(Deshvikharir Jamijiret 5)
প্রেসে টানা কাজ করেছি বছর দশেকের কিছু বেশি৷ ১৯৭২-এ ভদ্রেশ্বরে আসার পর থেকে ১৯৮৩-র মাঝামাঝি৷
এত দৈন্য, এত দারিদ্র্য, অভাব অনটন সত্ত্বেও এতগুলো বছর কেন প্রেসে পড়ে থাকলাম? নিজেকে প্রশ্ন করি৷ উত্তর পাই: এক, কোনও কাজ জোটাতে পারিনি সেদিন, যার উপর নির্ভর করে বেরিয়ে আসা যায়৷ সরকারি চাকরির জন্য যে প্রস্তুতি লাগে, তার অবকাশ ছিল না প্রেসের চাপে৷ ‘চাপ’ই বলব, কেন না আমি না গেলে আমার পিতৃদেবের কঠিন কঠোর বাণীঝঞ্ঝা আছড়ে পড়ত মায়ের উপর৷
আরও পড়ুন: দেশভিখারির জমিজিরেত পর্ব ১, পর্ব ২, পর্ব ৩, পর্ব ৪
তবু দুটো পরীক্ষায় বসেছি৷ একটা হয়নি অ্যাকাডেমিক রেজাল্ট ‘পুওর’ বলে৷ আরেকটা থেকে ছিটকে দিয়েছে পার্টিবাজি৷ লেখা পরীক্ষায় ফল ভালই হয়েছিল, ইন্টারভিউয়ের চিঠি এসেছিল নির্দিষ্ট তারিখের দুদিন পরে, মহাকরণ থেকে৷ খোঁজ নিয়ে জেনেছি, চাকরিটা এক ক্যাডারের জন্য বরাদ্দ ছিল৷ পরীক্ষা-ইন্টারভিউ সব আইওয়াশ৷
দুই, খুচরো কাজ কিছু করেছি, যা আজ আছে কাল নেই৷ পেমেন্ট অনিয়মিত এবং অঙ্কটা বলবার মতো নয়৷ একটা নামী প্রকাশন সংস্থা রুশ দেশের বই অনুবাদ করাতেন৷ ইংরেজি থেকে বাংলা৷ অর্থনীতি, সমাজতত্ত্ব, আন্তর্জাতিক রাজনীতি, মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী চক্রান্ত, উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে দেশে দেশে লড়াইয়ের বৃত্তান্ত ইত্যাদি বিষয়৷

ইংরেজি বইয়ের একেকটি পৃষ্ঠায় গড়ে ৬০০ শব্দ (১৫ শব্দ X ৪০ লাইন) থাকত৷ যাকে বলে ঠাসা কম্পোজ৷ এক পৃষ্ঠা অনুবাদ করে পাওয়া যেত আড়াই বা তিন টাকা৷ পার্ক স্ট্রিটের উপর বিশাল সুসজ্জিত বিপণি৷ মালিকপক্ষ চ্যাটার্জি দম্পতি৷ বামপন্থী ঘরানার পরিশীলিত কথাবার্তা৷ অনুবাদের টাকা পাওয়ার জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকেছি আলোকোজ্জ্বল বিপণির দরজায় হাফ-ভিখিরির মতো৷
মিসেস চ্যাটার্জি মিটিংয়ে ব্যস্ত৷ বিখ্যাত এক নেতা এসেছেন৷ মিসেস চ্যাটার্জির আজ শরীর খারাপ৷ কারও সঙ্গে দেখা করছেন না৷ এদের ভরসায় কি প্রেসে যাওয়া বন্ধ করা যায়? অনেক পরে, তখন চাকরি করি, আয়কর বিভাগের তলবে তাদের দপ্তরে গিয়ে জেনেছি, এই অনুবাদ বাবদ প্রগতি প্রকাশন তথা রুশ কর্তৃপক্ষের কাছে পার্ক স্ট্রিটের এই প্রকাশনাটি অনেক অনেক বেশি টাকা পেতেন৷ অনুবাদকদের দিতেন যৎকিঞ্চিৎ৷ সেসব অনুবাদ কোথায় যেত, কে পড়ত কে জানে৷ কোনও অশুভ চক্র ছিল হয়তো৷
আরও একটা কথা, কলকাতা থেকে ভদ্রেশ্বরের দূরত্বকে একদিন যিনি হেসে উড়িয়ে দিয়েছিলেন, সেই পিতৃদেব এবার সিদ্ধান্ত নিলেন ‘ডেলি প্যাসেঞ্জারি অসম্ভব’ এবং প্রেসের খুপরি ঘরেই তাঁর থাকা-শোয়ার ব্যবস্থা করলেন৷ বাড়ি থেকে ভাত টানার দায়িত্ব পড়ল আমার উপর এবং সেটা বছরের পর বছর৷
তিন, বোকার মতো শোনালেও এটা ঘটনা যে, আমি একটা অভ্যাসের খাঁচায় পড়ে গিয়েছিলাম, যেখান থেকে বেরিয়ে আসার সাহস ছিল না৷ তবু তো চলে যাচ্ছে যা হোক, বেরিয়ে এলে পরিবারের খাওয়াটা যদি ভেঙে পড়ে৷ অনিশ্চয়ের আনুগত্য৷ ভয়ের আনুগত্য৷ বাঘও খেলা দেখায়, আমি তো ছার৷ সেটা তৈরি করতে পেরেছিলেন আমার পিতৃদেব৷
আরও একটা কথা, কলকাতা থেকে ভদ্রেশ্বরের দূরত্বকে একদিন যিনি হেসে উড়িয়ে দিয়েছিলেন, সেই পিতৃদেব এবার সিদ্ধান্ত নিলেন ‘ডেলি প্যাসেঞ্জারি অসম্ভব’ এবং প্রেসের খুপরি ঘরেই তাঁর থাকা-শোয়ার ব্যবস্থা করলেন৷ বাড়ি থেকে ভাত টানার দায়িত্ব পড়ল আমার উপর এবং সেটা বছরের পর বছর৷

মনে পড়ে, রাত ১১টার কিংবা লাস্ট ট্রেন, ডিসেম্বর কি জানুয়ারি, প্রচণ্ড শীত, বাড়ি ফিরছি অলক, বিমল, ফিরোজদের সঙ্গে, এরা টেলিভিশন টেকনিশিয়ান (তখন কলকাতায় ঘরে ঘরে টিভি ঢুকছে), অনুজ বন্ধু, সবার গায়ে জম্পেশ গরম জামা, কারও মাথায় টুপি, হাতে গ্লাভস, আমার পরনে একটা গেঞ্জি ও হাফ-হাতা শার্ট। ফিরোজ বলল ‘আপনার ঠাণ্ডা লাগে না?’, বিমল জবাব দিল ‘টাকার গরম’! ট্রেন থেকে নেমে ব্যাগ খুলে দিদিমার জীর্ণ শাল গায়ে দিই, যা ১৯৫২ সালে পূর্ব পাকিস্তান থেকে এসেছিল৷
এই দেশভিখারির জীবনের প্রেস-পর্বে একটা প্রেম-পর্ব আছে৷
ফলে ঘর যেমন হওয়ার তেমনই হয়েছে৷ কাটমানি ঈশ্বরের মতো সর্বত্র ও সর্বকালে বিরাজমান৷ ডোবার পেটে অর্ধেকটা যাওয়ার পর জেগে থাকা আড়াই কাঠা জমিতে গাছগাছালি৷ দুটো কাঁঠাল, একটা বেল, একটা বাতাবিলেবু, একটা পেয়ারা, আর একটা আমগাছ৷ পেয়ারা খেতে টিয়ার দল আসে ভোরবেলা৷
প্রুফ রিডিং যখন শুরু হয়, তখন সে বালক৷ ভদ্রেশ্বরে যখন আসে, তখন ২০ বছরের যুবক৷ বিপ্লবী রাজনীতি তাকে এতই বিপন্ন করে যে প্রেসে লুকিয়ে থাকা মন্দের ভাল বলে পছন্দ করে নেয়৷ কলকাতা ছাড়তে বাধ্য হওয়ার পর মাসখানেকের মতো ঘরেই থাকে৷
দেড় কামরার ঘর৷ সব মিলিয়ে দশ ফুট বাই পনেরো ফুট৷ মাথায় অ্যাসবেস্টস, টিনের ছোটো দুটো জানালা৷ ঘেঁসের গাঁথনি৷ প্লাস্টার নেই৷ বাথরুম নেই৷ কুয়ো পায়খানা ঘর থেকে দূরে৷ জানা যায়, রিফিউজিদের ঘর বানাবার জন্য সরকারের তরফে যে টাকা দেওয়া হয়েছিল, তার আধাআধি মেরে দিয়েছেন কলোনির মাতব্বর ও ঠিকেদাররা৷

ফলে ঘর যেমন হওয়ার তেমনই হয়েছে৷ কাটমানি ঈশ্বরের মতো সর্বত্র ও সর্বকালে বিরাজমান৷ ডোবার পেটে অর্ধেকটা যাওয়ার পর জেগে থাকা আড়াই কাঠা জমিতে গাছগাছালি৷ দুটো কাঁঠাল, একটা বেল, একটা বাতাবিলেবু, একটা পেয়ারা, আর একটা আমগাছ৷ পেয়ারা খেতে টিয়ার দল আসে ভোরবেলা৷ কলকাতায় যে কোলাহলে বড় হয়েছি, সেটা আর নেই৷
পাশের বাড়ির গোয়ালঘরে ধুপধাপ৷ ডোবায় কাপড় কাচা৷ আর কিছু খুচরো শব্দ৷ দুপুর কাটে বই পড়ে, যে দু-চারটে সঙ্গে আনা গিয়েছিল৷ বিকেল ফুরোতে না ফুরোতে ঝাঁকে ঝাঁকে মশা এবং একটা হ্যারিকেন তক্তপোশের উপর৷ একটা কুপি রান্নাঘরে৷ সন্ধে থেকে যুবক রাত সাড়ে নটা/দশটা পর্যন্ত উঠোনে আর বাড়ির সামনে লম্বা রাস্তা ধরে হাঁটে একা৷
বন্ধুদের লিটল ম্যাগাজিন এল৷ মৃণাল নাথের ‘ভাষা’, সমীর দে রায়ের ‘পিলসুজ’ মনে পড়ছে৷ সজল বন্দ্যোপাধ্যায়ের কবিতার বই ‘পিকাসোর নীল জামা’ ছাপা হল৷ লিটল ম্যাগাজিনের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি হয় তখনই৷ দেব সাহিত্য কুটিরের বেশ কয়েকটি উপন্যাস ও গল্পের বই ছাপা হয়েছিল৷
রোডলাইট আছে টিমটিম, কয়েকটা ঘরের জানালায় বিদ্যুৎ, বাকি পাড়া অন্ধকার, নদীবক্ষে টুকরো টুকরো আলো৷ অগত্যা চরম বিরক্তি নিয়ে মশারির ভেতরে ঢুকে পড়া, উনুন-কড়ার পাশে একটুখানি মেঝেয়৷ এই কুৎসিত বেঁচে থাকা তাকে অস্থির করে৷ তাছাড়া, এই ঘরে বসে খাওয়ার একটি দিনও গঞ্জনাহীন ছিল না৷ থাকে কীভাবে!
সে প্রেসে যাওয়া শুরু করে৷ কাজ শেখে৷ এমএ পরীক্ষায় বসার প্রস্তুতি নেয়৷ এবং বলতে ভাল লাগে, বছর দুয়েকের মধ্যে সে এমএ হল, মার্কস যদিও বলবার মতো নয়, ঘরে বিদ্যুৎ এল, জব কাজের ম্রিয়মাণ দিনযাপন থেকে বেরিয়ে এল বাসুদেব প্রিন্টিং ওয়ার্কস৷ বইয়ের কাজ, ম্যাগাজিনের কাজ, সুভেনিরের কাজে প্রেস একটা অন্য চেহারা পেল৷
অপ্রেম থেকে প্রেমে যাওয়ার পর্ব এটাই৷ মুরলীধর গার্লস কলেজ, বাটানগর গার্লস হাই স্কুল, বেলঘরিয়া দেশপ্রিয় বিদ্যানিকেতন ফর গার্লসের ম্যাগাজিন ছাপার বরাত এল৷ চিত্তরঞ্জন লোকোমোটিভ ওয়ার্কস রিক্রিয়েশন ক্লাবের সুভেনির৷ রাউরকেলা থেকেও একটি ক্লাবের ম্যাগাজিন ছাপা হাতে আসে৷ নেত্রকোণা সম্মিলনীর বার্ষিক পত্রিকা, কোটালিপাড়া সম্মিলনীর পত্রিকা, আরও বেশ কয়েকটি৷
বন্ধুদের লিটল ম্যাগাজিন এল৷ মৃণাল নাথের ‘ভাষা’, সমীর দে রায়ের ‘পিলসুজ’ মনে পড়ছে৷ সজল বন্দ্যোপাধ্যায়ের কবিতার বই ‘পিকাসোর নীল জামা’ ছাপা হল৷ লিটল ম্যাগাজিনের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি হয় তখনই৷ দেব সাহিত্য কুটিরের বেশ কয়েকটি উপন্যাস ও গল্পের বই ছাপা হয়েছিল৷
কালি আর কেরোসিনের গন্ধ, গুমোট বাতাস, আধো-অন্ধকার, কর্মীরা যেন চিনের ‘খাজনা আদায়ের কাছারিবাড়ি’ থেকে উঠে আসা একেকটি আর্তমূর্তি৷ বাংলা সংস্কৃতির মর্মান্তিক কর্মশালা৷ এরপর বাঁধাইখানা বা দপ্তরিপাড়া৷ পাটোয়ারবাগান, অ্যান্টনিবাগান, সীতারাম ঘোষ স্ট্রিট জুড়ে এক ছবি৷
এসব ছাপা হত ফ্ল্যাটবেড মেশিনে, যা আমাদের ছিল না৷ ছাপার জন্য ম্যাটার নিয়ে যেতে হত আমহার্স্ট স্ট্রিট, সুকিয়া স্ট্রিট, ঝামাপুকুর লেন, গুরুপ্রসাদ চৌধুরী লেনে৷ গালিতে ম্যাটার নিয়ে টানা রিকশায় ছোটা প্রায় রোজ৷ ছাপা হলে ম্যাটার নিয়ে আসা৷ সেসব উদ্দাম প্রেমের দিন৷ মধ্য কলকাতার অলিগলির ভাঁজে ভাঁজে ছাপাখানা আবিষ্কার তখনই৷
কালি আর কেরোসিনের গন্ধ, গুমোট বাতাস, আধো-অন্ধকার, কর্মীরা যেন চিনের ‘খাজনা আদায়ের কাছারিবাড়ি’ থেকে উঠে আসা একেকটি আর্তমূর্তি৷ বাংলা সংস্কৃতির মর্মান্তিক কর্মশালা৷ এরপর বাঁধাইখানা বা দপ্তরিপাড়া৷ পাটোয়ারবাগান, অ্যান্টনিবাগান, সীতারাম ঘোষ স্ট্রিট জুড়ে এক ছবি৷ বাংলার লেখক-কবি-সংস্কৃতিকর্মীরা ‘অন্ন দে মা’ ডাকে৷ বাংলার কৃষিজীবী সম্প্রদায় আধমরা হয়ে বাঁচে৷ ঠিকঠাক বুঝেছি অনেক পরে, তবে শুরুটা সেই সময়েই৷

বরুণ মুখোপাধ্যায় লিখেছেন, ‘লাইনো প্রবর্তনের (১৯৩৫) তেতাল্লিশ বছর পরেও অধিকাংশ বাংলা বই হাতে কম্পোজ করা হয়৷ [১৯৭৮ সালের কথা বলা হচ্ছে৷] কারণ বাংলা বইয়ের চাহিদা অল্প, অল্পসংখ্যক কপি ছাপা হয়৷ বেশি কপি একসঙ্গে না ছাপলে যান্ত্রিক কম্পোজে ব্যয় বেশি পড়ে৷ তাছাড়া চড়া দামে বিদেশি যন্ত্র কেনার সামর্থ্যই বা কটি ছাপাখানার আছে?’ অর্থাৎ একদিকে বাজারের অভাব, অন্যদিকে পুঁজির অভাব৷ অনিবার্য ফল, ক্ষুধার সহবাস৷ আজ হ্যান্ডকম্পোজ বিলীন হয়ে গেছে৷ প্রযুক্তির উন্নতি হয়েছে৷ বাংলা মুদ্রণ ও প্রকাশনার সঙ্গে জড়িত মানুষজনের কপাল ফিরেছে কি?
অলীক প্রেমের সেই মোহমধুর পর্বের একটি ঘটনা বলি৷ বহুভাষাবিদ আচার্য হরিনাথ দে’র জীবনীগ্রন্থ প্রকাশ করবে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনামূলক ভাষাতত্ত্ব বিভাগ৷ বরাত পাওয়া গেল৷ বিভাগীয় প্রধান ছিলেন দ্বিজেন্দ্রনাথ বসু, যতদূর মনে পড়ে৷ তিনি বললেন, কাজটা যত্ন নিয়ে এবং তাড়াতাড়ি করে দিতে হবে৷ ওঁরা ফাইনাল প্রুফ দিলেন বইপ্রকাশ অনুষ্ঠানের দু’দিন আগে৷ মনে পড়ে, অনুষ্ঠানের আগের দিন সারারাত ধরে ছাপা হয়েছে৷ কেশব সেন স্ট্রিটের পচা গলির প্রেসে৷ অঝোর বৃষ্টি সারারাত৷
সুবোধ চৌধুরীর বন্ধু ছিলেন অদ্বৈত মল্লবর্মণ৷ ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ উপন্যাসের ভূমিকা সুবোধ চৌধুরীর লেখা৷ তিনিই আমাকে ‘তিতাস’ পড়িয়েছেন৷ কলকাতায় ঠাঁই নেওয়া তিতাস পাড়ের উদবাস্তুদের সাহায্য করার জন্য অদ্বৈত মল্লবর্মণ কী পরিশ্রম করতেন, তাঁর মুখেই প্রথম শুনি৷
কাঁধে করে ম্যাটারের গালি নিয়ে গেছি ভিজে ভিজে৷ ফ্লাটবেড মেশিনের পুরোনো রোলার (যেটা ম্যাটারে কালি মাখায়) বর্ষায় নরম ও আঠালো৷ রোলারের টানে টাইপ উঠে আসছে৷ ম্যাটার ভেঙে গেল৷ মেশিনে ঝুঁকে পড়ে ঠিক করা হল৷ বারবার৷ শতাধিক পৃষ্ঠার বই কোনওক্রমে ছাপা শেষ হল ভোরে৷ তারপর বাইন্ডিং৷ অন্তত কুড়ি কপি বই চাই৷ অনুষ্ঠানের ঠিক আগে পৌঁছে দেওয়া হয়েছিল৷ এত দায়িত্ব, এত পরিশ্রমের মূল্য? দৃশ্যত একটু হাসি এবং অদৃশ্য অনেক কচু৷
তবে এই প্রেমের সবটাই লোকসান ছিল না, আজ বুঝি৷ কিছু কাজ শিখেছি, যা পরে কাজে লেগেছে৷ সুশীল জানা, সুবোধ চৌধুরীর মতো গুণীজনের সান্নিধ্য পেয়েছি৷ তাঁরা আমাকে লিখতে বলেছেন৷ দিনের পর দিন তাঁদের সময়ের কথা বলেছেন, চল্লিশ-পঞ্চাশ দশকের কথা, আমার শুনতে ভাল লাগত৷

সুবোধ চৌধুরীর বন্ধু ছিলেন অদ্বৈত মল্লবর্মণ৷ ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ উপন্যাসের ভূমিকা সুবোধ চৌধুরীর লেখা৷ তিনিই আমাকে ‘তিতাস’ পড়িয়েছেন৷ কলকাতায় ঠাঁই নেওয়া তিতাস পাড়ের উদবাস্তুদের সাহায্য করার জন্য অদ্বৈত মল্লবর্মণ কী পরিশ্রম করতেন, তাঁর মুখেই প্রথম শুনি৷
‘দিনের সকল কাজ সারিয়া সন্ধ্যায় নগরীর পূর্ব উপান্তে ষষ্ঠীতলার বাসাটুকুতে ফিরিয়া যান৷ ঐ বাড়িতে অধিকাংশই রেলের শ্রমিক, ঘরে বারান্দায় ঠাসাঠাসি করিয়া তাহাদের খণ্ড খণ্ড সংসার; কিন্তু অপরিচ্ছন্ন অন্ধকার সিঁড়ি বাহিয়া চারতলা ছাতের ঘরটিতে পৌঁছিলে দেখা যায় আকাশ সীমাহীন— অদ্বৈত ক্লান্ত দেহ টানিয়া লইয়া তিতাসের কাহিনি লিখিতে বসিতেন, ক্রমে নগরীর আকাশ হইতে ধূমকলঙ্ক মুছিয়া গিয়া তাহা তিতাসের বুকের উপর ঝুঁকিয়া পড়া রঙীন আকাশের সঙ্গে এক হইয়া যাইত৷’
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত