(Jolke Chol 26)
স্নেহলতার শরীরটা ক’দিন ধরে ঠিক নেই। মাথায় একটা ব্যথা হচ্ছে। গা ম্যাজম্যাজ করছে। যেন জ্বর আসবে এমন। আসলে তাঁর মনটা ঠিক নেই। অনেকদিন ছেলেটাকে দেখেননি, সেই যে বাবা চলে যাওয়ার পর সাতদিনের জন্য দেশে এল, তারপর থেকে আর আসেনি। তিনি বোঝেন, ছেলের কাজের গুরুত্ব, এটাও বোঝেন, প্রমিত আসতেও চায় না, নইলে কি একবারও ছুটি পায় না! মোহনার সঙ্গেও যে সে যোগাযোগ রাখে না নিয়মিত, সেটাও বোঝেন। রাই অবশ্য নিয়ম করে ফোনে ভিডিও কলে ধরে দেয়। কিন্তু তাতে মন ভরে না।
তাঁর ইচ্ছে করে, ছেলেটার গায়ে পিঠে হাত বুলিয়ে দিতে, নিজের হাতে তদারকি করে তাঁর পছন্দের খাবার রান্না করে খাওয়াতে। হাজার হোক মা তো! ছেলের সঙ্গে সম্পর্ক যে এমন শিথিল হয়ে যাবে, এটা তিনি ভাবেননি। অথচ মোহনা পরের বাড়ির মেয়ে হয়েও তাঁকে ভাল রাখার নিরন্তর চেষ্টা করে।
আরও পড়ুন: জলকে চল: পর্ব – (১) (২) (৩) (৪) (৫) (৬) (৭) (৮) (৯) (১০) (১১), (১২) (১৩), (১৪) ,(১৫), (১৬), (১৭), (১৮), (১৯), (২০), (২১), (২২), (২৩), (২৪), (২৫)
একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল মুখ দিয়ে!
তিনি কি সন্তান মানুষে কোনও ভুল করেছিলেন? অতিরিক্ত ভালবাসা, খোকার সব কথা মেনে নিতে নিতে কি বুঝতেই পারেননি তার মধ্যে কোনও টান তৈরি হয়নি বাবা-মার প্রতি!
যদি মোহনা ফিরে না আসত দেশে, রাই না থাকত তার সঙ্গে, এই বৃদ্ধ বয়সে তিনি একা কীভাবে কাটাতেন!
স্নেহলতা শাড়ির আঁচল দিয়ে চোখ মুছল। কেন যে অকারণে চোখে জল আসে! যে তোমাকে ভালবাসে না, সে কখনও তোমার জন্য ফিরে আসবে না। তার কথা মনে করার দরকার নেই। শুধু শুধু নিজে কষ্ট পাওয়া।
আসলে স্নেহ নিজেও বোঝেন এগুলো মায়া। তবু মা বলেই হয়তো ভাবে।
প্রথম প্রথম মোহনার ওপর রাগ হত। বরকে ছেড়ে মেয়ে নিয়ে চলে এলি কোন যুক্তিতে? বিদেশে ছেলের কোনও অসুখবিসুখ হলে কে সামলাবে! তুই তো জেনে শুনেই বিয়ে করেছিলি। খুব প্রেম তখন। চলে আসার সময় সেই প্রেম উবে গেল?
খোকাও এখানেই খেলত তার বন্ধুদের সঙ্গে। তবে খেলাধুলার চেয়ে বই পড়তে সে বেশি ভালবাসত। তবু যে কেন বইয়ের ব্যবসাটাকে ভালবাসতে পারল না, এটা সে বুঝে উঠতে পারেনি। সারদা মা বলেছিলেন, অন্যের দোষ না ধরে নিজের দোষ দেখো। কিন্তু কোথায় তাঁর দোষ এটাই তিনি খুঁজে বের করতে পারেন না।
কিন্তু খোকার বাবা বুঝিয়েছিল, মোহনার সঙ্গে খোকার ছাড়াছাড়ি হয়নি। সে এখানে এসেছে আমরা যাতে বুড়ো বয়সে একা না থাকি। যদি তা না হত, তবে কি সে আমাদের সঙ্গে থাকত? একবার ভেবে দেখো অত বড় চাকরি যে করছে, তার দরকার কি আমাদের সঙ্গে থাকার? তার নিজের বাপের বাড়ি আছে, সে একটাই মেয়ে। তাছাড়া, সে নিজেও ইচ্ছে করলেই একটা ফ্ল্যাট কিনে নিতে পারে। কিন্তু সে এসব কিছুই করেনি। আমাদের যথেষ্ট খেয়াল রাখে, আর সবচেয়ে যেটা আনন্দের, রাই আমাদের সঙ্গে আছে। বুড়ো বয়সে সে-ই তো অন্ধের যষ্টি।
স্নেহলতা এসবই বুঝেছিলেন। তবু মেনে নিতে কষ্ট হত। পরে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অমিত যে কতটা যুক্তিযুক্ত কথা বলেছিলেন, তা অনুভব করেছেন। রাই আর মোহনা ছাড়া আজ আর কিছু ভাবা যায় না।

স্নেহলতা নিজের বিছানা থেকে উঠে জানলার গরাদ ধরে দাঁড়ালেন। এখান থেকে রাস্তা দেখা যায়। কতগুলো ছেলে ক্রিকেট খেলছে। এই গলিটায় গাড়িঘোড়া বিশেষ আসে না। তাই বিপদ মুক্ত হয়ে নির্ভাবনায় ছেলের দল খেলতে পারে।
খোকাও এখানেই খেলত তার বন্ধুদের সঙ্গে। তবে খেলাধুলার চেয়ে বই পড়তে সে বেশি ভালবাসত। তবু যে কেন বইয়ের ব্যবসাটাকে ভালবাসতে পারল না, এটা সে বুঝে উঠতে পারেনি। সারদা মা বলেছিলেন, অন্যের দোষ না ধরে নিজের দোষ দেখো। কিন্তু কোথায় তাঁর দোষ এটাই তিনি খুঁজে বের করতে পারেন না। মা হিসেবে এই ব্যর্থতা তাঁকে কুড়ে কুড়ে খায় মাঝে মাঝে।
শাড়ি পাল্টাতে পাল্টাতেই এক গাছের থেকে আরেক গাছের সঙ্গে বেঁধে রাখা কাপড়ের ছায়া দিয়ে দেখতেন পেতেন দূরে ছেলের দল দাঁড়িয়ে। তাঁরা এখান থেকে সরে গেলে তবেই তাদের প্রবেশ।
জানলা দিয়েই তিনি দেখতে পেলেন মোহনার গাড়ি এসে দাঁড়াল। ছেলেগুলো খেলা থামিয়ে একটু সরে গেল। মোহনা গাড়ি থেকে নেমে বাড়িতে ঢুকল। গাড়িটা গ্যারেজে ঢুকিয়ে দেওয়া মাত্র তারা আবার নিজেদের অবস্থানে ফিরে এল। খেলা শুরু করল।
তাঁর শৈশবে তিনি ক্রিকেট খেলা দেখেননি। তাঁরা পিট্টি, লুকোচুরি, ধাপ্পা, গাছে চড়ে এক গাছ থেকে আরেক গাছে লাফানো, সাঁতার এসব করতেন। মেয়েদের একটা দল ছিল। সেখানে ছেলেদের প্রবেশ নিষিদ্ধ। তাঁরা যখন বাঁধা পুকুর ঘাটে স্নানে যেতেন, তখন ছেলেরা সেখানে থাকার অনুমতি পেত না।
ঘণ্টা দুই-তিন পুকুরের এপার থেকে ওপার ডুব সাঁতার, চিৎ সাঁতার কেটে ক্লান্ত হয়ে যাওয়ার পর জল থেকে উঠে আসতেন।
শাড়ি পাল্টাতে পাল্টাতেই এক গাছের থেকে আরেক গাছের সঙ্গে বেঁধে রাখা কাপড়ের ছায়া দিয়ে দেখতেন পেতেন দূরে ছেলের দল দাঁড়িয়ে। তাঁরা এখান থেকে সরে গেলে তবেই তাদের প্রবেশ।
ইচ্ছে করেই এক-একদিন তারা দু-তিন ঘণ্টার বদলে চার ঘণ্টা পুকুরে থাকত। সেদিন ছেলেদের মুখটা বিরক্তিতে ফেটে যেত। কিন্তু কিছু বলতে পারত না।
বিশেষ করে শাশুড়ি মারা যাওয়ার পর তো আরওই যাওয়া বন্ধ হয়ে গেল। শ্বশুরকে একা রেখে যাওয়া সম্ভব ছিল না। আবার রেখে যাওয়ার ব্যবস্থা করা হলেও তাঁর মা বকতেন।
বাঁধা ঘাটটা কি আর আছে? কত বছর হয়ে গেল বাপের বাড়ি যাননি! সেই যে ছেলের বিয়ের নিমন্ত্রণ করতে গেছিল, তারপর আর যাওয়া হল না। এখন যেতে ইচ্ছে করে। কিন্তু কার সঙ্গে যাবে? মোহনাকে বললে হয়তো নিয়ে যাবে, বা গাড়িও দিয়ে দেবে, তবু নিজের ছেলে সঙ্গে থাকলে যে আনন্দ, গর্ব হয়, তা কি পাওয়া যায় একা গেলে!
তাছাড়া ওখানে আপন বলতে আর আছেই বা কে? বাবা, মা, জ্যেঠু, জ্যেঠাইমা, কাকু, কাকিমা…সবাই চলে গেছেন কবেই। ভাইবোনগুলোর মধ্যে দাদারা আর কেউ নেই, ভাই একটা আছে, তবে তার সঙ্গে সেভাবে যোগসূত্র তৈরি হয়নি। তার বিয়ে হয়ে যাওয়ার প্রায় চার পাঁচ বছর পরে সে জন্মেছে। খোকারই বয়সী। তাকে কি ভাই বলা যায়! ছেলের মতোই। খোকা যখন ছোট ছিল, তখন কয়েক বার গেছে। কিন্তু খোকা স্কুলে ভর্তি হয়ে যাওয়ার পর আর সেভাবে যাওয়া হল কই?

বিশেষ করে শাশুড়ি মারা যাওয়ার পর তো আরওই যাওয়া বন্ধ হয়ে গেল। শ্বশুরকে একা রেখে যাওয়া সম্ভব ছিল না। আবার রেখে যাওয়ার ব্যবস্থা করা হলেও তাঁর মা বকতেন। ‘তুই ঠিক করিসনি বৃদ্ধ মানুষটাকে কাজের লোকের ভরসায় রেখে এসে। লোকে জানলে নিন্দে করবে আমাদের। বলবে, এই শিক্ষাটুকু মেয়েকে দিতে পারেনি মা-বাবা।’
– মা, আমি তোমাদের থেকে আর কতটুকু শেখার সুযোগ পেয়েছিলাম? ও বাড়ির মা-ই তো সব হাতে ধরে শেখালেন।
মায়ের কথা শুনে রাগ হত তাঁর। চিৎকার করে বলতেন- পরিস্কার করে বললেই তো পারো, আমি আসি এটা তোমাদের পছন্দ নয়। আসলে তোমরা তো কোনও দিনই চাওনি আমাকে। জ্যাঠাইমা ছিল বলে কিছু বলতে পারোনি। যেই তিনি চলে গেলেন, অমনি তোমার স্বরূপ খুলে গেল।
– তাহলেই বোঝ, তাদের একা রেখে আসা কত বড় অন্যায়। তাছাড়া বিয়ের পর শ্বশুরবাড়িটাই সব। অত বাপের বাড়ি এলে লোকে ভাববে মেয়ে বুঝি ও বাড়িতে ভাল নেই।
মায়ের কথা শুনে রাগ হত তাঁর। চিৎকার করে বলতেন- পরিস্কার করে বললেই তো পারো, আমি আসি এটা তোমাদের পছন্দ নয়। আসলে তোমরা তো কোনও দিনই চাওনি আমাকে। জ্যাঠাইমা ছিল বলে কিছু বলতে পারোনি। যেই তিনি চলে গেলেন, অমনি তোমার স্বরূপ খুলে গেল।
– সে তুই যাই বল, আর যতই গাল দে আমাদের, আমি বারবার এক কথাই বলব। বৃদ্ধ বেয়াইমশাইকে একা রেখে এসে কাজটা তুই ভাল করিসনি। তাছাড়া জামাই বাবাজীবনও আসে না। সে এলে না হয় তুই কদিন থাকতে পারতিস। দু’জন পুরুষ মানুষ মিলে থাকতে পারে? সংসারের তারা কী বোঝে? বলিহারি মেয়ে বটে আমাদের! নিশ্চিন্তে সব ছেড়ে চলে এলি? একটুও মায়া দয়া হল না বরের জন্য! বাড়ি ফিরে তোকে না দেখতে পেলে তার ঘরে মন টিকবে?
মায়ের ওপর রাগ করে তখনই সুটকেস গুছিয়ে খোকাকে টানতে টানতে নিয়ে গরুর গাড়িতে উঠে বসতেন তিনি। স্টেশনে এসে ট্রেন ধরতেন। প্রতিজ্ঞা করতেন, আর কখনও আসবেন না এখানে।
স্নেহলতা জানলা থেকে সরে এসে আবার বিছানায় বসলেন। বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলে কোমরে ব্যথা হয়। মোহনা ডাক্তার দেখিয়েছিল। ডাক্তার বলেছেন, এটা বয়সের কারণে। কোনও রোগ নেই।
সত্যি রাগ করে বহুদিন যাননি সে। বাবা মারা যাওয়ার ট্রাঙ্ককল পেয়ে তবেই গিয়েছিলেন। সাদা শাড়িতে মাকে দেখে মন কেঁদে উঠেছিল। ভেবেছিলেন কদিন মায়ের সঙ্গে থাকলে মায়ের মন ভাল হবে, তারও ভাল লাগবে। কিন্তু মা তখনও একই কথা বলেছিলেন।
মা চলে যাওয়ার পর, দাদার খাতার পাতায় গোটা গোটা অক্ষরে মায়ের হাতে লেখা বিবরণ থেকে জেনেছিলেন, তার শহরে বিয়ে, সিনেমার নায়িকাদের মতো শাড়ি পরা, বড় বড় সাহিত্যিকদের সঙ্গে আলাপ পরিচয়- গ্রামের লোকেদের মনে ঈর্ষা জাগিয়ে তুলেছিল। মা ভয় পেতেন, তার যদি কোনও ক্ষতি করে দেয় গ্রামের লোকেরা! তুকতাক, জাদু বিদ্যা, মারণ, বাণ এসব গ্রামে লেগেই থাকে বলে মা বিশ্বাস করতেন। তাই যেনতেনপ্রকারণে তিনি গেলেই মা পাঠিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করতেন।
তাঁর আক্ষেপ হয়েছিল মাকে ভুল বোঝার জন্য। কিন্তু মা তখন অনেক দূরে।
স্নেহলতা জানলা থেকে সরে এসে আবার বিছানায় বসলেন। বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলে কোমরে ব্যথা হয়। মোহনা ডাক্তার দেখিয়েছিল। ডাক্তার বলেছেন, এটা বয়সের কারণে। কোনও রোগ নেই।
ওই সব চ্যানেলেই একই গল্প। গরিবের মেয়ে বড়লোকের ছেলে, অথবা উল্টোটা। আর তাদের ঘিরে একগাদা ভিলেন। বাড়ির মেয়েদের যে কতরকম শত্রু, হিংস্র, প্রতিশোধপরায়ণ, খারাপ বানানো যায়, তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ এগুলো।
মোহনা ওপরে এল কি না বুঝতে পারা যাচ্ছে না। সে বাইরে থেকে এসে স্নান করে তবেই দোতলায় ওঠে। পুজো করে, মেয়ের কাছে আগে যায়। তারপর তাঁর ঘরে আসে। এক সঙ্গে বসে তাঁরা চা খায়। আগে টিভি দেখত তাঁর সঙ্গে বসে চা খেতে খেতে।
এখন তাঁর নিজের আর টিভি চালাতে ইচ্ছে করে না। মোহনা বলে, ‘মা চালিয়ে দেখতে পারো তো! সময় কেটে যায় দেখলে।’
– না বউমা। ওই সব চ্যানেলেই একই গল্প। গরিবের মেয়ে বড়লোকের ছেলে, অথবা উল্টোটা। আর তাদের ঘিরে একগাদা ভিলেন। বাড়ির মেয়েদের যে কতরকম শত্রু, হিংস্র, প্রতিশোধপরায়ণ, খারাপ বানানো যায়, তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ এগুলো। তুমি বাস্তবে দেখবে না এত রকম নোংরামি।

– কিন্তু মা বাস্তব থেকে নিয়েই তাতে কল্পনা মিশিয়ে এগুলো তৈরি হয়। মোহনা বলে।
– কী জানি বাপু! শহরের ছেলে গ্রামে গেল, বাধ্য হয়ে সেখানকার মেয়েকে বিয়ে করে আনল, তার পরিবার যত রকম অত্যাচার পারা যায়স মেয়েটার প্রতি করল। আর মেয়েটা সব সহ্য করেও নিজেকে মহান প্রতিপন্ন করার জন্য ব্যস্ত হয়ে উঠল। এদিকে ছেলেটার আবার বিয়ে দেওয়ার অনুষ্ঠান তার বাগদত্তার সঙ্গে, শাশুড়ি হল অত্যাচারী…এসব গল্প দেখলে আমার মাথা ধরে যায়। বুকে যন্ত্রণা শুরু হয়।
– কিন্তু এসব গল্পের টিআরপি সবচেয়ে বেশি। আর চারপাশে এরকম ঘটনা হামেশাই ঘটছে।
কেন রে বাপু, সুস্থ সম্পর্ক, ভালবাসা, যৌথ পরিবারের গল্প এগুলো দেখানো যায় না? তাতে তো নীতিবোধ, মূল্যবোধ গড়ে ওঠে সমাজের। এ সব দেখার চেয়ে বই পড়া অনেক ভাল। মনে শান্তি পাই।
– সে যাই ঘটুক, আমার দমবন্ধ লাগে এসব দেখলে। মেয়েদের একটা এমনিতেই বদনাম আছে সেই আদিম যুগ থেকে। কৈকেয়ী, কুজি মন্থরা দিয়ে শুরু যে হল বলা মেয়েরাই মেয়েদের শত্রু, এগুলো দেখানোর মধ্যে দিয়ে যেন সেগুলোকেই প্রতিষ্ঠা করার আপ্রাণ চেষ্টা। কেন রে বাপু, সুস্থ সম্পর্ক, ভালবাসা, যৌথ পরিবারের গল্প এগুলো দেখানো যায় না? তাতে তো নীতিবোধ, মূল্যবোধ গড়ে ওঠে সমাজের। এ সব দেখার চেয়ে বই পড়া অনেক ভাল। মনে শান্তি পাই।
মোহনা হাসে শাশুড়ির কথা শুনে।
– আমার মা’ও একেবারে পছন্দ করে না সিরিয়াল দেখতে। সেও তোমার মতো ভাবে। বলে সময়ের অপচয়। বাবা খালি খবর দেখে।
– ওরে বাবা, বেয়াইকে খবর দেখতে একেবারে বারণ করো।
– কেন? খবরে আবার কী অসুবিধা?
– যত রকম ভয় মনে ঢোকানো যায়, সব ঢুকিয়ে দেওয়ার মাধ্যম হল খবরের চ্যানেলগুলো। রাজনৈতিক লড়াই থেকে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সমাজ, যা যা আছে সব নিয়ে তরজা বসাবে একগাদা লোক ডেকে এনে। আর তারপর এমন চেঁচামিচি জুড়বে যে, তোমার যদি কোনও অসুখ কখনও নাও থাকে এগুলো শুনেই হয়ে যাবে।
মা, ঘর অন্ধকার করে কী ভাবছ বসে? আলো জ্বালাওনি? শরীর ঠিক আছে? বলে আলো জ্বালালো মোহনা। মোহনার ডাকে যেন একটা ঘোরের থেকে উঠে বসল স্নেহলতা।
– মা তুমি দিন দিন ঘরকুনো হয়ে বিশ্ব সংসার থেকে মুখ ঘুরিয়ে নিচ্ছ।
– মোটেই না। তোমার ওই টিভি দেখার চেয়ে সেই সময় আমি রেডিও শুনব। কত অনুষ্ঠান হয়, গল্প, কবিতা পাঠ হয়। দূরদর্শন দেখব। কানের চোখের আরাম। আর এই বয়সে এসে নতুন করে আর শোনার কীই বা আছে?
– তোমার তাহলে এখন কী ইচ্ছে করে সেটা বলো। মোহনা জানতে চায়।
– এখন একটাই প্রার্থনা তোমরা ভাল থাক, আমি যেন শান্তিতে তোমার শ্বশুরের মতোই চলে যেতে পারি।

শাশুড়ির কথা শুনে মোহনা মুখ চেপে ধরে। এসব কথা মনেও এনো না। তোমাকে এখন একশো বছর বাঁচতে হবে।
– আবদার দেখে হাসি পায়। স্নেহলতা বলে।
– তবে আমি চাইলেই কি যেতে পারব? যেদিন আমার জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে চিত্রগুপ্তের খাতায় সেদিনই আমাকে যেতে হবে। আমার আর কীই বা পাওয়ার আছে! সবই তো উজাড় করে দিয়েছেন তিনি। এবার মনকে বলি ফিরে চল নিজ নিকেতনে।
মা, ঘর অন্ধকার করে কী ভাবছ বসে? আলো জ্বালাওনি? শরীর ঠিক আছে? বলে আলো জ্বালালো মোহনা। মোহনার ডাকে যেন একটা ঘোরের থেকে উঠে বসল স্নেহলতা।
শরীরে তেলেরও দরকার আছে। একেবারে তেল না খেলে উলটো প্রতিক্রিয়া হতে পারে। সব কিছুই খাবে পরিমাণমতো। তবেই ব্যালান্স থাকবে। তাছাড়া তুমি তো নিয়মিত জিম করো, এক্সট্রা ক্যালোরি বার্ন হয়ে যাবে তাতেই।
একটু চোখ লেগে গেছিল। ভাবছিলাম উঠে জ্বালাব। তারপর আর ইচ্ছে হল না।
স্নেহলতার সামনে গিয়ে গায়ে কপালে হাত রাখল মোহনা।
– না, জ্বর তো নেই। চোখগুলো একটু ফোলা লাগছে। ঠান্ডা লাগালে কী করে? সকালেও তো ফোলা দেখিনি।
– অসময়ে শুয়েছি বলে হয়তো। চিন্তা করো না, কিছু হয়নি আমার।
– না হলেই ভাল, বলে শাশুড়ির মুখের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকল মোহনা। যেন চোখের এক্সরে মেশিন দিয়ে মেপে নিতে চাইছে কী হয়েছে স্নেহলতার।
– চা এনেছ? মোহনার মন ঘুরিয়ে দেওয়ার জন্য বলল স্নেহলতা।
– বলে এসেছি আনতে। পকোড়া বানাতে বললাম।
– কীসের?
– আলু আর পেঁয়াজের। ক’দিন ধরে খেতে ইচ্ছে করছিল। যদিও তেল খেতে চাই না। তবে একদিন খেলে কিছু হবে না বলো! যেন স্নেহলতার থেকে এই কথাটাই শুনতে চাইছিল সে।
– না না, শরীরে তেলেরও দরকার আছে। একেবারে তেল না খেলে উলটো প্রতিক্রিয়া হতে পারে। সব কিছুই খাবে পরিমাণমতো। তবেই ব্যালান্স থাকবে। তাছাড়া তুমি তো নিয়মিত জিম করো, এক্সট্রা ক্যালোরি বার্ন হয়ে যাবে তাতেই। এত পরিশ্রম করলে খাবারটাও তো খেতে হবে। স্নেহলতার কথাগুলো শুনে মোহনা হাসল।
– আচ্ছা মা, ভাবছি এই উইকএন্ডে একবার ও বাড়ি যাব। বাবা বারবার যেতে বলছে। অনেকদিন যাওয়া হয়নি।
– হ্যাঁ, ঠিকই তো। যাও দুদিন ঘুরে এসো। স্নেহলতা বলল।
এতক্ষণে স্নেহলতার শরীরটা একটু ভাল লাগছে। খোকা তার পেটের ছেলে হয়েও এত ভাবে না, এই মেয়েটা যেমন ভাবে। সে মনে মনে খোকার বাবার উদ্দেশ্যে বলল, তুমি ঠিকই বলেছিলে, বউমার মতো ভাল আমাদের কেউ বাসে না।
– ঘুরে এসো না, তুমিও যাবে। মা বারবার করে বলে দিয়েছে দিদিকে নিয়ে আসবি। একা রেখে আসবি না।
– আবার আমাকে নিয়ে টানাটানি কেন? তোমরা একদিন আনন্দ করো। ওঁরাও তোমাদের পান না।
– মা, আমাদের তোমাকে বাদ দিয়ে আনন্দ করার মতো কোনও জায়গায় আমরা যাচ্ছি না। এ বাড়ি থেকে ও বাড়ি যাচ্ছি। ওঁরাও একা একা থাকে, তুমি গেলে ওঁদেরও ভাল লাগবে। আর আমিও নিশ্চিন্ত থাকব।
– সে দেখা যাবে। আজ তো সবে বুধবার। দেরি আছে।

– এখনও চা দিল না কেন কে জানে! দাঁড়াও দেখে আসি। বলে মোহনা রান্না ঘরের দিকে গেল।
এতক্ষণে স্নেহলতার শরীরটা একটু ভাল লাগছে। খোকা তার পেটের ছেলে হয়েও এত ভাবে না, এই মেয়েটা যেমন ভাবে। সে মনে মনে খোকার বাবার উদ্দেশ্যে বলল, তুমি ঠিকই বলেছিলে, বউমার মতো ভাল আমাদের কেউ বাসে না। ভাল রেখো এদের। আর আমাকে বেশিদিন একা রেখো না। লোভ বেড়ে যাচ্ছে এদের ভালবাসা সেবা পাওয়ার। ঠিক সময় ডেকে নিও।
(ক্রমশ)
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত