(Jolke Chol 27)
বাথরুমে স্নান করতে করতেই মোবাইল বাজার শব্দ শুনতে পাচ্ছিল রাই। টাওয়েল জড়িয়ে বাইরে বেরিয়ে ধরবে কি না ভাবতে ভাবতেই থেমে গেল রিং। বাঁচা গেল, ভেবে আবার বাথরুমে লাগানো আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নাচ ও মুখের নানা অঙ্গভঙ্গি করতে লাগল।
বাড়িতে নিজের ঘরের বাইরে তিনটে জায়গা তার সবচেয়ে পছন্দের। দক্ষিণের বারান্দা, ছাদ আর এই বাথরুম। অনেকটা বড়, পুরনো আমলের, মেঝেতে সাদা মার্বেল বসানো, দেওয়ালের একদিকে টাইলস আর অন্য দিকে বড় একটা আয়না। আরেকটা মজার বিষয় হল, বাথরুমের ভেতরে বিরাট সাদা চিনেমাটির বাথটব। ছোটবেলা থেকে এই জিনিসটা তার খুব পছন্দের। বাথটবের মাথার উপর শাওয়ার। সেখান থেকে জল পড়ে। অনেক সময় মা বা কারওর উপর রাগ হলে সে এর মধ্যে লুকিয়ে পড়ত। অবশ্য মা ঠিক বুঝতে পারত সে এখানেই আছে।
আরও পড়ুন: জলকে চল: পর্ব – (১) (২) (৩) (৪) (৫) (৬) (৭) (৮) (৯) (১০) (১১), (১২) (১৩), (১৪) ,(১৫), (১৬), (১৭), (১৮), (১৯), (২০), (২১), (২২), (২৩), (২৪), (২৫), (২৬)
‘আমার মেয়েটা কোথায় গেল, রাই সোনা তোমাকে খুঁজে পাচ্ছি না, আমার কিন্তু ভয় করছে, রাই কি ঝরনা হয়ে গেল নাকি নদী…এসব বলতে বলতে সামনে এসে দাঁড়িয়ে মা বলত- ওমা! এই তো আমার রাই সোনা এখানে, আমি ভাবলাম মেয়েটা আমার জলপরী হয়ে বুঝি জলে ভাসতে ভাসতে অনেক ডুব চলে গেল।’
– মা, তুমি জলপরীর গল্প জানো? রাই বাথটবে বসেই প্রশ্ন করত।
– জানি। কিন্তু এখানে বসে থাকলে কী করে বলব? উঠে মায়ের কোলে এলে বলা যেত।
রাই তখন সেখান থেকে উঠে এসে মায়ের কোলে চেপে ফিরে যেত ঘরে। গায়ের জল মুছতে মুছতে বলত,

– মা এবার বলো।
– কী?
– গল্পটা।
-রাতে বললে হবে না? এখন তো আমার অফিস আছে সোনা।
রাই ঠোঁট ফোলাত। নিজের মনে কিছু একটা ভাবত। তারপর বলত, বেশ তবে রাতে শুয়ে বলবে তো?
মৎস্যকন্যাদের গল্প প্রথম শোনা গেছিল, প্রাচীন অ্যাসিরিও সভ্যতায়। এই গল্প অনুযায়ী দেবী অ্যাটারগেটিস নাকি একবার ভুল করে হত্যা করে ফেলেন তার এক মানুষ বন্ধুকে। আর তারপরই দুঃখে এবং লজ্জায় দেবী থেকে পরিণত হন মৎস্যকন্যায়।
– বলবই বলব।
– প্রমিজ?
– এক্কেবারে প্রমিজ। ফাদার মাদার প্রমিজ। বলে রাইকে হামি দিয়ে অফিস চলে যেত। ভাবত, সারাদিনের শেষে রাই নিশ্চয়ই ভুলে যাবে জলপরীর কথা।
কিন্তু রাই রাতে বিছানায় শুয়েই বলত- নাও, মারমেডের গল্পটা শুরু করো।
মোহনা তখন নিরুপায় হয়ে বানিয়ে বানিয়ে বলত-
হাজার হাজার বছর আগে প্রাচীন পূর্বাঞ্চলীয় মহাসাগরে এক মহাশক্তিশালী সমুদ্রের ভয়ানক ড্রাগন ছিল। তার ভয়ে সকলে আতঙ্কিত থাকত। বিশেষ করে যারা নৌকায় চড়ে দূরদূরান্তে পাড়ি দিত। সেই ড্রাগনের স্ত্রী ছিল মৎসকন্যা বা জলপরী। তার নাম হল মারমেড। এই জলপরী স্থলভাগের সম্রাট ও তার স্বামীদের মধ্যেকার বিশ্বস্ত বার্তাবাহক ছিল। মানে দূতের কাজ করত। ডাঙায় কী ঘটছে সেগুলো সে তার স্বামীকে বলত আর সম্রাটকে রূপে ভুলিয়ে সব জেনে নিয়ে জলে মিলিয়ে যেত।
– অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসীরা মারমেইডকে কী বলে বলত?
রাই তার সদ্য পড়া অ্যানিমাল প্ল্যানেট থেকে উত্তর দিত- আমি জানি মা, ওরা বলে ইয়াকিয়কস। তারা এর নামে গানও করত।
– সোনা মেয়ে আমার! বলে মোহনা বলত-
মৎস্যকন্যাদের গল্প প্রথম শোনা গেছিল, প্রাচীন অ্যাসিরিও সভ্যতায়। এই গল্প অনুযায়ী দেবী অ্যাটারগেটিস নাকি একবার ভুল করে হত্যা করে ফেলেন তার এক মানুষ বন্ধুকে। আর তারপরই দুঃখে এবং লজ্জায় দেবী থেকে পরিণত হন মৎস্যকন্যায়। গ্রিক সাহিত্যে সাইরেন নামে এক ধরনের কাল্পনিক সামুদ্রিক প্রাণীর নাম শোনা যায়, যারা নাকি নানারকম রূপ ধারণ করতে পারে। প্রাচীন গ্রিসের মহাকবি হোমারের বিখ্যাত মহাকাব্য ‘ওডেসি’তেও উল্লেখ রয়েছে মারমেইডের।
প্রস্তরযুগের গুহাচিত্রে প্রথম এদের ছবি দেখা যায়। সেটা কয়েক হাজার বছর আগের কথা। মানুষ সে সময় মাটিতে ফসল ফলাতে শিখেছে, সমুদ্রপথে নৌকা চালাচ্ছে। মৎস্যকন্যাকে তারা তখন অর্ধমানব, চিমেরাস এসব বলে ডাকতে শুরু করে দিল। আমাদের পুরানেও উড়ন্ত মারমেইড বা মৎস্যকন্যার উল্লেখ রয়েছে।
সে তো বলব। কিন্তু আগে তো জানতে হবে আসলে মারমেইড বা জলপরী কোথা থেকে এল। গল্প তো তুই নিজেই পড়েছিস, জলপরী আর দুঃখী রাজপুত্র। আর যেন কী সব?
রাই বলত- মা, আমি গল্প শুনতে চেয়েছি। তুমি যেমন অন্য গল্প বল, সেই এক যে ছিল রাজকন্যা, আর ছিল… সে রকম।
– সে তো বলব। কিন্তু আগে তো জানতে হবে আসলে মারমেইড বা জলপরী কোথা থেকে এল। গল্প তো তুই নিজেই পড়েছিস, জলপরী আর দুঃখী রাজপুত্র। আর যেন কী সব?
– সে তো পড়েছি। আচ্ছা গুড নাইট, বলে হামি দিয়ে মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়ে পড়ত রাই।
পুরোনো কথাগুলো মনে পড়তেই রাই নিজের মনে হেসে উঠল আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে। গুণ গুণ করল-
বলতো আরশি তুমি মুখটি দেখে
যদিও কাজল আমি পরিনি
যদিও কবরী আজ বাধিনি
তবু বল তো রূপসী কে তোমার চোখে।

মোবাইলটা আবার বেজে উঠল। নাহ, এবার তাড়াতাড়ি স্নান সারতে হবে, ভেবে শাওয়ার চালিয়ে দিল। মোবাইলটা বেজে বেজে থেমে গেল। সে স্নান সেরে তাড়াতাড়ি ঘরে এসে মোবাইল হাতে নিয়ে শিবের কল দেখে রিং ব্যাক করে।
– বল।
– কখন থেকে ড্রইং রুমে বসে। তোর আর স্নান শেষ হয় না।
– তুই এসে গেছিস? রাই অবাক হল।
সাড়ে এগারোটায় যখন কথা হয়েছিল, শিব বলেছিল, ‘মাকে মাসির বাড়ি ছাড়তে আসব, বাগুইহাটি। তুই থাকলে একবার দেখা করে যাব,’ রাই তৎক্ষণাৎ ‘হ্যাঁ, চলে আয়,’ বলেছিল।
অনেকদিন দেখা হয়নি শিবের সঙ্গে। উবারের ভাড়া সাংঘাতিক বেড়ে গেছে, আর র্যাপিডো চড়লে মা ভীষণ রেগে যায়। কিন্তু সে ভেবেছিল, শিবের আসতে এখনও ঘণ্টা দুই লাগবে। সেই দক্ষিণ কলকাতা থেকে বাগুইহাটি হয়ে আসতে।
শিবকে এতদিন বাদে সামনে দেখে ভিতরে একটা অদ্ভুত উত্তেজনা টের পেল। শিবের মুখ দেখে বুঝতে পারল তারও একইরকম হচ্ছে। এই সময় স্কুলের বন্ধু হলে আনন্দে পরস্পরকে জড়িয়ে ধরত।
– আমি কি বাইরেই বসে থাকব? শিব প্রশ্ন করল।
– দু-মিনিট বোস, চেঞ্জ করে আসছি, বলে রাই তাড়াতাড়ি আলমারি খুলল। ডেনিম টি শার্ট আর ডেনিমের জিন্স পরে নিল চট করে। গায়ে একটু পারফিউম স্প্রে করল। চুল থেকে টাওয়েলটা খুলে বাথরুমে মেলে দিয়ে ঘরে রুম ফ্রেশনার দিয়ে বাইরে চলে এল।
শিবকে এতদিন বাদে সামনে দেখে ভিতরে একটা অদ্ভুত উত্তেজনা টের পেল। শিবের মুখ দেখে বুঝতে পারল তারও একইরকম হচ্ছে। এই সময় স্কুলের বন্ধু হলে আনন্দে পরস্পরকে জড়িয়ে ধরত। কিন্তু এক্ষেত্রে নিজেকে সংযত রাখল রাই। খালি আলতো করে হাতটা ধরে বলল-
– এত তাড়াতাড়ি কীভাবে এলি?
শিব হাসল।
– আরে ইয়ার আমি মৌসির বাড়ি থেকেই তোকে কল করেছিলাম আসছি বলে।
– ও! তুই যে বললি বাড়ি থেকে বেরোচ্ছিস।
– সে তো মৌসির বাড়ি থেকেই। কিন্তু সেটা বলিনি।
– বুঝলাম। এ হল অশ্বথমা ইতি গজ কেস।
– সমজে নেহি।
– মহাভারত পড়িসনি?
– ও, আভি সমঝা।
– ভেরি গুড। রাই হাসল।
– আম্মা কোথায়? শিব জানতে চাইল।

– নিজের ঘরে। চল, পরিচয় করিয়ে দিই।
– উনি জানেন আমি আসব?
– না। তবে বলেছি একটা সারপ্রাইজ আছে।
– কিছু মাইন্ড করবেন না তো?
– না। আম্মা খুব লিবারাল। শি ইজ মাই বেস্ট ফ্রেন্ড।
– আর আন্টি?
– আন্টিকে টেক্সট করে দিয়েছি। ডোন্ট ওরি।
– কী বলল আন্টি আমি আসব শুনে?
– মা বলল, কিছু খাবার বানাস। রেস্তোরা থেকে না আনিয়ে।
– বানিয়েছিস?
– ইয়েস
– কী?
– ধীরে বৎস ধীরে।
কথা বলতে আম্মার ঘরের সামনে এসে রাই বলল, আম্মা…
স্নেহলতা বলল- ও পোড়ামুখি, এই জন্যই আজ রান্না ঘরে গিয়ে রান্না করা হল, আমি ভাবলাম আমাকে নাতনি কী জানি কী সাপ্রাইজ দেবে! স্বয়ং দেবাদিদেব মহাদেব হাজির হবেন বলে রাই আমার ব্যস্ত।
স্নেহলতা আপনমনে জপ করছিল। এই সময় তার পুজো পাঠেই কাটে। রাইয়ের গলা শুনে দরজার দিকে তাকাল। নাতনির পাশে একজনকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে অনুমান করে নিল, এই রাইয়ের নতুন বয়ফ্রেন্ড শিব। তাড়াতাড়ি জপ থামিয়ে প্রণাম সেরে বলল- এসো বাবা এসো। তুমি নিশ্চয়ই শিব।
শিব পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করল। ভাল আছেন আম্মা?
– আরে এ তো দিব্বি বাংলা বলে। আমি ভাবছিলাম এই বয়সে এসে আমাকে আবার হিন্দি ইংরেজিতে কথা বলা শিখতে হবে। বলে শিবের মাথাটা টেনে নিয়ে আলতো করে কপালে একটা চুমু খেল। তারপর রাইয়ের দিকে তাকিয়ে হাসল।
– কী হল? রাই বোকা বোকা হাসল।

স্নেহলতা বলল- ও পোড়ামুখি, এই জন্যই আজ রান্না ঘরে গিয়ে রান্না করা হল, আমি ভাবলাম আমাকে নাতনি কী জানি কী সাপ্রাইজ দেবে! স্বয়ং দেবাদিদেব মহাদেব হাজির হবেন বলে রাই আমার ব্যস্ত।
– আম্মা রাই কোথায় ব্যস্ত হল? ও তো এতক্ষণ আমাকে বাইরের ঘরে বসিয়ে রেখে বাথরুমে ছিল। কত বার ফোন করলাম ধরলই না।
– সে কী! তুমি আমার ঘরে চলে এলে না কেন? দু’জনে মিলে রাইকে চমকে দেওয়া যেত।
– একবার ভেবেছিলাম চলে আসি। কিন্তু যিনি দরজা খুলে দিলেন বললেন, বোসো, রাইকে খবর দিচ্ছি, বলে আর এলো না। তাই সাহস পেলাম না।
– রাই বলল, তুই এখন খাবি? তাহলে রেডি করব খাবার।
শিব রাইয়ের দিকে তাকিয়ে বলল, তোরা যখন খাবি তখনই… নো প্রবলেম।
– না না, তুমি রেডি করো রাই। বেচারা কতদূর থেকে এসেছে। মুখটা শুকিয়ে গেছে। খিদে পেয়েছে দেখেই বোঝা যাচ্ছে।
ঠিক তা নয়। আগে আমরা এক সঙ্গে থাকতাম, কিন্তু এখন আমরা দাদিকে নিয়ে একটা বাড়িতে থাকি, আর বাকিরা আমাদের পুরোনো বাড়িটায় থাকে।
– না আম্মা, অত খিদে পায়নি। এখানে আসার আগে মৌসির ঘরে ধোকলা খেয়েছি।
রাই বলল, তুই আম্মার সঙ্গে তাহলে গল্প কর। আমি টেবিল রেডি করে ডাকছি।
রাই চলে গেলে স্নেহলতা শিবকে নিজের পাশে বসাল। দাদুভাই তুমি বাংলা শিখলে কোথা থেকে?
– আমার জন্ম এখানেই আম্মা। ছোট থেকে অনেক বন্ধুই বাঙালি, তাদের সঙ্গে কথা বলতে বলতে শিখে গেছি।
– বাড়িতে কে কে আছেন?
– আমার দাদি, মাম্মি, পাপা, ভাই, চাচা, চাচি, পাঁচ ভাই বোন
– ও, তোমাদের তাহলে জয়েন্ট ফ্যামিলি?
– না, ঠিক তা নয়। আগে আমরা এক সঙ্গে থাকতাম, কিন্তু এখন আমরা দাদিকে নিয়ে একটা বাড়িতে থাকি, আর বাকিরা আমাদের পুরোনো বাড়িটায় থাকে।
– ওই বাড়িটা ছেড়ে দিলে কেন?
– অত তো জানি না, মনে হয় রুমের প্রবলেম হচ্ছিল।
– সেই। আগেকার দিনে মানুষ যখন বাড়ি করতেন তখন তো অত ভেবে বানাতেন না।
অন্য কিছু শুনেই স্নেহলতার বুকটা নিজের সন্তানের জন্য তোলপাড় করে উঠল। সেও পারিবারিক ব্যাবসা না দেখে সেই যে প্রথমে দেশের অন্য প্রান্তে তারপর একেবারে বিদেশে চলে গেল, আর ফেরার ইচ্ছে নেই। এই ছেলেটাও কি তাহলে চলে যাবে! রাই কি মেনে নেবে? না না, এর সঙ্গে থাকলে রাই ভাল থাকবে না।
শিব কী বলবে বুঝতে না পেরে চুপ করে থাকাই শ্রেয় মনে করল।
স্নেহলতা আবার জিজ্ঞেস করল, তোমার মা তো সার্ভিস করেন,
– মা সার্ভিস করেন না, হার ওন বিজনেস। পাপারও বিজনেস।
– তুমিও তাহলে বিজনেসই করবে নিশ্চয়ই। সন্তানেরাই তো মা-বাবার বিজনেস বাড়াতে সাহায্য করে।
– আমার এমন কোনও প্ল্যান নেই, আপাতত দুজনেরটাই পড়ার ফাঁকে দেখছি। বাট ইচ্ছে আছে অন্য কোনও কিছু…

অন্য কিছু শুনেই স্নেহলতার বুকটা নিজের সন্তানের জন্য তোলপাড় করে উঠল। সেও পারিবারিক ব্যাবসা না দেখে সেই যে প্রথমে দেশের অন্য প্রান্তে তারপর একেবারে বিদেশে চলে গেল, আর ফেরার ইচ্ছে নেই। এই ছেলেটাও কি তাহলে চলে যাবে! রাই কি মেনে নেবে? না না, এর সঙ্গে থাকলে রাই ভাল থাকবে না। তার স্বপ্নগুলো পূরণ হবে না। সে তাড়াতাড়ি বলল, সে তুমি যাই করো না কেন, মা বাবাকে ছেড়ে খুব দূরে যেও না। বৃদ্ধ বয়সে একা থাকা খুব যন্ত্রণার। এই দেখো না রাই আর মোহনা যদি না থাকত, এখানে এই এত বড় বাড়িটায় আমি কী করে একা থাকতাম!
শিব হাসল। না না আম্মা, রাই তোমাকে ছেড়ে কোথাও যাবে না। সে কলেজ থেকে কোথাও গেলে খালি ঘড়ি দেখে, আম্মা একা আছে ফিরতে হবে তাড়াতাড়ি করে প্যানিক করে।
– আর তুমি?
– আমার তো মা এ্যালাউই করে না সাতটার পর বাইরে থাকা। আমাদের ডিনার হয় আটটায়।
কথাটা শুনে মনে মনে খুশি হল স্নেহলতা। বাড়িতে তাহলে ডিসিপ্লিন আছে। আজকালকার ছেলেমেয়েদের মতো বয়ে যাওয়া নয়। ছেলেটার ব্যবহারটাও বেশ ভাল। ভদ্র, নরম, কিন্তু রাইয়ের থেকে ছোট দেখতে লাগছে। দাড়ি গোঁফ না থাকলে ছেলেদের মানায় নাকি! খোকার বাবার দাঁড়ি ছিল না, ইয়াবড় মোচ ছিল। বলত, বাংলার বাঘ আশুতোষ আর আমার মধ্যে একটা মিল তো থাকবে। যদিও আদর করার সময় তাতে সুড়সুড়ি লাগত, তবু ওটা না থাকলে মানুষটাকে কেমন মাকন্দ মনে হত, ভেবেই নিজের মনে হেসে উঠল স্নেহ।
রাই তাড়াতাড়ি বলল, মা আসলে সময় পায় না। তাছাড়া মা যদি সব করবে তো মাসি কী করবে? ইউ নো মা খুব ভাল ভেজ আইটেম বানায়। পনির, ধোকার ডানলা, মায়ের হাতে খেলে ইউ নেভার ফরগেট। আম্মা খেয়ে নিয়ে তুমি রেস্ট নাও। আমি শিবকে আমাদের ছাদটা দেখাই।
রাই টেবিলে খাবার বেড়ে ডাকল, আম্মা চলে এসো, শিব আয়।
– চলো দাদুভাই, তোমার রাধার ডাক পড়েছে। বলে বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল।
– ধরব আম্মা?
– না না, আমি এখনও অতটা বুড়ো হইনি। তবে তুমি ধরলে মন্দ লাগবে না। বলে স্নেহলতা হেসে উঠল।
শিব ঠিক বুঝতে পারল না আম্মা কি বলতে চাইল। সে না বুঝেই হাসল।
রাই চেয়ারটা সরিয়ে আম্মাকে বসাল।
শিব মাথা নিচু করে খেতে খেতে হঠাৎ বলে উঠল, খানা তুম নে বানায়া?
– হ্যাঁ। কিউ?
– তুম তো কামাল কর দিয়া।
– আচ্ছা লাগা?
– বহুত।
স্নেহলতা বলল, তোমার বাড়িতে খানা কে বানায়? মা?

– না, আম্মা, কুক আছে। তবে স্পেশাল ডিস হলে মা বানায়।
– রাইয়ের খুব রান্নার শখ। সে ইউটিউবে দেখে আর বানায়। সে তুলনায় তার মা রান্না করতে ভালবাসে না।
রাই তাড়াতাড়ি বলল, মা আসলে সময় পায় না। তাছাড়া মা যদি সব করবে তো মাসি কী করবে? ইউ নো মা খুব ভাল ভেজ আইটেম বানায়। পনির, ধোকার ডানলা, মায়ের হাতে খেলে ইউ নেভার ফরগেট। আম্মা খেয়ে নিয়ে তুমি রেস্ট নাও। আমি শিবকে আমাদের ছাদটা দেখাই।
– হ্যাঁ, যাও দেখাও, বলে নিজের খাওয়া শেষ করে ঘরে ফিরে এল স্নেহলতা। ছেলেমেয়েদুটো একা একা ছাদে গেল, কোনও অঘটন ঘটাবে না তো! মনের মধ্যে একটা চিন্তা হল। পর মূহূর্তেই ভাবল, আমি এসব ভেবেই বা কী করব! তার মা যখন অনুমতি দিয়েছে বাড়িতে আসার, তখন আমার আর কী বলার থাকতে পারে!
মোহনার উপর রাগ হল। এত স্বাধীনতা দেওয়া কি ভাল মেয়েকে? আবার নিজেকেই বোঝাল, না, ছেলেটাকে দেখে মনে হল না তেমন ছুকছুকানি আছে। তাছাড়া রাই যথেষ্ট বুদ্ধিমতী, সে নিশ্চয়ই এমন কিছু করবে না যাতে তাদের মর্যাদা নষ্ট হয়। তবু একটা খচখচানি বুকের মধ্যে ঘুরপাক খেতে লাগল।
শিব ছাদে উঠে অবাক হয়ে গেল। আকাশে ঘুড়ি উড়ছে সারি সারি। মনে হচ্ছে যেন রঙবেরঙের পাখি ডানা মেলে আকাশ সাঁতরে যাচ্ছে।
চিৎকার করে বলে উঠল শিব- ইটস বিউটিফুল। তোদের এখানে এই সময়ও ঘুড়ি ওড়ে?
শিব এত কথা শুনছিল না। সে মুগ্ধ দৃষ্টিতে আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিল। হঠাৎ করেই একটা ঘুড়িকে নিচে পড়তে দেখে চেঁচিয়ে উঠল ‘ভো কাট্টা…’
– হ্যাঁ। সবসময়ই ঘুড়ি ওড়ে। কেন? তোদের ওখানে ওড়ে না?
– নেহি। অনলি বিশ্বকর্মা পুজোতে। বাট আই লাভ ফ্লাইং কাইট।
– তাহলে ওড়াস না কেন?
– কার সঙ্গে ওড়াব? একা একা হয় নাকি? আরিবাস্, কত্ত উঁচুতে উড়ছে ওগুলো। শিবের উত্তেজনা দেখে রাইয়ের মজা লাগছিল। সে এখানে আসার পর থেকেই দেখে আশেপাশের বেশিরভাগ ছেলেই দুপুর থেকে কাজ না থাকলে ঘুড়ি ওড়ায়। অতিমারিতে সেটা আরও বেড়ে গেছিল। সে পাশের ছাদের দিকে আঙুল দেখিয়ে বলল, ওই কাকুটাকে দেখছিস? ওর নাম শুভাশিস। ওর পেশা হচ্ছে ঘুড়ি ওড়ানো। দেশ বিদেশ থেকে এর জন্য তার ডাক আসে। আর যেখানেই যায় টাকা তো পায়ই, গাদা গাদা পুরস্কার নিয়ে আসে।
– রিয়েলি? আমেজিং।
– ইয়েস। আগেকার দিনে রাজা, জমিদার সম্রাট, মানে বড়লোকরা পায়রা ওড়াত, যার পায়রা যত বেশি উড়বে তার তত নাম, তার পর এল ঘুড়ি। আমাদের পত্রিকাতে এই নিয়ে কভার স্টোরি হয়েছিল একবার। সেখানে শুভাশিস কাকুরও ইন্টারভিউ ছিল।
শিব এত কথা শুনছিল না। সে মুগ্ধ দৃষ্টিতে আকাশের দিকে তাকিয়েছিল। হঠাৎ করেই একটা ঘুড়িকে নিচে পড়তে দেখে চেঁচিয়ে উঠল ‘ভো কাট্টা…’
নামার আগে সে রাইকে বলল, থ্যাংক্স, ইটস আ বিউটিফুল ডে হুইচ আই স্পেন্ড টুডে। আই নেভার ফরগেট দিজ ডে। লাভ ইউ রাই।
রাই শিবকে দেখছিল। শিবের এই আনন্দ সে আগে দেখেনি। খুশিতে শিবের মুখটা উজ্জল হয়ে উঠছিল। তাকে দেখে মনে হচ্ছে, যেন সেও একটা ঘুড়ির লাটাই ধরে আছে, আর তার ঘুড়িটা অনেক উঁচুতে পাল্লা দিয়ে উঠছে, সে চুপ করে শিবের এই উত্তেজনাটা উপভোগ করতে লাগল।
খানিক বাদে শিব বলল- নর্থ কলকাতা ইস ফার বেটার দ্যান সাউথ। এখানে অনেক প্রাণ আছে। আই মিস ইট।
– ডোন্ট গেট আপসেট। নেক্সট টাইম হোয়েন ইউ কাম, আমি শুভাশিষ কাকুকে বলে রাখব, তুই তার সঙ্গে ঘুড়ি ওড়াস।
– রিয়্যালি? পাক্কা?
– হান্ড্রেড পারসেন্ট পাক্কা। বলে রাই বলল, চল এবার নিচে যাই। নইলে আম্মার ব্লাড প্রেসার বেড়ে যাবে।
– কেন?
– সে তো ভাবতে পারবে না শিব ঘুড়ি দেখে এতই উচ্ছ্বসিত যে তার নাতনির সঙ্গে গল্প করছে না। সে ভাববে- কী জানি দু’জনে কী করছে একা একা!
শিব বিষয়টা ভালভাবে বুঝতে পারল না। মাঝে মাঝে রাইয়ের বাংলা কথাটা ঠিক বুঝে উঠতে পারে না সে। সে এই নিয়ে আর কথা না বলে, বলল, চল তাহলে নীচে যাই। আমাকে একটু বাদে বেরতেও হবে। মাম্মাকে পিক আপ করব।
নামার আগে সে রাইকে বলল, থ্যাংক্স, ইটস আ বিউটিফুল ডে হুইচ আই স্পেন্ড টুডে। আই নেভার ফরগেট দিজ ডে। লাভ ইউ রাই।
– লাভ ইউ টু, বলে রাই সিঁড়ির দিকে এগোল।এদের। আর আমাকে বেশিদিন একা রেখো না। লোভ বেড়ে যাচ্ছে এদের ভালবাসা সেবা পাওয়ার। ঠিক সময় ডেকে নিও।
(ক্রমশ)
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত