(Bengali Dal Recipe)
এই কিছুদিন আগে অবধিও বাঙালি যখন ডিজিটাল হয়নি, নেমতন্ন করতে গিয়ে বলত, আমাদের বাড়ি সেদিন দুটো ভাত-ডাল গ্রহণ করবেন, হয়তো ভোজ খাওয়াবেন তারা, বিয়ের ভোজ, কিন্তু ওই যে প্রতীকী ভাত-ডাল।
কোন ভাত? বাঙালি মূলত সিদ্ধ চালের ভাতের ওপর দৈনিক আহার নির্বাহ করে। কোন ডাল? সাধারণত মুসুর কি মুগ ডাল তার রোজের আহার তালিকায়। ঠিক যেমনভাবে ঋতু পরিবর্তন হয়, বদলায় আমাদের শাকপাতা, সবজি, মাছ, তেমনই বদলায় ডালের প্রকার, তার রান্নার প্রকার। বাঙালির ঘরোয়া রান্নাঘরের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ ডাল, এবং তাকে ঘিরে আনুষাঙ্গিক।
স্কুল, আপিস যাবার আগে গরম ভাতের সঙ্গে পুঁটলিতে বাঁধা ডাল, সেদ্ধ ঘি কি মাখন মেখে খেয়ে যাওয়া, আবার যেদিন সময় হয়, মা মুসুর ডালে ফোড়ন দেন, তেলে কালো জিরে শুকনো লঙ্কা দিয়ে ডাল ফোটে, চারিদিকে সুবাস, সেদিন পাতে গরম ভাত, ডাল আর মাছ ভাজা। শীতকালে ডালে পড়ে কাঁচা পাকা টোমাটো, ধনেপাতা, গরমে চলে টক ডাল, কুল, চালতা, আম, আমড়া, জলপাই দিয়ে ডাল, টকের ডালে সরষে, শুকনো লঙ্কা ফোড়ন। গরমে হয় কাঁচা মুগ, লাউ কি চালকুমড়ো দিয়ে শুক্তো ডাল, তাতে চাক চাক লাউ কেটে ডাল সেদ্ধ করে নেওয়া, তেলে জিরে, তেজপাতা দিয়ে উচ্ছে ভেজে সিদ্ধ ডাল ঢেলে, তাতে নুন, মিষ্টি, ঘি আদা বাটা দিয়ে নামানো চমৎকার স্বাদের ডাল।
সেদিন বৈষ্ণব আখড়ার মটর ডাল খেলাম, তাতে গরমের সব সবজি, ঘিতে সম্বর দেওয়া ডাল, গোবিন্দভোগ চালের ভাতের সঙ্গে তার স্বাদ অমৃত।

কত ফোড়ন ডালের, কেউ দেয় রাঁধুনি, কেউ পাঁচফোড়ন, উড়ে বামুনরা নাকি রাঁধতেন পেঁয়াজ ফোড়নে মুসুর ডাল, মেস বাড়ির সেই ডাল নাকি চমৎকার। আবার ভোজ বাড়িতে হবে মাছের মাথা দিয়ে রাজকীয় ডাল, তার সঙ্গে বেগুনি কি ঝুরি ঝুরি আলু ভাজা। কোন ডাল দিয়ে কী ভাজা বা কী সবজি খেতে হবে, সেটাও বাঙালির রান্নাঘরের এক স্বকীয়তা।
মোচা দিয়ে মুগের ডাল, শিম, কাঁঠাল দানার ডাল, সেও বড় আস্বাদের। ফোড়নে স্বাদের ভিন্নতা পায় ডাল, ঠিক যেমন লুচির সঙ্গে ছোলার ডালে হিং, পাঁচফোড়ন, নারকেলভাজা যায়, তেমনই ডাল ফেলা রান্নায় শাকপাতা দিয়ে ছোলার ডাল রাঁধলে তাতে অনেকে সাদা জিরে কি কালো জিরে ফোড়ন দেন।
গরমের দিনের আরেক উপাদেয় হল আমের ডাল। মুসুর ডাল একটু ফুটে গেলে তাতে খোসাসুদ্ধ আম দিয়ে সেদ্ধ করে নিতে হবে। ফোড়নে সরষে, শুকনো লঙ্কা দিয়ে ডাল ঢেলে ফুটিয়ে নামাতে হবে।
আজ কাজের বলি মটর ডালের ভাতের কথা, ডাল ধুয়ে জল ঝরিয়ে মিনিট তিরিশ রেখে দিতে হবে। তারপর কাপড়ে বেঁধে ভাতের হাঁড়িতে সেই ডালের পুঁটলি ফেলে দেওয়া, না হলে কুকারে অল্প জল দিয়ে ২-৩ টে সিটি, তবে ভাতের মধ্যে দিলে স্বাদ বেশি।
আমি মেখেছি আগের বছর জারানো আম তেলের মশলা আর লঙ্কা ভেজে, দিদা মাখতো নারকেল কোরা দিয়ে। গরমের দিনের আরেক উপাদেয় হল আমের ডাল। মুসুর ডাল একটু ফুটে গেলে তাতে খোসাসুদ্ধ আম দিয়ে সেদ্ধ করে নিতে হবে। ফোড়নে সরষে, শুকনো লঙ্কা দিয়ে ডাল ঢেলে ফুটিয়ে নামাতে হবে।
তিতার ডাল
মুগ ডাল ২০০ গ্রাম, উচ্ছে ২-৩ টি, ঘি, আদা বাটা, নুন, হলুদ, শুকনো লঙ্কা, জিরে

ডাল নুন হলুদ দিয়ে সেদ্ধ করে নিতে হবে। কড়াইতে তেল দিয়ে তাতে জিরে তেজপাতা, শুকনো লঙ্কা দিয়ে উচ্ছে দিয়ে ভাজতে হবে। উচ্ছে বেশ একটু ভাজা হলে, তবেই তাতে সেদ্ধ ডাল দিয়ে ফুটতে দিতে হবে পাঁচ মিনিট। সব ফুটে এলে নামানোর আগে আদা বাটা আর ঘি দিয়ে তৈরি। এতে চালকুমড়া কি লাউ ডুমো কেটে দেওয়া যায়।
মটর ডাল আর নারকেল ঝুরো পাতুরি
মটর ডাল ১০০ গ্রাম, নারকেল কোরা ১/২ কাপ, নুন, চিনি, কাঁচা লঙ্কা, লঙ্কা গুঁড়ো, সরষে বাটা ১ চামচ, সরষের তেল। কলাপাতা কি লাউ, কুমড়ো পাতা।

মটর ডাল ১০০ গ্রাম ভিজিয়ে লঙ্কা দিয়ে বেটে নিয়ে, তাতে নারকেল কোরা, নুন, চিনি, চেরা লঙ্কা, সরষে বাটা, কাঁচা তেল সব মেখে পাতায় মুড়ে প্যানে তেল মাখিয়ে দুই পিঠ ভাল করে সেঁকে গরম ভাতে খেতে হয়।
চালকুমড়ো, ডাল বড়া ঝাল
মটর ডাল ২০০ গ্রাম, চালকুমড়ো ডুমো কাটা, সরষে বাটা, কাঁচা লঙ্কা, নুন, চিনি, হলুদ

মটর ডাল লঙ্কা দিয়ে বেটে তাতে নুন চিনি হিং দিয়ে ফেটিয়ে ছোট ছোট বড়া ভেজে নিতে হবে। তেলে সরষে ফোড়ন দিয়ে চালকুমড়া সাঁতলাতে হবে। নুন, হলুদ, আদা বাটা দিয়ে ঢাকা দিয়ে ভাল করে সেদ্ধ করে নিতে হবে। মজে এলে ওতে সরষে বাটা আর কাঁচা লঙ্কা, বড়া ভাজা দিয়ে আবার ঢাকা দিয়ে রাখতে হবে, বেশ গা মাখা হবে, শেষে কাঁচা তেল ছড়িয়ে নামাতে হবে।
বাসি ডাল মাখা

আগের দিনের বেঁচে যাওয়া ডাল, কড়াইতে ঢিমে আঁচে বসিয়ে শুকিয়ে নিতে হবে। শুকনো লঙ্কা ভেজে, পেঁয়াজ কুচি কাঁচা তেল কি আচারের তেলে মেখে নিতে হবে।
ছবি সৌজন্য: লেখক
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
19 Responses
সুস্বাদু লেখা
Thankuuu
Superb
Excellent and informative writing on traditional bengali food
অসাধারণ স্বাদঘরের গল্প,আহা
অসাধারণ স্বাদঘরের গল্প,আহা
আহা,মন ভরে গেল
খুব সুন্দর লেখেন আপনি।
This is so beautiful I am spellbound reading the recipes
আহা স্বাদের ডাল❤️❤️
Osadharan.. 👌
অসাধারণ লেখা! আমরা যারা আসামের বাঙালী-আমরা আতপ চাল ই খাই । আর আমাদের অড়হর ডালের খুব প্রচলন। Bamboo Shoot (যাকে আমরা বলি করিল) দিয়ে রান্না হত আর মুগ ডালে মাছের মাথা দেওয়া হত না কারণ মগ ডাল সব সময়ের জন্যই নিরামিষ তাই । আজকাল চলে সবই ।
অপূর্ব লেখা আপনার। পড়েই সব কটি রান্নার স্বাদ পেলাম। কি স্নিগ্ধ রূপ আপনার।
Excellent. Always very palatable and close to heart.
অপূর্ব লেখনী
অনেক দিন পরে আপনার লেখার মাধ্যমে খুজে পেলাম মা য়ের রান্না, গরমের ছুটির দুপুরে মায়ের সাথে খাওয়ার দিনগুলো… অসাধারন লেখা আপনার।
নমস্কার ও এত্ত ভালোবাসা পাঠালাম আপনাকে। একটি বই প্রকাশ করার আবদার রইল সাথে।আর আশা রাখলাম কোনদিনও আপনার হাতের রান্নার স্বাদের আস্বাদন পাবার।। জয় শিবশম্ভু ।।
অসাধারণ লেখা। শুধু ডাল নিয়ে এত সুন্দর একটা লেখা পড়ে মুগ্ধ হয়ে গেলাম
Purano dine fire gelam , lekha porte porte thakumar kotha mone porchilo ..ei shob dal khub khetam ..