(Deshvikharir Jamijiret 2)
সেই দিনগুলির কথা মনে পড়ে, ভেসে ওঠে অনেক ছবি: গভর্নমেন্ট কোয়ার্টারের দেওয়ালে, ভ্রাতৃ সঙ্ঘের গলির দেওয়ালে, মালগাড়ি পোলের খাম্বায় লেখা ‘শ্রীকাকুলাম কি ভারতের ইয়েনান হবে?’, ‘সত্তর দশককে মুক্তির দশকে পরিণত করুন’, ‘সামাজিক সাম্রাজ্যবাদ নিপাত যাক’, করপোরেশন বাড়ির পলেস্তারা খসা দেওয়ালে মাও সে-তুংয়ের আবক্ষ প্রতিকৃতি, রাইফেলের স্কেচ ইত্যাদি৷ ভেসে ওঠে প্রায়ান্ধকার ঘরের জানালায় দিদিমার ভাঙাচোরা মুখ, কাশির দাপটে ঝুঁকে পড়া দাদুর নাকের সামনে গোলমরিচের ধোঁয়া, পেরেকে ঝুলে থাকা চটের থলে, এইসব৷ এন্টালি থানার গাড়ি ঘুরে যায়৷ বেনেপুকুর থানার গাড়ি চিত্তরঞ্জন হাসপাতালের পিছনে দাঁড়িয়ে খোঁচড়কে ডেকে তুলে নেয়৷
আরও পড়ুন: দেশভিখারির জমিজিরেত পর্ব ১
চটের থলের সুতোয় সুতোয় দাদু-দিদিমার প্রাণধারণের বৃত্তান্ত আছে৷ ‘দাদুভাই, বেগুনের পোকা আমার নজরে আসে না৷ তুমি বাইছা লও৷ আলু পটলে সমস্যা নাই৷ অরা ছাঁইটা ফালাইয়া দেয়৷’

দেববাবুর বাজারের পুবদিকে বস্তি লাগোয়া ছাঁট-সবজির বাজার৷ পোকালাগা পচাধরা যাবতীয় সবজি কেটে ছেঁটে মাটিতে ফেলে বিক্রি হয়৷ গরিবস্য গরিব, দিনমজুর, ক্যাচড়াকুড়ুনে, ধাঙড়, পকেটমার পাবলিক এই বাজারের খদ্দের৷ ‘দাদুভাই, হরেনের লঙ্কার জাত নাই৷ জঙ্গুইলা গন্ধ ছাড়ে৷ বিজু, তর কুমড়া তো শুকাইয়া চামড়া হইছে৷ নারান, সেদিন আমারে রাঙাআলু দিলি, কী বিস্বাদ!’
আমার দাদু নলিনীকুমার বসু, পূর্ববঙ্গের কিশোরগঞ্জের নলিন কবিরাজ ঘুরে ঘুরে ছাঁটবাজারের সবজি কেনেন৷ ‘কেন বাঁচি জানি না, মরতেও পারি না, খাইতে হয় দুই বেলা৷’ স্বাধীনতা তাঁর দেশ নিয়েছে৷ কাটা দেশ তাঁর পাতে দিয়েছে কাটা সবজির নিয়তি৷ আমার দিদিমা কিরণবালা বসু, মুক্তাগাছার শিক্ষিত সম্ভ্রান্ত পরিবারের আদরের মেয়ে, হেমবর্ণা, স্বাধীন দেশে নিক্ষিপ্ত হয়ে ডোবার পাঁক তুলে গুল দেন, গোবর এনে ঘুঁটে দেন, ফুলের মালা গাঁথেন, ঠোঙা বানান, দু’মুঠো ভাতের জন্য৷
এদের লড়াই কেন জানি আমার চোখ এড়িয়ে গেছে৷ বাইরের লড়াইয়ের ঘোর লেগেছিল চোখে৷ নকশালবাড়ি ভুল কি ঠিক বলছি না৷ বলতে চাইছি, আমি নকশালবাড়িতে যুক্ত না হলে দাদু-দিদিমা হয়তো একটু কম কষ্টে মরতেন৷ আজ মনে হয়, নিঃস্ব ও নিঃসহায় দাদু ও দিদিমার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছি৷ বলা যেতেই পারে, ব্যক্তিগত দুঃখ৷ অস্বীকার করব না৷ যে দুঃখ কোনওভাবেই ভোলা যায় না, ফিরে ফিরে আসে, বয়সে বয়সে বেড়ে যায়, সে দুঃখের ঊর্ধ্বে ওঠার শক্তি আমার নেই৷

সত্তর দশককে মুক্তির দশকে পরিণত করার ডাক দেওয়া হয়৷ ঘটনা এই যে, ১৯৭০-এর মাঝামাঝি থেকে শহর কলকাতাসহ এই রাজ্য মৃত্যু উপত্যকা হয়ে উঠতে থাকে৷ শঙ্খ ঘোষের লেখা থেকে মৃত্যুলাঞ্ছিত সেই সময়ের কয়েকটা খবর পড়ে নিতে পারি: ‘সেই বছরেই (১৯৭০) নভেম্বরের এক ভোররাত, যখন বেলেঘাটার পাঁচশো বাড়িতে হানা দিয়ে চুয়াল্লিশটি পুলিশভ্যান টেনে বার করে কিছু স্কুলকলেজের ছাত্রকে, আর প্রমাণহীন বিচারহীনভাবে চারজনকে গুলি করে ফেলে সেখানেই, প্রকাশ্য অঞ্চলে৷ শ্যামপুকুর পার্কের কাছে চোদ্দ বছর বয়সের টাইফয়েড আক্রান্ত একটি ছেলেকে পথে নিয়ে এসে দিনের আলোয় খুন করে পুলিশ, শ্যামপুকুর রোডে ডেপুটি কমিশনার নিজেরই হাতে গুলি করেন দু’জনকে, বেলঘরিয়াতেও ঘটে একইরকমের ঘটনা৷ আর এসব জানিয়েছেন সেদিন লোকসভার সদস্যদের এক তদন্তকারী দল, যে দলের মধ্যে ছিলেন কৃষ্ণ মেনন, হীরেন মুখোপাধ্যায়, অরুণপ্রকাশ চট্টোপাধ্যায় বা জ্যোতির্ময় বসুরা৷’
‘দেশব্রতী’ অফিস থেকে পত্রিকা নিয়ে আসা বন্ধ৷ পত্রিকা ডিস্ট্রিবিউট ও টাকা কলেকশনের চেইন ভেঙে গেছে৷ ইউনিভার্সিটিতে যাই শুধু রাখালদার ক্যান্টিনে খেতে, পড়াশোনা লবডঙ্কা৷ শেলটারগুলির দরজা বন্ধ হচ্ছে৷ সিপিএম বন্ধুদের গালিগালাজ বাড়ছে— আগে সিআইএ-র দালাল বলত, এখন আরও ‘দালাল’ জুড়েছে৷
কলকাতার পুলিশ কমিশনার তখন রঞ্জিত গুপ্ত৷ বাংলার ইতিহাসে এটি আরও একটি হননকাল, এবং এই হননকালের কয়েকটি দিক আছে, যা সেদিনের ১৮ কি ১৯ বছর বয়সি আমার নজরে পুরোটা ধরা পড়েনি৷ পাড়ার অ্যান্টিসোশ্যালরা পুলিশের হয়ে ভাড়া খাটছে, সেটা জানতাম৷ শাসক পার্টিতে ভিড় বেড়েছে লুম্পেনদের, এবং তারা দঙ্গল বেঁধে যেকোনও প্রতিবাদ দমন করছে, সেটাও জানতাম৷ জানতাম না, নকশালপন্থীদের মধ্যেও ঢুকেছে সমাজবিরোধীরা এবং তারা গ্রুপ বানিয়ে সংগঠনে ভাঙন ধরাচ্ছে৷ নকশালপন্থীদের হাতে খুন হচ্ছে নকশালপন্থী৷
এই পরিস্থিতিতে কলকাতায় থাকা অসম্ভব হয়ে পড়ে৷ বাবা-মা ভদ্রেশ্বরে চলে গেছে৷ পাড়ায় দলের যে ইউনিট ছিল তার এক নেতা জেলে, অন্যজন পলাতক (থানার বিশেষ নজর পাবার মতো রাজনৈতিক কর্মী ছিলাম না কোনওদিন৷ পরে জেনেছি, যে নেতা ধরা পড়েছিলেন, নৃশংস মারের চোটে তিনি একটি অস্ত্র কেনার কথা বলে ফেলেন এবং সেই সূত্রে আমার নামও বলেন৷ এটা ঘটনা, একটা পাইপগান কেনা নিয়ে কথা বলবার সময় আমি উপস্থিত ছিলাম)।

‘দেশব্রতী’ অফিস থেকে পত্রিকা নিয়ে আসা বন্ধ৷ পত্রিকা ডিস্ট্রিবিউট ও টাকা কলেকশনের চেইন ভেঙে গেছে৷ ইউনিভার্সিটিতে যাই শুধু রাখালদার ক্যান্টিনে খেতে, পড়াশোনা লবডঙ্কা৷ শেলটারগুলির দরজা বন্ধ হচ্ছে৷ সিপিএম বন্ধুদের গালিগালাজ বাড়ছে— আগে সিআইএ-র দালাল বলত, এখন আরও ‘দালাল’ জুড়েছে৷ কংগ্রেসি বন্ধুরা আগে দানার হুমকি দিত, এখন বলছে ‘নলি কেটে ফুটপাতে ফেলে রাখব, নর্দমা দিয়ে বিপ্লব ভেসে যাবে’ এবং অশ্লীল আরও কিছু৷ বাতাসে যেন অহরহ বাজে ‘মেরে দে’, ‘ঝেড়ে দে’, ‘ফেলে দে’৷ অলিগলি ধরে হেঁটেছি৷ ক্রমে একা হয়ে গিয়েছি৷ যাঁরা নকশালবাড়ির রাজনীতির প্রতি সহানুভূতিসম্পন্ন ছিলেন, তাঁরাও ভয়ে বা অন্য কারণে সরে যাচ্ছিলেন৷
প্রলয়দার কথা মনে পড়ে৷ বন্ডেল গেটে থাকতেন৷ বড় রাস্তা থেকে একটু দূরের গলিতে৷ উঁচু পাঁচিল, বাইরের দরজা ভারী লোহার, উঠোন বড়সড়, দীর্ঘ কদমগাছ, পরিপাটি বাড়ি৷ প্রলয়দা ছাড়া কেউ থাকে না৷ কেন ফাঁকা, জানার ইচ্ছে হলেও জানতে চাওয়া হয়নি৷ পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন অচিন্ত্যদা৷ বঙ্গবাসী কলেজে আমার এক ইয়ারের সিনিয়র৷ পরিচয় শহিদ মিনারে জনসভায়, পয়লা মে ১৯৬৯, যে সভায় ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি মার্কসবাদী লেনিনবাদী প্রতিষ্ঠার কথা ঘোষণা করেছিলেন কানু সান্যাল৷
মুহূর্তে ছিটকে গেলাম একটা আশ্রয় থেকে৷ বাইরে কোনও কাজ নেই, চলাফেরায় সব সময় ভয়, সহযোদ্ধাদের সঙ্গে যোগাযোগ নেই, এরকম পরিস্থিতিতে প্রলয়দার বাড়িতে বইপত্র জোগাড় করে পড়াশোনা করব ভেবেছিলাম৷ ছিটকে গেলাম৷
অচিন্ত্যদার সঙ্গে গিয়েছিলাম৷ সভার শেষে প্রলয়দার বাড়িতে আসি আমরা৷ সেই প্রথম৷ দুই দাদাই দারুণ উচ্ছ্বসিত৷ বিপ্লব শুরু হয়ে গেছে৷ জয় এবার অনিবার্য৷ প্রলয়দার বাড়িতে থেকে পার্ট টু পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়া এবং পরীক্ষা দেওয়ার ব্যবস্থা হতে পেরেছিল অচিন্ত্যদার সৌজন্যে৷ ১৯৬৯-এর শেষদিকে পরীক্ষা হয়ে যাওয়ার পরেও এ বাড়িতে এসেছি, থেকেছি৷ প্রলয়দা দশটা নাগাদ বেরিয়ে যান, ফেরেন রাতে৷ এক দিদি রান্না করে রেখে যান৷ সুতরাং খাওয়ার সমস্যা নেই৷ আমার কাছে বাড়ির ডুপ্লিকেট চাবি৷ বস্তির ছেলে আমি থাকা-খাওয়ার এতটা স্পেস ভাবতেই পারি না৷ প্রলয়দা আমাকে এতটা ভালবেসেছিলেন, বিশ্বাস করেছিলেন অচিন্ত্যদার সূত্রেই৷ অচিন্ত্যদা আসতেন কখনও সখনও৷
সেই ঠাঁই থেকে বিতাড়িত হলাম৷ একেবারেই আচমকা৷ সেদিন অচিন্ত্যদা এসেছিলেন সন্ধের দিকে৷ কথা হচ্ছিল রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে৷ পুলিশি তল্লাশি ভয়ঙ্কর হয়ে উঠছে৷ রোজ কেউ না কেউ ধরা পড়ছে৷ গ্রামাঞ্চলেও ব্যাপক ধরপাকড় চলছে৷ পার্টির কর্মীরাও অ্যাকশন করছে৷ কিন্তু একটা অ্যাকশনের পর যে সন্ত্রাস নামছে, তার মোকাবিলা কীভাবে করা যাবে?

হঠাৎই প্রলয়দা গলা চড়িয়ে বলে উঠলেন, অ্যাকশন না করেই তো আমরা তাড়া খাচ্ছি৷ ‘চিনের চেয়ারম্যান আমাদের চেয়ারম্যান’ বলব আমরা? কেন? আমাদের কোনও চেয়ারম্যান নেই? এত অপদার্থ? চিন থেকে আনতে হবে? মানুষ প্রশ্ন করছে৷ জবাব দিতে পারছি না৷ আরও ভয়ঙ্কর কথা, শ্রেণিশত্রুর রক্তে যে হাত রাঙায়নি, সে নাকি কমিউনিস্ট নয়? এ তো মতাদর্শগত লড়াই নয়, খতমের লাইন৷ খুনে হতে বলা হচ্ছে৷ আমার রাজনীতিকে যে মানে না, ভিন্নমত পোষণ করে, তাকে খুন করে আমাকে কমিউনিস্ট হতে হবে? কে শ্রেণিশত্রু? একটা সমাজবিরোধী একজন নিরীহ গোবেচারা সিপিএমকে খুন করে কমিউনিস্ট হয়ে যাবে? অচিন্ত্য, এভাবে যারা ভাবে তাদের সঙ্গে আমি থাকতে পারি না৷ কিছু মনে করিস না, অনেক হয়েছে, তোরা আমার কাছে আর আসবি না৷
মুহূর্তে ছিটকে গেলাম একটা আশ্রয় থেকে৷ বাইরে কোনও কাজ নেই, চলাফেরায় সব সময় ভয়, সহযোদ্ধাদের সঙ্গে যোগাযোগ নেই, এরকম পরিস্থিতিতে প্রলয়দার বাড়িতে বইপত্র জোগাড় করে পড়াশোনা করব ভেবেছিলাম৷ ছিটকে গেলাম৷ নকশালবাড়ির রাজনীতিতে যুক্ত হয়ে বিপন্ন হয়েছি বারবার, অনিবার্যই ছিল, বাতাসে আগুন ছিল বেপরোয়া, আমাদের আকুল কল্পনার সামনে ছিল মস্ত এক সুস্থ দিনের স্বপ্ন, তাই বহু বিপর্যয় সত্ত্বেও প্রশ্নসহ বিশ্বাসটা থেকে গেছে৷
সত্তরের দশক মুক্তির দশক হতে পারেনি৷ নকশালবাড়ি রাজনীতির আন্দোলন লক্ষ্য থেকে সরে গিয়ে ডেকে এনেছিল মৃত্যুর স্রোত৷ ভুল ছিল কৌশলে, কর্মসূচিতে, স্লোগানে, বিশ্লেষণে৷ দুর্বল ছিল নেতৃত্ব৷
পরে, অনেক পরে, তখন আমি ষাটোর্ধ্ব, সম্পাদনা করি ‘নকশালবাড়ি: অতন্দ্র উত্থানগাথা’, ‘রুদ্রপলাশ: নকশালবাড়ির গল্প’, ‘নকশালবাড়ি: বজ্রে বাঁশি বাজে’৷ লিখেছি তাত্ত্বিক নেতা চারু মজুমদারের ভাবনার স্বাতন্ত্র্য নিয়ে৷ ‘বজ্রে বাঁশি বাজে’ (প্রকাশ ২০২২) গ্রন্থের ভূমিকায় লেখা হয়: ‘সত্তরের দশক মুক্তির দশক হতে পারেনি৷ নকশালবাড়ি রাজনীতির আন্দোলন লক্ষ্য থেকে সরে গিয়ে ডেকে এনেছিল মৃত্যুর স্রোত৷ ভুল ছিল কৌশলে, কর্মসূচিতে, স্লোগানে, বিশ্লেষণে৷ দুর্বল ছিল নেতৃত্ব৷ অভাব ছিল সঙ্ঘবদ্ধতায়৷ অভাব ছিল রাষ্ট্রের হিংস্রতাকে প্রত্যাঘাত করবার মতো শক্তির৷ খাদ ছিল না আদর্শে৷ অনেক কিছুই পালটে দিল নকশালবাড়ি৷ আর আগের মতো রইল না অনেক কিছুই৷ সামাজিক জরাগ্রস্ততা, চিন্তার গতানুগতিকতা ভাঙল৷ আদর্শ, নীতিনিষ্ঠা, ত্যাগের ব্রত আর সাহস যেখানে প্রধান, কল্পনা যেখানে প্রবল, সৃজনের উচ্ছ্বাস সেখানে অপরিমেয় হবেই৷ নকশালবাড়ি রাজনীতির প্রভাবে তাই শিল্প-সাহিত্যের আবাদভূমি জুড়ে ফসলের দিগন্তপ্লাবী আয়োজন৷’
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত