(Gangman Sitaram)
সত্তর দশকের মাঝামাঝি সময়ে রাশিয়ার হাত ধরে ফারাক্কা ব্যারেজ চালু হয়। তার আগে কলকাতার সঙ্গে উত্তরবঙ্গের বা উত্তর-পূর্ব ভারতের সরাসরি রেল লাইন বা সড়ক পথে কোনওরকম যাতায়াত ব্যবস্থা ছিল না। সেই সময় হাওড়া, শিয়ালদা স্টেশন থেকে ইস্টার্ন রেলওয়ের ট্রেন লাইন বাঁধা ছিল ফারাক্কা পর্যন্ত।
ফারাক্কা স্টেশনে হোল্ডঅল, ট্রাঙ্ক, সুটকেসসহ সব মালপত্র কুলির মাথায় চাপিয়ে ট্রেন থেকে নেমে একটু এগিয়ে গিয়ে নিচের দিকে নামলেই ছিল ধুলিয়ান ঘাট। সেই ঘাট থেকে লঞ্চে ভেসে যেতে হত ওপারের খেজুরিয়াঘাটে। কলকাতা থেকে উত্তরবঙ্গে যাওয়ার বাস লঞ্চে করে সরাসরি পাড়ি দিত, কিন্তু এই জলপথ পাড়ি দেওয়ার সময়ে যাত্রীদের বাসে বসে থাকা নিয়ম ছিল না। ফারাক্কার জলে অনেক শুশুক শুশুক ভেসে বেড়াত মাঝ গঙ্গায়, তাদের খেলতে দেখা যেত। আমার মতো ছোটদের, সেটা ছিল যাত্রাপথের অন্যতম আকর্ষণ।
আরও পড়ুন: ‘স্বর্ণ যুগ’ পেরিয়ে বর্তমান বাংলা সিনেমা
খেজুরিয়াঘাটে পৌঁছে ঘাটের সিঁড়ি ভেঙে উপরে উঠে দেখা পেতাম আমাদের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছে এন এফ রেলওয়ে’র ট্রেন। ঘণ্টাখানেক অবসরের পর আবার নতুন করে যাত্রা শুরু হত। “এন এফ রেলওয়ে’র সেই ট্রেন ছুটে চলত খালতিপুর, চামাগ্রাম, জামিরঘাটা হয়ে মালদা টাউন। বর্তমানে জামিরঘাটা মালদা টাউনের মাঝের স্টেশন গৌড় মালদা। আমি যে সময়ের কথা বলছি, সে সময়ে গৌড় বঙ্গ নামে কোনও স্টেশন সেখানে ছিল না। বরকত আলি গনিখান চৌধুরীর একান্ত উদ্যোগে মালদা টাউনকে ইস্টার্ন রেলওয়ের অন্তর্ভুক্ত করার কাছাকাছি সময়ে প্যাসেঞ্জার ট্রেনে স্থানীয়দের যাতায়াতের সুবিধার্থে ওই স্টেশনটি হয়, তার কয়েক বছর পর আশির দশকের গোঁড়ায় ‘গৌড় এক্সপ্রেস’ নামে একটা নতুন ট্রেনও তিনি চালু করেছিলেন।
হাওড়া থেকে উত্তরবঙ্গে যাওয়ার আরেকটা ট্রেন ছিল ‘কামরূপ এক্সপ্রেস’। কিন্তু আমরা যাতায়াত করতাম দার্জিলিং মেল-এ, তার প্রধান কারণ ঢাকুরিয়া থেকে শিয়ালদার দূরত্ব কম হওয়াতে সকাল সকাল পেট ভরে সেদ্ধ ভাত খেয়ে বাকি রাস্তার জন্য পরোটা, তরকারি, ডিমভাজা, মিষ্টি, ফল বেঁধে নিয়ে রওনা দিয়েছি। যতদূর মনে পড়ে, তখন শিয়ালদা থেকে দুপুর দুপুর ট্রেনটা ছাড়ত, আর জানলার ধারে বসে চোখে উড়ে এসে কয়লায় কুচি পরতেই, বাবা জানলার কাঁচ নামিয়ে দিতেন। মা শাড়ির আঁচল মুখের ভাপে গরম করে আমার চোখের উপর দিতেই মুহূর্তে সব জ্বালা উবে যেত।

দেখতে দেখতে এই দার্জিলিং মেল ট্রেনের বয়সও প্রায় দেড়শো ছুঁইছুঁই। এক সময় এই ট্রেন ‘ক্যালকাটা স্টেশন’ (শিয়ালদা স্টেশনের আগে এই নাম ছিল) থেকে যাত্রা শুরু করে রানাঘাট হয়ে অবিভক্ত বাংলার ঈশ্বরদী, হিলি, সান্তাহার, পার্বতীপুর, হলদিবাড়ি ঘুরে জলপাইগুড়ি হয়ে শিলিগুড়িতে পৌঁছাত। নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু, স্বামী বিবেকানন্দ এমনকি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতো বহু মহাপুরুষ এই ট্রেনে যাতায়াত করেছেন। ১৯১৫ সালে দার্জিলিংয়ের লেখক ই. সি. ডজ (E. C. Dodge) তাঁর ‘Darjeeling- Past and Present’ বইতে লিখেছেন, সেই যুগে দার্জিলিং মেল ছিল ভারতের অন্যতম দ্রুতগামী ট্রেন।
যাই হোক প্রসঙ্গে ফিরি, আমার বড় মামা রেলে চাকরি করতেন। তাঁর চাকরি জীবনে প্রথম পোস্টিং হয়েছিল জামিরঘাটা স্টেশনে। একলা হাতে রান্না করে চাকরি এবং সংসার সামলাতে গিয়ে মাঝে মধ্যেই তিনি অনিয়ম করে অসুস্থ হয়ে পড়তেন। পোস্টকার্ডে বড় মামার সেই অসুস্থতার সংবাদ দিদার হাতে পৌঁছানো মাত্র তিনি আমায় বগলদাবা করে জামিরঘাটায় উপস্থিত হতেন। আমার বছর দেড়েক বয়স থেকে কলকাতার স্কুলে ভর্তি হওয়া পর্যন্ত সময়টা আমি দিদার কোলেপিঠে বেড়ে উঠেছি। জন্ম পি জি পলিক্লিনিকে হলেও আমার শৈশব জুড়ে আমার দিদা, দাদু, মামা, মামাবাড়ি। ছোটবেলার প্রথম স্মৃতি যা কিছু মনে পড়ে সবটাই জামিরঘাটার।
দিনান্তে একটাই আপ প্যাসেঞ্জার, ফলে গ্রামীণ স্বাধীন শান্তির ধীর স্থির জীবনে এই শব্দ ছিল এক আদেশনামা। এই শব্দ শুনে গাড়োয়ানের মুখে আওয়াজ উঠত হু-র-র-র-র হটহট, হাতের লাঠি তাল ঠুকত গরুর পিঠে।
মালদা থেকে এক স্টেশন দূরত্ব হলেও জামিরঘাটা ছিল প্রত্যন্ত নির্জন একটি গ্রাম। সবুজের মধ্যে ইট রং দিয়ে আঁকা একটা ছোট্ট স্টেশন। খালতিপুরের দিক থেকে সোজাসুজি ছুটে এসে দক্ষিণ কেবিনের সামনে পৌঁছে রেল লাইনটা দু’ভাগে ভাগ হয়ে প্ল্যাটফর্ম পেরিয়ে আবার জুড়ে গিয়ে সোজা হয়ে ছুটে যেত মালদা টাউনের দিকে। চোখে পড়ত সবুজের বুক চিরে অনেক দূর থেকে আকাশের গায়ে ভেসে থাকা ইঞ্জিনের কালো ধোঁয়া। প্যাসেঞ্জার ট্রেন আসার আগে লম্বা হয়ে ঝুলে থাকা একফালি রেল লাইনের মধ্যে লোহার কাঠির ছোঁয়ায় ঠং ঠং করে বেজে উঠত ট্রেনের আগমনী ছন্দ। অনেক দূর থেকে ভাসমান সেই সুরে ছিল ট্রেনের আগমনী বার্তা।
ওই শব্দ কানে পৌঁছোলেই গ্রামের সরল সোজা মানুষের ধীর পায়ে হাঁটার গতি জোগাত। নিরীহ মানুষেরা মাথায় পুঁটলি, মহিলাদের কোলেকাঁখে শিশুকে জড়িয়ে স্টেশন পানে শুরু হত দৌড়। দিনান্তে একটাই আপ প্যাসেঞ্জার, ফলে গ্রামীণ স্বাধীন শান্তির ধীর স্থির জীবনে এই শব্দ ছিল এক আদেশনামা। এই শব্দ শুনে গাড়োয়ানের মুখে আওয়াজ উঠত হু-র-র-র-র হটহট, হাতের লাঠি তাল ঠুকত গরুর পিঠে। বাঁধের ধারের উঁচু রাস্তায় গরুর গাড়ি ধুলো উড়িয়ে ছুটে আসত স্টেশন সম্মুখে।

পুনরায় সেই ঘণ্টি বেজে উঠতেই গার্ড সাহেব বাশি বাজিয়ে সবুজ নিশান উড়িয়ে দিতেন, ইঞ্জিন গরম হাওয়া ছেড়ে হেলে দুলে চলে উঠত ট্রেন। হারিয়ে যাওয়া সেই লোহার শব্দতরঙ্গ আজও আমার কানে সুর হয়ে রয়ে গেছে। রেলের ক্লাস ফোর স্টাফদের হাতের সেই সুরর ঐক্য ও ছন্দ ছিল সর্বভারতীয়। একই লয়ে বেজে উঠত তখনকার সকল ভারতীয় রেলস্টেশনে। আজও পুরনো বাংলা বেশ কিছু সিনেমাতে সেই সুর লয় ধরা রয়েছে। আকরিক সেই সুরের একতার জন্য রেলের স্টাফেরা কোন গুরুজির তালিম নিতেন, কে জানে!
সবুজ ঘাসের সমতল প্লাটফর্মের মাঝে দেড়খানা ঘর নিয়ে ছিল জামিরঘাটা স্টেশন। টিকিট আর দম দেওয়া টেলিফোন নিয়ে স্টেশন মাস্টারের একটা ঘর। আর অন্য ঘরের দরজার মাথায় নীল রং দিয়ে লেখা ছিল ‘বিশ্রামাগার’। সেই আধখানা ঘর খুলে কোনওদিন কাউকে বিশ্রাম নিতে দেখিনি, সবসময় বন্ধ থাকতেই দেখেছি। স্টেশনের ইট বাঁধানো অংশ ছেড়ে বাইরে এলে উঁচুনিচু মাটির রাস্তা, দূরে সবুজ রেখা দিকচক্রবালে মিলে মিশে যেত। রাস্তার বাঁ ধার ধরে গভীর নয়ানজুলির পাশ দিয়ে ছিল ট্রেন লাইন। আর ডান ধারে সারি সারি গাছের ছায়াতে একই ধরনের পাশাপাশি ইটের দেয়ালের গোটা চারেক রেলওয়ে স্টাফ কোয়ার্টার্স।
রেলের ইন্সপেক্টর বাবুরা এলে ট্রলির মাঝখানে ছাতা লাগিয়ে তার তলায় সাহেবকে বসিয়ে, দুপুর রোদে এক স্টেশন থেকে অন্য স্টেশন ছুটে বেড়াত। ইন্সপেকশনের দিনে ওদের কাজই ছিল মাইলের পর মাইল শুধু ছুটে বেড়ানো।
কোয়ার্টারের পিছন দিকে আদিগন্ত ধুধু প্রান্তর। কোনও এক মাঘী সকালে এক অস্পষ্ট শব্দ এসে পৌছাল, কিন্তু দৃশ্যায়ন হল অনেক পরে, সানাইয়ের সুর ক্রমশ স্পষ্ট হলে দেখা পেলাম এক দল মানুষের, তারা গরুর গাড়ি চেপে নতুন বর কনেকে ট্রেনে তুলতে আসছে। ওইদিনের আগে সেই প্রান্তে যে মানুষের বসবাস আছে সত্যিই আমার অজানা ছিল। ট্রেন স্টেশন ছেড়ে গেলেও, মেয়ে বিদায়ের রেশ ধরে তাদের কান্নাকাটি চলেছিল বেশ কিছুক্ষণ। আমার শৈশবের প্রশ্নে, দিদা মুখে পান গুঁজে গম্ভীর হয়ে বলেছিলেন, এ হল আনন্দাশ্রু, মেয়ে বিদায় দিয়ে পরিবার দায়মুক্ত হল তাই ওঁরা সবাই আনন্দে কাঁদছে। মানুষ দুঃখে অথবা আঘাতের ব্যাথায় কাঁদে, কিন্তু আনন্দে যে মানুষ কাঁদে সে অভিজ্ঞতাও সেদিন হল।
সন্ধ্যে হলে দিদা মাদুর বিছিয়ে হাতপাখা, পানের বাটা আর সঙ্গে আমায় নিয়ে কোয়ার্টারের বারান্দায় বসতেন। ডিউটি খতম করে কুয়োর ঠাণ্ডা জলে স্নান সারত গ্যাংম্যান ‘সীতারাম’, দূরে চাঁদের আলোয় তাঁকে অস্পষ্ট দেখতে পেতাম। স্নান সেরে নিয়মিত দিদার সামনে হাজিরা দিয়ে তাঁর সারাদিনের কাজের মাঝে সঞ্চিত অভিজ্ঞতার ডালি সাজিয়ে বসত। কোয়ার্টারের চৌকাঠে জ্বলে থাকত পলতে নামানো লণ্ঠন। গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে চাঁদের আলোর আলপনা ফুটে উঠত আমাদের সবার শরীরে, আমি দিদার কোল ঘেঁষে বসতাম। দোক্তা পান ছাড়াও দিদার গায়ে একটা নিজস্ব মিষ্টি গন্ধ ছিল। লক্ষ মানুষের ভিড়ে আমায় চোখ বেঁধে ছেড়ে দিলেও আমার বিশ্বাস , গন্ধ শুঁকে দিদাকে ঠিক খুঁজে নিতাম। আজও ঘুমের মধ্যে আমি আমার দিদা, দাদু, মা, বাবা সবার শরীরের আলাদা আলাদা গন্ধ পাই।

আজ সীতারামের বলা কোনও গল্প আমার মনে নেই। শুধু মনে আছে, কাঁচা-পাকা চুলের সুঠাম চেহারা দূর থেকে আসা লণ্ঠনের আলো মেখে তাঁর যত্ন করে বাংলা বলার ধরন। গাঁইতি শাবল কাঁধে নিয়ে, আর হাতে লাল সবুজ ফ্ল্যাগ নিয়ে সারাদিন রেল লাইনের উপরে খালি পায়ে হেঁটে হেঁটে কাজ করত সীতারামের দল।
রেলের ইন্সপেক্টর বাবুরা এলে ট্রলির মাঝখানে ছাতা লাগিয়ে তার তলায় সাহেবকে বসিয়ে, দুপুর রোদে এক স্টেশন থেকে অন্য স্টেশন ছুটে বেড়াত। ইন্সপেকশনের দিনে ওদের কাজই ছিল মাইলের পর মাইল শুধু ছুটে বেড়ানো। ছোট চার চাকার মাঝের রেলের লোহার পাত বাসানো ট্রলি। চাকার উপরের দু’ধারে দুটো হ্যান্ডেল, আর মাঝে রেলের কর্তা ব্যক্তিদের বসার ব্যবস্থা। দুপুর রোদে দু’ধারের হাতল ধরে লাইনের উপর ব্যালেন্স রেখে খালি পায়ে ছুটে চলত সীতারাম। বেশ খানিকটা ঠেলার পর ট্রলি নিজের গতিতে গড়িয়ে যেতেই হাতলের উপর বসে মিনিট খানেক জিরিয়ে নিয়ে গতি কমলেই আবার হাতল ঠেলে দে ছুট।
দিদারা দুই বোন, দিদার বাবা ছিলেন নাটরের রাজার নায়েব। খুব অল্প বয়সে মাকে হারিয়ে ছিলেন, ফলে সেই সময় থেকেই একা হাতে সংসার সামলে তারই সঙ্গে ছোট বোনকে মাতৃস্নেহে পালন করেছিলেন।
প্রতি বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় কলাপাতা হাতে আমাদের কোয়ার্টারে হাজির হত সীতারাম। বারান্দায় কলাপাতা পেড়ে দূরে দাঁড়িয়ে আমাদের দেখত আর শুনত। দিদা পাঁচালি পড়া শেষ করে, ভেজা আতপচাল, কলা সঙ্গে গুড়ের বাতাসা মেখে ওঁর পাতায় প্রসাদ সাজিয়ে দিতেন। সীতারাম সেই পাতা মাথায় ঠেকিয়ে কোয়ার্টারের বারান্দায় বসে, তৃপ্তিসহকারে প্রসাদ মুখে গল্প শুরু করত। বড়মামার দুটো-দশটা ডিউটি থাকলে সেই নির্জন সন্ধ্যাগুলোয় একটু বেশি সময় আমাদের কাছে কাটিয়ে যেত সীতারাম। আর যেদিন বড় মামার ছটা-দুটো ডিউটি থাকত, তার আগের সন্ধ্যায় সীতারাম নিচু গলায় কথা বলত। তখন ওঁর সেই চোখ গোল গোল করে ফিসফিস করে কথা বলার ধরন দেখে আমি বেশ মজা পেতাম।
দিদার সর্বক্ষণের সঙ্গী ছিল বই। তিনি সংসার জীবনের অবসর উপভোগ করতেন পড়াশোনার মধ্যে। পরনিন্দা, পরচর্চা, কুসংস্কারকে কোনওদিন তিনি প্রশ্রয় দিতেন না। দিদারা দুই বোন, দিদার বাবা ছিলেন নাটরের রাজার নায়েব। খুব অল্প বয়সে মাকে হারিয়ে ছিলেন, ফলে সেই সময় থেকেই একা হাতে সংসার সামলে তারই সঙ্গে ছোট বোনকে মাতৃস্নেহে পালন করেছিলেন। গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যা সম্বল করেও তিনি বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলতে শুরু করলেন, যা অনেক বিদ্বানের থেকে কোনও অংশে কম ছিল না। জমিদার বাড়ির বউ হলেও তাঁর দৈনন্দিন জীবনযাপন ছিল অত্যন্ত সাধারণ কিন্তু বৈষয়িক বুদ্ধি ছিল তুখোড়।

ওঁদের দুই বোনের মানসিক অবস্থান ছিল দুই মেরুর কিন্তু জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত একে অপরের প্রতি ভালবাসার টান ছিল অটুট। দিদার জামিরঘাটায় থাকার পিছনে আর একটা বড় কারণ হল তাঁর ছোট বোন শংকরী ছিল মালদা কুট্টিটোলার বাসিন্দা। আমরা প্রায় দিন প্যাসেঞ্জার ট্রেনে চেপে মালদা যেতাম। দিদা ট্রেনের জানলা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে মামাকে বলে দিতেন, রান্নাঘরে কোথায় কোন খাবার কোন বাটিতে ঢেকে রাখা আছে। ট্রেন গড়াতে শুরু করলে দিদা গলার স্বর চড়িয়ে বলতে থাকতেন, ঘরে দই পেতে রেখেছেন, পরের দিন ডিউটিতে আসার আগে চিড়ে আর কলা দিয়ে মামা যেন খাওয়া সেরে নেয়। অনান্য যাত্রীদের মাঝে বসে এভাবে ঘরের কথা বলতে তিনি কোনও দ্বিধা করতেন না।
আমি জানলা দিয়ে হাত বাড়িয়ে মামাকে টাটা করতাম, মামাও স্টেশনে দাঁড়িয়ে বাধ্য ছেলের মতো তাঁর মার কথা শুনতে শুনতে আমার দিকে হাত নাড়তেন। স্টেশন ছাড়তেই জানলার কাচ নামিয়ে বালতি ব্যাগ থেকে পানের বাটা বের করে কোলে খবরের কাগজ বিছিয়ে দিদা পান সাজতে বসতেন। পান মুখে পুরে আবার কাচ তুলে দিতেন। ধোঁয়াতে মিশে থাকা কয়লার গুড়ো উড়ে এসে পানে পড়বে বলে এটা ছিল তাঁর আগাম সতর্কতা। নর্থ কেবিন অতিক্রম করার সময় সীতারামকে দেখতে পেতাম। সবুজ পতাকা তুলে সে দাঁড়িয়ে আছে। আগে থেকে জানত যে আজ তাঁর খোকা ‘টাউনে’ যাচ্ছে। আমাকে দেখতে পেয়ে আনন্দে তাঁর পতাকা ধরা হাতটা আরও জোরে দুলে উঠত।
আবছা মনে পড়ে, আমার আবদারেই সীতারাম প্রথম আমার হাতে পতাকা তুলে দিয়েছিল। সেই সময় আমার ছোট্ট হাতে বেশিক্ষণ সে পতাকা ধরে রাখতে পারিনি। কাটিহার থেকে আসা সেই সীতারাম আজ কোথায় জানি না।
মালদা টাউনে তখনও সেভাবে রিক্সার চল হয়নি। স্টেশনের বাইরে গাছের ছায়ায় সার দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকত টমটম। স্টেশন ছেড়ে বড় রাস্তা জুড়ে দিনের বেলায় দু’ধারের বিশাল উঁচু গাছের ছায়াপথ ধরে একটু এগোতেই ‘ঝলঝলিয়া’, তারপর ‘কানির মোড়’ পার করে ‘চারশো বিশ মোড়’ সোজা গেলে ‘রথবাড়ির মোড়’। চারশো বিশ মোড়ের দোকান থেকে দিদা বোনের বাড়ির সকলের জন্য রসকদম্ব কিনতেন, তারপর ঘোড়া ছুটত ‘কুট্টিটোলা’র দিকে। ঘোড়াকে জল খাওয়ানোর জন্য টমটমের একধারে একটা লোহার বালতি ঝুলে থাকত, কোচোয়ান সেই বালতির গায়ে লাঠি পিটিয়ে আবার কখনও বা কাঠের চলন্ত চাকার উপর লাঠি ঠেকিয়ে আওয়াজ তুলে রাস্তার মানুষ সরিয়ে ছুটে চলত।
এই হল আমার এক সমস্যা। কথা হচ্ছিল জমিরঘাটার সীতারামকে নিয়ে, কিন্তু প্রসঙ্গ বদলে বলে চলেছি মালদার টমটমের ইতিহাস নিয়ে। আসলে দু’চার কলম লিখলেই যে লেখক হওয়া যায় না, আমার এই লক্ষণ বোধহয় সেটাই প্রমাণ করে। যাই হোক, প্রসঙ্গে ফিরি। সীতারামকে আমি কোনওদিন আমাদের কোয়ার্টারের চৌকাঠ ডিঙিয়ে ভিতরে আসতে দেখিনি। আমি বাঁশের কঞ্চির গেট পেরিয়ে ওঁর দিকে ছুটে গেলেই সীতারাম ধরা না দিয়ে পালিয়ে যেত। আমি এটাকে খেলা ভাবতাম, কিন্তু দিদার মুখে পরে জেনেছিলাম, মেল ট্রেনের নোংরার রেল লাইনের মাঝে ছড়িয়ে থাকত, তার মধ্যে দাঁড়িয়ে থেকে ওঁকে দৈনন্দিন কাজ করতে হত বলে হঠাৎ করে সে আমায় ধরা দিত না।
আরও পড়ুন: ‘স্বর্ণ যুগ’ পেরিয়ে বর্তমান বাংলা সিনেমা
আবার, সেই সীতারাম ছুটির দিনে আমায় কাঁধে চড়িয়ে স্টেশনে নিয়ে যেত। আমায় অসময়ে রেলের ঘণ্টি বাজাতে দিত। মালগাড়ির খবর হলে দু’হাত দিয়ে লিভার টেনে লাইন বদল করে, কেবিনের দোতলা বারান্দায় আমায় কোলে তুলে নিয়ে আমার হাতে পতাকা ধরিয়ে দিত। কয়লার ইঞ্জিনে মাথায় রুমাল বাঁধা ড্রাইভার আমার হাতে পতাকা দেখে সেও হাত বাড়িয়ে আমায় ইশারায় বলতো যে, তার কাছেও একই রকমের আর একটা পতাকা আছে।
আবছা মনে পড়ে, আমার আবদারেই সীতারাম প্রথম আমার হাতে পতাকা তুলে দিয়েছিল। সেই সময় আমার ছোট্ট হাতে বেশিক্ষণ সে পতাকা ধরে রাখতে পারিনি। কাটিহার থেকে আসা সেই সীতারাম আজ কোথায় জানি না। জানি না সে আদৌ এ পৃথিবীতে আছেন কি না। এত বছর পরে লকডাউনের সময় মাইলের পর মাইল পায়ে হাঁটা মানুষগুলোকে দেখে কেন যেন আমার সীতারামের কথা ভীষণভাবে মনে পড়েছে। সেদিনের সব মানুষগুলোকে আমার সীতারাম মনে হয়েছে, এ যেন সীতারামের মিছিল। আমাদের মনে রাখতে হবে এই ভারতবর্ষ যতটা রাম-সীতার দেশ, ঠিক ততটাই ‘সীতারাম’দেরও দেশ।
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত