(Sholay Villain)
১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট মুক্তি পেয়েছিল রমেশ সিপ্পি পরিচালিত ‘শোলে’। এই ছবিকে শুধু একটি সফল বাণিজ্যিক চলচ্চিত্র হিসেবে বিচার করলে ভুল হবে। ‘শোলে’ ভারতীয় জনপ্রিয় সংস্কৃতির ইতিহাসে এক যুগান্তকারী সৃষ্টি। আজ পাঁচ দশক পরেও ‘শোলে’ নিয়ে আলোচনা, গবেষণা এবং পুনর্মূল্যায়ন অব্যাহত রয়েছে। ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে খুব কম ছবি আছে, যেগুলো একই সঙ্গে বক্স অফিস, সমালোচক, জনপ্রিয় সংস্কৃতি এবং চলচ্চিত্র ভাষার উপর এত গভীর প্রভাব ফেলতে পেরেছে।
ইতিপূর্বে ‘শোলে’ সম্পর্কে আলোচনায় বারবার উঠে এসেছে এই ছবির চিত্রনাট্য, সিনেমাটোগ্রাফি, সংলাপ, সংগীত এবং ওয়েস্টার্ন ঘরানার প্রভাবের কথা। কিন্তু আমার কাছে অন্যতম বিস্ময়কর দিক হল এই ছবির অভিনয় বিন্যাস।
পাল্লার এক প্রান্তে ভারতীয় চলচ্চিত্র জগতের প্রতিষ্ঠিত তারকাদের মহাজোট, অন্যদিকে অচেনা নবাগত অভিনেতা আমজাদ খান একা। এই অসম সমীকরণেই জন্ম নিয়েছিল ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসের সবচেয়ে স্মরণীয় খলনায়ক— গব্বর সিং। তৎকালীন ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে এই অসম অথচ ক্লাসিক লড়াই নিয়ে আমার ব্যক্তিগত তাগিদ থেকেই আজকের এই প্রসঙ্গ।
প্রথমতঃ প্রতিষ্ঠিত তারকা মেলা
রূপালী পর্দায় নায়ক-নায়িকারাই সাধারণত দর্শকের চোখের মণি। ‘শোলে’ ছবির তারকা খচিত কাস্টিং লিস্ট দেখলেই স্পষ্ট ধরা পড়ে, তৎকালীন হিন্দি ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির প্রায় সিংহভাগ শক্তিই এই ছবিতে নিয়োজিত ছিল। ইতিমধ্যে এঁদের প্রত্যেকের নিজস্ব অভিনয়ের মজবুত এক ভিত তৈরি হয়ে গিয়েছিল, নামপ্রসিদ্ধি, বিপুল ফ্যানবেসের ফলে সাড়া ভারত জুড়ে বিশাল সংখ্যায় ছিল তাঁদের নিজস্ব ভক্তকূল। কিন্তু পর্দার সবচেয়ে শক্তিশালী ভিলেন কিংবা প্রতিদ্বন্দ্বী চরিত্রে ‘গব্বর সিং’ একা— ছবিতে তাঁর লড়াইটা ছিল একাকিত্বের।

ধর্মেন্দ্র (বীরু): আশির দশক পর্যন্ত তিনি ছিলেন বলিউডের অন্যতম সেরা ও সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ‘বক্স অফিস ড্র’ এবং অ্যাকশন-রোমান্টিক হিরো। এই ছবিতে তিনি ‘জয়’ (অমিতাভ বচ্চন)-এর বন্ধু। ‘বীরু’ অ্যাকশন, রোমান্টিক এবং কমেডি মিশ্রণে এক প্রাণবন্ত চরিত্র। ধর্মেন্দ্রের স্বাভাবিক ক্যারিশমা এবং শারীরিক কৌতুকপূর্ণ অভিব্যক্তি এবং ‘বাসন্তী’ (হেমা মালিনী)-র সঙ্গে রসায়ন মিলেমিশে বীরু দর্শকমনে অন্যতম প্রিয় চরিত্র। আজও জলের ট্যাংকের উপর দাঁড়িয়ে আত্মহত্যার হুমকি দেওয়া মাতাল বীরুর দৃশ্য ভারতীয় চলচ্চিত্রের অন্যতম জনপ্রিয় কৌতুক দৃশ্য হিসেবে বিবেচিত হয়।
অমিতাভ বচ্চন (জয়): ‘জঞ্জির’ (১৯৭৩) এবং ‘দিওয়ার’ (১৯৭৫)-এর সাফল্যের পর তিনি তখন সদ্য উদীয়মান সুপারস্টার। দেশজুড়ে তাঁর ‘অ্যাংরি ইয়ং ম্যান’ ইমেজ তৈরি হয়ে গেছে। এই ছবিতে ‘জয়’ খুব কম কথা বলা এক যুবক। তাঁর আইকনিক অভিনয়, ব্যারিটোন কণ্ঠস্বর, ন্যূনতম অভিব্যক্তি এবং স্থির দৃষ্টির মাধ্যমে ভারতীয় চলচ্চিত্রে একজন কিংবদন্তি চরিত্রকে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠা দেয়। লক্ষ্যণীয় বিষয়, ছবির সবচেয়ে আবেগঘন দৃশ্যের অনেকগুলোতেই অমিতাভ প্রায় সংলাপহীন।
পর্দায় নিজেকে সবসময় এক ধূসর আবরণে ঢেকে অচল থাকা সত্ত্বেও তাঁর গুরু গম্ভীর কর্তৃত্বপূর্ণ ভঙ্গি, দৃঢ় কণ্ঠস্বর এবং তীব্র চোখের দৃষ্টিতে যে প্রতিশোধস্পৃহা ফুটে ওঠে, তা হয়ে ওঠে সঞ্জীব কুমারের অভিনয়ের প্রধান অস্ত্র। ভারতীয় চলচ্চিত্র ইতিহাসে এ এক অন্যতম বিরল দৃষ্টান্ত।
সঞ্জীব কুমার (ঠাকুর বলদেব সিং): শোলের আগে তিনি দু-দুটো জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার (‘দস্তক’ এবং ‘কোশিশ’) পেয়ে ভারতের অন্যতম সেরা ও শক্তিমান অভিনেতা হিসেবে স্বীকৃত। ‘ঠাকুর বলদেব সিং’ চরিত্রে তাঁর অভিনয় এক অসাধারণ সংযমের উদাহরণ। ছবিতে তিনি একজন অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ অফিসার। চরিত্রটার দুই হাত নেই— অর্থাৎ অভিনয়ের অন্যতম প্রধান মাধ্যমকে তিনি প্রায় ব্যবহার করতে পারেননি বললেই চলে।
পর্দায় নিজেকে সবসময় এক ধূসর আবরণে ঢেকে অচল থাকা সত্ত্বেও তাঁর গুরু গম্ভীর কর্তৃত্বপূর্ণ ভঙ্গি, দৃঢ় কণ্ঠস্বর এবং তীব্র চোখের দৃষ্টিতে যে প্রতিশোধস্পৃহা ফুটে ওঠে, তা হয়ে ওঠে সঞ্জীব কুমারের অভিনয়ের প্রধান অস্ত্র। ভারতীয় চলচ্চিত্র ইতিহাসে এ এক অন্যতম বিরল দৃষ্টান্ত।
হেমা মালিনী (বাসন্তী): তৎকালীন বলিউডের একচ্ছত্র ‘ড্রিম গার্ল’, সর্বোচ্চ পারিশ্রমিক পাওয়া ও বাণিজ্যিকভাবে সর্বাধিক সফল অভিনেত্রী ছিলেন হেমা মালিনী। বাসন্তী এই ছবিতে শুধু নায়িকা নন, এই ছবির প্রাণশক্তির স্পন্দন। অত্যন্ত বাচাল প্রকৃতির, গ্রামীণ প্রেক্ষাপটের এক তরুণী টাঙ্গাচালিকা।
সুন্দরী, সরল অথচ বুদ্ধিমতী ও নির্ভীক এই চরিত্র অন্য চরিত্রগুলোর তুলনায় ছবিতে এক আলাদা প্রাণবন্ত স্বতন্ত্রতা এনে দেয়। তাঁর দ্রুত লয়ে সংলাপ বলার ভঙ্গি এবং ফাইট সিকোয়েন্সে সাহসী ব্যক্তিত্ব চরিত্রকে সহজেই দর্শকের কাছে আপন করে তোলে।
জয় এবং রাধার গভীর অব্যক্ত সংযোগকে পর্দায় তুলে ধরতে আমরা দেখি। গোধূলি বেলায় জয় মোষের পিঠে চড়ে ঠাকুরবাড়ির দিকে ফিরছে এবং একই সময় রাধা ক্যামেরার ‘ফোর গ্রাউন্ড’ দিয়ে সিঁড়ি বেয়ে নেমে এসে দাঁড়ায়। আচম্বিতে দু’জনের দৃষ্টি বিনিময় হয়। নিঃশব্দে উচ্চারিত হয় সহস্র শব্দ।
জয়া বচ্চন (রাধা): সত্যজিৎ রায়, ঋষিকেশ মুখার্জির মতো পরিচালকদের ছবিতে কাজের অভিজ্ঞতা থাকা এক অত্যন্ত সংবেদনশীল, প্রতিভাময়ী অভিনেত্রী হিসেবে ততদিনে নিজের অভিনয় দক্ষতার প্রমাণ দিয়ে ফেলেছেন জয়া। এই ছবিতে তিনি ‘রাধা’, ‘ঠাকুর বলদেব সিং’-এর পুত্রবধূ। একমাত্র ‘ফ্লাশব্যাক’-এর সামান্য অংশ ছাড়া বাদবাকি ছবিতে তিনি একজন সাদা শাড়ি পরা স্নিগ্ধ শান্ত চরিত্রের বিধবা। ‘রাধা’ চরিত্রটা সম্ভবত শোলে-র সবচেয়ে সংযতভাবে নির্মিত চরিত্র। চিত্রনাট্যে জয়া বচ্চনের এই চরিত্রে সংলাপের থেকে তাঁর চোখের দৃষ্টি এবং সূক্ষ্ম অভিব্যক্তি ব্যবহারে জোর দেওয়া হয়েছে। জয়া ভাদুড়ির অভিনয়ের বড় শক্তি ছিল তাঁর নীরবতা। জয় ও রাধার সম্পর্কের বিকাশে সংলাপের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্ব পেয়েছে আলো, ছায়া, তাঁদের দৃষ্টি বিনিময় এবং নীরবতা।
জয় এবং রাধার গভীর অব্যক্ত সংযোগকে পর্দায় তুলে ধরতে আমরা দেখি। গোধূলি বেলায় জয় মোষের পিঠে চড়ে ঠাকুরবাড়ির দিকে ফিরছে এবং একই সময় রাধা ক্যামেরার ‘ফোর গ্রাউন্ড’ দিয়ে সিঁড়ি বেয়ে নেমে এসে দাঁড়ায়। আচম্বিতে দু’জনের দৃষ্টি বিনিময় হয়। নিঃশব্দে উচ্চারিত হয় সহস্র শব্দ।

ঠিক তার পরের দৃশ্যে রাধা দোতলার বারান্দায় একের পর এক বাতি নিভিয়ে দিচ্ছে। অন্যদিকে জয় তাঁর ঘরের দাওয়াতে বসে এক মনে হারমোনিকা বাজিয়ে চলেছে। এই দৃশ্যে সন্ধে থেকে রাত ক্রমশ গভীর হচ্ছে। ঠাকুর পরিবারের এক অসহায় বিধবা মহিলা এবং একজন পরিচয়হীন ছিঁচকে চোরের মধ্যে ধীরে ধীরে সম্পর্ক গড়ে উঠছে। সিনেমার এই দৃশ্য ফুটিয়ে তুলতে প্রয়োজন ‘ম্যাজিক আওয়ার’।
ফটোগ্রাফির ভাষায় সূর্যোদয় এবং সূর্যাস্তের ওই ক্ষণস্থায়ী সময়কে ‘ম্যাজিক আওয়ার’ বলা হয়। সূর্যোদয়ের সময় শুটিং করতে হলে মাঝরাত থেকে তার প্রস্তুতি আবশ্যক। সেই সময় জয়া বচ্চন অন্তঃসত্ত্বা থাকার দরুণ সিপ্পি সাহেব এবং দ্বারকাজি এই দৃশ্য শুটিং-এর জন্য বিকেলের ‘ম্যাজিক আওয়ার’কে বেছে নিয়েছিলেন। ফলে টানা কুড়িদিন ‘লাঞ্চ’-এর পর থেকে প্রস্তুতি নিয়ে এই দৃশ্য কুড়িটা ‘ম্যাজিক আওয়ার’-এ শুট করা হয়েছিল।
ছবির শুটিং শুরুর প্রথম দিকে ইউনিটের অনেকেই আমজাদ খানকে নিয়ে সন্দিহান ছিলেন। বিশেষ করে তাঁর গলার স্বর নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। সেলিম-জাভেদের মনে হয়েছিল আমজাদের গলার আওয়াজ গব্বর সিংয়ের মতো খলনায়ক হিসেবে বড্ড বেশি ‘পাতলা’ বা ‘খসখসে’ (gravelly voice)।
দ্বিতীয়তঃ তারকার বিপরীতে এক নবাগত
একদিকে জনপ্রিয় তারকাদের সঙ্গে থাকে প্রচার আর দর্শকদের ভালবাসা, অন্যদিকে খলনায়ককে একা তাঁর নিজের অভিনয় ক্যারিশমার জোরে লড়াই করে রূপোলি পর্দায় টিকে থাকতে হয়। ‘শোলে’র এই চাঁদের হাটের বিপরীতে দাঁড়িয়ে থাকা ‘গব্বর সিং’ চরিত্রের জন্য যখন কাস্টিং শুরু হয়, তখন পরিস্থিতি ছিল সম্পূর্ণ অন্যরকম। লেখক জুটি সেলিম-জাভেদ মূলত এই চরিত্রটা ভেবেছিলেন অভিনেতা ড্যানি ডেঞ্জংপা-র কথা মাথায় রেখে।
কিন্তু ড্যানি তখন ফিরোজ খানের ‘ধর্মাত্মা’ ছবির শুটিং-এর জন্য আফগানিস্তানে, ফলে তাঁর ফাঁকা ডেট পাওয়া গেল না। এরপর সেলিম খানের সুপারিশে ডাক পান থিয়েটারের ব্যাকগ্রাউন্ড থাকা নবাগত আমজাদ খান। চলচ্চিত্রে এর আগে মাত্র একটি ছবিতে (‘হিন্দুস্তান কি কসম’) অত্যন্ত ছোট একটি চরিত্র করেছিলেন তিনি, যা প্রায় কারও নজরেই আসেনি। ফলে এই ‘শোলে’-ই ছিল তাঁর প্রথম বড় ব্রেক।
ছবির শুটিং শুরুর প্রথম দিকে ইউনিটের অনেকেই আমজাদ খানকে নিয়ে সন্দিহান ছিলেন। বিশেষ করে তাঁর গলার স্বর নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। সেলিম-জাভেদের মনে হয়েছিল আমজাদের গলার আওয়াজ গব্বর সিংয়ের মতো খলনায়ক হিসেবে বড্ড বেশি ‘পাতলা’ বা ‘খসখসে’ (gravelly voice)। এমনকি একসময় আমজাদ খানকে বদলে অন্য কাউকে নেওয়ার কথাও ভাবা হয়েছিল। কিন্তু পরিচালক রমেশ সিপ্পি আমজাদের উপর ভরসা রাখেন।
এক্ষেত্রে আমজাদ খান প্রসঙ্গে আরও কয়েকটা কথা বলা প্রয়োজন। ‘গব্বর সিং’ চরিত্রে তিনি অভিনয়ের নিশ্চয়তা লাভ করেছিলেন ২০শে সেপ্টেম্বর অর্থাৎ শুটিং শুরুর মাত্র কয়েকদিন আগে। ২০৪ মিনিটের ছবিতে তাঁর মাত্র ন’টা সিন এবং মেরেকেটে ২০ মিনিটের উপস্থিতি। অথচ এই গব্বর সিং অন্যতম আইকনিক খলনায়ক এবং একজন ডাকাত, যে শুধুমাত্র চিত্রনাট্যের উপস্থাপনার মাধ্যমে এত জনপ্রিয় হয়। ‘গব্বর সিং’-কে দেখার আগে বাঙালি যুবসমাজে খৈনির এত কদর ছিল না!
ঠাকুরের বিরুদ্ধে গব্বরের প্রতিশোধ-আকাঙ্ক্ষাই এই ছবির কেন্দ্রীয় দ্বন্দ্ব। অথচ পর্দায় গব্বরকে প্রথম দেখা যায় ছবি শুরুর এক ঘণ্টারও বেশি সময় পরে। তাঁর দলের ব্যর্থতার পর পাথরের উপর শুধু গব্বর সিংয়ের পা পায়চারি করছে, আর নেপথ্যে ভেসে আসে সেই বিখ্যাত প্রশ্ন— ‘কিতনে আদমি থে?’
তৃতীয়তঃ তারকা বনাম একাকী গব্বর
আমজাদ খানকে একাই নিজের জায়গা তৈরি করে নিতে হয়েছিল। চরিত্রের খাতিরে ছবিতে বীরু বা জয়ের সঙ্গে গব্বরের কোনও মেলবন্ধন ছিল না, বরং ছিল চরম শত্রুতা। বিচ্ছিন্নতা ও চারিত্রিক গভীরতার প্রয়োজনে, অভিনয়ে সেই রুক্ষতা বজায় রাখতে আমজাদ খান নিজেকে আড়ালে রেখে অন্যদের অভিনয়ের প্রতি সজাগ দৃষ্টি রাখতেন।
ছবিতে তাঁর ময়লা সামরিক পোশাক, মুখে আধখোঁচা দাড়ি, তামাক চিবানোর বিশ্রী ভঙ্গি এবং হলুদ দাঁতের ক্রূর হাসি— সবটাই ছিল গতানুগতিক সুবেশ, চটকদার খলনায়কদের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। সঞ্জীব কুমারের মতো শক্তিশালী অভিনেতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে তাঁর হাত কেটে নেওয়ার দৃশ্যে, কিংবা অমিতাভ-ধর্মেন্দ্রের অ্যাকশনের সামনে আমজাদ যেভাবে নিজেকে ফুটিয়ে তুলেছিলেন, তা এককথায় অবিশ্বাস্য।

ঠাকুরের বিরুদ্ধে গব্বরের প্রতিশোধ-আকাঙ্ক্ষাই এই ছবির কেন্দ্রীয় দ্বন্দ্ব। অথচ পর্দায় গব্বরকে প্রথম দেখা যায় ছবি শুরুর এক ঘণ্টারও বেশি সময় পরে। তাঁর দলের ব্যর্থতার পর পাথরের উপর শুধু গব্বর সিংয়ের পা পায়চারি করছে, আর নেপথ্যে ভেসে আসে সেই বিখ্যাত প্রশ্ন— ‘কিতনে আদমি থে?’
মাত্র তিন শব্দের এই সংলাপ প্রাথমিকভাবে অতিনাটকীয় মনে হলেও, দর্শকমনে ভয় বিস্তার এবং গব্বরের ‘ভিলেনি’ চেহারা ফুটিয়ে তুলতে যথেষ্ট প্রয়োজনীয় ছিল। আমজাদ খানের শুটিং শুরু হয়েছিল এই নির্দিষ্ট দৃশ্য দিয়েই। প্রায় ছয় মিনিটের এই দৃশ্য শুটিং-এর জন্য তাঁকে মুম্বাই-বেঙ্গালুরু বেশ কয়েকবার যাতায়াত করতে হয়।
ছবিতে গব্বরকে দ্বিতীয়বার দেখা যায় হোলির গানের ঠিক পরপরই। গ্রামীণ মেলায় নাগরদোলা ঘিরে গুলালের রঙিন বৃষ্টির মধ্যে, গলায় ফুলের মালা পরা বীরু-বাসন্তীর নাচের তালে তালে, গ্রামবাসীর উদ্দাম আনন্দের বহিঃপ্রকাশের ফাঁকেই আমরা দেখি জয় ও রাধার নিঃশব্দ দৃষ্টি বিনিময়।
এই প্রসঙ্গে আরেকজনের নাম না বললেই নয়— ম্যাকমোহন। গব্বরের প্রশ্নের জবাবে ‘সাম্বা’ (ম্যাকমোহন) বলে ওঠে, ‘পুরে পচাশ হাজার’। মাঝে মধ্যে ঘোড়ায় বসে গব্বরের পাশে বা সঙ্গীদের সঙ্গে তাসের আসরেও তাঁকে দেখা যায়। এই সামান্য পরিমাণ উপস্থিতির জন্যও তাঁকে মোট সাতাশ বার মুম্বাই থেকে বেঙ্গালুরু যাতায়াত করতে হয়েছিল।
ছবিতে গব্বরকে দ্বিতীয়বার দেখা যায় হোলির গানের ঠিক পরপরই। গ্রামীণ মেলায় নাগরদোলা ঘিরে গুলালের রঙিন বৃষ্টির মধ্যে, গলায় ফুলের মালা পরা বীরু-বাসন্তীর নাচের তালে তালে, গ্রামবাসীর উদ্দাম আনন্দের বহিঃপ্রকাশের ফাঁকেই আমরা দেখি জয় ও রাধার নিঃশব্দ দৃষ্টি বিনিময়।
গান শেষ হতেই নাগরদোলার ছাউনিতে আগুন জ্বলে ওঠে (সিনেমার একটা সামান্য সামগ্রী এই নাগরদোলা, অথচ গানে এবং ফাইট সিনে ব্যবহারের ফলে অজান্তেই তা ছবির এক নাটকীয় মুহূর্ত সৃষ্টিকারী চরিত্র হয়ে ওঠে)। আগুন দেখেই দর্শক ধরে নেয়, এবার গ্রামবাসীর সামনে স্বয়ং গব্বর সিং হাজির হবে— কিন্তু বাস্তবে তেমনটা হয় না। শুরু হয় ডাকাত দলের সঙ্গে জয় ও বীরুর প্রায় তিন মিনিটের টানটান উত্তেজনাপূর্ণ সংঘর্ষ।
দর্শকমন থেকে গানের মেজাজ সম্পূর্ণ মুছে দিয়ে চিত্রনাট্য তাদের এক নতুন সংকটের মুখোমুখি দাঁড় করায়—নিরস্ত্র জয় নাগরদোলার মাঝে দাঁড়িয়ে, গব্বরের লোকেরা চারদিক থেকে তাঁকে ঘিরে রেখেছে; অন্যদিকে বীরুর হাতে পিস্তল থাকা সত্ত্বেও গুলি শেষ। ঠিক সেই মুহূর্তে লো অ্যাঙ্গেলে মিড-লং শটে গব্বর সিংকে আমরা প্রথম পর্দায় দেখতে পাই। ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে সম্ভবত প্রথমবার কোনও খলনায়ককে এভাবে দর্শকের সামনে উপস্থাপন করে তাঁকে ‘সুপারভিলেন’ মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করা হয়।
এই প্রসঙ্গে গব্বর যখন নিজের দলের ব্যর্থতা হাসিমুখে উদযাপন করে, অতিনাটকীয়তার চরমে পৌঁছে তিনটি গুলি ছুঁড়ে বলে ওঠে— ‘যো ডর গয়া, সমঝো মর গয়া’— তখন এই সংলাপও নিছক চিত্রনাট্য থেকে বেরিয়ে ভারতীয় জনপ্রিয় সংস্কৃতির শব্দভাণ্ডারের অংশ হয়ে যায়।
ছবিতে তৃতীয়বার গব্বরকে দেখা যায় হরিপুরে, যেখানে ঠাকুরের হাতে গব্বর ধরা পড়ে আর সঞ্জীব কুমারের মুখে শোনা যায় সেই বিখ্যাত সংলাপ— ‘ইয়ে হাত নেহি, ফাঁসি কা ফান্দা হ্যায়।’
মুক্তির প্রথমদিকে ‘শোলে’র সংলাপ নিয়ে সমালোচকদের একাংশ বেশ ধারালো মন্তব্য করেছিলেন— অযথা দীর্ঘ, অতিনাটকীয় ও মশলাদার এই সংলাপ দর্শকহৃদয়ে পৌঁছবে না বলেই তাঁরা দাবি করেছিলেন। কিন্তু পরে দর্শকের কাছে গ্রহণযোগ্যতা বাড়বার সঙ্গে সঙ্গে এই সংলাপগুলোই হয়ে ওঠে চিরন্তন প্রবাদবাক্য, যা আজও জনপ্রিয়তার শীর্ষে এবং ভারতীয় সংস্কৃতিতে গভীরভাবে প্রোথিত। অনেক সমালোচকের মতে, ‘বাসন্তী, ইন কুত্তোঁ কে সামনে মৎ নাচনা!’ সংলাপটি নারী জাতির প্রতি অসম্মানজনক এবং পিতৃতান্ত্রিক মানসিকতাকেই আরও স্পষ্ট করে তোলে।

তবে সমাজবিজ্ঞানীদের একাংশের মত, এই সংলাপ নারীর অবমাননাকে কেন্দ্র করে তৈরি হলেও দর্শকমনে গভীর আঘাত করে গব্বরকে আরও ঘৃণ্য, নিষ্ঠুর ও ভয়ংকর করে তুলতে সাহায্য করেছে। এই প্রসঙ্গে গব্বর যখন নিজের দলের ব্যর্থতা হাসিমুখে উদযাপন করে, অতিনাটকীয়তার চরমে পৌঁছে তিনটি গুলি ছুঁড়ে বলে ওঠে— ‘যো ডর গয়া, সমঝো মর গয়া’— তখন এই সংলাপও নিছক চিত্রনাট্য থেকে বেরিয়ে ভারতীয় জনপ্রিয় সংস্কৃতির শব্দভাণ্ডারের অংশ হয়ে যায়।
ছবির মাঝপথে সংলাপহীন এক দৃশ্যে আমরা গব্বরকে দেখি ঠাকুর পরিবারের মর্মান্তিক গণহত্যায়। আকাশ মেঘলা থাকায় এই দৃশ্যের শুটিং শেষ করতে তেইশ দিন সময় লেগেছিল। হত্যাদৃশ্যের মাঝে অত্যন্ত দক্ষতায় জুড়ে দেওয়া হয় ঠাকুরের বাড়ি ফেরার দৃশ্য। ঘোড়ায় বসে গব্বর বন্দুক তাক করে ঠাকুরের নাতি ‘দীপক’-এর (মাস্টার অলংকার) দিকে। কিন্তু গব্বরের গুলিতে শিশুর মৃত্যু সরাসরি না দেখিয়ে, অসাধারণ পরিচালনশৈলীতে কয়লার ইঞ্জিনের ধোঁয়ার সঙ্গে পরের দৃশ্য মিশিয়ে দেওয়া হয়।
পর্দায় এই দিকপাল বনাম নবাগতের লড়াইয়ের পরিণতি আজ চলচ্চিত্র ইতিহাসের অংশ। ‘কিতনে আদমি থে?’, ‘যো ডর গয়া, সমঝো মর গয়া’, ‘অরে ও সাম্বা’, ‘ইয়ে হাত হামকো দে ঠাকুর’— সেলিম-জাভেদের লেখা সংলাপগুলো আমজাদ খানের অসামান্য বাচনভঙ্গিতে এক অন্য মাত্রা পেয়েছিল।
এই প্রসঙ্গে আরেকটি দৃশ্যের কথাও বলতে হয়— গব্বর যখন ‘ইয়ে হাত হামকো দে ঠাকুর’ বলে চিৎকার করে তরোয়ালের কোপ মারে, ঠিক তখনই ফ্ল্যাশব্যাক থেকে ফিরে আমরা দেখি সঞ্জীব কুমারের পায়ের সামনে তাঁর গায়ের চাদর খুলে পড়ছে; ক্যামেরা টিল্ট-আপ ও ট্র্যাক-ব্যাক করতেই জয় ও বীরুর সঙ্গে দর্শকও প্রথমবার দেখতে পায়, ঠাকুর বলদেব সিংয়ের দুই হাতই কাটা।
ছবির আরেকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দৃশ্য— বৃদ্ধ ইমামের (এ. কে. হাঙ্গাল) ছেলে আহমেদের (সচিন) মৃত্যু দৃশ্য। গব্বর তখন নিজের ডেরায় উপুড় হয়ে শুয়ে কাঁচা মাংস ঝলসাচ্ছে। হঠাৎ সে লক্ষ করে তার ডান হাতে একটা পিঁপড়ে হেঁটে বেড়াচ্ছে। ঠিক তখনই নেপথ্যে কোনও সহচর আহমেদের পরিচয় দেয়, আর গব্বর সেই মুহূর্তেই হাতের পিঁপড়েটাকে এক ঝটকায় পিষে ফেলে। পরের দৃশ্যেই, ঘোড়ার পিঠে আহমেদের মৃতদেহ গ্রামের পথ ধরে এগিয়ে আসে। এই দৃশ্যগুলোতে ১৯৬৮ সালের ‘ওয়ান্স আপন আ টাইম ইন দ্য ওয়েস্ট’ ছবির স্পষ্ট প্রভাব লক্ষ্যণীয়।
চতুর্থঃ. চলচ্চিত্রের ইতিহাস ও চূড়ান্ত ফলাফল
পর্দায় এই দিকপাল বনাম নবাগতের লড়াইয়ের পরিণতি আজ চলচ্চিত্র ইতিহাসের অংশ। ‘কিতনে আদমি থে?’, ‘যো ডর গয়া, সমঝো মর গয়া’, ‘অরে ও সাম্বা’, ‘ইয়ে হাত হামকো দে ঠাকুর’— সেলিম-জাভেদের লেখা সংলাপগুলো আমজাদ খানের অসামান্য বাচনভঙ্গিতে এক অন্য মাত্রা পেয়েছিল। আজ নির্দ্বিধায় বলা যায়, এই সংলাপ ও উপস্থিতি ছবির নায়ক-নায়িকাদের জনপ্রিয়তাকেও একরকম ছাপিয়ে গিয়েছিল। গব্বরের সংলাপের আরেকটা বিশেষত্ব হল, সে শুধু মানুষকে ভয় দেখায় না, মানুষের মনস্তত্ত্ব নিয়েও খেলা করে।
‘শোলে’ মুক্তির পর প্রথম কয়েক সপ্তাহে নানা কারণে ছবির ব্যবসা কিছুটা মন্থর ছিল। কিন্তু যখনই ছবি গতি পেল, তখন ‘গব্বর সিং’ রাতারাতি এক ‘কাল্ট’ আইকনে পরিণত হল। ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, ভারতীয় চলচ্চিত্রে আমজাদ খানই সম্ভবত প্রথম খলনায়ক, যিনি খলচরিত্রে অভিনয় করেও বিভিন্ন বাণিজ্যিক পণ্যের বিজ্ঞাপনের মুখ হয়ে উঠেছিলেন। সে সময়ের শিশুদের কাছেও তাঁর সংলাপ তুমুল জনপ্রিয় হয়েছিল।
২০০৫ সালে পরিচালক রমেশ সিপ্পিকে ফিল্ম ফেয়ার বিশেষ সম্মান প্রদান করে। সে সময় ‘শোলে’র ভাগ্যে বড় পুরস্কার না জুটলেও, ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসকে অনেকে ‘শোলে’র আগের যুগ ও ‘শোলে’র পরের যুগ— এই দুই ভাগে ভাগ করে দেখেন।
১৯৭৬ সালের ফিল্ম ফেয়ার অনুষ্ঠানে ‘শোলে’ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিভাগে মনোনীত হলেও শেষ পর্যন্ত এম. এস. শিন্দে (শ্রেষ্ঠ চিত্রসম্পাদনা) একমাত্র পুরস্কার বিজয়ী হন। একই বছর কলকাতায় ‘বেঙ্গল ফিল্ম জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশন’ রাম ইয়েদেকরকে সেরা শিল্পনির্দেশক, দ্বরকা দ্বিভেচী সেরা মেরাম্যান এবং আমজাদ খানকে সেরা পার্শ্ব অভিনেতার সম্মানে ভূষিত করে।

২০০৫ সালে পরিচালক রমেশ সিপ্পিকে ফিল্ম ফেয়ার বিশেষ সম্মান প্রদান করে। সে সময় ‘শোলে’র ভাগ্যে বড় পুরস্কার না জুটলেও, ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসকে অনেকে ‘শোলে’র আগের যুগ ও ‘শোলে’র পরের যুগ— এই দুই ভাগে ভাগ করে দেখেন। ভারতীয় দর্শকের মনে আজও ‘শোলে’ গভীরভাবে গেঁথে আছে, আগামীতেও তা থাকবে বলেই ধারণা।
সব শেষে একথা বলতেই হয়, ‘শোলে’র এই কাস্টিং বিন্যাস প্রমাণ করে, সিনেমার পর্দায় প্রতিভার মাঝে জুনিয়র বনাম সিনিয়র বা তারকা বনাম নবাগতের অদৃশ্য দেওয়াল সবসময় থাকে না। ধর্মেন্দ্র, সঞ্জীব কুমার, অমিতাভ বচ্চন, জয়া বচ্চন, হেমা মালিনীর মতো মহীরুহদের সম্মিলিত উপস্থিতি সত্ত্বেও, একা আমজাদ খান তাঁর অসামান্য অভিনয়দক্ষতা ও পর্দা-উপস্থিতি (screen presence) দিয়ে ‘গব্বর সিং’ চরিত্রকে এমন এক উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন, যেখানে তিনি ছবির সব দিকপাল অভিনেতার সমকক্ষ। সর্বভারতীয় দর্শকমনে নিছক সিনেমার তারকা সত্তা অতিক্রম করে ‘গব্বর সিং’কে তিনি পরিণত করেছেন এক কিংবদন্তি চরিত্রে।
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত