(Japan Travel 2)
সেন্সোজি মন্দির থেকে বেরিয়ে দেখি রাস্তার দু’পাশে ফুলন্ত চেরি গাছ, গোলাপি-সাদা। তবে আমায় বেশি আকর্ষণ করল ফুল ফোটার আশায় ছোট ছোট কুঁড়ি সমেত তাজা চেরি গাছ। ঠিক যেন আমাদের বাংলা দেশের অরক্ষণীয়া কুমারী মেয়ে, রূপের হাটে নিজেকে বিকিয়ে দিতে উন্মুখ। পথে চলছে লাল রঙের দোতলা বাস, ঘোমটা দেওয়া লাল-সাদা রঙের মানুষের হাতে টানা রিক্সা।
ট্যুর গাইড কোজি তাড়া লাগায়। চলো, লাঞ্চ খাবে। যা খুশি। জাপানি, কন্টিনেন্টাল, বার্বিকিউ করা মিট। জাপানি সুশি বেশ কয়েকরকমের বেছে নিলাম। আর প্রচুর হোমমেড আইসক্রিম।
আরও পড়ুন: নিপ্পণ দেশে কয়েকটি দিন – ১ম পর্ব
এবার চললাম টোকিও শহরের দক্ষিণ-পশ্চিম প্রান্তের বাণিজ্যকেন্দ্র এবং বেজায় আমোদ–আহ্লাদের জায়গা জনবহুল শিবুয়াতে। গন্তব্য হল প্রভুভক্ত কুকুর হাচিকোর ব্রোঞ্জমূর্তি দেখা। সবাই সেই কুকুরের সঙ্গে ছবি নিতে চায়। এই কুকুর আর মানুষের সম্পর্কের বাস্তব কাহিনি নিয়ে দুটি সিনেমাও হয়েছে।
গত শতকে টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষিবিজ্ঞানী এবং প্রফেসর হিদেসাবুরো ইনিও ও তাঁর আদরের জাপানি পাহাড়ি কুকুর হাচিকোর নিঃশর্ত বন্ধনের কাহিনি। সকাল সন্ধ্যায় প্রভুকে শিবুয়া স্টেশনে সে সঙ্গ দিত। প্রভুর মৃত্যুর পরেও দশ বছর ধরে প্রতি সন্ধ্যাবেলায় সে শিবুয়া স্টেশনে প্রভুর অপেক্ষায় থাকত। শেষ পর্যন্ত রোগে ভুগে ১৯৩৫ সালের ৮ই মার্চ স্টেশনের কাছে রাস্তায় মারা যায় হাচিকো।

প্রাণীটির আমৃত্যু অনিঃশেষ আনুগত্যে মুগ্ধ হয়ে স্থানীয় মানুষ এই ব্রোঞ্জ স্ট্যাচু নির্মাণ করেন। গাইড বোঝাচ্ছিল, শিবুয়া ক্রশিং জনবাহুল্যের জন্য বিখ্যাত। আমরাও তাকে জানালাম, একবার পুজোর সময় কলকাতা এসো, ভিড় কাকে বলে জানবে। শিবুয়া স্ট্রিট মার্কেটটি ইতিহাসপ্রসিদ্ধ। পথের দু’ধারে খাবার আর কিছু স্যুভেনির কেনার দোকান, তবে ছোটখাটো জিনিসের দাম মনে মনে জাপানি মুদ্রা থেকে ভারতীয় মুদ্রায় বদল করেই সিদ্ধান্ত নিই, কী হবে কিনে? আসলে জাপানে জীবনযাপন বেশ মহার্ঘ। চোখে লাগার মতো জিনিসের দাম চার-পাঁচ হাজার ইয়েনের কম নয়, সে ছাতা হোক, বা জাপানি পাখা।
দুপুর তিনটে বাজল, আমরা ক’জন মহিলারা হৈ হৈ করে উঠি, টোকিও এসেছি, রাজপ্রাসাদ দেখব না? ইন্ডিয়ান গাইড সাগ্নিক মাথা নাড়ে। না ম্যাডাম, ওটার জন্য শুধুই আউটসাইড ভিউ। সহযাত্রীরা ছাড়ে না। ড্রাইভার একটু আস্তেই গাড়িটা চালিয়ে প্রদক্ষিণ করল রাজপ্রাসাদ। কিন্তু দেখব কী? চারপাশে উঁচু পাথরের পাঁচিল, শহরের কেন্দ্রস্থলে আড়াইশো একর জমিতে এই প্রাসাদে বাস করে সম্রাটের পরিবারের সদস্যেরা। বাস একটু ঘুরতেই নজরে এল ঘন সবুজ মাঠে অনেক ছোট-বড় সারিবদ্ধ পাইন গাছ পেরিয়ে দূরের প্রাসাদটি। ‘কোজি! তোমাদের সম্রাট প্রজাদের দেখা দেন না?’
দিন শেষের গন্তব্য ওডাইবা মেরিন ন্যাশানাল পার্ক। টোকিও বে-র ধারে, মানুষের তৈরি ছোট্ট এক দ্বীপে। এখানে দেখলাম, ফ্রান্স আর জাপানের বন্ধনের প্রতীক ‘স্ট্যাচু অব লিবার্টি’।
-‘অফ কোর্স।’ কোজির মুখ গর্বে ঝলমল। বছরে দু’দিন, ২রা জানুয়ারি আর ২৯শে এপ্রিল। জনসাধারণ প্রাসাদে ঢোকার অনুমতি পায়। জলাভূমি থেকে এককালে দুর্গ। সেখানে সামন্তপ্রভুরা বাস করতে শুরু করে। পরে ১৬০৩ সালে সামরিক সরকার বা সেগুন পরিচালনা করতেন ইয়েসুতোকুগাওয়া, এই দুর্গ-প্রাসাদ থেকে। ১৮৬৮ সালে রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হল। সম্রাট মেইজি রাজধানী কিয়োতো থেকে স্থানান্তরিত করলেন এখানে। দুর্গ-প্রাসাদ হল রাজপ্রাসাদ। জাপানে এখন গণতান্ত্রিক সরকার। বর্তমান সম্রাট নারুহিতো উচ্চশিক্ষিত, অক্সফোর্ডে পড়াশুনো করেছেন।
কী আর করা যাবে! আজ ২রা জানুয়ারি নয়, ২৯শে এপ্রিলও নয়। আজ ২৩শে মার্চ ।

দিন শেষের গন্তব্য ওডাইবা মেরিন ন্যাশানাল পার্ক। টোকিও বে-র ধারে, মানুষের তৈরি ছোট্ট এক দ্বীপে। এখানে দেখলাম, ফ্রান্স আর জাপানের বন্ধনের প্রতীক ‘স্ট্যাচু অব লিবার্টি’। ১১ মিটার লম্বা ৯ টন ওজনের এই স্ট্যাচুটি প্যারিস থেকে সাময়িকভাবে আনা হয়েছিল প্রদর্শনের জন্য। ২০০০ সাল থেকে এটি এখানে চিরস্থায়ী করে রাখা হয়েছে।
এখান থেকেই দেখা হল গোধূলির আকাশের রং, রঙিন কৃত্রিম ঝর্না, আলো ঝলমল ‘রেন-বো ব্রিজ’ আর দূরের আলোকিত ‘টোকিও টাওয়ার’। এখানে সুন্দর টিউলিপ ফুলের চাষ হয়েছে, ফুলভারে নম্র গোলাপি ক্যামেলিয়ার গাছ রয়েছে, আর সামনেই টোকিওর বিখ্যাত স্যাটেলাইট সেন্টার। স্থানীয় হোটেলে জাপানি আর কন্টিনেন্টাল খাবার খেয়ে রাতের মতো কাজ সারা। কালকের ভ্রমণসূচিতে আছে ফুজিপাহাড় দেখার পর্ব।
কোজি বলল, ‘জানো তো, ফুজি আসলে একটি ঘুমন্ত আগ্নেয়গিরি। শেষ জেগেছিল ১৭০৭ সালের ২২শে নভেম্বর। বিজ্ঞানীদের ধারণা, আর জেগে ওঠার সম্ভাবনা কম। তবে দেবতার মেজাজ!’
ভ্রমণের তৃতীয় দিন আজ। সহযাত্রীদের সঙ্গে দিব্য আলাপ পরিচয় হয়ে গেছে। সকালের আবহাওয়া বেশ উজ্জ্বল। হোটেলের রুম সার্ভিসের প্রবীণা জাপানি স্টাফটি ভাঙা ইংরেজিতে বলল, ‘ফুজি পাহাড় দেখেছ? খুব সৌভাগ্যের ব্যাপার। আশা করি, তুমি দেখতে পাবে।’ তার কথাই সত্যি হল। অল্প সময় বাসে পথ পরিক্রমার পর বাঁদিকে ঝকঝকে রোদে ফুজির রূপোলি চূড়া নজরে এল। সবাই আনন্দে আত্মহারা। কিন্তু চলতি হাইওয়েতে বাস থামবে না। অগত্যা জানলা দিয়েই আশ্লেষে সবটুকু দৃশ্য মনে ধরে রাখলাম। এই সেই বিখ্যাত ফুজিয়ামা!
জাপানিরা বলে ফুজিসান, উচ্চতা মাত্র ১২৩৯৫ ফুট, আমাদের দেশের কেদারনাথ পাহাড়ের মতো। জাপানিদের পরম তীর্থক্ষেত্র। আগে মহিলাদের সেখানে চূড়ায় ওঠার অনুমতি দেওয়া হত না, তীর্থক্ষেত্রকে অপমান করা হবে বলে। এই নিয়ম বাতিল হয়ে যায় মেইজি যুগে। এখন মেয়েরাও পাহাড়ে চড়ে।

কোজি বলল, ‘জানো তো, ফুজি আসলে একটি ঘুমন্ত আগ্নেয়গিরি। শেষ জেগেছিল ১৭০৭ সালের ২২শে নভেম্বর। বিজ্ঞানীদের ধারণা, আর জেগে ওঠার সম্ভাবনা কম। তবে দেবতার মেজাজ!’
রাস্তায় যেতে যেতে একটি বাড়ির মাথায় জাপানের পতাকা দেখাল কোজি। সাদার মাঝে লাল একটি বৃত্ত, হিনোমারু বা গোলাকার সূর্য, জাপানের প্রতীক, নিপ্পন।
আরও কিছুক্ষণ যাবার পর বাস থামল শিনজুকু গোয়েন পার্ক বা চেরি ব্লসম পার্ক-এর কাছে। পার্কের তিনটি গেট। ভিতরে আছে তিন ধরনের গার্ডেন— ল্যান্ডস্কেপ গার্ডেন, চেরি ট্রি এরিয়া আর জাপানের ট্র্যাডিশানাল গার্ডেন। আমাদের প্রাথমিক লক্ষ্য ফুলন্ত চেরি গাছ দেখা। তাই ঢুকেছিলাম সেন্ডাগায়া গেট দিয়ে।
জাপানের মেইজি যুগে কৃষিখেত ছিল। ১৯০৬ সালে রূপান্তরিত হয় সম্রাটের বাগানে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯৪৯ সালে জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত হয়। এখন এটি জাতীয় উদ্যান।
একটু পথ যেতেই মনে হল, সেই যে রবীন্দ্রনাথ গানে গানে বলেছিলেন, “ফুলের বনে যার পাশে যায় তারেই লাগে ভাল”। পার্কে গাছ ভরা চেরির শোভা দেখে আজ আমার সেই দশা। ল্যান্ডস্কেপ গার্ডেনে রয়েছে নানা রঙের টিউলিপ ফুল। ভিতরে বেশ কয়েকটি পুকুর আর শিশুদের খেলার জায়গা আছে। এই পার্কে নাকি প্রায় ৭০ রকম ভ্যারাইটি চেরির ছয়শোটি চেরি গাছ আছে। কিমানো পরা বেশ কিছু জাপানি তরুণী বন্ধু সহযোগে এসেছে। ফুল গাছের নিচে দাঁড়িয়ে ছবি তোলা হল। তবে সব গাছে চেরি তখনও ফোটেনি।
এটি নাকি জাপানের মেইজি যুগে কৃষিখেত ছিল। ১৯০৬ সালে রূপান্তরিত হয় সম্রাটের বাগানে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯৪৯ সালে জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত হয়। এখন এটি জাতীয় উদ্যান। বাগানে অবশ্য চেরি ছাড়াও দেখলাম গোলাপি-সাদা রঙের ক্যামেলিয়া আর হলুদ ড্যাফোডিল। ফুলভারে নত চেরি গাছের নিচে জাপ সুন্দরীদের ছবি তোলার অনুমতি চাইলাম। কোজির শেখানো বুলিতে জাপানি ভাষায় বলে বসলাম, “শাশিন-ইয়ো-তোত্তোমা-ঈ দেসুকা”? দুটি মেয়ে এক গাল হেসে মাথা ঝাঁকায়। আমিও কোমর ভেঙে হাসিমুখে বলি, আরিগোতো (ধন্যবাদ)।

শিনজুকু গোয়েন পার্ক থেকে বেরিয়েও পথের ধারে সর্বত্র এক ছবি। ফুলন্ত, প্রায় ফুলন্ত চেরি গাছ। পরের গন্তব্য লেক আশি। বাসে প্রায় দু’ঘণ্টা পর পৌঁছলাম জাপানের কানাগুয়া প্রিফেকচারে। প্রিফেকচার মানে একটি দেশের প্রশাসনিক বিভাগ বা অঞ্চল। জাপানে কোনও রাজ্য বা প্রদেশ নেই, পুরো দেশে মোট সাতচল্লিশটি প্রিফেকচার আছে। প্রতিটি প্রিফেকচারের নিজস্ব গভর্নর এবং স্থানীয় সরকার থাকে। আশি লেক (Lake Ashi) কানাগাওয়া প্রিফেকচারের হাকোনে অঞ্চলের একটি বিখ্যাত জ্বালামুখ হ্রদ। প্রায় ৩০০০ বছর আগে মাউন্ট কামিয়ামা আগ্নেয়গিরির লাভা উদ্গীরণের পরে তৈরি হয়। হাকোনে অঞ্চলটি আগ্নেয়গিরি আর উষ্ণ প্রস্রবণে পরিপূর্ণ।
আশি লেকের ধারে এসে বিশাল জলরাশি দেখে মুগ্ধ হলাম। ভাগ্য ভাল থাকলে আশি লেক থেকে ফুজি পাহাড় দেখা যায়। আমরা চড়লাম বিখ্যাত পাইরেট শিপ ‘কুইন আসিনোকো’তে। তিনতলা যুদ্ধ জাহাজের আদলে গড়া হলুদ রঙের ক্রুজ। ক্রুজ ভ্রমণের জন্য মূলত তিনটি প্রধান ঘাট রয়েছে। আমরা লেকের দক্ষিণ পাড়ের হাকোনে-মাচি ঘাট থেকে ক্রুজে উঠলাম।
বেলা দুটো বাজে। প্রচন্ড জোরালো ঠান্ডা হাওয়া। না, ফুজি এখান থেকেও অদৃশ্য। আকাশে নীলচে ঘোলাটে মেঘ। অনেকেই এই পঞ্চম স্টেশন থেকে তাকে দেখতে পায়। কনকনে ঠান্ডা হাওয়ায় বেশিক্ষণ থাকা গেল না।
লেকটা বেশ বড়, দু’ধারে সবুজে ঢাকা পাহাড়। জলে ভাসছে বিলাসবহুল নৌকা। কিছু নৌকা হাঁসের আকারের। আমাদের দেশের নৈনিতাল লেকের মতো। আধ ঘণ্টার বেশি সময় ধরে জলবিহার চলল, উৎসাহীরা উপরের ডেকে প্রচণ্ড হাওয়া উপেক্ষা করে প্রচুর ছবি তুলল। ক্রুজ ভর্তি সারা পৃথিবীর লোক। কিন্তু ফুজি তার রূপোলি মাথা নিয়ে একবারের জন্যেও ধরা দিল না।
ক্রুজ থেকে নেমে এলাম হাকোনে রোপওয়ে চড়তে। মাউন্ট কামিয়ামার পাশের পাহাড় মাউন্ট কোমাগাতেক-এর মাথা থেকে ফুজি দর্শন যদি হয়। এখানকার রোপওয়ের কেবলকারটি বেশ প্রশস্ত, জনা পঞ্চাশেক মানুষ আঁটে। মাত্র সাত–আট মিনিটেই পাহাড়ের চূড়োয় পৌঁছে গেলাম। মাত্র সাড়ে তেরোশো মিটার উঁচু। পাহাড়ের পথে রয়েছে রুক্ষ জমিতে, অল্প কিছু সবুজ গাছ আর শুকনো লম্বাটে গাছপালা। পাহাড়-চূড়া এক্কেবারে সমতল ভূমি।

বেলা দুটো বাজে। প্রচন্ড জোরালো ঠান্ডা হাওয়া। না, ফুজি এখান থেকেও অদৃশ্য। আকাশে নীলচে ঘোলাটে মেঘ। অনেকেই এই পঞ্চম স্টেশন থেকে তাকে দেখতে পায়। কনকনে ঠান্ডা হাওয়ায় বেশিক্ষণ থাকা গেল না। পাহাড়ের উপর একটি স্যুভেনির শপ, আর কফির ব্যবস্থা আছে। অনেক প্রাচীন এই পাহাড়, প্রায় ৪০ হাজার বছর পুরোনো। তার স্মারক হিসেবে ইতস্তত কিছু এবড়ো-খেবড়ো পাথরের টুকরো ছড়ানো।
বেঁটে আকারের বাঁশ, আর ঘাসে ভরা ঢালু পাহাড়। অদূরেই সিঁড়ি বেয়ে ঘাসে ঢাকা পাহাড়ের মাথায় জাপানিদের আরেক তীর্থক্ষেত্র প্রাচীন হাকোনে-মোটো সুমিয়া মন্দিরে গেলাম। কোনও মূর্তি নেই। এখানে উপাসনা করা হয় হাকোনে অঞ্চলের দেবতা পাশের সেই কামিয়ামা পাহাড়ের। বিগত ২৪০০ বছর ধরেই তিনি এই অঞ্চলের দেবতা। তবে পাহাড়চুড়ো থেকে নিচের আশি লেক দেখতে মন্দ লাগল না।
মনে মনে সকালের সেই হোটেলের স্টাফটিকে ধন্যবাদ জানালাম। সকালে টোকিওর পথের বাঁকে বাঁকে, আর এখন এই শেষ বিকেলে ঘরে ফেরার সময়, সত্যিই ভাগ্য আজ সহায় ছিল।
কেবলকার থেকে নিচে নেমে এসেই বুঝলাম খুব খিদে পেয়েছে। সেখানেও দুঃসংবাদ। আজ ট্যুরে লাঞ্চ নেই। আগে জানা ছিল না। তবে খাওয়ার দোকান আছে, রেডিমেড জাপানি খাবার, গরম নুডলস, ভাত–মাছ মিলবে। কপাল মন্দ। খাবার শেষ। অগত্যা স্থানীয় আইসক্রিম খেয়ে উদরকে শান্ত করে অভয় দিয়ে বললাম, চিন্তা কীসের? আর কিছুক্ষণ পরেই তো ডিনার জুটবে।
বেশ মনোরম বিকেল। কোজি লোভ দেখাল, চলো কাছেই ‘ওশিনো মুরা’ গ্রাম আছে, ভাগ্য ভাল থাকলে সেখান থেকে ত্রিশ কিলোমিটার দূরের ফুজি নিশ্চয় দেখতে পাবে। শান্ত পাহাড়ে ঘেরা গ্রামটি মাউন্ট ফুজি ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটের অংশ। গ্রামে শুকনো ঘাসে ছাওয়া বাড়ি, রাস্তার ধারের খাবার দোকান, স্যুভেনির শপ সবই আছে। স্থানীয় জাপানিরা হাত নেড়ে হাসিমুখে প্রশ্ন করে ‘ইন্ডিয়ান’? কয়েকটা ফ্রিজ ম্যাগনেট কিনে আর কফি খেয়ে কিছু ধাতব মুদ্রা পাওয়া গেল। এরপরের গন্তব্য শান্ত মফস্বলের শহর শিজুওকা।

সবার তৃষ্ণার্ত চোখ কিন্তু শেষ বিকেলের আকাশের দিকেই। বাস উঠল হাইওয়েতে। কোজিকে প্রশ্ন করি, ‘ও ভাই! এই রাস্তার নাম কী?’ ড্রাইভার বলল, এটা বাইপাস, এরপর ‘টমে এক্সপ্রেসওয়ে’ ধরব। হঠাৎ দেখি ঘন কালচে সবুজ গাছপালার পিছনে খুব কাছেই ধূসর মেঘের গায়ে হেলান দেওয়া ফুজি পাহাড়ের শ্রান্ত, প্রসারিত রূপোলি চূড়া। তখনই ট্রাফিক সিগন্যালে গাড়ি থামল। দু’চোখ ভরে দেখলাম। মনে মনে সকালের সেই হোটেলের স্টাফটিকে ধন্যবাদ জানালাম। সকালে টোকিওর পথের বাঁকে বাঁকে, আর এখন এই শেষ বিকেলে ঘরে ফেরার সময়, সত্যিই ভাগ্য আজ সহায় ছিল। তা না হলে মেঘের চাদর সরিয়ে দিনের শেষে— জাপানের এই শ্রেষ্ঠ নগরাজের দেখা কি মিলত?
(ক্রমশ)
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত