(Deshvikharir Jamijiret 7)
‘চীনের চেয়ারম্যান আমাদের চেয়ারম্যান’— এই ঘোষণা প্রলয়দাকে ক্ষিপ্ত করেছিল৷ আমরা নিক্ষিপ্ত হয়েছিলাম তাঁর সম্পর্ক থেকে দূরে৷ সেদিনের এই ঘটনা ভাবতে গিয়ে মনে পড়ল আরেকটি রাজনৈতিক বয়ান— ‘দুই ককুরের লড়াই’৷ পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালির মুক্তিযুদ্ধকে এভাবে চিহ্নিত করার ফলে নকশালপন্থী রাজনীতির কর্মীরা অনেকে প্রলয়দার তথা এপারের বাঙালির রোষের মুখে পড়েছিলেন৷ আমার অভিজ্ঞতা সেরকমই বলে৷ ‘একটা দেশ স্বাধীনতার জন্য লড়াই করছে, প্রাণ দিচ্ছে, তাকে কুকুরের লড়াই বলবে? তোমাদের বোধবুদ্ধির অভাব আছে৷ নিজেরা ভাবতে জানো না৷ কোনও এক ভিনদেশের নেতাদের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকো৷’
আরও পড়ুন: দেশভিখারির জমিজিরেত পর্ব ১, পর্ব ২, পর্ব ৩, পর্ব ৪, পর্ব ৫, পর্ব ৬
পূর্ববাংলার মুক্তিযুদ্ধকে দুই কুকুরের লড়াই কেন বলা হবে? কোনও এক ওপর মহল থেকে যে ব্যাখ্যা শেখানো হয়েছিল তা হল, দুই কুকুর মানে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ এবং সোভিয়েত সামাজিক সাম্রাজ্যবাদ৷ সামাজিক সাম্রাজ্যবাদের মদতে ভারতীয় সম্প্রসারণবাদ অখণ্ড পাকিস্তানকে ভাঙতে চাইছে, তথাকথিত মুক্তিযুদ্ধের আড়ালে ভারত পূর্ব পাকিস্তানে আধিপত্য কায়েম করতে চাইছে৷ পাকিস্তানের অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার স্বার্থে এই চক্রান্ত ব্যর্থ করতেই হবে৷ এই ব্যাখ্যা অন্তত আমার কাছে স্পষ্ট ছিল না৷ তাই প্রশ্ন উঠলে পালিয়ে বেঁচেছি৷
চোখের সামনে যখন দেখি, একটি দেশের মানুষ ঔপনিবেশিক শাসন ও শোষণ থেকে মুক্তির জন্য যুদ্ধ করছে, শহিদ হচ্ছে, বুকের রক্ত ঢেলে স্বাধীনতার সূর্যোদয় ঘটাতে চাইছে, কীভাবে সেই যুদ্ধকে ‘দুই কুকুরের লড়াই’ বলি? যে যুদ্ধে দুই বাংলার বাঙালি সহযোদ্ধা হয়ে যায়, দুই ভূখণ্ডের আকাঙ্ক্ষা একটি ভাষাদেশের স্বপ্ন তুলে ধরে, দেশভাগের যন্ত্রণা পেরিয়ে একটি জনগোষ্ঠী ধর্মসম্প্রদায়ের ঊর্ধ্বে উঠে যৌথযাপনের পরিসর পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে চায়, সেই যুদ্ধকে কীভাবে ভারতীয় সম্প্রসারণবাদ বলে দাগিয়ে দেওয়া যায়?

এটা ঘটনা, এত গুছিয়ে ভাবতে তখনও শিখিনি৷ দেখেছি, মুক্তিযুদ্ধে সাহায্যের জন্য অর্থসংগ্রহ হচ্ছে বস্তির পাড়ায় পাড়ায়৷ প্রাণ বাঁচাতে লক্ষ লক্ষ মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে আশ্রয় নিয়েছেন ভারত তথা পশ্চিমবঙ্গের সীমান্তে৷ তাঁদের জন্য ত্রাণ নিয়ে আশ্রয় শিবিরে যাচ্ছেন স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী৷ বিভিন্ন এলাকায় গঠিত হচ্ছে সংহতি সমিতি৷
হেমন্ত মুখোপাধ্যায় গাইছেন ‘মাগো, ভাবনা কেন,/আমরা তোমার শান্তিপ্রিয় শান্ত ছেলে/শত্রু এলে অস্ত্র হাতে ধরতে জানি’, ‘এ দেশের মাটির পরে/অনেক জাতির অনেকদিনের লোভ আছে,/এ কথা ইতিহাস বলে/এ মাটি সোনার মাটি’; গাইছেন সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়, নির্মলেন্দু চৌধুরী, ভূপেন হাজারিকা; নতুন নতুন গান রচিত হচ্ছে, সলিল চৌধুরী লিখছেন; বেতারে প্রণবেশ সেনের ‘সংবাদ পরিক্রমা’ এবং উপেন তরফদারের ‘সংবাদ পরিক্রমা’ জানাচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের খবর; ‘টাকডুম টাকডুম বাজাই বাংলাদেশের ঢোল’ গানে শচীন দেববর্মণ সংযোজন করেন ‘বিসর্জনের ব্যথা ভোলায় আগমনীর খুশিতে৷’ প্রকাশিত হচ্ছে ছোট পত্রিকা ও পুস্তিকা মুক্তিযুদ্ধের আবেগের সহমর্মী হয়ে৷
‘দুই কুকুরের লড়াই’-এর তত্ত্বের উৎস খুঁজি অনেক পরে, তখন নকশালবাড়ির রাজনীতি নিয়ে ডকুমেন্টেশেনের কাজ করছি৷ জানতে পারি, এটা ছিল অসীম চট্টোপাধ্যায় তথা কাকাদের লাইন৷ পিকিংয়ের আন্তর্জাতিক রাজনীতির বিশ্লেষণ অনুসারে৷
একই সময়ে দক্ষিণ কলকাতায় দেওয়াল লিখন দেখেছি ‘মুক্তিযুদ্ধ নয়, এটা দুই কুকুরের লড়াই’, ‘সম্প্রসারণবাদী ভারত পাকিস্তান থেকে হাত ওঠাও’, ‘পাকিস্তানকে ভাঙার চক্রান্ত রুখছি রুখব’ ইত্যাদি৷ স্লোগানগুলির নিচে লেখা থাকত সিপিআই এমএল৷
শুনেছি, নকশালপন্থী আন্দোলনের অগ্রবর্তী অঞ্চল বীরভূমে পোস্টার পড়েছিল ‘ইয়াহিয়া খান লাল সেলাম’৷ ইয়াহিয়া তখন পাকিস্তানের রাষ্ট্রপ্রধান৷ বাংলাদেশের বিশিষ্ট চিন্তাবিদ আহমদ ছফা এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হবার পরে আমি পশ্চিমবাংলায় ছিলাম৷ সেসময় পশ্চিমবাংলার বিভিন্ন জায়গায় দেওয়ালে দেখেছি সিপিআই (এমএল)-এর পক্ষে শেখ মুজিব ও মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে নানা রাজনৈতিক স্লোগান লেখা রয়েছে৷’

এটাও ঘটনা, ওপার বাংলার মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে উচ্ছ্বাসে চাপা পড়ে যায়, গৌণ হয়ে যায় এপার বাংলার গ্রামশহরে প্রতি রাতে রাষ্ট্রীয় দমন পীড়নে মৃত্যু উপত্যকা হয়ে ওঠার করুণতম বৃত্তান্ত— কোন্নগর, বরানগর-কাশীপুর, ডায়মন্ডহারবারের গণহত্যা, জেলে জেলে বিপ্লবী যুবকদের পিটিয়ে মারা৷
‘দুই কুকুরের লড়াই’-এর তত্ত্বের উৎস খুঁজি অনেক পরে, তখন নকশালবাড়ির রাজনীতি নিয়ে ডকুমেন্টেশেনের কাজ করছি৷ জানতে পারি, এটা ছিল অসীম চট্টোপাধ্যায় তথা কাকাদের লাইন৷ পিকিংয়ের আন্তর্জাতিক রাজনীতির বিশ্লেষণ অনুসারে৷
বীরভূমে যে পাকিস্তানের স্বৈরশাসক ইয়াহিয়া খানকে লাল সেলাম জানিয়ে পোস্টার পড়েছিল, এবার তার নেপথ্য-কাহিনি জানা গেল৷ এই প্রচারপত্রের শিরোনামও কি ছিল ‘দুই কুকুরের লড়াই’?
পরে, অসীম চট্টোপাধ্যায়ের ‘নকশালবাড়িনামা’ গ্রন্থে পাই, ‘পিকিং রিভিউ-য়ে সম্ভবত নয় নম্বর সংখ্যায় একটি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়— What the Indian Expansionists are trying to do, ভারতীয় সম্প্রসারণবাদীরা কী করতে চেষ্টা করছে৷
এই প্রবন্ধে চিনের পার্টি পরিষ্কারভাবে ঘোষণা করে যে, ভারতীয় সম্প্রসারণবাদীরা পাকিস্তানের অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্বের পরোয়া না করে বাংলার মুক্তিযুদ্ধের নামে পাকিস্তানকে দ্বিখণ্ডিত করার অপচেষ্টা করছে৷ সকল বামপন্থীদের ও গণতান্ত্রিক মানুষজনের এই অপচেষ্টার বিরোধিতা করা উচিত এবং পাকিস্তানের সার্বভৌমত্বের ন্যায় সংগ্রামে পাকিস্তানকে সমর্থন করা উচিত৷ আমরা চিনের পার্টির অবস্থানকে সমর্থন করে একটি প্রচারপত্র প্রকাশ করি ও বিলি করি৷’

বীরভূমে যে পাকিস্তানের স্বৈরশাসক ইয়াহিয়া খানকে লাল সেলাম জানিয়ে পোস্টার পড়েছিল, এবার তার নেপথ্য-কাহিনি জানা গেল৷ এই প্রচারপত্রের শিরোনামও কি ছিল ‘দুই কুকুরের লড়াই’? সিপিআইএমএল-এর মুখপত্র ‘দেশব্রতী’-তে এই লাইনের বিরোধিতা করা হয়৷ অসীম চ্যাটার্জিদের লাইন সঠিক বলে মনে করেনি পার্টি-নেতৃত্ব৷ তবু স্লোগানের নিচে পার্টির নাম থাকত৷
অসীম চ্যাটার্জির এককালের সহযোদ্ধা সন্তোষ রাণা এই প্রসঙ্গে কিছু বলেছেন কি না জানতে তাঁর আত্মকথা ‘রাজনীতির এক জীবন’ পড়ি৷ সেখানে পাই, ‘পূর্ববাংলার মুক্তিসংগ্রামের প্রশ্নে আমাদের দলিলে (বাংলা-বিহার-ওড়িশা সীমান্ত আঞ্চলিক কমিটির দলিল) কিছু ভুল অবস্থান ছিল৷ চিনা সরকার আন্তর্জাতিক রীতিনীতির প্রশ্ন তুলে ভারতীয় সম্প্রসারণবাদের বিরোধিতা করেছিল এবং ‘পাকিস্তানের ঐক্য ও অখণ্ডতা রক্ষার’ সংগ্রামে পাকিস্তানকে সমর্থন করেছিল৷
পুববাংলার মুক্তিযোদ্ধাদের একটি অংশও চিনের লাইনের অনুসারী ছিল৷ সেদিনের পরিস্থিতি জেনে নিতে আমার বইয়ের গোডাউন (লাইব্রেরি সাজাবার জায়গা নেই, সামর্থ্য নেই) থেকে একটি বই খুঁজে বের করি৷ শরদিন্দু দস্তিদারের ‘জীবনস্মৃতি’৷ লেখক পূর্ব পাকিস্তানের বাম রাজনীতিতে আমৃত্যু সক্রিয় অগ্রণী নেতা৷
আমাদের দিক থেকে ভারতীয় সম্প্রসারণবাদ ও ভারতীয় হস্তক্ষেপের বিরোধিতা করার লাইন সঠিক ছিল৷ কিন্তু পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করার কোনও যুক্তি ছিল না৷ চারু মজুমদারের নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় কমিটি আওয়াজ তুলেছিল ‘পূর্ববাংলার জনগণের মুক্তিসংগ্রামের পাশে দাঁড়াও, ভারতীয় হস্তক্ষেপের বিরোধিতা কর৷’ এই স্লোগানই সঠিক ছিল৷’
চারু মজুমদার ছোট একটি লেখায় সেদিন স্পষ্ট করে বলেছিলেন, ‘দরিদ্র মানুষের পূর্ববাংলা যেমন সোনার বাংলা গড়ে তুলবে, তেমনি দরিদ্র মানুষের পশ্চিমবাংলাও গড়ে তুলবে সোনার বাংলা৷’

পুববাংলার মুক্তিযোদ্ধাদের একটি অংশও চিনের লাইনের অনুসারী ছিল৷ সেদিনের পরিস্থিতি জেনে নিতে আমার বইয়ের গোডাউন (লাইব্রেরি সাজাবার জায়গা নেই, সামর্থ্য নেই) থেকে একটি বই খুঁজে বের করি৷ শরদিন্দু দস্তিদারের ‘জীবনস্মৃতি’৷ লেখক পূর্ব পাকিস্তানের বাম রাজনীতিতে আমৃত্যু সক্রিয় অগ্রণী নেতা৷
সেদিনের স্মৃতিচারণায় তিনি লিখেছেন, আবদুল হক (পূর্ব পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টি মার্কসবাদী-লেনিনবাদীর শীর্ষস্থানীয় নেতা) তখন কেন্দ্রীয় কমিটির কাছে একটি বিরাট দলিল মারফত জোর বক্তব্য হাজির করলেন, এ যুদ্ধ স্বাধীনতা যুদ্ধ নয়, এ হচ্ছে পাক সরকার এবং রুশ-ভারত সমর্থিত মুক্তিবাহিনীর যুদ্ধ৷ কার্যত এটা হচ্ছে দু-দেশের শোষক গোষ্ঠীর মধ্যকার যুদ্ধ৷ আবদুল হক তার নামকরণ করেন ‘দুই কুকুরের লড়াই’৷ তবে কি আবদুল হকের দলিল থেকে এই তত্ত্বায়ন এ বাংলায় এসেছিল?
এমনি অন্ধভাবে (অন্য দেশের কমিউনিস্ট পার্টির) বক্তব্য ও মূল্যায়নকে গ্রহণ করে নিজ দেশের অবস্থা বিচার করাটা সঠিক পথের সন্ধান সবসময় দেয় না৷’
শরদিন্দু দস্তিদার বলছেন, একসময় মস্কোর সাপ্তাহিক ‘নিউ টাইমস’ এবং পরে ‘পিকিং রিভিউ’ পড়ে পূর্ব পাকিস্তানের কমিউনিস্ট নেতারা নীতি নির্ধারণ করেছেন৷ ‘এমনি অন্ধভাবে (অন্য দেশের কমিউনিস্ট পার্টির) বক্তব্য ও মূল্যায়নকে গ্রহণ করে নিজ দেশের অবস্থা বিচার করাটা সঠিক পথের সন্ধান সবসময় দেয় না৷’
একই অন্ধতায় আক্রান্ত হয়নি কি আমাদের দেশের কমিউনিস্ট পার্টিগুলিও?
তথ্যঋণ:
দেশভাগ: বাংলা ও বাঙালি— সম্পাদনা কেশব মুখোপাধ্যায়
নকশালবাড়িনামা— অসীম চট্টোপাধ্যায়
রাজনীতির এক জীবন— সন্তোষ রাণা
চারু মজুমদারের রচনা সংগ্রহ
জীবনস্মৃতি— শরদিন্দু দস্তিদার
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
