Planning Commission 6

প্ল্যানিং কমিশন

প্রবর্তন থেকে বিসর্জন (পর্ব - ৬)

(Planning Commission 6)

পঞ্চম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার সময়সীমা ছিল ১৯৭৪ থেকে ১৯৭৯। পরিকল্পনার প্রধান লক্ষ্য ছিল— দারিদ্র্য দূরীকরণ। চলতি কথায় যা ‘গরিবি হঠাও’ নামে প্রচারিত হত। আত্মনির্ভরশীলতা অর্থাৎ বিদেশি সহায়তার উপর নির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় উৎপাদন ও সম্পদের উন্নয়নও লক্ষ্য ছিল। বিশেষত কৃষি উৎপাদন এবং প্রতিরক্ষার স্বনির্ভতার উপর নজর দেওয়া হয়। বেকারত্ব কমানোর জন্য নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির প্রস্তাবও পঞ্চম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার নথিতে ছিল। 

এছাড়াও, ন্যূনতম প্রয়োজন কর্মসূচি (Minimum Needs Programme) অর্থাৎ শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পানীয় জল, গ্রামীণ সড়ক, বিদ্যুতের মতো মৌলিক পরিষেবা সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। পাশাপাশি প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল কৃষি ও শিল্পক্ষেত্রে উৎপাদন বৃদ্ধির। এছাড়াও, মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখার সিদ্ধান্তও নেওয়া হয় এই পরিকল্পনায়।


আরও পড়ুন: প্ল্যানিং কমিশন প্রবর্তন থেকে বিসর্জন পর্ব- ১, ২, ৩, ৪


পঞ্চম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার সময়সীমা ছিল ১৯৭৪ সাল থেকে ১৯৭৯ সাল। এই সময়ের মধ্যেই দেশজুড়ে জারি ছিল ‘জরুরি অবস্থা’ (১৯৭৫ সালের ২৫শে জুন থেকে ১৯৭৭ সালের ২১শে মার্চ)। জরুরি অবস্থার সময় প্রশাসনিক কড়াকড়ি ও শাসকদলের রাজনৈতিক বাড়াবাড়ি বিশেষত ‘গরিবি হটাও’ স্লোগান জনমানসে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছিল। ওই সময়ে চালু হওয়া বিশ দফা কর্মসূচিও একই সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছিল। ১৯৭৭-এর লোকসভা নির্বাচনে তৎকালীন শাসকদল পরাস্ত হয়। প্রধানমন্ত্রী নিজেও নির্বাচনে জিততে পারেননি।

আবার এই পরিকল্পনার সময়ই ১৯৭৫ সালে বিদ্যুৎ সরবরাহ আইন সংশোধন করা হয়। এর ফলে কেন্দ্রীয় সরকার বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং বিদ্যুৎ সঞ্চালনে প্রবেশ করতে সক্ষম হয়। স্থাপিত হয় NTPC। এতদিন পর্যন্ত রাজ্য বিদ্যুৎ পর্ষদগুলি এই দায়িত্ব পালন করত। ভারতীয় জাতীয় সড়ক ব্যবস্থা চালু হয় এবং ক্রমবর্ধমান যানবাহনের জন্য বহু রাস্তা প্রশস্ত করা হয়। পর্যটনেরও প্রসার ঘটে। 

Planning Commission 6
সংবাদপত্রে জনতা দলের রোলিং প্ল্যানের খবর

পঞ্চম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার প্রথম বছরে ন্যূনতম প্রয়োজন কর্মসূচি (MNP) চালু করা হয়েছিল। এমএনপি কর্মসূচির উদ্দেশ্য ছিল দৈনন্দিন জীবনের কিছু মৌলিক ন্যূনতম চাহিদা মেটানো এবং জনগণের জীবনযাত্রার মান উন্নত করা। 

এই পরিকল্পনা ১৯৭৪-৭৯ সালের জন্য প্রণয়ন করা হয়, এবং প্রকৃত ব্যয় বরাদ্দ ছিল ৩৯ হাজার ৪২৬ কোটি টাকা। কিন্তু মেয়াদ শেষ হওয়ার এক বছর আগেই পরিকল্পনাটি বন্ধ করে দেওয়া হয়। সেই সময় দেখা যায় প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা খরচ হয়েছে। অর্থাৎ পাঁচ বছরের জন্য নির্ধারিত ব্যয় বরাদ্দ চার বছরেই খরচ হয়ে গেছে। বৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রার হার ধার্য করা হয়েছিল ৪.৪ শতাংশ। তবে প্রকৃত বৃদ্ধি হয়েছিল ৪.৮ শতাংশ।

এরপর শুরু হয় ‘রোলিং প্ল্যান’ (১৯৭৮-১৯৮০)। জনতা পার্টি সরকার পঞ্চম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা প্রত্যাখ্যান করে এক নতুন ধরনের পরিকল্পনা (১৯৭৮-১৯৮০) প্রবর্তনের উদ্যোগ নেয়। রোলিং প্ল্যানে তিন ধরনের পরিকল্পনার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। 

দুই

জরুরি অবস্থার অবসানের পরে ক্ষমতাসীন হয় একটি নবগঠিত রাজনৈতিক দল— জনতা পার্টি। কেন্দ্রে দীর্ঘ তিরিশ বছরের একদলীয় শাসন (ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস) থাকায় পরিকল্পনা ব্যবস্থায় যে ধারাবাহিকতা ছিল, তাতে বাধা পড়ে। নতুন সরকার ১৯৭৭-এ গঠিত হওয়ার পর পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার মূল্যায়ন শুরু হল। দেখা গেল যে, মূল্যস্ফীতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা যায়নি। প্রত্যাশিত হারে কমেনি দারিদ্র্য ও বেকারত্ব। আয় ও সম্পদের বৈষম্য পুরোপুরি দূর করা সম্ভব হয়নি। অর্থনৈতিক বৃদ্ধি লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় যথেষ্ট কম। এইসব কারণে নতুন সরকার পরিকল্পনাটি নির্ধারিত সময়ের আগেই বন্ধ করে দেয়।

এরপর শুরু হয় ‘রোলিং প্ল্যান’ (১৯৭৮-১৯৮০)। জনতা পার্টি সরকার পঞ্চম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা প্রত্যাখ্যান করে এক নতুন ধরনের পরিকল্পনা (১৯৭৮-১৯৮০) প্রবর্তনের উদ্যোগ নেয়। রোলিং প্ল্যানে তিন ধরনের পরিকল্পনার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। 

Planning Commission 6
১৯৮২ সালের ১২ জুলাই গ্রামীণ এলাকার উন্নয়নের জন্য ন্যাশনাল ব্যাঙ্ক ফর এগ্রিকালচার অ্যান্ড রুরাল ডেভেলপমেন্ট (নাবার্ড) প্রতিষ্ঠিত হয়

প্রথম প্রস্তাবটি ছিল বর্তমান বছরের (১৯৭৭-৭৮) জন্য, যা বার্ষিক বাজেট নিয়ে তৈরি এবং দ্বিতীয়টি ছিল একটি নির্দিষ্ট সংখ্যক বছরের জন্য একটি পরিকল্পনা— যা ৩, ৪ বা ৫ বছর ধরে চলতে পারে। দ্বিতীয় প্রস্তাবটি ভারতীয় অর্থনীতির দরকার অনুযায়ী পরিবর্তিত হতে পারে। 

তৃতীয় প্রস্তাবটি ছিল দীর্ঘমেয়াদী অর্থাৎ ১০, ১৫ বা ২০ বছরের জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা (Perspective Planning) করা হয়েছিল। রোলিং প্ল্যানগুলিতে পরিকল্পনা শুরু এবং সমাপ্তির জন্য কোনও তারিখ নির্ধারণ করা হয়নি। চক্রাকারে চলতে থাকা পরিকল্পনাগুলির প্রধান সুবিধা ছিল, যে সেগুলি নমনীয় ছিল এবং দেশের অর্থনীতিতে পরিবর্তিত পরিস্থিতি বুঝে লক্ষ্যমাত্রা, অনুশীলনের উদ্দেশ্য, অনুমান এবং বরাদ্দ সংশোধন করতে পারত।

প্ল্যানিং কমিশনের প্রাক্তন সদস্য বি.শিবরমনের নেতৃত্বাধীন একটি কমিটির সুপারিশে ১৯৮২ সালের ১২ জুলাই গ্রামীণ এলাকার উন্নয়নের জন্য ন্যাশনাল ব্যাঙ্ক ফর এগ্রিকালচার অ্যান্ড রুরাল ডেভেলপমেন্ট (নাবার্ড) প্রতিষ্ঠিত হয়। অতিরিক্ত জনসংখ্যা রোধে পরিবার পরিকল্পনারও প্রসার ঘটানোর প্রস্তাব করা হয়।

এই পদ্ধতি পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার অনমনীয়তাও কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হয়েছিল। তবে এই পরিকল্পনার প্রধান অসুবিধা ছিল প্রতি বছর লক্ষ্যমাত্রা সংশোধন করা হত। এতে পাঁচ বছরের মেয়াদে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা কঠিন হয়ে পড়ে এবং গোটা বিষয়টি জটিল পরিকল্পনায় পরিণত হয়। এছাড়াও, ঘন ঘন সংশোধনের ফলে অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতার অভাব দেখা দেয়। ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস আবার ১৯৮০ সালে সরকার ক্ষমতাসীন হওয়ার পর এই পরিকল্পনাটি (রোলিং প্ল্যান) বাতিল করে একটি নতুন ষষ্ঠ পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়। 

ভারতে অর্থনৈতিক উদারিকরণের সূচনা হয় ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার (১৯৮০-১৯৮৫) সময়। মূল্য নিয়ন্ত্রণ আর সরকারের দায়িত্ব থাকল না। রেশনের দোকানে ঝাঁপ পড়ে গেল। বেড়ে গেল খাদ্যপণ্যের দাম। বৃদ্ধি পেল জীবনযাপনের খরচ। জওহরলাল নেহরুর প্রবর্তিত অর্থনৈতিক ধারণার (নেহরুভিয়ান সমাজতন্ত্র) অবসান ঘটাল ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা। 

Planning Commission 6
১৯৭৫ সালের ২৫শে জুন থেকে ১৯৭৭ সালের ২১শে মার্চ দেশজুড়ে জারি ছিল ‘জরুরি অবস্থা’

প্ল্যানিং কমিশনের প্রাক্তন সদস্য বি.শিবরমনের নেতৃত্বাধীন একটি কমিটির সুপারিশে ১৯৮২ সালের ১২ জুলাই গ্রামীণ এলাকার উন্নয়নের জন্য ন্যাশনাল ব্যাঙ্ক ফর এগ্রিকালচার অ্যান্ড রুরাল ডেভেলপমেন্ট (নাবার্ড) প্রতিষ্ঠিত হয়। অতিরিক্ত জনসংখ্যা রোধে পরিবার পরিকল্পনারও প্রসার ঘটানোর প্রস্তাব করা হয়। চিনের কঠোর ও বাধ্যতামূলক এক সন্তান নীতির বিপরীতে, ভারতীয় নীতি অবশ্য জরুরি অবস্থার মতো বলপ্রয়োগ করেনি। 

ভারতের ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার মোট পরিকল্পনা-ব্যয় (Plan Outlay) ছিল ৯৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা।  প্রকৃতপক্ষে ব্যয় হয়েছিল ১ লক্ষ ৯ হাজার ২৯১ টাকা। অতিরিক্ত ব্যয় হয় ১১ হাজার ৭৯১ কোটি টাকা। অর্থাৎ, ষষ্ঠ পরিকল্পনায় প্রকৃত ব্যয় বরাদ্দের তুলনায় প্রায় ১২.১ শতাংশ বেশি ছিল। লক্ষ্যমাত্রা বৃদ্ধির হার ছিল ৫.২ শতাংশ এবং প্রকৃত বৃদ্ধির হার ছিল ৫.৭ শতাংশ। 

বাস্তবে দারিদ্র্য পুরোপুরি দূর করা যায়নি। দরিদ্রদের জন্য কর্মসূচি থাকলেও বিপুল সংখ্যক মানুষ দারিদ্রসীমার নিচে থেকে যায়। আপাত দৃষ্টিতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হলেও জনসংখ্যার তুলনায় তা যথেষ্ট ছিল না।

ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার প্রাথমিক লক্ষ্য ছিল দারিদ্র্য দূরীকরণ। কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি ও প্রযুক্তিগত ও অর্থনৈতিক আত্মনির্ভরশীলতা অর্জনের কথাও ষষ্ঠ পরিকল্পনার নথিতে বলা হয়েছিল। নজরে ছিল কৃষি ও শিল্প উৎপাদন বৃদ্ধি। দারিদ্র্য হ্রাসে অগ্রগতি— গ্রামীণ দরিদ্রদের জন্য বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়। ইন্টিগ্রেটেড রুরাল ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম (IRDP) এবং ন্যাশনাল রুরাল এমপ্লমেন্ট প্রোগ্রাম (NREP) কর্মসূচির মাধ্যমে আয় ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানোর চেষ্টা হয়। 

শক্তি (বিদ্যুৎ, কয়লা, তেল) খাতের উন্নয়নের পাশাপাশি জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ ও জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন নিয়ে ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার নথি সরব ছিল। আয়ের বৈষম্য হ্রাস এবং সামাজিক ন্যায় প্রতিষ্ঠার প্রস্তাবও ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার নথিতে উল্লিখিত হয়েছিল।

বাস্তবে দারিদ্র্য পুরোপুরি দূর করা যায়নি। দরিদ্রদের জন্য কর্মসূচি থাকলেও বিপুল সংখ্যক মানুষ দারিদ্রসীমার নিচে থেকে যায়। আপাত দৃষ্টিতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হলেও জনসংখ্যার তুলনায় তা যথেষ্ট ছিল না। আঞ্চলিক বৈষম্যও কমেনি— উন্নত-অনুন্নত রাজ্য এবং গ্রাম-শহরের মধ্যে অর্থনৈতিক বৈষম্য বজায় ছিল।

ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা চলাকালীন মুদ্রাস্ফীতি ও দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির চাপ সাধারণ মানুষের উপর পড়ে। সামগ্রিক অর্থনৈতিক বৃদ্ধি হলেও তার সুফল সমাজের সব স্তরে সমানভাবে পৌঁছায়নি। সরকারি কর্মসূচির বাস্তবায়নে দুর্বলতা লক্ষণীয়। দারিদ্র্য ও কর্মসংস্থানমুখী বিভিন্ন প্রকল্পে প্রশাসনিক দুর্বলতা, অপচয় ও সুবিধাভোগী নির্বাচনে সমস্যা ছিল। স্বনির্ভরতার লক্ষ্য পুরোপুরি অর্জিত হয়নি— কিছু ক্ষেত্রে আমদানি ও বৈদেশিক ঋণের উপর নির্ভরতা ছিল।

১৫ বছরের স্থিতিশীল বৃদ্ধির জন্য প্রচেষ্টার উপর ভিত্তি করে, সপ্তম পরিকল্পনাটি ২০০০ সালের মধ্যে আত্মনির্ভরতা বৃদ্ধির পূর্বশর্তগুলি অর্জনের উপর নজর দিয়েছিল। পরিকল্পনার নথিতে অনুমান করা হয়েছিল, দেশের শ্রমশক্তিতে ৩.৯ কোটি জন নতুন নাগরিককে যুক্ত করা হবে এবং প্রতি বছর কর্মসংস্থান ৪ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে। 

তিন

সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় (১৯৮৫-১৯৯০) প্রযুক্তির মানোন্নয়ন করে শিল্পের উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর উপর জোর দেওয়া হয়। এই পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার মূল উদ্দেশ্য ছিল অর্থনৈতিক উৎপাদন বৃদ্ধি, খাদ্যশস্য উৎপাদন বৃদ্ধি এবং ‘সামাজিক ন্যায়বিচার’-এর মাধ্যমে কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি।

সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা ব্যাপকভাবে অর্থনৈতিক বৃদ্ধি ও শক্তি উৎপাদনে প্রয়াসী হয়েছিল। এই পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলি ছিল— সামাজিক ন্যায়বিচার, দুর্বলদের নিপীড়ন দূরীকরণ, আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার, কৃষি উন্নয়ন, দারিদ্র্য বিরোধী কর্মসূচি, খাদ্য, বস্ত্র ও বাসস্থানের পূর্ণ সরবরাহ, ক্ষুদ্র উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং ভারতকে একটি স্বনির্ভর অর্থনীতিতে পরিণত করা।

Planning Commission 6
সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা ব্যাপকভাবে অর্থনৈতিক বৃদ্ধি ও শক্তি উৎপাদনে প্রয়াসী হয়েছিল

১৫ বছরের স্থিতিশীল বৃদ্ধির জন্য প্রচেষ্টার উপর ভিত্তি করে, সপ্তম পরিকল্পনাটি ২০০০ সালের মধ্যে আত্মনির্ভরতা বৃদ্ধির পূর্বশর্তগুলি অর্জনের উপর নজর দিয়েছিল। পরিকল্পনার নথিতে অনুমান করা হয়েছিল, দেশের শ্রমশক্তিতে ৩.৯ কোটি জন নতুন নাগরিককে যুক্ত করা হবে এবং প্রতি বছর কর্মসংস্থান ৪ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে। 

সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার সময় জাতীয় উন্নয়নের স্বার্থে ভারত প্রথম বেসরকারি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাগুলির (Non-Government Organisation NGO) অবদানকে স্বীকৃতি দেয়। এবং সাধারণ জনগণের কাছ থেকে মূল্যবান অবদানের সঙ্গে দেশে একটি স্বনির্ভর অর্থনীতি আনতে সচেষ্ট হয়। 

সংক্ষেপে সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার (১৯৮৫–১৯৯০) মূল্যায়ন করতে হলে বলতে হবে— দ্রুত অর্থনৈতিক বৃদ্ধি, কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি এবং বেকারত্ব হ্রাস, খাদ্যশস্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়া, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, দারিদ্র্য হ্রাস, সামাজিক ন্যায় প্রতিষ্ঠা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য এবং পানীয় জলের মতো মৌলিক পরিষেবার উন্নয়ন করা ছিল প্রধান লক্ষ্য।

ভারতের সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার (১৯৮৫–১৯৯০) মোট পরিকল্পনা ব্যয় ছিল (Plan Outlay) ১ লক্ষ ৮০ হাজার কোটি টাকা। প্রকৃত ব্যয় (Actual Expenditure) হয়েছিল ২ লক্ষ ১৮ হাজার ৭২৯.৬ কোটি টাকা। অতিরিক্ত ব্যয় হয় ৩৮ হাজার ৭২৯.৬ কোটি টাকা। অর্থাৎ, সপ্তম পরিকল্পনায় প্রকৃত ব্যয় অনুমোদিত পরিকল্পনা-ব্যয়ের তুলনায় প্রায় ২১.৫২ শতাংশ বেশি ছিল। লক্ষ্যমাত্রা বৃদ্ধির হার ঠিক করা হয়েছিল ৫.৬ শতাংশ। সেখানে প্রকৃত বৃদ্ধির হার ছিল ৬.৮ শতাংশ।

সংক্ষেপে সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার (১৯৮৫–১৯৯০) মূল্যায়ন করতে হলে বলতে হবে— দ্রুত অর্থনৈতিক বৃদ্ধি, কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি এবং বেকারত্ব হ্রাস, খাদ্যশস্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়া, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, দারিদ্র্য হ্রাস, সামাজিক ন্যায় প্রতিষ্ঠা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য এবং পানীয় জলের মতো মৌলিক পরিষেবার উন্নয়ন করা ছিল প্রধান লক্ষ্য। নিয়মমাফিক এই পরিকল্পনায় উচ্চারিত হয়েছিল আত্মনির্ভরশীলতা ও অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করার প্রত্যয়।

এই সময় জাতীয় আয়ের গড় বার্ষিক বৃদ্ধি ৬ শতাংশের বেশি হয়। কৃষি ও শিল্প উৎপাদনেও উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি ঘটে। খাদ্যশস্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা আরও মজবুত হয়। ভারতে প্রথম তথ্যপ্রযুক্তি ও টেলিকমিউনিকেশনে উন্নতি করে।

তবে দারিদ্র্য ও বেকারত্ব পুরোপুরি দূর হয়নি। আয় ও সম্পদের বৈষম্য যথারীতি বজায় ছিল। রাজস্ব ঘাটতি ও আর্থিক ভারসাম্যের সমস্যা বৃদ্ধি পায়। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণেও পুরোপুরি সাফল্য আসেনি। পরিকল্পনার সমাপ্তিলগ্নে দেখা যায় আঞ্চলিক উন্নয়নে বৈষম্য যথেষ্ট পরিমাণে রয়ে গিয়েছে।

মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

Please login to bookmark Close
Picture of অমিতাভ রায়

অমিতাভ রায়

প্রশিক্ষিত প্রযুক্তিবিদ ও পরিচিত পরিকল্পনাবিশারদ। পড়াশোনা ও পেশাগত কারণে দেশে-বিদেশে বিস্তর ভ্রমণের অভিজ্ঞতা। তার ফসল বেশ কয়েকটি জনপ্রিয় বই। জোয়াই, আহোম রাজের খোঁজে, প্রতিবেশীর প্রাঙ্গণে, কাবুলনামা, বিলিতি বৃত্তান্ত ইত্যাদি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

The Banglalive's Picks

Weekly Newsletter

Enjoy our flagship newsletter as a digest delivered once a week.

By signing up, you agree to our User Agreement and Privacy Policy & Cookie Statement.

Please login to bookmark Close
কলকাতা দূরদর্শন বিশেষ অনুষ্ঠান করল সমরেশ বসুকে নিয়ে। সেই অনুষ্ঠানে অন্যান্যদের সঙ্গে অংশগ্রহণ করেছিলেন মৃণাল সেন। এরপর একদিন মা আমার হাতে দূরদর্শনের কনট্র্যাক্ট ফর্ম দিয়ে পাঠাল ভবানীপুরের বেলতলা রোডে মৃণাল সেনের বাড়িতে, কারণ ওঁকে দিয়ে কন্ট্রাক্ট ফর্মটা সই করাতে হবে। লিখছেন অরিজিৎ মৈত্র...
Please login to bookmark Close
যে মানুষটাকে আমরা রুপোলি পর্দায় হাসিমুখে দর্শকের মন জয় করতে দেখেছি, তাঁর জীবনের অন্তরালে লুকিয়ে আছে এমন অনেক অধ্যায়, যা প্রকাশ্যে খুব কম আলোচিত হয়েছে। তাঁর খ্যাতির এই ঝলমলে আলোর পেছনে ছিল কঠিন সংগ্রাম, করুণ ব্যর্থতা, জটিল সম্পর্ক এবং গভীর নিঃসঙ্গতা। সেইসব মিলেমিশে গড়ে ওঠে ‘রহস্যের আড়ালে উত্তম’। লিখছেন প্রেমেন্দু বিকাশ চাকী...
Please login to bookmark Close
প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হতে গিয়ে ভয়ে পালিয়েছি৷ বঙ্গবাসী কলেজকে নিজের জায়গা মনে হল৷ এখানে আমি স্বচ্ছন্দ প্রথম দিন থেকে৷ প্রেসিডেন্সি বিল্ডিংয়ের বিশালতা এবং ছাত্রছাত্রীদের চেহারায়, পোশাকে ধনীঘরের চাকচিক্য দেখে বস্তিবালক নিজেকে বেমানান ভেবেছিল, এটা ঘটনা৷ মধুময় পালের কলমে পড়ুন দেশভিখারির জমিজিরেত। আজ পর্ব ৬...

Subscribe

Banglalive.com/TheSpace.ink Guidelines

Established: 1999

Website URL: https://banglalive.com and https://thespace.ink

Social media handles

Facebook: https://www.facebook.com/banglaliveofficial

Instagram: https://www.instagram.com/banglalivedotcom

Twitter: @banglalive

Needs: Banglalive.com/thespace.ink are looking for fiction and poetry. They are also seeking travelogues, videos, and audios for their various sections. The magazine also publishes and encourages artworks, photography. We however do not accept unsolicited nonfiction. For Non-fictions contact directly at editor@banglalive.com / editor@thespace.ink

Time: It may take 2-3 months for the decision and subsequent publication. You will be notified. so please do not forget to add your email address/WhatsApp number.

Tips: Banglalive editor/s and everyone in the fiction department writes an opinion and rates the fiction or poetry about a story being considered for publication. We may even send it out to external editors/readers for a blind read from time to time to seek opinion. A published story may not be liked by everyone. There is no one thing or any particular feature or trademark to get published in the magazine. A story must grow on its own terms.

How to Submit: Upload your fiction and poetry submissions directly on this portal or submit via email (see the guidelines below).

Guidelines:

  1. Please submit original, well-written articles on appropriate topics/interviews only. Properly typed and formatted word document (NO PDFs please) using Unicode fonts. For videos and photos, there is a limitation on size, so email directly for bigger files. Along with the article, please send author profile information (in 100-150 words maximum) and a photograph of the author. You can check in the portal for author profile references.
  2. No nudity/obscenity/profanity/personal attacks based on caste, creed or region will be accepted. Politically biased/charged articles, that can incite social unrest will NOT be accepted. Avoid biased or derogatory language. Avoid slang. All content must be created from a neutral point of view.
  3. Limit articles to about 1000-1200 words. Use single spacing after punctuation.
  4. Article title and author information: Include an appropriate and informative title for the article. Specify any particular spelling you use for your name (if any).
  5. Submitting an article gives Banglalive.com/TheSpace.ink the rights to publish and edit, if needed. The editor will review all articles and make required changes for readability and organization style, prior to publication. If significant edits are needed, the editor will send the revised article back to the author for approval. The editorial board will then review and must approve the article before publication. The date an article is published will be determined by the editor.

 

Submit Content

For art, pics, video, audio etc. Contact editor@banglalive.com