] [২] [৩] [৪] [৫] [৬] [৭] [৮] [৯] [১০] [১১] [১২] [১৩] [১৪] [১৫] [১৬] [১৭] [১৮] [১৯] [২০] [২১] [২২][২৩], [২৪], [২৫]
এল নিনো-ই বলো আর পুঁজিবাদের থাবা— গ্রামগঞ্জের চায়ের দোকানে সেসব নিয়ে কথাটথা হয় না। বরং কার এ’বছর শ্যালোর বিল কত এল, এ’বছর বিছনের পাল্লা কত যাচ্ছে সেই নিয়েই মানুষের মাথা ব্যথা বেশি। এই বিশ্বগ্রাম কথাটার মানে খুঁজতে গিয়ে দেখেছি গ্রামদেশ এসব নিয়ে ভাবে না। একেকদিন তাই মনে হয় গ্রামদেশের কাছে এই পৃথিবীখানা চৌকো। সেই পৃথিবীর আলে আলে কেবল শ্যামল বিমল কমলের জমি ভাগাভাগি হয়ে শুয়ে আছে। গ্রামের গল্পেরা তাই আষাঢ়ের মেঘ নিয়ে অত মাথা ঘামায় না।

কালিদাসের কথা ভেবে ভেবে যারা মাঠে মাঠে ইন্দ্রগোপ কীট খোঁজে এখনও, তারা একা, বেমালুম একা! এই গ্রামদেশে একা মানুষের ভারী মুশকিল। ঘাড় তুলে মেঘ দেখার অভ্যেস যার, মেঘের খবরাখবরে যাদের খানিক যায় আসে— তারা কেবলই করঞ্জা গাছের ছায়ায় বসে একা হতে থাকে। গ্রামে গ্রামে এমন একা মানুষেরা হাতে গোনা। কিছুদিন পরে তারাও বুঝি বা তামাদি হয়ে যাবে। চৌকো পৃথিবীর আলগুলো এমন আষাঢ় দিনে হাটিটি, মদনটাক আর মখমলি ঘাসে ভরে যাওয়ার কথা ছিল। যায়নি। চৌকো পৃথিবীর নিয়মই অমন।

যদি বা এক দু’পশলা বৃষ্টিতে বিলে খানিক জল জমে— টাকি মাছের পোনায় ভরে উঠছে বিল। ঝুড়ি ঝুড়ি পোনা ধরে নিলে এই বর্ষার বিল কৃপণা হয়ে পড়ে সহজেই। এই বিলের জল আর ঘাস-লতাপাতারা তখন নিতান্ত গরিব। জীবনের কিছু কিছু নীতি থাকতে হয় তো, সেই নিয়েই গ্রামের মানুষের গর্ব। সেই দেমাকেই শহুরে মানুষের ভুল ধরিয়ে দেওয়ার এক্তিয়ার জন্মায় তাদের। সেসব ভুলে গেলে জীবনটাই ভুলে ভরে যায়।

এইসব ভুলের পৃথিবীতে তাই আষাঢ় দিনে মানুষ ধুলোটের বীজতলা করে বেশি করে। জলের আকাল তুমি দেখোনি বোধহয়! ভাতের আকাল নিয়ে ভেবে ভেবে ফুরিয়ে ফেলা জলে ফুরিয়ে আসে ছায়া। সেই শুকনো পুকুরের শরীরে তখন গিমে শাকের জাজিম। এই বর্ষায় সেই জাজিমে আবার ছড়িয়ে পড়বে আরও কত শাক লতা আর ফড়িঙের দল। পৃথিবী আসলে ফুরিয়ে গিয়েও ফুরায় না। চেষ্টা করে যায় আপ্রাণ। ডুমুরের ডালে ডালে তাই গোটা গোটা ফল। পাকা ফলে পিঁপড়েরা ভাগ বসিয়েছে, খাচ্ছে পাখিরাও। সেসব দেখে দেখে বোঝা যায়, মানুষকে নিয়ে পৃথিবীর মাথা ব্যথা কম। মানুষ ফুরিয়ে গেলেও পৃথিবী ফুরাবে না।
অনেক দূরে অনেক কাছে বসে বসে যারা গাছ কাটছে, জঙ্গল পোড়াচ্ছে, মাটি জল হাওয়াকে তাতিয়ে তুলছে, তারাই আবার ধরা যাক সুন্দরবনে মেকং নদীর পাড়ে অর্থ বিনিয়োগ করছে কার্বন পয়েন্ট পেতে।
এই চৌকো পৃথিবী বৃষ্টির প্রত্যাশায় ব্যাঙের বিয়ে দেয়, অথচ এই গাছ পাতা আর অনন্তলতার শুশ্রূষায় তেমন আগ্রহ নেই। বিশ্বগ্রামের পৃথিবীতে তাই আষাঢ় পিছিয়ে গেছে। অনেক দূরে অনেক কাছে বসে বসে যারা গাছ কাটছে, জঙ্গল পোড়াচ্ছে, মাটি জল হাওয়াকে তাতিয়ে তুলছে, তারাই আবার ধরা যাক সুন্দরবনে মেকং নদীর পাড়ে অর্থ বিনিয়োগ করছে কার্বন পয়েন্ট পেতে।

এই নিয়েই গড়ে উঠছে নতুন পৃথিবীর ব্লু-কার্বন (blue carbon) কলোনাইজেশন। মেঘ বর্ষা আর ঝড়ের মানচিত্রে এই চৌকো গ্রাম আর বিশ্বগ্রাম এভাবেই জুড়ে যাচ্ছে আশ্চর্য নিয়মে। পাড়ার চায়ের দোকানে এসব নিয়ে মেঘ জামানোর অবকাশ কারই বা থাকে। তবে দেখি একা একা একটা হাটিটি পাখি নিজেরই মুদ্রাদোষে মাঠে মাঠে ডেকে বেড়াচ্ছে সকাল থেকে।
পাখিদের তো গোলাপি মলাটের পাঁজি নেই, পাখিরা কেবল মেঘের ভাষা পড়তে শিখেছে। আকাশের ভাষা পড়তে শিখেছে। চৌকো পৃথিবীর মানুষেরা বরং সেই ভাষা শিখলে পারত। আসলে সে ভাষা শিখতে পারেও কেউ কেউ, শিখেছেও। তারা এমন আষাঢ় দিনে ডুমুরের ঝোল রাঁধে, টাকি মাছের ভর্তা রাঁধে। চৌকো পৃথিবীর রান্নার ভাষা আরেকরকম। সে ভাষায় আষাঢ় মেঘের ছায়া পড়ে না বোধহয়।

টাকি মাছের ভর্তা
উপকরণ: বড় বা মাঝারি দেখে টাকি বা ল্যাটা মাছ নিন। পেঁয়াজ গোটা একটা, কুচানো ১টা, রসুন গোটা, শুকনো লঙ্কা, কাঁচালঙ্কা, ধনেপাতা, সর্ষের তেল, প্রয়োজনমতো নুন হলুদ।
পদ্ধতি: টাকি মাছ ভাল করে ধুয়ে গা অল্প চিরে নুন হলুদ আর সামান্য সর্ষের তেল মাখিয়ে কিছুক্ষণের জন্য রেখে দিন। উনুনে সেঁকে মাছ সময় নিয়ে পুড়িয়ে নিন। সেটা সম্ভব না হলে কম তেলেই সময় নিয়ে ভেজে নিন। ভাজা বা পোড়া মাছের কাঁটা বেছে নিন। মাছের সঙ্গে সঙ্গে পেঁয়াজ রসুনও পুড়িয়ে নিন। এবারে শুকনো লঙ্কা ভেজে নিন। একটি পাত্রে নুন আর ভাজা শুকনো লঙ্কা খুব ভাল করে মেখে নিন। এর পরে কাঁচা আর পোড়া পেঁয়াজ রসুন দিয়ে খুব ভাল করে মাখুন। তারপরে বেছে রাখা মাছ দিয়ে মাখুন। শেষে ধনেপাতা, কাঁচালঙ্কা আর সর্ষের তেল দিন। গরম ভাতে এই ভর্তা খুবই উপাদেয়। খাওয়ার সময় ভাতের পাতে এক ফালি লেবু দেবেন। আর ঝালের মাত্রা অবশ্যই নিজের স্বাদমতো।

চিংড়ি দিয়ে ডুমুরের ঘণ্ট
উপকরণ: ডুমুর, চিংড়ি মাছ, নারকেলের দুধ, সামান্য জিরে বাটা, ফোড়নের জন্য গোটা জিরে ও শুকনো লঙ্কা, সর্ষের তেল, নুন, মিষ্টি, কাঁচালঙ্কা। ইচ্ছে হলে সামান্য ঘি।

পদ্ধতি: ডুমুরগুলো ভাল করে কেটে নিন, মানে বীজ বাদ দিয়ে। এবারে নুন হলুদ দিয়ে সেদ্ধ করে জল ঝরিয়ে রাখুন। তেলে চিংড়িগুলো দিয়ে নুন হলুদ দিয়ে সাঁতলে তুলে নিন। আরেকটু তেল দিয়ে জিরে শুকনো লঙ্কা ফোড়ন দিন। ফোড়নের উপরে ডুমুরগুলো দিয়ে দিন। সামান্য জিরে বাটা, নুন, হলুদ দিয়ে ভাল করে কষিয়ে নিন। কষানোর সময় অল্প অল্প নারকেলের দুধ দেবেন। সব বেশ মাখা মাখা হয়ে এলে বাকি নারকেলের দুধ দিয়ে ফুটতে দিন। শেষের দিকে চিংড়ি দিন। অল্প চিনি বা গুড় দিন। বেশ ভাল করে সব মিশে গেলে নামানোর আগে কাঁচালঙ্কা আর সামান্য ঘি দিন। ডুমুর উপকারী একটি ফল। কাটার ঝামেলাটুকু বাদ দিলে খেতে খুবই ভাল। কেউ চাইলে এই রান্নায় আলুও যোগ করতে পারেন।
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত