(Rustic Cooking 28)
ভাদ্র এসে পড়ল। আকাশের আলো আর হাওয়া জানিয়ে দিচ্ছে সে কথা। মাঠে মাঠে এখন ধানের জাজিম পাতা— সেসব জমি কখনও জলহীন হয়ে মোরাম বেরিয়ে পড়ছে, কখনও বাঁধভাঙা নোনাজল ডুবিয়ে দিচ্ছে ক্ষেত খামার। মানুষের জীবনে তাই দিন শেষে দুই কুড়ি সুখ তিন কুড়ি দুঃখ। কিন্তু রান্নাঘরের এত কি ভাবার সময় আছে? শোক বলো বিরহ বলো চুলো জ্বালিয়ে দুটো ভাত তাকে ফোটাতেই হয়। এই বাদল আঁধারে বসে বসে সে তাই নিজের মতো করে একখানা কাব্য লেখে দিনে রাতে। বলতে পারেন, সেও একখানা বারোমাস্যা।
আরও পড়ুন: বনজ কুসুম: পর্ব – [১] [২] [৩] [৪] [৫] [৬] [৭] [৮] [৯] [১০] [১১] [১২] [১৩] [১৪] [১৫] [১৬] [১৭] [১৮] [১৯] [২০] [২১] [২২][২৩], [২৪], [২৫], [২৬], [২৭]
সেই কাব্যের শরীর বিছিয়ে থাকে ভাদ্রের শাপলার বিল। কুটে নেওয়া শাপলার বড়া ভাজবে কেউ, কেউ বা শাপলার ঘণ্ট রাঁধবে সামান্য জোগাড়ে। এই অনন্ত পৃথিবীর রান্নাঘর ভরে উঠছে অ-কৃষিজাত শাক পাতা ফুলে। মানুষের কেবল তার সাহচর্য পাবার অবসর হোক, এটুকুই চাওয়া। গাছে গাছে তাল পাকছে এখন। কী অসামান্য ওর তেল চকচকে গা। পাকা তাল কেউ পেড়ে খায় না। গাছতলায় কুড়িয়ে পায়।

তবে সেও খানিক ভাগ্যের ব্যপার, তাল পড়ে ফেটে গেলে সঙ্গে সঙ্গে তুলতে হয়— নইলে পোকা ধরে যায়, তখন সেই তাল ফেলে দেওয়া ছাড়া গতি নেই। এই রাঢ়দেশের পুরনো ছবি যাঁদের মনে আছে, তাঁরা মনে করতে পারবেন, তালের সারি আর বেনাঘাসের জঙ্গল দিয়ে ঘেরা ডাঙাজমি আর কাঁদড়ের পাড়। ভাদ্রের দিনে তাল পড়ে পড়ে পাহাড় হয়ে যায়, খাওয়ার লোক থাকে না।
অবন ঠাকুরের সেই মাণিকের দেশ— মুক্তার দেশের মতো এদেশে তালেরা গড়াগড়ি যায় ধুলোমাটিতে। মানুষেরা সেই তাল কুড়িয়ে এনে মাড়ি বের করে জ্বাল দেয়। কেউ বানায় ফুলুরি, কেউ বানায় ক্ষীর। কিন্তু দেশ গাঁয়ে এক সময় এত জুত করে ফুলুরি করারও ফুরসত ছিল না রোজ রোজ। এ দেশের ঘরে ঘরে ভাদরের জলখাবারে তখন তালের রুটি হত। গরম গরম চা আর মন ভাল করা গন্ধের তালের রুটি ভারী উপাদেয়। এই সব তালের আঁটি এখন মাটির তলে চাপা থাকবে। কার্তিক মাসে আকুর হবে, মিঠে আকুর খাবে ছেলেপুলেরা। দাদি নানিরা সেই আকুরের হালুয়া বানাবে। আসলে বলা ভাল, বানাত, ঘরে ঘরে সেসবের চল উঠে গেছে প্রায়। তালেরা তাই পড়ে থাকে অনন্ত শয্যায়, ঘরে তুলে নিয়ে যাবার লোক কম।

বাগালেরা— যারা মাঠে মাঠে দিনভর গরু চড়ায়, গাড়ল চড়ায়; তারা তালের ছায়ায় বসে বসে দিগন্তরেখা দেখে, দেখেও না হয়তো। তবে, তাল কুড়োবার আগ্রহ তাদের কম। তালেরা তাই খানিক ব্রাত্য। তবে তালের পাতা বিক্রি হয় খুব। বিক্রি হয় তালকাড়ি। অপসৃয়মাণ তাল আর বেনাঘাসের ঝোপ নতুন ল্যান্ডস্কেপ গড়ে তুলছে এই রাঢ়দেশের। পুরনো ছবিগুলো তাই মেলে বসি। ছবিরা বদলে গেলে রান্নাঘরের সমীকরণও বদলে যায়।
এই নতুন ব্যবস্থায় ভাদ্রের দিন এক নতুন জীবন পাচ্ছে আসলে। ভাদুরে কুমড়ো আর তিল পঁই(পুঁই) নিয়ে ভাদ্রের বেলা গড়িয়ে যায়, তাল শাপলা আর নুয়ে পড়া আমড়ার ডাল আগের মতোই সেজে থাকে অবিকল। মানুষের সাহচর্য তারা চায় না হয়তো— কিন্তু মানুষের রান্নাঘর, সে তো কেবল বাজার দিয়ে থলে ভরাবার প্রত্যাশা রাখে না! মানুষের এই প্রশস্ত বা অপ্রশস্ত জীবনে তার উপচে পড়া নিসর্গেরা রান্নাঘরে ব্রাত্য হয়ে পড়ে দিনে দিনে।

কুলেখাড়ার ডাল, নিরামিষ টক অথবা চুনোমাছের চচ্চড়ি নিয়ে একটা বালকবেলা হারিয়ে গেছে কাঁদড়ের ওই পাড়ে। সে ফিরিতে চাইছে হয়তো, হয়তো চাইছেও না— বলা তো যায় না! রান্নাঘর আসলে ঠিক কী চায় তার খোঁজ জানে এই মানুষেরই মন। ঝেড়ে বেছে নেওয়ার অধিকার তো সকলেরই। জোর তো আর করা যায় না। তালেরা তাই গড়াগড়ি খায় একা একা। শাপলায় ভরে ওঠে বিল। ভরে উঠুক, প্রিয়তমা পৃথিবীর আলোকসজ্জায় এতটুকু যেন ফাঁকি না থাকে। রান্নাঘর কী করবে সে ভাবনা না হয় মানুষই ভাবুক, সে তার ব্যক্তিগত চাওয়া। ভাদ্রের দিন তবু আসে, শ্রাবণ পেরিয়ে, বানভাসি নদী পেরিয়ে— রান্নাঘর সেই ভাদ্রদিনকে ভালবাসবে না?
বিলাতি আমড়া দিয়ে ডিমের ডালনা

উপকরণ: বিলাতি আমড়া, ডিম, আদা, পেঁয়াজ, রসুন, লঙ্কা, কাশ্মীরী লঙ্কার গুঁড়ো (ইচ্ছে হলে), নারকেলের দুধ, তেল, নুন, মিষ্টি।
পদ্ধতি: ডিম সেদ্ধ করে নিন, আমড়াও খোসা ছাড়িয়ে সেদ্ধ করে নিন। তেল গরম হলে নুন হলুদ মাখিয়ে সেদ্ধ ডিম ভেজে তুলে নিন। ওই পাত্রেই আরেকটু তেল দিয়ে আদা, পেঁয়াজ, রসুন, লঙ্কাবাটা দিয়ে ভাল করে কষিয়ে নিন। একেবারে কাঁচা গন্ধ চলে গেলে, তেল ছেড়ে দিলে, নারকেলের দুধ দিয়ে আবার কষান। চাইলে অল্প কাশ্মীরী লঙ্কার গুঁড়োও দিন। মশলা কষে গেলে আমড়া দিয়ে কষিয়ে ডিম দিন। সব বেশ কষানো হয়ে গেলে উষ্ণ জল দিয়ে ফুটতে দিন। নুন দেখে নিন, আমড়া কতটা টক সেই বুঝে প্রয়োজন হলে অল্প মিষ্টি দিন। বেশ মাখামাখা হয়ে এলে রান্না শেষ করুন। চাইলে একেবারে শেষে উপর থেকে একটু ভাজা মশলা ছড়িয়ে দিতে পারেন। পুরনো অথচ এখন কিছুটা প্রচলন কমে যাওয়া একটি গ্রামীণ রান্না আমড়া দিয়ে ডিমের ডালনা।
তিল শুক্তো

উপকরণ: সাদা তিল, পাট পাতা, নুন, সামান্য মিষ্টি, ঘি
পদ্ধতি: তিল শুক্তা বা শুক্তো পুরনো একটি পদ্ধতি। এই রান্নার একটি প্রধান উপকরণ পাট পাতা বা শুক্তো পাতা। এই পাতা রোদে শুকিয়ে রাখা হয়। শুকনো পাতা সংগ্রহে না থাকলে টাটকা পাতাও ব্যবহার করতে পারেন। শুকনো পাতা হলে তাওয়ায় টেলে মুচমুচে করে ভেজে নিন। আর কাঁচা পাতা হলে অল্প ঘি দিয়ে বা এমনিই তাওয়ায় ভেজে মুচমুচে করে নিন। এবারে শুকনো খোলায় তিল ভেজে তুলে নিন। শিলে বা গ্রাইন্ডারে মুচমুচে তিল নুন, আর এক দুই দানা চিনি দিয়ে বেটে নিন। বাটার শেষে তিলের পাতাও হালকা করে মিশিয়ে নিন বা বেটে নিন। এই বাটা শুক্তো গরম ভাতে অল্প ঘি দিয়ে প্রথম পাতে পরিবেশন করুন।।
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত