(Golden Age Cinema)
বিগত পঁচিশ বছরে সেলুলয়েড থেকে ডিজিটাল ফরম্যাটে রূপান্তরের ফলে বাংলা সিনেমার ইতিহাস এক বৈপ্লবিক পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে অতিবাহিত হয়েছে। এই পরিবর্তন শুধু কারিগরি বিবর্তন নয়, বরং সিনেমা নির্মাণের ভাষা, নান্দনিকতা এবং ব্যবসার ধরনকেও আমূল বদলেছে।
সিনেমা নির্মাণের বিবর্তনে সেলুলয়েড যুগের সেই ধ্রুপদী আভিজাত্য এবং বর্তমান ডিজিটাল যুগের নিখুঁত কারিগরি উৎকর্ষের মধ্যে এক বিশাল ব্যবধান রয়েছে। সে যুগে শুটিংয়ের সময় লেন্সের ভেতর দিয়ে যা দেখা যেত, তার ওপর একমাত্র নিয়ন্ত্রণ থাকত সিনেমাটোগ্রাফার বা ক্যামেরাম্যানের। ল্যাব থেকে প্রিন্ট না আসা পর্যন্ত শুটিংয়ে ছবিতে কী উঠেছে, কতটা উঠেছে এবং কীভাবে উঠেছে বা ধরা পড়েছে, পরিচালক বা অভিনেতা কারওর পক্ষেই আগাম জানা সম্ভব ছিল না। সে যুগে ক্যামেরাম্যানই ছিলেন সিনেমার ‘প্রথম এবং একক দর্শক’। সিনেমার যে এক ধরনের ‘অনিশ্চয়তার সৌন্দর্য’ ছিল, ডিজিটাল যুগে তা রূপান্তরিত হয়েছে ‘নিশ্চিত ও নিখুঁত’ নির্মাণে। ডিআই (ডিজিট্যাল ইন্টারমিডিয়েট) এবং গ্রাফিক্স আমাদের ছবিকে আরও রঙিন ও ঝকঝকে করলেও, সেলুলয়েডের সেই গভীরতা আজও সিনেমাপ্রেমীদের কাছে এক অপার্থিব নস্টালজিয়া।
আরও পড়ুন: পশ্চিমবাংলার ক্ষমতা বদলের প্রাক সুবর্ণ জয়ন্তী
সেলুলয়েডে ব্যয়বহুল ফিল্ম নষ্ট হওয়ার আতঙ্ক থেকে এই যুগের সিনেমাজগত সম্পূর্ণভাবে মুক্ত। আগে এডিটিং ছিল কায়িক শ্রমের কাজ। ফিল্ম থেকে ফ্রেম কেটে নেল পালিশের তুলির সাহায্যে সিমেন্ট আঠা লাগিয়ে ফিল্ম জোড়া হত। এখন কম্পিউটার সফটওয়্যার অতি দ্রুত সেই কাজ করে দেয়। স্পেশাল এফেক্ট বা ভিএফএক্স-এর ব্যবহার এখন বাংলা সিনেমায় জলভাত। ফলে তরুণ ও স্বাধীন চিত্রনির্মাতারা কম বাজেটে সিনেমা বানানোর সাহস নিয়ে এগিয়ে আসছে।
আগে ছবির পরিবেশকদের ভারী ভারী রিলের বাক্স এক সিনেমা হল থেকে অন্য হলে পাঠাতে হত। সেই কাজে সামান্য অসাবধানতায় প্রিন্টে কিছু হলে সেটা হলের স্ক্রিনে প্রকটভাবে ফুটে উঠত। এখন অনলাইন সার্ভার বা ডিসিপি (ডিজিটাল সিনেমা প্যাকেজ)-র মাধ্যমে হলে ছবি পৌঁছে যায়। এটাই বিশ্বব্যাপী এখন প্রেক্ষাগৃহে চলচ্চিত্র প্রদর্শনের জন্য শিল্পমানসম্মত বা আদর্শ ডিজিটাল ফরম্যাট। ডিসিপি-তে অডিও, ভিডিও, সাবটাইটেল এবং মেটাডেটার মতো ডিজিটাল ফাইলের একটি সংকলন থাকে, যা ডিজিটাল প্রোজেক্টর দ্বারা পড়া যায়।

আর একটা গুরুত্বপূর্ণ দিক হল নিরাপত্তা। ডিজিটাল সিনেমা প্যাকেজ প্রায়শই এনক্রিপ্ট (Encrypt) করা থাকে, যা পাইরেসি রোধ করতে সহায়তা করে। পুরনো ৩৫ মিমি (35mm) ফিল্মের ডিজিটাল বিকল্প হিসেবে তৈরি হওয়ার ফলে প্রেক্ষাগৃহে ছবি এখন ঝকঝকে। তবে এই রূপান্তরে অনেক পুরনো সিনেমা হল বন্ধ হয়ে মাল্টিপ্লেক্সের সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। ডিজিটাল রূপান্তর বাংলা সিনেমার জন্য একাধারে আশীর্বাদ এবং বড় চ্যালেঞ্জ। প্রযুক্তির এই সহজলভ্যতা আমাদের সিনেমাকে বিশ্বদরবারে পৌঁছে দিলেও, সেই সুযোগ আমরা কতটা কাজে লাগাতে পারছি, সে বিষয়ে গভীর বিশ্লেষণের অবকাশ রয়েছে।
সত্যি বলতে কি, ১৯৫০–৭০ সালে বাংলা সিনেমার ‘স্বর্ণ যুগ’ পেরিয়ে ২০০০ সাল থেকে সেই বাংলা সিনেমায় মানহীন বস্তাপচা চলচ্চিত্রের পাশাপাশি দেদার নকল সিনেমা নির্মিত হয়েছে। সে সময় অনেক প্রযোজক ও পরিচালকেরা ভেবেছিলেন যে বাংলা সিনেমায় বাংলা মেজাজ, বাংলার ঐতিহ্য বা বাঙালিয়ানাকে কেন্দ্র করে ছবি তৈরি করলে সে ছবি জনপ্রিয় হবে না। তাঁদের মতে ‘দর্শকের চাহিদা বদলেছে’ সেই অজুহাতে অহেতু্ক, হাই বাজেট, বিদেশের মাটিতে বাংলার নায়ক নায়িকার উদ্দাম নৃত্য এবং অপ্রয়োজনীয় মারদাঙ্গাকে ‘নতুন স্বাদ নতুন পছন্দ’ বলে জোর করে দাগিয়ে দেওয়া হয়েছে। এই সস্তা মোহকে প্রাধান্য দিয়ে স্কুলকলেজের ছাত্রছাত্রীদের সাময়িকভাবে সিনেমা হলে হাজির করা যায়, এটা যেমন ঠিক, তেমনই আবার অন্যদিকে সেই সময় থেকেই সাধারণ মধ্যবিত্ত খাঁটি বাঙালি দর্শক হলবিমুখ হয়ে বাড়ির টেলিভিশনে তাঁদের বিকল্প মনোরঞ্জন খুঁজে নেয়।
এই রাজ্যে সিনেমা হলের সংখ্যা ছিল চারশোর বেশি। এখন মাল্টিপ্লেক্সসহ সেই সংখ্যাটা দাঁড়িয়েছে মাত্র একশ কুড়ির আশেপাশে। এই গণহারে প্রেক্ষাগৃহ বন্ধ হয়ে যাওয়ার ধারাবাহিকতায় আশঙ্কাজনকভাবে সিনেমা নির্মাণের সংখ্যা কমেছে।
অবশ্য সব প্রোডাকশন হাউজ বা সব পরিচালক সেদিনের এই অবান্তর যুক্তি মেনে নিতে পারেনি। সে সময় নকলনবিশিদের মাধ্যমে ভিন ভাষার অতিনাটকীয় অশ্লীলতানির্ভর বাংলা চলচ্চিত্রে যে ধ্বংসের বীজ বপন করা হয়েছিল, ইন্ডাস্ট্রি তার ফল আজও ভোগ করে চলেছে। প্রমাণস্বরূপ বলা যেতে পারে, সেসময় এই রাজ্যে সিনেমা হলের সংখ্যা ছিল চারশোর বেশি। এখন মাল্টিপ্লেক্সসহ সেই সংখ্যাটা দাঁড়িয়েছে মাত্র একশ কুড়ির আশেপাশে। এই গণহারে প্রেক্ষাগৃহ বন্ধ হয়ে যাওয়ার ধারাবাহিকতায় আশঙ্কাজনকভাবে সিনেমা নির্মাণের সংখ্যা কমেছে।
২০০০-এর দশকে বাংলা সিনেমায় ‘কমার্শিয়াল’ বিকল্প, নান্দনিক এবং মধ্যবর্তী সিনেমার মধ্যেও ভাঙন শুরু হয়। কিছু নির্মাতা নতুন চ্যালেঞ্জ, নতুন দর্শক, নতুন স্বপ্ন, নতুন কনটেন্ট নিয়ে এগিয়ে আসেন। তার মধ্যে বেশকিছু সিনেমা বাণিজ্যিক ‘হিট’ না হলেও সিনেমার দৃষ্টিকোণ, সামাজিক বা মানসিক গভীরতার নতুন ভাবনার মধ্যে দিয়ে শহুরে মধ্যবিত্ত শ্রেণি এবং বুদ্ধিজীবী দর্শকদের মনে আশার সঞ্চার করেছিল। সেই মাহেন্দ্রক্ষণে বাংলা সিনেমায় নতুন আত্মবিশ্বাসের আড়ালে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নাম ঋতুপর্ণ ঘোষ। তাঁর পরিচালিত উৎসব (২০০০), চোখেরবালি (২০০৩), রেনকোট (২০০৪), দোসর (২০০৬), আবহমান (২০১০) এই ছবিগুলো সম্পর্ক, স্মৃতি ও অন্তর্জগতের নান্দনিকতা ফিরিয়ে এনে বাংলা সিনেমার ‘সংস্কৃতি মূল্য’ পুনর্স্থাপিত করে।

দীর্ঘ বিরতির পর বর্ষীয়ান পরিচালক তরুণ মজুমদার ২০০১ সালে ‘আলো’ ছবির প্রস্তুতি শুরু করেছিলেন (২০০৩ সালে মুক্তি পায়)। তাঁর এই সক্রিয়তা বাংলা সিনেমার সুস্থ ধারার দর্শকদের আশাবাদী করে তুলেছিল।
গৌতম ঘোষের ‘দেখা’ (২০০১) বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে শুধু শৈল্পিক সৃষ্টি হিসেবে নয়, বরং কারিগরি বিপ্লব হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। এই সিনেমার হাত ধরেই বাংলা সিনেমা হলে প্রথম বেজে ওঠে ‘ডলবি ডিজিটাল’ (Dolby SR) শব্দ প্রযুক্তি। সুতরাং, সেই অর্থে বলতেই হয়, বাংলা সিনেমায় ডিজিটাল রূপান্তরের প্রথম সোপানটি তৈরি হয়েছিল শব্দের মাধ্যমে।
নবারুণ ভট্টাচার্যের উপন্যাস অবলম্বনে সুমন মুখোপাধ্যায় প্রথম ছবি ‘হারবার্ট’ (২০০৫)। এই ছবিতে সুমন কলকাতার নগর জীবন, মৃত্যু এবং সমাজ-রাজনৈতিক ভাষ্যকে ‘ডার্ক কমেডি’ এবং মর্মস্পর্শী বাস্তবতার সঙ্গে অন্বেষণ করেন যা পোস্ট-মডার্ন বাংলা সিনেমার মাইলফলক।
অনিরুদ্ধ রায় চৌধুরীর ‘অনুরণন’ (২০০৬) এবং ‘অন্তহীন’ (২০০৯) বাংলা সিনেমায় এক নতুন পথ দেখিয়েছে। ভাল সিনেমা মানেই জটিল বা দুর্বোধ্য কিছু নয়। কারিগরি উৎকর্ষ এবং ভাল সঙ্গীত থাকলে গভীর বিষয়ের সিনেমাও অতি সহজে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছুতে পারে।
অনিরুদ্ধ রায় চৌধুরীর ‘অনুরণন’ (২০০৬) এবং ‘অন্তহীন’ (২০০৯) বাংলা সিনেমায় এক নতুন পথ দেখিয়েছে। ভাল সিনেমা মানেই জটিল বা দুর্বোধ্য কিছু নয়। কারিগরি উৎকর্ষ এবং ভাল সঙ্গীত থাকলে গভীর বিষয়ের সিনেমাও অতি সহজে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছুতে পারে। আরও এক পরিচালক সুমন ঘোষ, তাঁর ছবি ‘পদক্ষেপ’ (২০০৬) সিনেমা গল্প এবং অভিনয়ের মিশ্রণে ভীষণভাবে উল্লেখযোগ্য। এই ছবিতে অভিনয়ের সূত্রে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের পঞ্চাশ বছরের সুদীর্ঘ অভিনয় জীবনে প্রথম শ্রেষ্ঠ অভিনেতার জাতীয় পুরষ্কার অর্জন করেছিলেন।
সেই একই সময়ে বাংলা সিনেমার দর্শকদের অন্য ধারার ছবি উপহার দিয়েছিলেন অঞ্জন দত্ত। আধুনিক নব্য বাঙালির জীবন, বিভ্রান্তি, দূরত্ব, সম্পর্ক, পরিবার, বন্ধুত্ব, পেশা এই সবকিছুর এক আন্তঃসম্পর্কিত ছবি ‘দ্য বঙ কানেকশন’। আবার সংস্কৃতি ও বাস্তব জীবনের দূরত্ব নিয়ে লো-কী, মুডি, নস্টালজিক স্টোরিটেলিং-এ এক প্রজন্মের হারানো সময়ের ডায়েরি অঞ্জন দত্তের ‘ম্যাডলি বাঙালি’ (২০০৯)।

২০১০ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত সংবেদনশীল, সাহিত্যমনস্ক, নারীকেন্দ্রিক কাব্যিক সিনেমার ধারক অপর্ণা সেন পরিচালিত ‘দ্য জাপানিজ ওয়াইফ’। এই ছবিতে অপর্ণা সেন দূরত্ব নির্ভর প্রেমের নবরূপকার। তাঁর সৃষ্ট প্রেমে শারীরিক উপস্থিতি বা মিলন দৃশ্য নেই, আছে শুধু চিঠি, উপহার আর অনুপস্থিতির তীব্র আকুলতা। অন্যদিকে ‘মনের মানুষ’ গৌতম ঘোষের হাত ধরে লালন সাঁইয়ের জীবনদর্শন। অপর্ণা সেন যেখানে প্রেমের ‘অনুপস্থিতি’-কে শিল্পের নান্দনিক পর্যায়ে পৌঁছে দিয়েছেন, সেখানে গৌতম ঘোষ লালনের মাধ্যমে মানুষের ‘অন্তরাত্মা’র জয়গান গেয়েছেন। এই দুই ছবিই প্রমাণ করে, প্রযুক্তির আধুনিকতার পাশাপাশি বাংলা সিনেমার আসল শক্তি তার সাহিত্যমনস্কতা ও গভীর জীবনবোধ।
এই দশকের পরিশেষে এ কথা বলা যেতেই পারে যে জিৎ, দেব, কোয়েল-এর মতো নতুন মুখের উত্থানের প্রেক্ষাপটে একদিকে যেমন বাণিজ্যিক ধারার ছবিতে বড় পরিবর্তন এসেছিল। অন্যদিকে সমান্তরাল বাংলা সিনেমা জাতীয় স্তরে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং সেখানে পরিচালকই হয়ে ওঠেন ছবির ব্র্যান্ড।
২০১০ সালে আমিই প্রথম ‘বাই বাই ব্যাংকক’ ছবিতে ‘রেড ক্যামেরা’ ব্যবহার করি এবং সেই ছবির সাফল্য থেকেই বাংলা সিনেমায় ডিজিটাল মাধ্যম ক্রমশ দখল নেয়। ফলে স্বাধীন প্রযোজকের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং নতুন অভিনেতা ও পরিচালকের আবির্ভাবে বাংলা ছবির পরিস্থিতিতে বহুমুখী রূপান্তর ঘটে।
এবার আসি দ্বিতীয় দশক অর্থাৎ ২০১০–২০২০ প্রসঙ্গে। এই সময়ে বিকল্প ধারার বিস্ফোরণ ও নব্য-শহুরে সিনেমার উত্থান ছিল বাংলা সিনেমার জন্য ‘পরিবর্তন ও পুনরুদ্ধার’-এর সন্ধিক্ষণ। পুরনো ‘সোনালি যুগ’-এর ছাপ পেরিয়ে ডিজিটাল সিনেমাটোগ্রাফির আগমন হয়। ‘নীল নির্জনে’ (২০০৩) ছবিতে ডিজিটাল মাধ্যম পরীক্ষামূলকভাবে ব্যবহার হয়েছিল। কিন্তু ২০১০ সালে আমিই প্রথম ‘বাই বাই ব্যাংকক’ ছবিতে ‘রেড ক্যামেরা’ ব্যবহার করি এবং সেই ছবির সাফল্য থেকেই বাংলা সিনেমায় ডিজিটাল মাধ্যম ক্রমশ দখল নেয়। ফলে স্বাধীন প্রযোজকের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং নতুন অভিনেতা ও পরিচালকের আবির্ভাবে বাংলা ছবির পরিস্থিতিতে বহুমুখী রূপান্তর ঘটে।
এ প্রসঙ্গে সর্বপ্রথম উল্লেখ করতে হয় পরিচালক সৃজিত মুখোপাধ্যায়ের নাম। তাঁর অটোগ্রাফ (২০১০), বাইশে শ্রাবণ (২০১১), হেমলক সোসাইটি (২০১২) আধুনিক শহুরে গল্প, ডার্ক হিউমার, বুদ্ধিদীপ্ত সংলাপে, সঙ্গে অনুপম রায়-এর গান এবং নির্মাণ বৈচিত্রে পরিপূর্ণ। তাঁর চলচ্চিত্রে থ্রিলার এবং নন-লিনিয়ার ন্যারেটিভ গল্প বলার ধরনে বাঙালি দর্শকের বয়স এবং রুচিতে বড় পরিবর্তন ঘটায়, ফলে নতুন একদল শিক্ষিত তরুণ দর্শক হলমুখী হয়।

ব্যঙ্গ, কমেডি ও স্যাটায়ারের এক অসাধারণ মিশ্রণ বাংলা সিনেমাকে নতুন ধারায় নিয়ে যান পরিচালক অনীক দত্ত। তাঁর ভূতের ভবিষ্যৎ (২০১২) কম বাজেটে বিশাল জনপ্রিয়তায় বাংলা কমার্শিয়াল ছবির ধারণা বদলে দেয়। আবার অসম্ভব স্বল্প পুঁজির ছবি ‘বাকিটা ব্যক্তিগত’ (২০১৩)। আধুনিকতার সঙ্গে লোকগল্পের ধারাকে অক্ষুণ্ণ রেখে সমসাময়িক বাংলা সিনেমার ভাষা নিয়ে যারা অবিছিন্নভাবে কাজ করে চলেছেন, তাঁদের মধ্যে ব্যতিক্রমী সংযোজন পরিচালক প্রদীপ্ত ভট্টাচার্য।
কৌশিক গাঙ্গুলির ছবি প্রসঙ্গে প্রথম বলতে হয় শব্দ (২০১৩)-এর কথা। এই ছবিতে সিনেমার নেপথ্যে শব্দ পরিকল্পনা ও শব্দ সৃষ্টির এক কারিগরের জীবিকার কথা তিনি বলেছেন। আবার তিনি সিনেমাওয়ালা (২০১৬)-তে সিঙ্গল স্ক্রিনের মৃত্যু নিয়ে ব্যথাতুর মর্মস্পর্শী গল্পও বলেছেন। নগরকীর্তন (২০১৯) ছবিতে LGBTQ+-এর মতো বিষয়টাকে তিনি সাহস এবং মানবিকতাকে একসূত্রে গেঁথে সত্যকে সিনেমার পর্দায় তুলে ধরেছেন।
মৃত্যুকে কেন্দ্র করে সিনেমা কিন্তু ভয় বা বিষাদের দৃষ্টিতে নয়, বরং হাস্যরস, কৌতুক, দার্শনিক ভাবনা এবং বন্ধুত্বের অদ্ভুত উষ্ণতার ছবি পিস হেভেন (২০১৬)। পরিচালক সুমন ঘোষের এক ব্যতিক্রমী, ব্যঙ্গধর্মী এবং একাধারে গভীরভাবে মানবিক বাংলা সিনেমা।
আসা যাওয়ার মাঝে (২০১৪) আদিত্য বিক্রম সেন গুপ্তের পরিচালনায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষামূলক পদক্ষেপ। ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে এই ছবি প্রথম প্রদর্শিত হয় এবং পরবর্তী সময়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মঞ্চ থেকে যাবতীয় স্বীকৃতি লাভের মাধ্যমে বাংলা সিনেমার ইতিহাসে অন্যতম সেরা সিনেমার মর্যাদা আদায় করে নেয়।
মৃত্যুকে কেন্দ্র করে সিনেমা কিন্তু ভয় বা বিষাদের দৃষ্টিতে নয়, বরং হাস্যরস, কৌতুক, দার্শনিক ভাবনা এবং বন্ধুত্বের অদ্ভুত উষ্ণতার ছবি পিস হেভেন (২০১৬)। পরিচালক সুমন ঘোষের এক ব্যতিক্রমী, ব্যঙ্গধর্মী এবং একাধারে গভীরভাবে মানবিক বাংলা সিনেমা।
আধুনিক বাংলা রোমান্টিক ড্রামা ও পারিবারিক বিনোদনধর্মী মেইনস্ট্রিম সিনেমার ‘ট্রেন্ড সেটার’ হিসেবে রাজ চক্রবর্তী বাংলা সিনেমায় এক বলিষ্ঠ সংযোজন। তাঁর ছবি চিরদিনই তুমি যে আমার (২০০৮)-ই প্রথম সিনেমা যেটা প্রদর্শনে “কিউব” সিস্টেমএর মাধ্যমে প্রদর্শিত হয়।

শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় এবং নন্দিতা রায়ের জুটি বেলাশেষে (২০১৫), প্রাক্তন (২০১৬) বাংলা সিনেমায় আবেগঘন পারিবারিক ন্যারেটিভের সাহায্যে মধ্যবয়সী দাম্পত্য, সম্পর্ক, বিচ্ছেদ ও পুনর্মিলন। অসাধারণ মানবিক গল্পের দরুণ সর্বজনীন দর্শকশ্রেণির উপস্থিতিতে তাঁদের ছবি বাংলা সিনেমার নতুন বাজার তৈরি করে। ওটিটি (ওভার দ্য টপ) পূর্ব যুগে প্রেক্ষাগৃহে সবথেকে বড় সাফল্য এই জুটির। এই ধারা ২০২০-এর পর বাণিজ্যিক সিনেমা পুনরুজ্জীবিত করতে ব্যাপক ভূমিকা রাখতে দেখা যায়।
গৌতম ঘোষের শঙ্খচিল (২০১৬) এবং অতনু ঘোষ-এর ময়ূরাক্ষী (২০১৮) বিকল্প ধারার শক্তিশালী উত্থান হিসেবে অবশ্যই দর্শকমনে এবং জাতীয় পুরস্কারের মঞ্চে সমান ভাবে সমাদৃত হয়েছে। একটা সময় যখন মনে হয়েছিল, বাংলা সিনেমা হয়তো সাঙ্ঘাতিকভাবে পিছিয়ে পড়েছে, তখন এই ছবিগুলো বাংলা সিনেমাকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্রের আঙ্গিনায় প্রতিনিধিত্ব করেছে।
বন্ধুত্ব, সারল্য, গ্রামীণ জীবন এবং সাম্প্রদায়িকতার সূক্ষ্ম সংঘাত দিয়ে ভারত বাংলাদেশ সীমান্তে দুই ভিন্ন ধর্মাবলম্বী বালকের গভীর বন্ধুত্ব। যা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন ও বিচ্ছেদকে কেন্দ্র করে নির্মিত ছবি দোস্তজি (২০২২)।
২০২০ থেকে ওটিটি–র হাত ধরে নতুন প্রজন্মের উত্থান বাংলা সিনেমাকে আরও বহুমাত্রিক ও বৈচিত্র্যময় করে তুলেছে। এটাই যে আগামী দশকের নতুন ন্যারেটিভ তৈরি করবে, এমনটা আশা করা যেতেই পরে। বর্তমানে প্রেক্ষাগৃহের দর্শক এবং ওটিটি-র দর্শক এই দুই ক্ষেত্রে আলাদা জনরুচি তৈরি হয়েছে। যার ফলে আশ্চর্যরকমভাবে অধুনিক সিনেমার গল্প, গতি, চরিত্র নির্মাণ সব ক্ষেত্রে ‘OTT’-র প্রত্যক্ষ প্রভাব ভীষণভাবে লক্ষণীয়।
পরিচালক অভিজিৎ সেন বাণিজ্যিক বাংলা ছবি প্রজাপতি (২০২২) পরিবারকেন্দ্রিক আবেগ দিয়ে আবার মূল স্রোতে ফিরিয়ে এনেছেন। সাম্প্রতিক বাংলার সবচেয়ে বেশি আয় করা ছবির মধ্যে এই ছবি উল্লেখযোগ্য। বন্ধুত্ব, সারল্য, গ্রামীণ জীবন এবং সাম্প্রদায়িকতার সূক্ষ্ম সংঘাত দিয়ে ভারত বাংলাদেশ সীমান্তে দুই ভিন্ন ধর্মাবলম্বী বালকের গভীর বন্ধুত্ব। যা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন ও বিচ্ছেদকে কেন্দ্র করে নির্মিত ছবি দোস্তজি (২০২২)। পরিচালক প্রসূন চট্টোপাধ্যায়ের এই ছবি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির ভাণ্ডার। ২০২৫-এ সেই ধারার বাহক প্রদীপ্ত ভট্টাচার্যের ‘নধরের ভেলা’।
ডিজিটাল যুগে শহরের গঠন, তথ্যপ্রযুক্তি, পেশাগত চাপ, সম্পর্কের জটিলতা বাংলা সিনেমায় এক নতুন বাস্তবতা তৈরি করা স্বত্তেও বিগত পঁচিশ বছরে বাংলা সিনেমা নিজের পরিচয়কে ‘আঞ্চলিক’ থেকে ‘জাতীয়’, আবার ‘বৈশ্বিক’ তিন ফ্রেমেই নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করেছে।
২০০০–২০২৫ এই সময়কালে বাংলা সিনেমাকে নতুন শিল্পভাষা, প্রযুক্তি, দর্শক সংস্কৃতি ও বয়ান দিয়েই পুনর্গঠিত করেছে। বাণিজ্যিক ধারা এবং নান্দনিক ধারা এই দুই ধারাতে সমান্তরালভাবে বাংলা সিনেমা এগিয়ে চলেছে। আকর্ষণীয় বিষয় হল, কোনও একটা ধারা অপর ধারাকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। ডিজিটাল যুগে শহরের গঠন, তথ্যপ্রযুক্তি, পেশাগত চাপ, সম্পর্কের জটিলতা বাংলা সিনেমায় এক নতুন বাস্তবতা তৈরি করা স্বত্তেও বিগত পঁচিশ বছরে বাংলা সিনেমা নিজের পরিচয়কে ‘আঞ্চলিক’ থেকে ‘জাতীয়’, আবার ‘বৈশ্বিক’ তিন ফ্রেমেই নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করেছে।
একজন সাধারণ চলচ্চিত্রকর্মী হিসেবে আমার ব্যক্তিগত বিশ্বাস বাংলা সিনেমা এখন এক রূপান্তরময় সময়ের মধ্যে দিয়ে অতিক্রম করছে, এবং ভবিষ্যতের আরও বহু সম্ভাবনা বহন করে চলেছে। এখন ভীষণভাবে প্রয়োজন ব্যক্তিগত অহংকার ও অতিরঞ্জিত প্রচার দূরে সরিয়ে আত্মসমালোচনার মাধ্যমে আত্মশুদ্ধি করে বাংলা সিনেমার জন্য নতুন পথের সন্ধান করা, এবং আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলা সিনেমার পুনরুত্থান। শিল্প, প্রযুক্তি ও বাণিজ্য তিনটে বিষয় যদি সমানভাবে বাংলা সিনেমার স্বার্থে এক হয় তাহলেই আগামী দিনে সেটা সম্ভব হবে।
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত