(Rustic Cooking 29)
আশ্বিনের আলোর মতো আর কী আছে! সে যেন সকলকে ছাপিয়ে যায়, ঝরিয়ে দেয় তার শিউলি। ভোরেরা এখন হিম মাখতে শুরু করেছে। সেই অস্বচ্ছ হিমতন্তুর ওপার থেকে দেখা দেন আলোর দেবতা। তখন কোঁচড় ভরে ফুল কুড়োতে যাই। এই যাওয়া কত কালের, কত প্রজন্মের। একেকটা গন্ধ ইন্দ্রিয়ের মধ্যে থিতু হয়ে যায়, স্মৃতির মধ্যে তাদের সদাই চলাচল। এই আশ্বিনের আলোটির মতো সে জড়িয়েই আছে আশৈশব।
আরও পড়ুন: বনজ কুসুম: পর্ব – [১] [২] [৩] [৪] [৫] [৬] [৭] [৮] [৯] [১০] [১১] [১২] [১৩] [১৪] [১৫] [১৬] [১৭] [১৮] [১৯] [২০] [২১] [২২][২৩], [২৪], [২৫], [২৬], [২৭], [২৮]
ওই দূরে দেখা যায় শাল নদীর পাড়, কাশের জঙ্গল সেখানে। হাওয়ায় হাওয়ায় ওর শরীর উড়ে যাবে ক্রমে, নুনের পুতুলটি হয়ে নুনের সাগরে মিশে যাওয়ার মতো এও যেন এই মাটির পৃথিবীতে মিলিয়ে যাওয়ার বাসনা। মানুষের মানচিত্র ভারী অদ্ভুত। সে কখন কাকে যে কী নামে ডেকে ফেলে! এই শালনদীই আর খানিক দূর এসে নাম নিয়েছে কোপাই, মানুষেরা বলে ও নাকি ময়ূরাক্ষীরই উপনদী। কিন্তু এ গাঁয়ের মানুষদের শুধিয়ে এসো না কেন! তারা বলবে, উ তো নদীই! উপনদীটো কী বটে?

ঘরে ঘরে এখন তাল পিঠে হচ্ছে হামেশাই। দোকানে দোকানে এখন চালগুড়ি, চিনি আর রুলময়দা কেনার ব্যস্ততা। কেউ কেউ আবার পিঠে না গড়ে, হাতে ছেনে সেই মাড়ি পাঠাচ্ছে মেয়ে-জামাইয়ের বাড়ি। আগে তো ঘরে ঘরে ভাদুগানের দল আসত, আলু চাল পয়সা নিয়ে যেত গামছা পেতে। এখন ওসব চুকে গেছে। এখন কোপাই নদীর ধারে কেবল পর্যটনের বেসাতি।
এই নতুন বেসাতি– ভাদু, ভাজো এসবে মন দিতে চাইবে কেন! শরতে বর্ষায় হেমন্তে ঘুরে ফিরে তাই ‘বাউল গান’ আর ‘বাঙালি থালি’। ভাদ্র সংক্রান্তিতে ভাদু নেই, ঘরে ঘরে ঘুরে গান নেই। তবু ইচ্ছে করে খুঁজে দেখি, এই শহর হয়ে ওঠা কোপাই নদীর এদিকে সেদিকে আশ্বিনের ভাতের থালাখানি কেমন। খুব ভোর ভোর ওই হিমের চাদর সরালেই চোখে পড়ে এগাঁয়ে সেগাঁয়ে এখনও পচা খড়ে ছাতু জন্মেছে।

পাইকাররা সাইকেলে ঘণ্টি বাজিয়ে ছাতুর দর করছে। কেউ দিয়ে যায়, কেউ বলে– তোমায় দেব কেন! পেঁয়াজ দিয়ে ছাতু ভাজা খেয়ে দ্যাখো কেনে! এখানে, এই শালনদীর পাড়ে পাড়ে মাছমাংসের চেয়েও মানুষের ঘরে ছাতুর কদর বেশি। চাষের ছাতুতে কি এই স্বাদ হয়! হয় না, হতে পারে না।
পাইকাররা সাইকেলে ঘণ্টি বাজিয়ে ছাতুর দর করছে। কেউ দিয়ে যায়, কেউ বলে– তোমায় দেব কেন! পেঁয়াজ দিয়ে ছাতু ভাজা খেয়ে দ্যাখো কেনে! এখানে, এই শালনদীর পাড়ে পাড়ে মাছমাংসের চেয়েও মানুষের ঘরে ছাতুর কদর বেশি। চাষের ছাতুতে কি এই স্বাদ হয়! হয় না, হতে পারে না।
মাঠে মাঠে মেয়ে বউরা ঘাস নিড়াতে গিয়ে শুসনি শাক তুলে আনে। সে শাক খেয়েই তুমি বলে দিতে পারবে– এ জমিতে বিষ কম আছে না বেশি। গাঁয়ের মানুষেরা আমন ধানে বিষ দেয়, পোকা মারার বিষ। লোকের মুখফেরতা ও হল ওষুধ। তা সে শাক মুখে দিলেই টের পাবে– কোন শাক মিষ্টি বেশি, কোন শাক বিস্বাদ। ওই যে বললাম না, ইন্দ্রিয়ের একখানা স্মৃতিকাতর মন আছে! সে যেমন শিউলির গন্ধ মনের মধ্যে জমিয়ে রাখে, তেমনি রাখে শাকের স্বাদগুলিও।

এই ধরো না কেন টকপাতার ডাল! কেউ আবার বলে মেস্তাপাতা। সে তো এক মুঠো তুলে ডালে দিলেই হল। ও মুখে দিলেই বুঝবে– চাষ করা জিনিসের সঙ্গে ওর তফাত আছে। কচি বাঁশ তুলে এনে ওই মেস্তাপাতার চচ্চড়ি খেয়ে দেখো কেনে! এই শাল আর অজয় নদীর পাড়ের লোকেরা এসব কী শিখলো ওই বাঙালপাড়া থেকে! মাছ দিয়ে বাঁশ দিয়ে মেস্তাপাতার টক চচ্চড়ি আগে তো কখনও খাইনি বাপু!
কী আশ্চর্য এই নদীর গল্প, নদীদের গল্প– সে কেবল হাতে আঁকা নদীটি হয়ে থাকতে চায়নি কিন্তু। তার এপাড়ে ‘বাঙালি থালি’র পর্যটন তো ওপাড়ে উদবাস্তু কলোনিপাড়ার গন্ধ। এ পাড়ার লোক যাকে বলে ছাতু, ওপাড়ার দিদিমা তারেই কয় পাতালফোঁড়।

আশ্বিনের আলো আর শিউলির গন্ধের মতো এপাড়া ওপাড়া দুপাড়ারই একটা পুরনো মন আছে, ইন্দ্রিয়সুখ আছে। কিন্তু তারও পরে থাকে একটা, থাকে মানে আছেই– সেখানে হিমে বর্ষায় নিদাঘে স্বতন্ত্র স্বাদ গন্ধ ধুয়ে মুছে যাচ্ছে প্রতিদিন। সেখানে কেবলই আছে– ফিস থালি, ভেজ থালি আর হ্যাণ্ডলুম।
কী আশ্চর্য এই নদীর গল্প, নদীদের গল্প– সে কেবল হাতে আঁকা নদীটি হয়ে থাকতে চায়নি কিন্তু। তার এপাড়ে ‘বাঙালি থালি’র পর্যটন তো ওপাড়ে উদবাস্তু কলোনিপাড়ার গন্ধ। এ পাড়ার লোক যাকে বলে ছাতু, ওপাড়ার দিদিমা তারেই কয় পাতালফোঁড়।
ছাতুর পাতুরি
উপকরণ: ছাতু (মাশরুম), সাদা এবং কালো সর্ষে, অল্প টমেটো বা তেঁতুল, কাঁচালঙ্কা, অল্প গোটা জিরে, পেঁয়াজ, রসুন, কুমড়ো পাতা, কলাপাতা, সর্ষের তেল এবং স্বাদমতো নুন।

পদ্ধতি: এখন অনেক রকম ছাতু বা মাশরুম পাওয়া যাচ্ছে, পোয়াল ছাতু, দুর্গা ছাতু এইসব। এগুলো পেলেই ভাল, না পেলে যেকোনও চাষের মাশরুম। প্রথমে মাশরুমগুলি ছোট করে কেটে ধুয়ে পরিষ্কার করে নিন। কুমড়ো পাতা অল্প নুন মাখিয়ে রেখে নরম করে শিরা তুলে ফেলে দিন। অন্যদিকে, দুরকম সর্ষে, লঙ্কা, এক-দুই কোয়া রসুন এবং এক চিমটে জিরে দিয়ে বেটে দিন। নুন, হলুদ, বাটা মশলা, সর্ষের তেল, অল্প টমেটো সব ভাল করে মেখে রাখুন কিছুক্ষণ। এবারে প্রথমে কুমড়ো পাতায় মুড়ে তার পরে কলপাতায় মুড়ে উনুনের নিভু আঁচে দিয়ে উলটে পালটে সেঁকে নিন। উনুন না থাকলে তাওয়াতেই করুন। খেতে দেওয়ার একদম আগে, কলাপাতা খুলে নিয়ে শুধু কুমড়োপাতাটি আরেকবার অল্প তেলে এপিঠ ওপিঠ ভেজে পরিবেশন করুন ছাতুর পাতুরি।
টকপাতা আর বাঁশ কোড়লের চচ্চড়ি
উপকরণ: চুকাই বা টক পাতা কিছুটা, বাঁশ কোড়ল টাটকা বা ফার্মেন্টেড, নুন, হলুদ, সাদা তেল, আদা, পেঁয়াজ, রসুন, লঙ্কা, সঙ্গে চিংড়ি বা মুরগির মাংস (যার যা ইচ্ছে)।

পদ্ধতি: চুকাইপাতা রান্না করলে কমে যায়, তাই একটু বেশি করেই নিন। বাঁশ কোড়ল টাটকা হলে কুচিয়ে সিদ্ধ করে জল ফেলে দিন, ফার্মেন্টেড হলে কুচিয়ে নিন। চিংড়ি নুন, হলুদ মাখিয়ে সাঁতলে তুলে রাখুন। মুরগি হলে ছোট ছোট টুকরো করে নুন, হলুদ মাখিয়ে রাখুন। আদা, পেঁয়াজ, রসুন এবং লঙ্কা বেটে নিন। কড়াই বসিয়ে তেল দিন। তেল গরম হলে বাটা মশলা কষিয়ে নিন। মশলা কষানো হয়ে গেলে টকপাতা আর বাঁশ কোড়ল দিন। অল্প নুন, হলুদ দিয়ে কষান। তেল ছেড়ে এলে চিংড়ি বা মুরগি দিন। কষিয়ে অল্প জল দিন। চিংড়ি হলে অল্প সময় লাগবে, সেই বুঝে জল দিয়ে খোলাই রাখুন। মুরগি হলে ঢাকা দিন। সব মিলেমিশে মাখামাখা হলে দু-চার দানা চিনি দিন। রান্না শেষ করে একটু পরে স্বাভাবিক তাপমাত্রায় এলে পরিবেশন করুন টকপাতার চচ্চড়ি।
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত