(WB Political History 3)
কেন্দ্র–রাজ্য অর্থনৈতিক দ্বন্দ্ব
পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাসের যে উত্থান-পতন আমরা দেখি, তার নেপথ্যে ছিল এক গভীর অর্থনৈতিক সংকট। ১৯৫২ সালে ভারত সরকার কর্তৃক প্রবর্তিত ‘ফ্রেট ইকুয়ালাইজেশন পলিসি’ বা মাশুল সমীকরণ নীতি হল এই সংকটের অন্যতম প্রধান কারণ। বাংলার বহু অর্থনীতিবিদ ও রাজনীতিবিদের মতে, এই নীতি ছিল রাজ্যের প্রতি কেন্দ্রের এক ঐতিহাসিক অর্থনৈতিক অবিচার, যা পশ্চিমবঙ্গের শিল্পের মেরুদণ্ড ভেঙে দেয়।
স্বাধীনতার সময় ভারতের ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্পের প্রাণকেন্দ্র ছিল পশ্চিমবঙ্গ। ১৯৫০ সালেও ভারতের মোট ইঞ্জিনিয়ারিং উৎপাদনের প্রায় ৪৮ শতাংশ জোগান দিয়েছে পশ্চিমবঙ্গ এবং বিহার। কিন্তু মাশুল সমীকরণ নীতির ফলে লোহা ও কয়লার মতো কাঁচামাল সারা ভারতে একই দামে উপলব্ধ হতে শুরু করে। কাঁচামালের দাম এক হয়ে যাওয়ায় নতুন বিনিয়োগকারীরা খনি-সমৃদ্ধ পশ্চিমবঙ্গ ছেড়ে সমুদ্র বন্দরের নিকটবর্তী মহারাষ্ট্র, গুজরাট বা তামিলনাড়ুকে বেছে নেয়। কাঁচামাল এ রাজ্যের নিজস্ব সম্পদ হলেও, স্টিল প্রসেসিং ইউনিট বা গাড়ি তৈরির কারখানাগুলো হরিয়ানা বা গুজরাটে গড়ে উঠতে শুরু করে। কারণ তারা নিজেদের রাজ্যে বসেই সস্তায় ইস্পাত ও কয়লার জোগান পাচ্ছিল।
আরও পড়ুন: পশ্চিমবাংলার ক্ষমতা বদলের প্রাক সুবর্ণ জয়ন্তী পর্ব ১, পর্ব ২
উনিশ ও বিশ শতকে কলকাতা সংলগ্ন হাওড়ার লিলুয়া এবং তার আশেপাশের এলাকায় ছোট-বড় বহু ইঞ্জিনিয়ারিং ফার্ম, ঢালাই কারখানা, চটকল, ভারী যন্ত্রাংশ তৈরির কারখানা, এমনকি জাহাজ নির্মাণসহ বিভিন্ন ভারী শিল্প গড়ে ওঠে। ভারতের শিল্পায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা লাভ করায় ব্রিটিশ আমল থেকেই হাওড়ার ওই অঞ্চলকে ‘ভারতের শেফিল্ড’ বলা হত। তখন দুর্গাপুর বা আসানসোল থেকে কম খরচে কাঁচামালের জোগান পাওয়ায় হাওড়া-হুগলির কারখানাগুলো সব থেকে সস্তায় পণ্য তৈরি করতে পারত। কিন্তু ফ্রেট ইকুয়ালাইজেশন পলিসি চালু হলে পশ্চিমবঙ্গের সেইসব কারখানা তাদের প্রাকৃতিক সুবিধা হারিয়ে ফেলে, এবং মুম্বাই বা চেন্নাইয়ের আধুনিক কারখানাগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে বন্ধ হতে থাকে।
এই নীতির সবচেয়ে বিতর্কিত দিক ছিল এর একপাক্ষিক চরিত্র। কেন্দ্র পূর্ব ভারতের লোহা ও কয়লার উপর মাশুল সমীকরণ করলেও, পশ্চিম ভারতের প্রধান কাঁচামাল তুলা বা কার্পাসকে এই নীতির আওতায় আনেনি। যার ফলে পশ্চিমবঙ্গ খনিজ সম্পদ ভর্তুকিতে দিলেও, নিজেদের বস্ত্রশিল্পের জন্য পশ্চিম ভারত থেকে চড়া দামে তুলা কিনতে বাধ্য হয়েছে। এমনকি পাটের মতো কৃষিভিত্তিক শিল্পের আধুনিকীকরণেও কেন্দ্র কোনও গুরুত্ব দেয়নি। এই বৈষম্য বাংলার মানুষের মনে ‘কেন্দ্রীয় বঞ্চনা’র বিরুদ্ধে এক স্থায়ী ধারণা তৈরি করে।

১৯৫২ সালের পূর্বে খনিজ সম্পদ থেকে রাজ্য যে পরিমাণ রাজস্ব আদায় হত, এই নীতির কারণে তা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়, যার প্রভাব পরে সামগ্রিক শিল্পায়নের উপরে। পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন বামপন্থী এবং কংগ্রেস বিরোধী দলগুলো এই নীতিকে ‘কেন্দ্রীয় বঞ্চনা’ হিসেবে তুলে ধরে। এখান থেকেই বাংলার সাধারণ মানুষের মধ্যে বদ্ধমূল ধারণা তৈরি হয়, কেন্দ্রের একমুখী নীতিই পশ্চিমবঙ্গের শিল্পকে ধ্বংস করার জন্য ভীষণ ভাবে দায়ী। ‘বাঙালির আবেগ’ ও ‘রাজ্যের স্বাধিকার’ নিয়ে রাজনীতি আরও জোরালো হয়। ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্পে ধ্বস নামায় শিল্পাঞ্চলে বেকারত্ব বাড়ে। সিটু (CITU) এবং অন্যান্য শ্রমিক সংগঠনগুলি কারখানা বন্ধের প্রতিবাদে এবং শ্রমিকদের অধিকারের বিষয় নিয়ে আন্দোলন শুরু করলে কিছু সংখ্যক সমালোচকদের মনে হয়েছে ঘন ঘন ধর্মঘট ও ‘ঘেরাও’-এর ফলে পশ্চিমবঙ্গ থেকে নতুন বিনিয়োগকারীরা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে।
শিল্পায়ন থমকে যাওয়ায় শিক্ষিত যুবকদের মধ্যে হতাশা সৃষ্টি হয়। ফলে বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনগুলো কর্মসংস্থানের দাবিতে সত্তরের দশকের ‘ছাত্র আন্দোলন’-এর উত্তাল রাজনীতিতে জ্বালানি হিসেবে কাজ করেছে।
এই বৈষম্যের প্রতিবাদে একা পশ্চিমবঙ্গ নয়, তৎকালীন ওড়িশার মুখ্যমন্ত্রী বিজু পট্টানায়েক এবং বিহারের নেতারাও সোচ্চার হয়েছিলেন। তাঁদের সম্মিলিত চাপে শেষ পর্যন্ত ১৯৯৩ সালে নরসিমা রাও সরকার এই নীতি বাতিল করতে বাধ্য হয়।
পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে এই মাশুল সমীকরণ নীতিই ‘দিল্লি বনাম কলকাতা’ লড়াইয়ের জন্ম দেয়। এই নীতি রাজ্যবাসীর মধ্যে চিরস্থায়ী ধারণা তৈরি করে যে, বাংলার শিল্পোন্নয়ন সর্বদা দিল্লির মর্জির উপরেই নির্ভরশীল। এই বৈষম্যের প্রতিবাদে একা পশ্চিমবঙ্গ নয়, তৎকালীন ওড়িশার মুখ্যমন্ত্রী বিজু পট্টানায়েক এবং বিহারের নেতারাও সোচ্চার হয়েছিলেন। তাঁদের সম্মিলিত চাপে শেষ পর্যন্ত ১৯৯৩ সালে নরসিমা রাও সরকার এই নীতি বাতিল করতে বাধ্য হয়।
‘ফ্রেট ইকুয়ালাইজেশন পলিসি’ বাতিলের পর পশ্চিমবঙ্গের শিল্পক্ষেত্রে মিশ্র প্রভাব দেখা যায়। রাজ্য তার হারানো প্রাকৃতিক সুবিধা ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করেছে ঠিকই, কিন্তু চল্লিশ বছর ধরে বাংলায় নতুন শিল্প না আসায় রাজ্যের ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইকোসিস্টেম বা শিল্পের উপযুক্ত পরিবেশ অনেকাংশে নষ্ট হয়ে যায়। ইতোমধ্যে দক্ষ শ্রমিকরা (ব্রেন ড্রেন) অন্য রাজ্যে পাড়ি দিয়েছে। গুজরাট, মহারাষ্ট্র বা কর্ণাটকের মতো রাজ্যগুলো ওই চল্লিশ বছরে নিজেদের পরিকাঠামো গড়ে তুলে বর্তমান প্রতিযোগিতামূলক বাজারে নিজেদের অনেকটা এগিয়ে রেখেছে। অথচ স্বাধীনতার এত বছর পরেও পশ্চিমবঙ্গকে এখনও নতুন করে সেই ভিত্তি প্রস্তুতির লড়াই চালিয়ে যেতে হচ্ছে।
১৯৫০ থেকে ১৯৭০-এর দশকের যে গণ-অভ্যুত্থান, শরণার্থী সংকট বা নকশাল আন্দোলন আমরা দেখেছি, তার নেপথ্যে অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছিল এই পঙ্গু করে দেওয়া অর্থনীতি। মাশুল সমীকরণ নীতি শুধুমাত্র একটা প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ছিল না, এটা ছিল পশ্চিমবঙ্গের শিল্পায়নের কফিনে শেষ পেরেক পোঁতার পরিকল্পনা। আজ যখন আমরা পশ্চিমবঙ্গের শিল্পের বর্তমান অবস্থা নিয়ে ভারতের অন্যান্য শহরের সঙ্গে তুলনা করি, তখন ১৯৫২ সালের সেই বৈষম্যমূলক নীতির কথা অনেকেই ভুলে যাই। কিন্তু ভুললে চলবে না সেই সব মডেল ইন্ড্রাস্টিয়াল শহর গড়ে ওঠার পিছনে তৎকালীন পশ্চিমবঙ্গের প্রত্যক্ষ বলিদান অনস্বীকার্য।
শিক্ষিত মধ্যবিত্ত ‘ভদ্রলোক সমাজ’ সংস্কৃতি ও সমালোচনামূলক রাজনীতি
একটা সময় পর্যন্ত বাংলার রাজনীতিতে শুধুমাত্র ভোট বা ক্ষমতার সমীকরণ ছিল না, কারণ দীর্ঘদিন ধরে এই রাজ্যের রাজনীতি শিক্ষিত মধ্যবিত্ত ‘ভদ্রলোক সমাজ’ দ্বারা পরিচালিত এবং প্রভাবিত। উনিশ শতাব্দীর নবজাগরণ থেকে শুরু করে বিশ শতকের উত্তাল আন্দোলন, যার প্রতিটা বাঁকেই বাংলার শিক্ষিত মধ্যবিত্ত বা ‘ভদ্রলোক’ সমাজ নেতৃত্বের রাশ ধরেছেন। শুধুমাত্র প্রশাসনিক বা রাজনৈতিক নেতৃত্বের দায়ভার নিয়েছিলেন এমনটা নয় বরং বাঙালির চিন্তা, মতাদর্শ, এবং সংস্কৃতির বিভিন্ন স্তরে বুদ্ধিবৃত্তিক সমালোচনামূলক পরিসর তৈরি করেছিলেন। এই ‘ভদ্রলোক সমাজ’-এর আদর্শবাদ, নৈতিক রাজনীতির দাবি এবং ক্ষমতার প্রতি সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি বাংলার রাজনীতিকে এক স্বতন্ত্র চরিত্র দিয়েছিল।
এই ভদ্রলোক সমাজই বাংলায় জাতীয়তাবাদকে প্রথম সংগঠিত রূপ দেয়। বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে যে তীব্র আন্দোলন গড়ে ওঠে, তা মূলত বঙ্গদর্শন ইত্যাদি পত্রপত্রিকার জনমত গঠনের মাধ্যমে শিক্ষিত মধ্যবিত্তের নেতৃত্বেই পরিচালিত হয়।
লেখার শুরুর দিকে এ কথার উল্লেখ আছে যে, উনিশ শতকের বাংলার নবজাগরণের সময় থেকেই বাংলায় এক নতুন শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণির উত্থান ঘটেছিল। যারা অন্ধ আনুগত্যের বদলে যুক্তি দিয়ে সমাজ ও রাষ্ট্রকে বিচার করতে শেখে। ইংরেজি শিক্ষার প্রসার, ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ এবং হিন্দু কলেজের মতো প্রতিষ্ঠানে পাশ্চাত্য শিক্ষা ও যুক্তিবাদে বিশ্বাস, নৈতিকতা ও আদর্শভিত্তিক রাজনীতির প্রতি আকর্ষণ, রাষ্ট্র ও ক্ষমতার সমালোচনার সাহস, সমাজ সংস্কারের প্রতি দায়বদ্ধতাই এই ‘ভদ্রলোক’ শ্রেণিকে আলাদা করে গড়ে তোলে। এই ভদ্রলোক সমাজই বাংলায় জাতীয়তাবাদকে প্রথম সংগঠিত রূপ দেয়। বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে যে তীব্র আন্দোলন গড়ে ওঠে, তা মূলত বঙ্গদর্শন ইত্যাদি পত্রপত্রিকার জনমত গঠনের মাধ্যমে শিক্ষিত মধ্যবিত্তের নেতৃত্বেই পরিচালিত হয়। বাংলা সাহিত্য ও ভাষণে বঙ্কিমচন্দ্রের ‘বন্দে মাতরম’ এবং নেতাজির ‘জয় হিন্দ’ সর্বভারতীয় রাজনৈতিক প্রতিবাদের আজও বলিষ্ঠ স্লোগান।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘জনগণমন অধিনায়ক’ ভারতের জাতীয় সংগীত। এই বিষয়গুলো থেকেই প্রমাণ হয়, তখনকার বাঙালি শিক্ষিত সমাজ রাজনীতিকে শুধু ক্ষমতা দখলের জন্য নয়, তাঁরা নৈতিক সংগ্রাম হিসেবেই দেখেছিলেন।

এই প্রসঙ্গে বলতেই হয়, বাংলার রাজনীতি কখনই রাজনৈতিক মঞ্চের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি, থাকে না। বাংলার রাজনীতি গভীরভাবে প্রতিফলিত হয়েছে বাংলা সাহিত্য, নাটক, গান এবং চলচ্চিত্রে। রবীন্দ্রনাথ তাঁর রচনায় জাতীয়তাবাদ, রাষ্ট্র এবং ব্যক্তিস্বাধীনতার প্রশ্ন তুলেছেন। ‘ঘরে বাইরে’ উপন্যাসে উগ্র জাতীয়তাবাদের স্পষ্ট সমালোচনা করেছেন। ভারতীয় গণনাট্য সংঘ (IPTA)-এর মতো সংগঠন সাংস্কৃতিক আন্দোলনের মাধ্যমে বাংলায় রাজনৈতিক বার্তা ছড়িয়ে দিয়েছে। সত্যজিৎ রায়, ঋত্বিক ঘটক, মৃণাল সেন তাঁদের চলচ্চিত্রে একনায়কতন্ত্রের বিরুদ্ধে তীব্র ব্যঙ্গ করেছেন। আবার, শহুরে দারিদ্র ও রাজনৈতিক অস্থিরতাকে তুলে ধরে রাষ্ট্রের ব্যর্থতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন।
এক সময় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়সহ শহরের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো শুধুমাত্র পুঁথিগত শিক্ষার কেন্দ্র ছিল না। সেখানে সংস্কৃতি বিতর্ক, মতভেদ ও প্রতিবাদের স্বাভাবিক পরিবেশ তৈরি করে, রীতিমতো রাজনৈতিক বিতর্ক ও মতাদর্শের শিক্ষা প্রদান করা হয়েছে। বিশেষত ১৯৬০ থেকে ৭০-এর দশকে ছাত্র রাজনীতি যখন তীব্র হয়ে ওঠে, তার অন্তরালেও বুদ্ধিমান সমাজের একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। ফলে বাংলায় ধর্মঘট, মিছিল, আন্দোলন এই সব কর্মকাণ্ড সামাজিকভাবে স্বীকৃত। বাংলার সমাজে প্রতিবাদ বা বিরোধিতা অত্যন্ত স্বাভাবিক ও গ্রহণযোগ্য ঘটনা। আজও বাংলায় সরকারবিরোধী মত প্রকাশকে সাধারণ মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার হিসেবে দেখা হয়।
এই ভদ্রলোক-নির্ভর রাজনীতির কিছু নেতিবাচক দিকও রয়েছে, যেমন অনেক সময় অতিরিক্ত আদর্শবাদ ও তত্ত্বকথা সাধারণ গ্রামীণ বা শ্রমজীবী মানুষের রূঢ় বাস্তব থেকে নেতৃত্বকে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে। আবার তীব্র রাজনৈতিক মেরুকরণ অনেক সময় সামাজিক বিভাজন তৈরি করেছে।
ভারতের রাজনৈতিক মানচিত্রে বাংলার রাজনীতি আরও একটা বিষয়ে স্বতন্ত্র, সেটা হল বাঙালি ‘চিন্তাশীল’ রাজনীতিতে অভ্যস্ত। এখানে বিরোধিতা মানে শত্রুতা নয়, বিরোধিতা একটা গণতান্ত্রিক অধিকার। এই সুদীর্ঘ ঐতিহ্য, নবজাগরণ থেকে শুরু করে নকশাল আন্দোলন, বামপন্থা থেকে আজকের আধুনিক রাজনীতি পর্যন্ত বিস্তৃত, যা প্রমাণ করে, বাংলার মানুষ আজও মাথা উঁচু করে প্রশ্ন করতে জানে। এই সাংস্কৃতিক ও বৌদ্ধিক শেকড়ই পশ্চিমবঙ্গকে একটা স্বতন্ত্র ও চিন্তাশীল অঞ্চল হিসেবে বিশ্বের দরবারে পরিচিত করেছে।
তবে এই ভদ্রলোক-নির্ভর রাজনীতির কিছু নেতিবাচক দিকও রয়েছে, যেমন অনেক সময় অতিরিক্ত আদর্শবাদ ও তত্ত্বকথা সাধারণ গ্রামীণ বা শ্রমজীবী মানুষের রূঢ় বাস্তব থেকে নেতৃত্বকে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে। আবার তীব্র রাজনৈতিক মেরুকরণ অনেক সময় সামাজিক বিভাজন তৈরি করেছে, ফলে বাস্তবসম্মত নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রে অনেক সময় বাধার সম্মুখীন হয়েছে।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে বিশ্বায়ন ও ডিজিটাল বিপ্লবের যুগে বাংলার ‘ভদ্রলোক’ রাজনীতির সেই চিরাচরিত কাঠামোটি এক গভীর পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। আগে ‘ভদ্রলোক’ বা বুদ্ধিজীবীরাই ছিলেন তথ্যের প্রধান উৎস এবং জনমত গঠনের কারিগর। ডিজিটাল যুগে সোশ্যাল মিডিয়ার দাপটে সেই একাধিপত্য ভেঙে গেছে। এখন সাধারণ মানুষ সরাসরি তাঁর ব্যক্তিগত মত প্রকাশ করতে পারে, যেখানে অনেক সময় পাণ্ডিত্যপূর্ণ তর্কের চেয়ে ‘ভাইরাল’ হওয়া বা চটকদার স্লোগান বা অর্ধসত্য কাল্পনিক ইতিহাস বেশি গুরুত্ব পায়।
ফলে বুদ্ধিজীবীদের সেই অভিভাবকসুলভ আসন আগের মতো অটুট নেই। আজকের বাংলার রাজনীতিতে আমরা আদর্শবাদ এবং বস্তুবাদী রাজনীতির এক প্রবল সংঘাত দেখতে পাচ্ছি। সত্তরের দশকে যে মেধাবী ছাত্ররা উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ ছেড়ে বাংলার গ্রামে বা রাজপথে বিপ্লব করতে নেমেছিলেন, বিশ্বায়নের যুগে সেই মেধার একটা বড় অংশ এখন বিদেশের বা ভিনরাজ্যের কর্পোরেট দুনিয়ায় থিতু। ফলে স্থানীয় রাজনীতিতে সেই মানের বুদ্ধিবৃত্তিক নেতৃত্বের এক শূন্যতা তৈরি হয়েছে। রাজনীতির ময়দানে ‘পেশিশক্তি’ ও ‘অর্থশক্তি’র প্রাধান্য বাড়ায় আদর্শবাদী ভদ্রলোক সমাজ আজ অনেকটাই কোণঠাসা।
সাম্প্রতিককালে দেখা গিয়েছে, বড় কোনও সামাজিক ইস্যুতে (যেমন আরজি কর কাণ্ড বা পরিবেশ আন্দোলন) কলকাতার সেই পুরনো মধ্যবিত্ত বা ভদ্রলোক সমাজ এবং ছাত্র সমাজ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে আজও বিপুল জনমত গঠন করতে পারে।
বিশ্বায়নের সমান্তরালে ভারতে এখন ধর্মীয় ও জাতিগত পরিচিতির রাজনীতি বা ‘আইডেন্টিটি পলিটিক্স’ প্রবল হয়ে উঠেছে। বাংলার রাজনীতি, যা একসময় মূলত ‘শ্রেণি সংগ্রাম’ বা ‘উন্নয়ন’- এর উপর ভিত্তি করে চলত, এখন সেখানে জাতপাত ও ধর্মের সমীকরণ ঢুকে পড়েছে। ভদ্রলোক রাজনীতির যে ‘ধর্মনিরপেক্ষ ও উদার’ ভাব ছিল, এই নতুন বাস্তবতায় সেটা আজ চ্যালেঞ্জের মুখে। তথাকথিত ‘ভদ্রলোক’ বৃত্তের বাইরে থাকা প্রান্তিক মধ্য এবং নিম্ন মেধার মানুষ এখন সরাসরি ক্ষমতায় অংশীদার হচ্ছে। এটা একদিকে যেমন গণতন্ত্রের জন্য ইতিবাচক, অন্যদিকে এর ফলে রাজনীতিতে আগের সেই ‘বৌদ্ধিক আভিজাত্য’ বা ‘এলিটিজম’ কমছে।
এখন রাজনীতি চলে পেশাদার পরামর্শদাতা বা পি আর (PR) এজেন্সির নির্দেশে। রাজনৈতিক আন্দোলন এখন আর শুধু স্বতঃস্ফূর্ত আবেগ নয়, আজ সেটা ডেটা অ্যানালিটিক্স এবং সোশ্যাল মিডিয়া ম্যানেজমেন্টের একটি অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে বাঙালির ‘প্রতিবাদের চেতনা’ আজও সুপ্ত রয়েছে, মরেনি। সাম্প্রতিককালে দেখা গিয়েছে, বড় কোনও সামাজিক ইস্যুতে (যেমন আরজি কর কাণ্ড বা পরিবেশ আন্দোলন) কলকাতার সেই পুরনো মধ্যবিত্ত বা ভদ্রলোক সমাজ এবং ছাত্র সমাজ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে আজও বিপুল জনমত গঠন করতে পারে।

পরিশেষে বলা যায়, ‘ভদ্রলোক’ রাজনীতির সেই ট্র্যাডিশনাল রূপ হয়তো আজ অনেকটা বদলেছে, আগে বাঙালি এমন অনেক বিষয় নিয়ে চর্চা করত যার কোনও তাৎক্ষণিক আর্থিক মূল্য নেই, যেমন কবিতা লেখা, থিয়েটার করা বা ঘণ্টার পর ঘণ্টা কফি হাউসে আড্ডা দেওয়া। কিন্তু আজকে ইঁদুরদৌড়ে ‘সময়ই অর্থ’, ফলে যেখানে রোজগার নেই, সেই জ্ঞান বা চর্চার প্রতি অনীহা তৈরি হচ্ছে, যা বাঙালির চিরচেনা সেই ‘মুক্তচিন্তার’ পরিসরকে ক্রমশ ছোট করে সংকটের মুখে ফেলেছে।
অর্থনৈতিক উন্নতির চাপে ভাষা, ইতিহাস বা দর্শনের মতো বিষয়গুলোর বদলে নতুন প্রজন্মের প্রযুক্তি বা ম্যানেজমেন্টের মতো বিষয়ের দিকে মধ্যবিত্ত বাঙালির ঝোঁক বাড়ছে। বাঙালির ঘরোয়া আড্ডার জায়গা দখল করে নিচ্ছে কর্পোরেট নেটওয়ার্কিং। ডিজিটাল যুগে বুদ্ধিবৃত্তিক নেতৃত্ব এখন আর ড্রয়িংরুমের আড্ডায় সীমাবদ্ধ নেই, তা ছড়িয়ে পড়েছে ফেসবুকের ওয়ালে বা ইউটিউব লাইভে। বিশ্বায়নের চাপে পড়ে বাংলার রাজনীতি এখন অনেক বেশি ‘ট্রানজ্যাকশনাল’ বা দেওয়া-নেওয়ার রাজনীতিতে পরিণত হয়েছে।
ভারতীয় সংবিধানে স্বীকৃত ২২টা ভাষার মধ্যে ১,৫০০ থেকে ২,০০০ বছরের বেশি প্রাচীন, স্বতন্ত্র ও সমৃদ্ধ সাহিত্যিক ঐতিহ্য রয়েছে এমন ১১টা ধ্রুপদী ভাষার মধ্যে অন্যতম হল বাংলা। এই ২২টা এবং ১১টার মধ্যে কোথাও কিন্তু হিন্দি ভাষার উল্লেখ নেই।
সাফল্যের খোঁজে বাঙালি এখন বিশ্বনাগরিক। কিন্তু এই প্রক্রিয়ায় অনেক সময় নিজস্ব ভাষা বা সংস্কৃতির প্রতি এক ধরনের হীনম্মন্যতা বা উদাসীনতা তৈরি হয়। লক্ষ্য করে দেখেছি অনেক প্রবাসী বন্ধু বা আত্মীয়দের। তাঁদের নতুন প্রজন্মের অনেকের মধ্যেই নিজের ভাষার চেয়ে ইংরেজি বা অন্য ভাষার প্রতি অধিক স্বাচ্ছন্দ্য, যা দীর্ঘমেয়াদে সাংস্কৃতিক সত্তাকে ভীষণভাবে দুর্বল করে দিচ্ছে। প্রবাসী দক্ষিণীরা অবশ্য বিদেশের মাটিতে বাস করেও তাঁদের আগামী প্রজন্মকে উইকেন্ডে মাতৃ ভাষায় তালিম দিয়ে তাঁদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ধরে রাখছে।
এই সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ধরে রাখতে হলে সবার আগে মাতৃভাষার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া ভীষণ জরুরি। ভারতীয় সংবিধানে স্বীকৃত ২২টা ভাষার মধ্যে ১,৫০০ থেকে ২,০০০ বছরের বেশি প্রাচীন, স্বতন্ত্র ও সমৃদ্ধ সাহিত্যিক ঐতিহ্য রয়েছে এমন ১১টা ধ্রুপদী ভাষার মধ্যে অন্যতম হল বাংলা। এই ২২টা এবং ১১টার মধ্যে কোথাও কিন্তু হিন্দি ভাষার উল্লেখ নেই।
আমার বিশ্বাস, অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী বাঙালি যদি তাঁর সাংস্কৃতিক পরিচয়কে না হারিয়ে তার ধরন বদলে দিয়ে বাংলা সিনেমা, গান বা সাহিত্য প্রকাশনা সংস্থাকে আধুনিক প্রযুক্তিতে সাজিয়ে তোলে, তাহলে সেই পরিচয় বিশ্ব দরবারে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি নতুন আঙ্গিকে স্বীকৃতি লাভ করবে।
ক্ষমতার বিরুদ্ধে বাঙালির ‘অভ্যাসগত সন্দেহ’
ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা হল বাঙালির রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার প্রতি চিরস্থায়ী অবিশ্বাসের মূল উৎস। দীর্ঘ ২০০ বছরের পরাধীনতা বাঙালির মনে এই ধারণা গেঁথে দিয়েছে যে— ‘ক্ষমতার স্বভাবই হল শোষণ’। ফলে রাষ্ট্রীয় আইন বা ব্যবস্থার প্রতি অন্ধ আনুগত্য দেখানোর বদলে তাকে যুক্তি দিয়ে বিচার করা এবং প্রয়োজনে তার বিরোধিতা করাকেই বাঙালি নাগরিক কর্তব্য বলে মনে করে।
নন্দীগ্রাম-সিঙ্গুরের মতো ঘটনায় বাঙালি আবারও ক্ষমতার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর স্বভাবের জানান দেয়। এই পরিস্থিতিতে সর্ব ভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেস এবং দলের নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ‘পরিবর্তন’-এর বার্তা নিয়ে ২০১১ সালে ক্ষমতায় আসেন।
স্বাধীনতার পরবর্তীতে পশ্চিমবঙ্গে দীর্ঘ সময় ধরে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস ক্ষমতায় ছিল (১৯৪৭–১৯৭৭)। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রশাসনিক দুর্নীতি, খাদ্য আন্দোলন (১৯৬০-এর দশক) এবং বেকারত্ব ও অর্থনৈতিক স্থবিরতার কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে অসন্তোষ বাড়তে থাকে। এর ফলস্বরূপ ১৯৭৭ সালে বামফ্রন্ট ক্ষমতায় আসে। এই পরিবর্তনকে শুধুমাত্র একটা রাজনৈতিক পরিবর্তন ভাবলে ভুল হবে, এই পরিবর্তন ছিল ক্ষমতাসীন শক্তির বিরুদ্ধে বাঙালির এক স্পষ্ট এবং জোরালো প্রতিক্রিয়া।
বামফ্রন্ট সরকার ক্ষমতায় এসে ভূমি সংস্কার ও পঞ্চায়েত ব্যবস্থা শক্তিশালী করার পদক্ষেপ নেয়। প্রথমদিকে এই নীতি ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করলেও দীর্ঘ ৩৪ বছরের শাসনে শিল্পহীনতা, কর্মসংস্থানের অভাব, প্রশাসনিক জড়তা, দলীয়করণের অভিযোগ মানুষের মধ্যে আবারও ক্ষমতার প্রতি সংশয় তৈরি করে। বিশেষত নন্দীগ্রাম-সিঙ্গুরের মতো ঘটনায় বাঙালি আবারও ক্ষমতার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর স্বভাবের জানান দেয়। এই পরিস্থিতিতে সর্ব ভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেস এবং দলের নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ‘পরিবর্তন’-এর বার্তা নিয়ে ২০১১ সালে ক্ষমতায় আসেন।

এই পরিবর্তন যতটা না কোনও একটা দলের জয় ছিল তার থেকেও বেশি ছিল ক্ষমতাসীন শক্তিকে দর্পচূর্ণ করার বাঙালির এক সম্মিলিত প্রয়াস। বাঙালির রাজনৈতিক আচরণের অন্যতম সিগনেচার বা গুরুত্বপূর্ণ দিক হল কেন্দ্রীয় শক্তির সঙ্গে সংঘাত। কংগ্রেস আমলে বামেদের কেন্দ্র-বিরোধী আন্দোলন। বাম আমলে কেন্দ্রীয় বঞ্চনার অভিযোগ। বর্তমান সময়ে তৃণমূল সরকারের সঙ্গে কেন্দ্রের ধারাবাহিক সংঘাত। এই প্রবণতা প্রমাণ করে যে, বাঙালি ভোটাররা এমন এক আঞ্চলিক বা রাজনৈতিক সত্তাকে পছন্দ করে যারা দিল্লির ক্ষমতার সামনে মাথা নত না করে ‘বাংলার অধিকার’ নিয়ে সওয়াল করতে পারে।
বাঙালির এই সদা-সতর্ক এবং প্রশ্ন করার মানসিকতা রাজনীতিতে দুটো বিপরীতধর্মী প্রভাব রয়েছে। যেমন বাঙালির সহজাত প্রশ্ন করার অভ্যাস যে কোনও শাসকগোষ্ঠীকে জবাবদিহির গণ্ডির মধ্যে রাখে। ক্ষমতার দম্ভকে চ্যালেঞ্জ করার এই সংস্কৃতি গণতন্ত্রকে সজীব রাখে। দ্বিতীয়ত, একঘেয়েমি বা একাধিপত্য বাঙালিরা কোনও কালেই পছন্দ করেনি। ফলে নতুন কোনও রাজনৈতিক ধারা বা তরুণ নেতৃত্ব উঠে আসার জন্য একটা উর্বর জমি সবসময় প্রস্তুত থাকে। কোনও নীতি চাপিয়ে দিলে তা মুখ বুজে সহ্য না করে তার ভাল-মন্দ বিচার করার যে বৌদ্ধিক ক্ষমতা বাঙালির আছে, তা অনেক উন্নত দেশেও বিরল। আবার, নেতিবাচক দিক হল অতিরিক্ত ‘আন্দোলনমুখী’ রাজনীতির কারণে অনেক সময় বড় পরিকাঠামো প্রকল্প বা শিল্পায়ন ধাক্কা খায়।
বাঙালির এই ‘সদা-সতর্ক’ থাকাটা আসলে এক ধরনের বৌদ্ধিক বিলাসিতা এবং একইসঙ্গে নাগরিক অধিকারের সংমিশ্রণ। চ্যালেঞ্জটা হল— কীভাবে এই তীক্ষ্ণ বিচারবুদ্ধিকে ধ্বংসাত্মক বিরোধিতা থেকে সরিয়ে গঠনমূলক এবং উন্নয়নমুখী বিতর্কে রূপান্তরিত করা যায়।
ধর্মঘট বা বিক্ষোভের সংস্কৃতি অর্থনৈতিক গতিকে শ্লথ করে দেয়। অতি-রাজনীতি অনেক সময় ব্যক্তিগত সম্পর্কের উর্ধ্বে চলে যায়, যা সামাজিক সংহতি নষ্ট করে। পাড়ায় বা ক্লাবেও অনেক সময় রাজনৈতিক রং লেগে যাওয়ায় ঐক্য বিঘ্নিত হয়। পুঁজি সবসময় স্থিরতা বা ‘স্টেবিলিটি’ খোঁজে। ঘনঘন প্রশাসনিক নীতি পরিবর্তন বা রাজনৈতিক অস্থিরতা থাকলে বড় শিল্পগোষ্ঠী বিনিয়োগ করতে দ্বিধাবোধ করে, যা দীর্ঘমেয়াদে কর্মসংস্থানের ক্ষতি করে।
বাঙালির এই ‘সদা-সতর্ক’ থাকাটা আসলে এক ধরনের বৌদ্ধিক বিলাসিতা এবং একইসঙ্গে নাগরিক অধিকারের সংমিশ্রণ। চ্যালেঞ্জটা হল— কীভাবে এই তীক্ষ্ণ বিচারবুদ্ধিকে ধ্বংসাত্মক বিরোধিতা থেকে সরিয়ে গঠনমূলক এবং উন্নয়নমুখী বিতর্কে রূপান্তরিত করা যায়। পরিশেষে বলতেই হয়, বাংলার রাজনীতি মূলত এক ‘চলমান সমালোচনার ক্ষেত্র’। এখানে ক্ষমতা শুধু আদেশ দেওয়ার জন্য নয়, বরং তাকে প্রতি মুহূর্তে জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে হয়। এই ‘ভদ্রলোক’ সমাজ এবং সাধারণ মানুষের সম্মিলিত প্রতিরোধ-স্পৃহা বাংলাকে ভারতের মানচিত্রে এক অনন্য ‘চিন্তাশীল রাজনৈতিক জাতি’’ হিসেবে চিহ্নিত করে।
সমাপ্ত
তথ্যসূত্র
‘The Partitions of Memory: The Afterlife of the Division of India’ সুবীর কৌল সম্পাদিত।
প্রান্তিক মানব: পশ্চিমবঙ্গের শরণার্থী এবং বাম রাজনৈতিক লক্ষণ । প্রফুল্ল চক্রবর্তী,
১৯৫৯ সালের খাদ্য আন্দোলন: পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাসের এক সন্ধিক্ষণের দলিল। সুরঞ্জন দাস, এবং পি কে বন্দ্যোপাধ্যায়।
https://pagefournews.com/foodmovement_1966_shibnath_choudhury/ শিবনাথ চৌধুরী
https://matricula.co.in/chapter/%E0%A6%AC%E0%A6%BE%E0%A6%82%E0%A6%B2%E0%A6%BE%E0%A6%B0-%E0%A6%A8%E0%A6%AC%E0%A6%9C%E0%A6%BE%E0%A6%97%E0%A6%B0%E0%A6%A3-%E0%A6%8F%E0%A6%B0-%E0%A6%9A%E0%A6%B0%E0%A6%BF%E0%A6%A4%E0%A7%8D%E0%A6%B0/
https://archive.roar.media/bangla/main/history/calcutta-tram-a-testimony-of-one-paisa-price-hike-and-change-in-politics
https://www.sahapedia.org/calcutta-1950s-and-1970s-what-made-it-hotbed-rebellions
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত