(Jolke Chol 28)
গাড়িটা চাঁদনি চক অতিক্রম করলেই মোহনা কাচ নামিয়ে দেখে রাস্তাগুলো। প্রতিদিন তার নতুন লাগে। প্রথম যখন এই সংস্থার দায়িত্ব নিল, তখন বিজ্ঞাপনের খোঁজে মেট্রোতে এসে নামত এই স্টেশনে। তারপর হেঁটে মোড়ের মাথার প্রাচীন বিল্ডিং। এখানকার চিফ পাবলিক রিলেশন অফিসার সৌমজিৎ দত্ত। কাঁচা পাকা চুল। বয়স পঞ্চাশের কোঠায়। দেখতেও যেমন সুন্দর, তেমন কথাও ভারি মিষ্টি বলতেন।
– আপনার শ্বশুরমশাইকে আমি চিনি। আগে আসতেন এখানে। আমরা দিতাম বিজ্ঞাপন। কিন্তু বহুদিন আসেননি। পত্রিকা প্রকাশিত হচ্ছে আবার জেনে খুব ভাল লাগল। আমরা চেষ্টা করব সহায়তা করতে। তবে এখন এই খাতে আমাদের বরাদ্দ ভীষণ কমে গেছে। কাজেই কতটা পারব, তা বলতে পারছি না।
আরও পড়ুন: জলকে চল: পর্ব – (১) (২) (৩) (৪) (৫) (৬) (৭) (৮) (৯) (১০) (১১), (১২) (১৩), (১৪) ,(১৫), (১৬), (১৭), (১৮), (১৯), (২০), (২১), (২২), (২৩), (২৪), (২৫), (২৬), (২৭)
মোহনা তার কথা শুনতে শুনতে পুরো ঘরটায় চোখ বোলাত। ব্রিটিশ আমলের বিল্ডিং। সিলিং ছুঁতে গেলে কত বড় মই লাগে, সে ভাবার চেষ্টা করত। যতবার গেছে, গিয়েই সে দেখত ঝুল আছে কি না! এত উঁচু জায়গা কীভাবে পরিস্কার থাকে, সে কিছুতেই বুঝতে পারত না।
প্রতিটি সিলিং-এই বিশাল পদ্মফুল। সেখান থেকে লোহার বড় রড নেমে আসত টেবিলের খানিক উপরে। তাতেই লাগানো ফ্যান। অবশ্য সৌম্যদার ঘরে এসি ছিল।

সৌম্য তার এই অবাক চাউনি লক্ষ করেছিলেন। একদিন বললেন- প্রতি রবিবার পুরো বিল্ডিং ঝাড়পোছ করার লোক আসেন। তাদের হাতে সচরাচর বাড়িতে যেরকম ঝুলঝাড়ু ব্যবহার করা হয়, তার থেকে অনেক লম্বা লাঠিতে কাপড় বাঁধা থাকে। সেই দিয়ে মইয়ে চেপে তাঁরা ঝুল পরিস্কার করেন।
– এটা তো খুব রিস্কি। একবার স্লিপ করলে তো হাত পা কোমর সব গেল।
মোহনার মনে পড়ে যায়, তাদের বাড়ির একতলায় ঝোলানো কৃষ্ণের ছবিতে মইয়ে উঠে মালা পরাতে গিয়ে পা স্লিপ করে পড়ে গেছিলেন পাল কাকু। কাকু প্রতি রবিবার বাড়ির ঠাকুরকে মালা পরাতে আসতেন।
– না, অতটা ভয়েরও নয়। তাছাড়া মইগুলোর মাথায় আঙটা লাগানো থাকে। সেগুলো সিলিং-এর কড়ি-বর্গাগুলোতে আটকে দেওয়া হয়, যাতে স্লিপ না করে। তাছাড়া নিচ থেকেও ধরে রাখা হয়।
– যাই বলুন, বিষয়টা বেশ রিস্কি।
– সে রিস্ক কোথায় নেই বলুন? আমাদের কত কর্মী তার লাগাতে গিয়ে প্রতিদিন মারা যান জানেন? গড়ে তিন থেকে চার। বর্ষার সময় আরও বেশি। এছাড়া অবৈধ কানেকশন কাটতে গিয়েও কারেন্ট খেয়ে কত জন চলে যায়, বেঁচে থাকলেও অর্ধমৃত হয়ে থাকে। প্রতিটি মুহূর্তেই এসব কর্মীদের প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করতে হয়। বরং এদের ঝুঁকি কম।
মোহনার মনে পড়ে যায়, তাদের বাড়ির একতলায় ঝোলানো কৃষ্ণের ছবিতে মইয়ে উঠে মালা পরাতে গিয়ে পা স্লিপ করে পড়ে গেছিলেন পাল কাকু। কাকু প্রতি রবিবার বাড়ির ঠাকুরকে মালা পরাতে আসতেন।
বাবা চিৎকার করে ডেকে বলেছিল, মোহনা শিগগিরই গাড়ি বের কর, মনে হচ্ছে একটা অঘটন ঘটেছে।
পাল কাকু মেঝেতে পড়ে থাকা অবস্থায় বলেছিলেন, আমার পটি পেয়ে গেছে।
সেদিন অ্যাম্বুলেন্স ডেকে স্ট্রেচারে করে পাল কাকুকে হাসপাতালে নিয়ে গেছিল তারা। সুস্থ হওয়ার পরেও তার স্ত্রী এসে মাসে মাসে টাকা নিয়ে যেত পাল কাকু অসুস্থ বলে। একদিন মোহনাই আবিষ্কার করেছিল, পাল কাকু দিব্বি হেঁটে বাজার করে ফিরছেন।
মোহনার বাবা তাড়াতাড়ি করে রাইয়ের এক বছর বয়সের পটি করার ছোট্ট নীল রংয়ের পোর্টেবেল কমোডটা এনে দিয়ে বলেছিলেন–
– নাও এতে করে নাও।
পাল কাকুর ওঠার অবস্থা ছিল না। তাকে বাবা তুলে ধরে সেটার উপর বসানোর চেষ্টা করা মাত্র সেটা ভেঙে গেল।
শিপ্রা প্রচণ্ড রেগে গেছিল বরের উপর। তোমার মাথায় কি এই বুদ্ধিটুকুও নেই, এতটুকু জিনিসের উপর এই ভারি চেহারার বয়স্ক মানুষ বসতে পারেন!

মোহনার বাবার মুখের করুণ অভিব্যক্তি দেখে একই সঙ্গে হাসি ও দুঃখ হয়েছিল। মানুষটা এতটাই সহজ সরল নিরীহ কেন!
সেদিন অ্যাম্বুলেন্স ডেকে স্ট্রেচারে করে পাল কাকুকে হাসপাতালে নিয়ে গেছিল তারা। সুস্থ হওয়ার পরেও তার স্ত্রী এসে মাসে মাসে টাকা নিয়ে যেত পাল কাকু অসুস্থ বলে। একদিন মোহনাই আবিষ্কার করেছিল, পাল কাকু দিব্বি হেঁটে বাজার করে ফিরছেন। সেই ছবি মোবাইলে তুলে এনে বাবাকে দেখিয়ে তবে টাকা দেওয়া বন্ধ করা গেছিল।
আসলে এই পুরোনো বিল্ডিংগুলোর আর্কিটেকচার দেখলেই বোঝা যায় এই দেশ, এই রাজ্য এক সময় উপনিবেশবাদের ফলশ্রুতি। তবে যাই বলুন না কেন, এরকম শক্ত মজবুত বিল্ডিং এখন আর বানানো সম্ভব নয়।
কোন ভাবনার সাগরে ডুবে গেলে মোহনা? সৌম্যদার কথায় সম্বিত ফিরে আসে মোহনার। সে বলল-
– তেমন কিছু নয়। ভাবছিলাম এই এত বড় বাড়িতে আগে কারা থাকতেন, এত ঘর, বিশাল বিশাল বারান্দা…
– অত বিস্তারিত বলতে পারব না। তবে এটা জানি, প্রথম থেকেই বাড়িটা ইলেক্ট্রিক সাপ্লাইয়ের প্রধান অফিস হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। ১৮৮৯ সালের ১৭ এপ্রিল কলকাতায় প্রথম থার্মাল পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি দ্য ক্যালকাটা ইলেক্ট্রিক সাপ্লাই কর্পোরেশন লিমিটেড তাদের কাজ শুরু করল। তখন তাদের অফিস ছিল প্রিন্সেপ ঘাটের কাছে এমবার্গ লেনে। এরপর ট্রাম কোম্পানি ঘোড়ায় ট্রাম টেনে নিয়ে যাওয়া বন্ধ করে ইলেক্ট্রিকের ব্যবহার চালু করল। আর এর পর আরও তিনটে পাওয়ার জেনারেটিং স্টেশন তৈরি হল ১৯০৬-এ। ১৯৩৩ সালে এই ভিক্টোরিয়া হাউসে কোম্পানি উঠে এল। তারপর থেকে এখানেই। নানা পালা বদল, হাত বদল হলেও ইটালিয়ান স্টাইলে বানানো এই বিল্ডিং এখনও ক্যালকাটা ইলেক্ট্রিক সাপ্লাই কর্পোরেশন বা সিইএসসি-র মূল ভবন। এর বেশি আমি জানি না। তুমি আগ্রহী হলে খোঁজ খবর নিতে পারি।

– না না। অত কিছুর দরকার নেই। আসলে এই পুরোনো বিল্ডিংগুলোর আর্কিটেকচার দেখলেই বোঝা যায় এই দেশ, এই রাজ্য এক সময় উপনিবেশবাদের ফলশ্রুতি। তবে যাই বলুন না কেন, এরকম শক্ত মজবুত বিল্ডিং এখন আর বানানো সম্ভব নয়।
সৌম্য হাসতেন। এখন একটা ব্রিজ বা রাস্তা বানালেই দু-তিন বছরের বেশি টেকে না, আর এমন বাড়ি! নো ওয়ে। বলে কাঁধ ঝাঁকালেন।
স্মৃতির সরণী ধরে মোহনা পুরোনো দিনে ফিরে যায়।
– তুমি মোগলাই খাবে? রোল? এখানে দারুণ বানায়।
পরদিন ফোন অন করা মাত্র ‘সরি’ লেখা একাধিক মেসেজ পেয়েছিল সৌম্যর থেকে। না, শেষ অবধি মানুষটাকে ঘৃণা করতে পারেনি মোহনা। তবে আগে ওই চত্ত্বরে গেলেই যেমন চলে যেত তার দপ্তরে, সেই যাওয়াটা বন্ধ করে দিয়েছিল।
– আপনার অফিসে বানায়? ক্যান্টিনে?
– দূর! অফিসে নয়। সামনে একটা রেস্তোরা আছে। সেখানে। বলেই বেল বাজাতেন সৌম্য। সাদা পোশাক পরা আর্দালি এসে দাঁড়ালে টাকা বের করে অর্ডার দিয়ে আনিয়ে নিতেন।
ক্রমশ তার ব্যবহারে মোহনার মধ্যে অপার শ্রদ্ধা জমা হয়েছিল মানুষটার প্রতি। সেই মানুষটাই একদিন রাতে লিখেছিল, মোহনা আমি এখন পুরো নগ্ন হয়ে একা আলো নিভিয়ে শুয়ে আছি। আসবে আমার শরীরে?
মোহনা হতভম্ব হয়ে গেছিল তার টেক্সট পড়ে। সে লিখেছিল, আপনার মাথা খারাপ হয়ে গেছে।

– মাথা সেদিনই খারাপ হয়েছে, যেদিন তুমি প্রথম এসেছিলে আগুন রঙের চুড়িদারে। কিন্তু আমি কখনও তোমাকে অমর্যাদা করিনি। আসলে আমি তোমাকে ভালবেসে ফেলেছি। বিশ্বাস করো কোনও অসৎ উদ্দেশ্য আমার নেই। তবে আজ একটু ড্রিংক করেছি। তাই হয়তো…
– বেশ, তবে আজ আর কথা নয়। ঘুমিয়ে পড়ুন, বলে মোহনা সুইচ অফ করে দিয়েছিল।
পরদিন ফোন অন করা মাত্র ‘সরি’ লেখা একাধিক মেসেজ পেয়েছিল সৌম্যর থেকে। না, শেষ অবধি মানুষটাকে ঘৃণা করতে পারেনি মোহনা। তবে আগে ওই চত্ত্বরে গেলেই যেমন চলে যেত তার দপ্তরে, সেই যাওয়াটা বন্ধ করে দিয়েছিল।
সৌম্যদাও কলকাতা ছেড়ে মুম্বাই চলে গেল। তারপর যোগাযোগ প্রায় বন্ধ হয়ে এল। এখন মাঝে মাঝে অফিসিয়াল টেক্সটের মতো হ্যাপি নিউ ইয়ার, শুভ পয়লা বৈশাখ, শুভ বিজয় দশমী… এসবের আদানপ্রদানটুকুই রয়ে গেছে।
তার মনে পড়ে সমাজের উঁচুতলার মানুষগুলোর নানা বিকৃত মুখ, যেগুলো মুখোশের আড়ালে লুকিয়ে রাখে তারা। সময়মতো খুলে স্বরূপ দর্শন করায়। তারপর আরেকটা মুখোশ পরে নেয়।
ধর্মতলা থেকে হাঁটতে হাঁটতে মোহনা পৌঁছাল স্মৃতির সরণি ধরে রবীন্দ্রসদন। মাঝে যতগুলো প্রাইভেট অরগানাইজেশন, জুতোর শোরুম, হোটেল, কর্পোরেট অফিস, সব ভিজিট করা বিজ্ঞাপনের জন্য।
আলোককাকুর কথাগুলো তার মাথায় ঘোরে সব সময়।
“-পত্রিকা চালাতে হবে বিজ্ঞাপনের টাকায়, আর প্রকাশনী চলবে বই বিক্রি করে তার থেকে আসা টাকা রোল করে, সেখানে মাঝে মাঝে ইনভেস্ট করতেই পারিস। তবে মাথায় রাখবি, পত্রিকার মেরুদণ্ড কিন্তু বিজ্ঞাপন। একটা এলেও জানবি সেটা দিয়ে তোর একটা পারপাস সার্ভ হবে।
-কিন্তু সব সংখ্যায় কীভাবে পাব? বেশিরভাগই তো দিতে চায় না।
– হাল ছাড়লে হবে না। এটা হচ্ছে সমুদ্রের মতো। একবার যখন নেমে পড়েছিস, তখন সাঁতরে যেতেই হবে। নইলে কূল পাওয়া মুশকিল।”
মোহনা ভাবত আরও কতটা সাঁতরে যেতে হবে তাকে! কতটা পথ পেরোলে সে সংস্থাকে আবার টেনে তুলে দাঁড় করাতে পারবে!
মাঝে মাঝে খুব হাসি পায় তার নিজের। এই যে এতটা পথ সে হেঁটেছে, ইতিহাস কি তাকে মনে রাখবে? এই কিছুদিন আগে অতিমারিতে যখন পৃথিবীর মানুষ মুহূর্তের মধ্যে নেই হয়ে যাচ্ছিল, তখন শেষ অবধি কারা টিকে থাকবে সেটাও অজানা। সে না থাকলে এর ভার কে নেবে! যদি রাই নেয়ও, তবেও কি নতুন পৃথিবীর ইতিহাস যখন লেখা হবে, প্রকাশনা সংস্থার কাল বিবরণী যখন মানুষ পড়বে, সেখানে কীভাবে তারা বিবৃত করবে মোহনা চৌধুরীর এই স্ট্রাগল, এত মানুষের যৌন প্রলোভন উপেক্ষা করে মাথা উঁচু রেখে নিজের কাজে মগ্ন এক নারীর উত্থানের কাহিনিকে!
তার মনে পড়ে সমাজের উঁচুতলার মানুষগুলোর নানা বিকৃত মুখ, যেগুলো মুখোশের আড়ালে লুকিয়ে রাখে তারা। সময়মতো খুলে স্বরূপ দর্শন করায়। তারপর আরেকটা মুখোশ পরে নেয়।
আমাদের আদি বাড়ি ছিল দক্ষিণ ভারতের মহিশূরে। সেখান থেকে প্রায় সাড়ে তিনশো বছর আগে আমাদের বংশের একজন ইংরেজদের ও মারাঠাদের সঙ্গে যুদ্ধে পরাজিত টিপু সুলতানের পরিবার যখন কলকাতা আসেন, তখন ভাগ্য অন্বেষণে তাদের সঙ্গে এখানে চলে এলেন।
কম তো ঠকেনি সে অন্যকে বিশ্বাস করে। কিন্তু খাদে পড়ে যাওয়ার ঠিক আগের মুহূর্তে কে যেন টেনে তুলেছে হাত ধরে।
আলোক কাকু বলে, “যে কাজ ভালোবাসে, কাজের প্রতি সৎ থাকে তার মাথার উপর ঈশ্বরের হাত থাকে।
– তুমি আবার কবে থেকে ঈশ্বর বিশ্বাসী হলে কাকু? তুমি তো ঘোর নাস্তিক।
– ঠিকই। এই মূর্তি পুজোয় আমার বিশ্বাস নেই। কোটি কোটি টাকা দেবতার নামে ব্যয় করে পূণ্য অর্জন করাকে আমি কখনও সমর্থন করি না। সেই টাকা মানব উন্নয়নে কাজে লাগালে সভ্যতার উন্নতি হয় অনেক বেশি। কিন্তু এখানেই তো এমন এক সন্ন্যাসী জন্মেছিলেন, যিনি বলেছিলেন- “বহু রূপে সম্মুখে তোমার ছাড়ি কোথা খুঁজিছ ঈশ্বর জীবে প্রেম করে যেই জন সেই জন সেবিছে ঈশ্বর …।”

আমি তো মনে করি তাঁর মতো কর্মনিষ্ঠ মানুষ সারা পৃথিবীতেই কম জন্মেছেন। তিনি কিন্তু বলেননি, দেবতার জন্য দেদার খরচ করো, মানুষের সেবা করতে বলেছেন, নিজের কাজ মন দিয়ে করতে বলেছেন। কাজেই মুক্তি। যে নিরলস ভাবে কাজ করে, তার পাশে কেউ না কেউ ঠিক থাকে। এই মানুষরুপী ভগবানের কথাই আমি বলছি।
– বুঝলাম। তোমার কথা বলো কাকু। তুমি কী করে এই প্রকাশনা শুরু করলে?
– সে লম্বা গল্প। বলে আলোক সিগারেট ধরাল। তোকে তো বলেছিলাম, আমার পূর্বপুরুষেরা ঘিয়ের ব্যবসা করত। আমাদের আদি বাড়ি ছিল দক্ষিণ ভারতের মহিশূরে। সেখান থেকে প্রায় সাড়ে তিনশো বছর আগে আমাদের বংশের একজন ইংরেজদের ও মারাঠাদের সঙ্গে যুদ্ধে পরাজিত টিপু সুলতানের পরিবার যখন কলকাতা আসেন, তখন ভাগ্য অন্বেষণে তাদের সঙ্গে এখানে চলে এলেন। তারপর এখানকার মেয়ে বিয়ে করে এখানেই থেকে গেলেন। ধীরে ধীরে এখানেও ঘিয়ের ব্যবসা শুরু করলেন। জোড়াসাঁকোর কাছে দোকান দিলেন। ক্রমশ তাঁর ব্যবসা বাড়তে লাগল। ছেলেপুলেও হল। এভাবেই পরিবার বাড়ল।
তিনি সেই ইউনিভার্সিটির প্রিন্টিং বিভাগের হেডের সঙ্গে আমাকে পরিচয় করিয়ে দিয়ে বললেন, একে গড়ে নিন। এই তরুণ প্রকাশনা সংস্থা শুরু করছে। কিন্তু কিছু ধারণা নেই। তবে আমার বিশ্বাস শিখিয়ে দিলে শিখে যাবে।
– এখনও আছে সে দোকান?
– হ্যাঁ, আছে তো। আমি নিজেই ছোটবেলায় কতবার গেছি বাবার সঙ্গে সেখানে। বিশাল দোকান। অবশ্য তখন আর শুধু ঘিয়ের ছিল না। গ্রসারির সঙ্গে সঙ্গে মিষ্টি, জামাকাপড় সবেতেই তখন তারা টাকা লাগিয়েছিল। আর এর ফলে একটা সময় তারা মনে করেছিল, পড়াশোনা করাতেই হবে ছেলেমেয়েদের। কারণ শিক্ষা ছাড়া মানে পুঁথিগত ডিগ্রি ছাড়া সমাজের এলিট শ্রেণি বলে তারা পরিগণিত হবে না। ফলে টাকা খরচা করে দেশের বাইরে ছেলেদের পাঠাল পড়তে, মেয়েরাও সাহেবদের স্কুলে পড়তে গেল।
পড়া শেষে কেউ ব্যবসা বাড়াল, কেউ স্কুল-কলেজে পড়াতে ঢুকল, আবার কেউ কেরানি হল। কিন্তু মূল ব্যবসায় সকলের ভাগ রইল। আমি তো স্কুলে পড়ার সময় জেলে গেলাম। ছাড়া পেয়ে বাইরে গিয়ে গা ঢাকা দিয়ে যবে ফিরলাম আবার এখানে, তখন বুঝতে পারছিলাম না কী করব! বাইরে থাকতে পড়াশোনা ভালভাবেই করেছি, দোকানে বসতে ইচ্ছে হচ্ছিল না। সেই সময় আমার এক জামাইবাবু বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াচ্ছেন। তিনি একদিন আমাদের বাড়ি এসেছেন। আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, কী করব বলে মনস্থির করেছি?
আমি বললাম, দোকানে বসতে ইচ্ছে করে না। কিন্তু বিয়ে হয়ে গেছে, কিছু তো করতে হবে।
তখন তিনি বললেন, তোমার বই প্রকাশনা নিয়ে আগ্রহ আছে?
আমি তখন এই নিয়ে কিছুই জানি না। কিন্তু একটা বিকল্প রাস্তা পাচ্ছি ভেবে বলে ফেললুম, আছে।
তিনি বললেন, কাল আমার ডিপার্টমেন্টে বিকেল চারটের পর চলে এসো। দেখি কীভাবে শুরু করা যায়।
গেলাম পরদিন। তিনি সেই ইউনিভার্সিটির প্রিন্টিং বিভাগের হেডের সঙ্গে আমাকে পরিচয় করিয়ে দিয়ে বললেন, একে গড়ে নিন। এই তরুণ প্রকাশনা সংস্থা শুরু করছে। কিন্তু কিছু ধারণা নেই। তবে আমার বিশ্বাস শিখিয়ে দিলে শিখে যাবে।
সেই আমার পথ চলা শুরু হল। সংস্থার নাম, লোগো সব তাঁর দেওয়া, বানানো। ধীরে ধীরে বহু বিখ্যাত মানুষের বই প্রকাশ করলাম। তিনিই নিয়ে যেতেন আমাকে বড় বড় লেখক লেখিকাদের কাছে। প্রথাগত গল্প কবিতা উপন্যাস বাদ দিয়ে আমরা প্রবন্ধ, নাটক, অনুবাদ সাহিত্যে বেশি আগ্রহী হলাম। ফলে অন্য ধারার প্রকাশনা হিসেবে স্বীকৃতি আসতে শুরু করল। তারপর ধীরে ধীরে বহু বিখ্যাত মানুষের বই প্রকাশ করলাম। অবশ্য জামাইবাবু যতদিন বেঁচেছিলেন আমাকে সমানে গাইড করেছেন। ওঁর জন্যই আজ এখানে এসে পৌঁছাতে পেরেছি।
আমার জীবনে তাঁর প্রচুর অবদান। তিনি শিখিয়েছিলেন, একমাত্র সত্যের জন্য মাথা নত করবে, আর কারওর কাছে কোনও মূল্যেই মাথা নোয়াবে না। মেরুদণ্ড একবার বাঁকতে শুরু হলে সেটা আর কখনও সোজা করা যায় না।
– কখনও তাঁর সঙ্গে মতবিরোধ হয়নি?
– একেবারেই হয়নি বললে ভুল বলা হবে। হয়তো তিনি বলছেন, এই বইটার সাইজ এমন করতে হবে। আমি তখন ভাবছি বিদেশি একটা বই দেখেছিলাম অন্য কোনও সাইজে, সে রকম করলে ভাল হবে। বিশেষ করে নাটকের বইগুলো নিয়েই বেশি মতান্তর হত। তবে তিনি শেষ অবধি মেনে নিয়েছিলেন, এবং ডামি দেখে খুশি হয়ে প্রশংসাও করেছিলেন। আসলে কী জানিস, অন্ধ অনুকরণ করলে একটা নির্দিষ্ট দূরত্ব অবধি পৌঁছানো যায়। তারপর? আমি চেয়েছিলাম ধীরে হোক, কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী হতে হবে। তাই চোখ কান খোলা রেখে যেখান থেকে যা শেখার শিখেছি। সেখানে আপোস করিনি।
– তোমার অফিস ঘরের দেওয়ালে যার ছবি ঝোলে তিনি? তাঁকে দেখে তো সন্ন্যাসী মনে হয়।

– না না, তিনি নন। যাঁর ছবি ঝোলে, তিনি আমার ছোট কাকু। তিনি আমাদের পারিবারিক ব্যবসা সামলাতেন। কিন্তু আদতে তিনি ছিলেন এক নির্লিপ্ত সন্ন্যাসী। কোনও লোভ, হিংসা, ঈর্ষা তাঁকে স্পর্শ করেনি কখনও। নিজের রান্না নিজেই করে খেতেন। নিরামিষ খেতে ভালবাসতেন। গরিব দুঃখীদের জন্য বিনা পয়সায় দোকান থেকে মাসে মুদিখানার জিনিস নেওয়ার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। কেউ কিছু এ বিষয়ে বললে, বলতেন, এই টাকা আমার ভাগ থেকে কেটে নেবে। ধরে নাও, এত টাকার জিনিস আমি কিনেছি।
– আশ্চর্য মানুষ তো!
– হ্যাঁ। আমার জীবনে তাঁর প্রচুর অবদান। তিনি শিখিয়েছিলেন, একমাত্র সত্যের জন্য মাথা নত করবে, আর কারওর কাছে কোনও মূল্যেই মাথা নোয়াবে না। মেরুদণ্ড একবার বাঁকতে শুরু হলে সেটা আর কখনও সোজা করা যায় না।
সে এখন ঘুম আসে না। নানা রোগে জেরবার। নইলে আর কোনও অশান্তি নেই। আলোক শেষ হয়ে যাওয়া সিগারেটের টুকরোটা আশট্রেতে ফেলে আরেকটা ধরায়।
তুমি তাঁর যথার্থ উত্তরসুরী। তোমার সঙ্গে যাঁরা কাজ শুরু করেছিলেন, তাঁরা আজ একচেটিয়া কারবার করছে, আর তুমি?
– আমি কী রে? ভালই তো আছি। কাউকে তেল না দিয়ে, না ঠকিয়ে সৎভাবে মাথা উঁচু করে বাড়ি ফিরে রাত্রে নিশ্চিন্তে ঘুমোতে পারি। এটা বড় পাওনা নয়?
– নিশ্চিন্তে আর ঘুমোও কোথায়? যখনই ফোন করি জেগে আছো দেখি।
– সে এখন ঘুম আসে না। নানা রোগে জেরবার। নইলে আর কোনও অশান্তি নেই। আলোক শেষ হয়ে যাওয়া সিগারেটের টুকরোটা আশট্রেতে ফেলে আরেকটা ধরায়।
মোহনা সেই পরিতৃপ্ত মুখের দিকে তাকিয়ে ভাবে, যদি তাই হয়, তবে তুমিও আমার কাছে ঈশ্বর হয়েই এসেছ। সরে যেও না পাশ থেকে।
(ক্রমশ)
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত