(Nababorsho Recipe)
আশ্বিনে অম্বিকা পূজা বলি পড়ে পাঁঠা
কার্তিকে কালিকা পূজা ভাইদ্বিতীয়ার ফোঁটা।
অঘ্রাণে নবান্ন দেয় নতুন ধান কেটে।
পৌষমাসে বাউনি বাঁধে ঘরে ঘরে পিঠে।
মাঘ মাসে শ্রীপঞ্চমী ছেলের হাতে খড়ি।
ফাল্গুন মাসে দোলযাত্রা ফাগ ছড়াছড়ি।
চৈত্র মাসে চড়ক সন্ন্যাস গাজনে বাঁধে ভারা।
বৈশাখ মাসে তুলসী গাছে দেয় বসুধারা।
জৈষ্ঠ্যমাসে ষষ্ঠী বাটা জামাই আনতে দড়
আষাঢ় মাসে রথযাত্রা যাত্রী হয় জড়ো।
শ্রাবণ মাসে ঢেলা ফেলা ঘি আর মুড়ি।
ভাদ্র মাসে পচা পান্তা খান মনসা বুড়ি
বাংলার ক্যালেন্ডারে বারোমাসে তেরো পার্বণ। চৈত্র মাসও তার ব্যতিক্রম নয়, বছরের শেষ মাস এটি। বসন্তের শেষ, খরানির দিনের শুরু, গ্রীষ্মের দিনের অপেক্ষা, মাটিতে টান, খালবিল, নদীনালায় জলের আকাল। গ্রামবাংলার প্রকৃতিতে এই সময় গাছে গাছে আমের মুকুল, লেবু ফুল।
রোগব্যাধির সময় চৈত্র, বসন্ত, জ্বর ইত্যাদি, বারুণীর স্নানযাত্রা সেরে শীতলা মায়ের পুজো দিয়ে বছরের প্রথম আম ঠাকুরের সেবায় দিয়ে প্রকৃতির প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করার আচার। প্রথম আম প্রকৃতিকে, তারপর মানুষকে।

চৈত্র মাসের মাঝামাঝি যদি বৃষ্টি না হয়, তবে মাস হয় তপ্ত। আবার কৃষকদের মতে, এই সময় বৃষ্টি হলে পাটের বীজ আর আউশ ধানের চাষ হয় ভাল। সংক্রান্তির আগের দিন হয় নীলষষ্ঠী। ঘরে ঘরে মায়েরা সন্তানের মঙ্গল কামনায় ব্রত করেন। আর শেষ দিন হয় সংক্রান্তির উৎসব। গ্রামের মাঠের একটা বিশাল গাছ, তার কাণ্ডকে চড়ক গাছ বলে। গাছটি হল শিবের প্রতীক, পার্বতীর প্রতীক ভূমি।
অঞ্চলভেদে সংক্রান্তির নিয়মাবলি ভিন্নতা পায়। কোথাও কুমিরের পুজো, কোথাও কাঁচা বেলের পুজো। উত্তরবঙ্গে মানুষ বাড়ির উঠোনে ময়না, বেগুন, কুল কাঁটা পুঁতে দেন। নিয়ম যেমন ভিন্ন, তেমন খাবারেও ভিন্নতা দেখতে পাই আমরা, কেউ কেউ ভাত বানিয়ে জল ঢেলে রাখেন, সঙ্গে অনান্য ভাজাপোড়া। পয়লা বৈশাখের দিন ওই ভাত খাওয়া হয়। অনেকের বাড়ি আবার ঘটকে দেবী রূপে খাবার সাজিয়ে ভোগ দেওয়া হয়।

তবে গ্রাম, শহর অনেক বাড়িতেই আম দিয়ে টক ডাল, তিতার বড়া, যেমন গিমা, কি তিতা পাটের বড়ার সঙ্গে ১৪ থেকে ২৮ রকমের সবজি দিয়ে পাঁচন আর আম টক রাঁধার চল রয়েছে। পাঁচন এই সময়ের মরসুমি সবজির পাঁচমিশালি তরকারি। সংক্রান্তির আগে ঘরের বিছানাপত্র, পর্দা সব ধোয়ামোছা হয়।
বৈশাখের পয়লা দিন অনেকের শুরু হয় ফলার দিয়ে, চিঁড়ের ফলার কি ছাতুর, যবের ছাতু, দই, তাল পাটালি, মিষ্টি, মিছরি ইত্যাদি। দুপুরে বৈশাখের প্রথম দিনে বাঙালি খাবারই প্রাধান্য পায়, সামর্থ্য অনুযায়ী মাছ, মাংস, দই মিষ্টি।
উনুন ধুয়ে তাতে প্রথম হয় খইয়ের ছাতুর নাড়ু। এই নাড়ু বড় হাঁড়িতে বেঁধে মা লক্ষ্মীর সামনে রাখা হয়। ছড়া বাঁধা হয় মুখে মুখে- ‘শত্রু বাঁধি, দুশমন বাঁধি, অসুখ বিলাই বাঁধি, মশা মাছি, আপদভোলা বাঁধি।’ নাড়ুর নিয়মের পরে হয় পাজন।

তিতা সবজি, উচ্ছে, পটল, বেগুন সব্জির ডগা পাতা, পাটপাতা, থানকুনি, এঁচোড়, আমসহ সব সবজি রান্না হয় আদা, লঙ্কা, নুন হলুদ, চিনি, কাঁচা লঙ্কায়। শেষে তেল গরম করে রাঁধুনি, জিরে, কি পাঁচফোড়ন। এতে অনেকেই মেশান ভাজা নারকেল কোরা, আখের গুড়, শিমের দানা। আমের ডাল, সঙ্গে পাঁচন, গিমা শাকের বড়া, নিম বেগুন, শেষ পাতে টক কি দই এই হল সংক্রান্তির খাবার।
বৈশাখের পয়লা দিন অনেকের শুরু হয় ফলার দিয়ে, চিঁড়ের ফলার কি ছাতুর, যবের ছাতু, দই, তাল পাটালি, মিষ্টি, মিছরি ইত্যাদি। দুপুরে বৈশাখের প্রথম দিনে বাঙালি খাবারই প্রাধান্য পায়, সামর্থ্য অনুযায়ী মাছ, মাংস, দই মিষ্টি।

কাঁচা কুমড়োর ঝোল
কাঁচা কুমড়ো ডুমো করে কাটা, চাইলে আলুও মেশানো যায়। সরষের তেলে কালোজিরে দিয়ে তেলেই একটু হলুদ ফেলে ওতে কুমড়ো সাঁতলে নিতে হবে। এইবার আদা বাটা, কয়েকটা কাঁচা লঙ্কা আর একটু জল দিয়ে নুন হলুদ দিয়ে সবজি কষে নিয়ে পরিমাণমতো গরম জল দিয়ে ঢাকা দিয়ে সবজি সেদ্ধ করে নিতে হবে। সবজি সেদ্ধ হয়ে এলে চিনি, কাঁচা লঙ্কা আর ১/২ চামচ কালোজিরে গুঁড়ো করে এতে মিশিয়ে আঁচ বন্ধ করে দিন। চিংড়ি মাছ আগে ভেজে রেখে মিশিয়ে দিন শেষের দিকে। নিরামিষও হয় এই ঝোল, কিন্তু কাঁচা কুমড়োতেই এর স্বাদ। ভাতের সঙ্গে গন্ধরাজ বা কাগজি লেবু দিয়ে পরিবেশন করুন এই ঝোল।

হাতধোয়া জলের ইলিশ
ইলিশ অবশ্যই কাঁচা থাকবে। কড়াতে মাছ, এক খাবলা হলুদ, নুন, এক খাবলা কাঁচা লঙ্কা, আর মনের আনন্দে খানিক তেল দিয়ে, হাতে করে দিতে হবে সব, চামচ নয়। সেই হাতে জল ধুয়ে কড়াতে, মাছ ডোবার মতো জল, ব্যস, কেল্লাফতে, ফুটে গেলেই মাছ রেডি। ইলিশ হতে হবে টাটকা। কালোজিরে দেওয়া নিজের ইচ্ছায়।

কাতলা মাছের ডিমের টক
তেঁতুলের মশলা ফলি আর গুড় দিয়ে। মাছের ডিম ভাজার সময় বেসনের বদলে একটু সেদ্ধ আলু মিশিয়ে ভাজলে ডিমের পকোড়া শক্ত হয়ে যাবে না। আবার অনেকে অল্প মুসুর ডাল বেটেও মেশান, আর বেশি সময় মাখা যাবে না কিন্তু।

রাজস্থানি প্রসাদী ছানার মালপোয়া
ছানা ১২০ গ্রাম, ময়দা ১৭৫ গ্রাম, সুজি ৮০ গ্রাম, চাল গুঁড়ো ২-৩ চামচ, এলাচ গুঁড়ো, মৌরি গুঁড়ো
ছানা হাতে মেখে সব জিনিস মিক্স করে দুধ দিয়ে একটা ঘন ব্যাটার বানাতে হবে। এটা ৩০ মিনিট ফ্রিজে রেখে দিতে হবে। এতে এক চিমটি বেকিং পাউডার মেশানো যায়। বানাতে হবে দেড় কাপ চিনি আর ১ কাপ জল, কয়েকটি জাফরান, আর এলাচ দানার চিনির সিরা। একটা ফ্রাইপ্যানে ঘি অথবা তেল গরম করে মালপোয়া ভাজতে হবে। ভেজে এগুলো কয়েক মিনিট চিনির রসে ডুবিয়ে নিলেই রেডি। উপর থেকে নিজের ইচ্ছে মতো সাজানো যায়। কয়েকটি কথা, চিনির সিরা যেনো গরম হয়। বাড়িতে ছানা বানালে লেবু ব্যবহার করা ভাল। ডিপ ফ্রাই করতে হবে এমন নয়, কম তেলে ও ভাজা যায়।

অনুষ্ঠানবাড়ির মতো আমের চাটনি
আমের চাটনির জন্য একটা ভাজা মশলা আগে রোস্ট করে গুঁড়ো করে রাখতে হবে। মৌরি ২-৪ চামচ, শুকনো লঙ্কা ২টি, দু একটা গোল মরিচ দানা, একটু লবঙ্গ, আর অল্প ১/৪ চামচ মেথি দানা।
আম খোসা সুদ্ধ কেটে নুন জলে ভিজিয়ে রাখুন। তারপর তেল গরম করে তাতে পাঁচফোড়ন দিয়ে আম ছেড়ে দিন, সঙ্গে নুন হলুদ। এইবার আম একটু ভেজে নিতে হবে, মিনিট পাঁচেক হালকা আঁচে। তারপর দিতে হবে চিনি আর অল্প আদা কুড়ানো। চিনি গলবে, সঙ্গে চিনির জলের ভাপেই আম ও সেদ্ধ হবে। ঢাকা দিয়ে রাখলে ভাল হয়, আম গলে যাবে, চিনির রঙ ও খোলতাই হবে, এই সময় দিতে হবে ভাজা মশলা। চাইলে কিসমিস ইত্যাদিও দিতে পারেন। এই আমের চাটনি ঠান্ডা করে বোতলে ভরে ফ্রিজে রেখে দিন। এক মাস ভাল থাকবে। রবিবার দুপুরে পাঁপড় ভেজে চাটনির সঙ্গে সার্ভ করুন।
ছবি –উইকিমিডিয়া কমনস, এআই, লেখক
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত