(WB Political History)
পশ্চিমবাংলা একটানা দীর্ঘ সময় ধরে কেন্দ্র বিরোধী রাজ্য এবং রাজনৈতিক শক্তির ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। এই সত্যিটা বাস্তবায়িত হয়েছে শুধুমাত্র বাংলার রাজনৈতিক কারণে, এমনটা ভাবা ঠিক হবে না। তার সঙ্গে কাজ করেছে বাংলার নিজস্ব ঐতিহাসিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক বিষয়ের সমন্বয়।
নবজাগরণে বাঙালির প্রশ্নমুখী চিন্তার উদয়
বাংলার নবজাগরণ (১৯শ-২০শ শতক) ছিল ব্রিটিশ শাসনামলে শিক্ষিত বাঙালি সমাজে পাশ্চাত্য শিক্ষা, যুক্তিবাদী চিন্তা এবং সামাজিক সংস্কারের এক গভীর প্রজ্ঞার জাগরণ। রাজা রামমোহন রায়, বিদ্যাসাগর, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং ইয়ং বেঙ্গল আন্দোলনের মাধ্যমে ডিরোজিও কুসংস্কার ও অন্ধবিশ্বাস ত্যাগ করে যুক্তিবাদী চিন্তাধারার প্রসার ঘটান। এইসময় ইংরেজি শিক্ষার প্রসারে পাশ্চাত্য দর্শন, বিজ্ঞান এবং মানবিক মূল্যবোধের সঙ্গে বাঙালির পরিচয় ঘটে, যা চিন্তার আধুনিকায়ন ঘটায়। যার দরুণ তাঁরা সতীদাহ, বাল্যবিবাহ ও কঠোর জাতিভেদ সামাজিক কুপ্রথা দূর করে নারীদের শিক্ষার ও অধিকারের সপক্ষে জনমত গড়ে তোলেন।
আরও পড়ুন: দেশভাগ, মধুবালা ও মুঘল-এ-আজম
পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রবর্তনের ফলে বিজ্ঞান, দর্শন ও সাহিত্যের নতুন ধারণা প্রচারিত হয়। যা শিক্ষিত বাঙালিদের মধ্যে যুক্তিবাদ ও সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনার জন্ম দেয়। ফরাসি বিপ্লব, দার্শনিক টমাস পেইন, ভলতেয়ার ও রুসোর দর্শনের বৈপ্লবিক চিন্তাধারায় অনুপ্রাণিত হয়ে গড়ে ওঠে, তরুণদের মুক্তচিন্তার নেতৃত্ব দিয়েছিলেন হিন্দু কলেজের অধ্যাপক হেনরি ভিভিয়ান ডিরোজিও।
তাঁর অনুসারীদের পরিচালিত ‘ইয়ং বেঙ্গল’ বা ‘নব্যবঙ্গ’ আন্দোলন ছিল বাংলা তথা ভারতের ইতিহাসে প্রথম উগ্র-প্রগতিশীল ও যুক্তিবাদী সংস্কার আন্দোলন। যার মূল লক্ষ্য ছিল হিন্দুদের কঠোর বর্ণভেদ, বহু বিবাহ, ব্যাভিচার, খাদ্যের বাছবিচার, হিন্দুশাস্ত্রের অন্ধবিশ্বাস, মহিলাদের উপর আরোপিত নানান বিধিনিষেধ, প্রাচীন শাস্ত্র নির্ভর শিক্ষা ব্যবস্থা, মূর্তি পুজো পরিহার করে যুক্তিবাদ ও বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে সমাজ গঠন করা। “ইয়ং বেঙ্গল” আন্দোলনই বাংলার রেনেসাঁ বা নবজাগরণের ভিত্তি তৈরি করেছিল।

একইভাবে রামমোহন রায় ও দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতো চিন্তাবিদরা ব্রাহ্ম সমাজের মতো নতুন ধর্মীয় সংগঠনকে ধর্মীয় রীতিনীতিকে আধুনিক ও যুক্তিসঙ্গত, এবং প্রতিমাপূজা প্রত্যাখ্যান করে একেশ্বরবাদের প্রচার করেছিলেন। অন্য দিকে, বাংলা ভাষায় মাইকেল মধুসূদন দত্ত, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতো ব্যক্তিত্বের দ্বারা নতুন সাহিত্য আঙ্গিকের আধুনিকীকরণের মাধ্যমে সূচনা হয় বাংলা গদ্য ও পদ্যের নতুন যুগ।
এই সময়কালেই কলকাতায় হিন্দু কলেজ (বর্তমানে প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়), এশিয়াটিক সোসাইটি, এবং বিভিন্ন পত্রপত্রিকা (সমাচার দর্পণ) বাঙালির বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা শুরু হওয়ার দরুণ ভারতীয় জাতীয়তাবাদী চিন্তা এবং ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে ওঠে। যাকে শুধুই সাংস্কৃতিক পুনরুজ্জীবন না বলে, আধুনিক বাঙালি পরিচয় নির্মাণের প্রক্রিয়া বলা শ্রেয়। উনিশ শতকের বাংলার নবজাগরণের মূল মন্ত্রই ছিল “প্রতিবাদ”, “প্রশ্ন” এবং প্রতিষ্ঠিত ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ করা। এই আন্দোলন শুধু বাঙালির সংস্কৃতিকে ঋদ্ধ করেনি, বরং ভারতীয় সমাজের মূলধারায় আমূল পরিবর্তন এনেছিল। কুসংস্কার ত্যাগ করে যুক্তিবাদী মানুষ হয়ে ওঠার এই যে প্রক্রিয়া, তা আজও আমাদের আধুনিকমনস্কতার প্রধান অনুপ্রেরণা।
ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে বাংলার সংগ্রাম
বাংলার রাজনৈতিক সংস্কৃতির মূলে রয়েছে উনিশ শতকের নবজাগরণের সেই বুদ্ধিবৃত্তিক চেতনা, যা বাঙালিকে প্রশ্ন করতে শিখিয়েছিল। আধুনিক শিক্ষা, যুক্তিবাদ এবং সামাজিক সংস্কারের মাধ্যমে যে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণির উত্থান ঘটেছিল, তাঁদের হাত ধরেই বাংলার মাটিতে রোপিত হয় ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের বীজ। সেটা শুধু ক্ষমতার পরিবর্তন ছিল না, বরং ছিল এক গভীর রাজনৈতিক ও সামাজিক রূপান্তর।
১৯০৫ সালে তৎকালীন ভাইসরয় লর্ড কার্জন বাংলাকে বিভক্ত করার সিদ্ধান্ত নিলে বাঙালিরা ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়। ৭ই আগস্ট, কলকাতার টাউন হলে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বদেশি আন্দোলনের সূচনা হয় এবং এই আন্দোলনের ফলেই ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ করা সম্ভব হয়েছিল। স্বদেশি আন্দোলনের প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল বিদেশি পণ্য বয়কট, দেশীয় শিল্পের প্রসার, ছাত্র ও যুবকদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ ব্যাপক জনসমাবেশ ও রাজনৈতিক সভা।

বঙ্গভঙ্গ ছিল “ব্রিটিশ সিদ্ধান্ত”, তার বিরুদ্ধে “স্বদেশি আন্দোলন” ছিল বাঙালির তীব্র প্রতিরোধ। এই ঐতিহ্যের ফলে কেন্দ্রীয় ক্ষমতার বিরুদ্ধে প্রশ্ন তোলা বা প্রতিবাদ করার সংস্কৃতি বাংলার রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে সেই সময় থেকেই গেঁথে যায়।
ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে যে বাংলার ভূমিকা ছিল সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ, সে সম্পর্কে উল্লেখ রয়েছে আধুনিক ভারতের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ইতিহাস বিশেষজ্ঞ শ্রী বিপন চন্দ্রের “India’s Struggle for Independence” গ্রন্থে। সেখানে তিনি লিখেছেন, এই স্বদেশি আন্দোলন ভারতের প্রথম বৃহৎ গণভিত্তিক রাজনৈতিক আন্দোলন।
বাংলার ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে একক অধ্যায় নয়, এই আন্দোলন বাংলার রাজনৈতিক সংস্কৃতির মৌলিক চরিত্র গঠনে ভীষণভাবে সাহায্য করেছে। নবজাগরণের বুদ্ধিবৃত্তিক চেতনা, বঙ্গভঙ্গবিরোধী গণআন্দোলন, বিপ্লবী সংগঠনের কার্যকলাপ এবং নেতাজীর নেতৃত্ব, এইসব মিলিয়ে বাংলায় এক শক্তিশালী প্রতিবাদী রাজনৈতিক ঐতিহ্য তৈরি হয়। এই শক্তিশালী প্রতিবাদী ঐতিহ্য ব্রিটিশ আমলেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে বাংলায় বামপন্থী রাজনীতির উত্থান, ছাত্র আন্দোলন এবং বিভিন্ন সামাজিক সংগ্রামের মধ্যেও এই “চ্যালেঞ্জ করার” মানসিকতা প্রতিফলিত হয়েছে। নবজাগরণের সেই যুক্তিবাদী ও প্রগতিশীল চিন্তা আজও বাংলার মানুষকে যে কোনও অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে উদ্বুদ্ধ করে।
বাংলার নবজাগরণ শুধু সমাজ সংস্কারের মধ্যে থেমে না থেকে জন্ম দিয়েছিল এক বিদ্রোহী সত্তার। বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে আজকের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পর্যন্ত, বাংলার লড়াকু ঐতিহ্য ভারতের ইতিহাসে এক অনন্য উদাহরণ। আধুনিক বাঙালি পরিচয় মানেই হল সেই চেতনা, যা মাথা নত না করে সত্যের সপক্ষে প্রশ্ন তুলতে জানে। কেন্দ্রীয় ক্ষমতার বিরুদ্ধে প্রশ্ন তোলা আজও বাংলার রাজনৈতিক সংস্কৃতির এক গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য, যার সঙ্গে ভারতের অন্য কোনও প্রদেশের কোনওরকম সামঞ্জস্য নেই।

ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে লড়াই করে আন্দামানের সেলুলার জেলে মোট ৫৮৫ জন ভারতীয় রাজনৈতিক বন্দিদের মধ্যে বাঙালি ছিলেন ৩৯৮জন, এই সংখ্যাটাই উপরিউক্ত তথ্যের সত্যতা প্রমাণের জন্য যথেষ্ট নয় কি?
যুদ্ধ ও দুর্ভিক্ষ-এর বাঙালির সম্মিলিত অভিজ্ঞতা
বাংলার রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক সচেতনতা পাঠ্য বই পড়ে অর্জিত হয়নি, বাঙালি এটা অর্জন করেছে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে, পর্তুগিজ, ওলন্দাজ, ফরাসি, ব্রিটিশ উপনিবেশবাদের প্রত্যক্ষ করার অভিজ্ঞতা থেকে। বাঙালির কাছে ‘যুদ্ধ’ মানে সীমান্তে দুই সৈন্যদলের লড়াই নয়, বরং যুদ্ধ মানে রাষ্ট্রের ব্যর্থতা এবং সাধারণ মানুষের চরম দুর্ভোগ। ভারতের অন্যান্য শহরে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ একটা দূরবর্তী ইতিহাস হলেও, কলকাতার কাছে সেটাই ছিল আকাশ থেকে পড়া জীবন্ত বিভীষিকা।
১৯৪২ থেকে ১৯৪৪ সালের মধ্যে ভারতের বড় শহরগুলোর মধ্যে একমাত্র কলকাতা সরাসরি বিশ্বযুদ্ধের রোষানলে পড়ে। খিদিরপুর ডকইয়ার্ড থেকে হাতিবাগান, জাপানি বিমানবাহিনীর বোমাবর্ষণে প্রকম্পিত হয়েছিল বাংলার মাটি। যুদ্ধের সেই ধ্বংসলীলা বাঙালি সমাজকে শিখিয়েছিল যে, আন্তর্জাতিক রাজনীতির দাবার ঘুঁটি হিসেবে সাধারণ মানুষের জীবন কতটা সস্তা হতে পারে।
১৯৪২-এর জানুয়ারিতে জাপানি সেনাবাহিনী যখন থাইল্যান্ড থেকে বাংলার দোরগোড়ায় বার্মা (বর্তমান মায়ানমার)-য় পৌঁছোতেই ব্রিটিশ সরকার আতঙ্কিত হয়ে ওঠে। তাঁদের মনে হয়েছিল জাপানি সেনারা যদি বাংলা দখল নেয়, তাহলে তারা স্থানীয় সম্পদ ব্যবহার করে আরও শক্তিশালী হয়ে ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটাবে। এই সম্ভাবনা রুখতে তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার বাংলার মাটিতে ‘পোড়ামাটি নীতি’ বা ‘Scorched Earth Policy’ কার্যকর করে।

অত্যন্ত কঠোর ও বিধ্বংসী রণকৌশল এই ‘পোড়ামাটি নীতি’। যার মূল উদ্দেশ্য, কোনও এলাকা শত্রুপক্ষ দখল নেওয়ার আগেই সেখানের সব ধরণের সুযোগ সুবিধা ধ্বংস করে ফেলা। শত্রু এলাকায় পৌঁছে যেন কোনও খাবার, আশ্রয়, যানবাহন বা কোনও প্রয়োজনীয় সম্পদ ব্যবহার করতে না পারে। অর্থাৎ নিজের এলাকার সব সম্পদ পুড়িয়ে বা নষ্ট করে দিয়ে এলাকাকে সম্পূর্ণ “বন্ধ্যা ভূমিতে” পরিণত করা।
অবিভক্ত বাংলায় যাতায়াত ও পণ্য পরিবহন হত প্রধানত নৌকার মাধ্যমে জলপথ ধরে। জাপানিরা যাতে বাংলার জলপথে নৌকা ব্যবহার করতে না পারে, তাই তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার বাংলার কৃষকদের মজুত খাদ্যশস্যসহ হাজার হাজার নৌকা বাজেয়াপ্ত করে আগুন লাগিয়ে পুড়িয়ে দেয়। বিশেষ করে মেদিনীপুর এবং চব্বিশ পরগনার উপকূলীয় অঞ্চলে খাদ্যশস্যের সঙ্গে পশুসম্পদ এমনকি বহু রাস্তাঘাট, ছোট ব্রিজ, গুদামঘর পুড়িয়ে ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছিল।
১৮১২ সালে ২৪ জুন নিয়েমেন নদী পেরিয়ে নেপোলিয়ন তাঁর দলবল নিয়ে রাশিয়া আক্রমণ করে। ১৪ই সেপ্টেম্বর যখন তিনি মস্কোতে প্রবেশ করেন, তার আগেই রুশ বাহিনী সেই শহর জ্বালিয়ে সেখানকার মজুত খাদ্য এবং আশ্রয় স্থল ধ্বংস করে দেয়। চরম শীতের মধ্যে খাবারের অভাব, অসুখ এবং রুশ বাহিনীর অতর্কিত হামলায় প্রায় পাঁচ লক্ষেরও বেশি ফরাসি সৈন্য মারা যায়। যার ফলে অল্প সময়ের মধ্যেই (১৯ অক্টোবর ১৮১২) নেপোলিয়ন মস্কো ছাড়তে বাধ্য হন। এই ব্যর্থ অভিযানই ছিল নেপোলিয়ন সাম্রাজ্যের পতনের সূচনা।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ১৯৪১ সালে হিটলারের নাৎসি বাহিনীর “দ্রুত অগ্রগতি” ঠেকাতে সোভিয়েত ইউনিয়নের তৎকালীন রাষ্ট্রপ্রধান জোসেফ স্তালিন এই “পোড়ামাটি নীতি” পুনরায় প্রয়োগ করেছিলেন। নাৎসি বাহিনী এসে সে দেশের কোনও খাদ্য বা আশ্রয় স্থল ব্যবহার করতে পারার আগেই সেখানের গুরুত্বপূর্ণ ব্রিজ, রেললাইন এবং বিদ্যুৎ কেন্দ্র ধ্বংস করে কৃষিজমি, খাদ্য এবং বাড়িঘর পুড়িয়ে দেওয়া হয়। ফলে জার্মান বাহিনীর রসদ সরবরাহ ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়, অন্যদিকে রাশিয়া ও ইউক্রেনের তীব্র শীত জার্মানদের যুদ্ধের গতি শ্লথ করে দেয়। রেড আর্মির পাল্টা প্রতিরোধে হিটলারের সোভিয়েত দখলের পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়, এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন শেষ পর্যন্ত এই যুদ্ধে ঘুরে দাঁড়াতে সক্ষম হয়।

এই ‘পোড়ামাটি নীতি’র ফলে সরাসরি যুদ্ধের চেয়েও অনেক বেশি ক্ষতি হয়েছিল বাংলার। ঐতিহাসিকদের মতে ১৯৪৩ সালে বাংলায় ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের অন্যতম প্রধান কারণ ছিল এই অমানবিক ‘পোড়ামাটি নীতি’। এই নীতিতে সে সময় প্রায় ত্রিশ লক্ষ মানুষ প্রাণ হারায়। এই মৃত্যু সংখ্যা কোনও যুদ্ধের ময়দানের থেকে কোনও অংশে কম ছিল না। বাংলার মানুষের এই করুণ পরিণতি ভারতের অন্য কোনও প্রদেশে দেখা যায়নি। এই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটই বাঙালিকে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অন্ধ আনুগত্যের বদলে প্রশ্ন তুলতে, এবং কর্তৃপক্ষের ব্যর্থতাকে চ্যালেঞ্জ করতে শিখিয়েছে। যুদ্ধের সেই ক্ষত এবং পোড়ামাটি নীতির স্মৃতি আজও বাংলার রাজনৈতিক মনস্তত্ত্বে এক গভীর সচেতনতা হিসেবে টিকে আছে, যেখানে সাধারণ মানুষের জীবনই হল শ্রেষ্ঠ সম্পদ।
নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু ও জাতীয়তাবাদের চূড়ান্ত রূপ
বাংলা তথা ভারতের রাজনৈতিক ঐতিহ্যের সবচেয়ে শক্তিশালী এবং দীপ্যমান প্রতিনিধি হলেন নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু। ব্রিটিশদের আপসকামী নীতির বিপরীতে তিনি বেছে নিয়েছিলেন সশস্ত্র সংগ্রামের পথ। তাঁর প্রতিষ্ঠিত ‘আজাদ হিন্দ ফৌজ’ বা ‘আইএনএ’ ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামকে বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে নিয়ে যায়। যখন এই বাহিনী বার্মা সীমান্ত দিয়ে ভারতের মাটিতে পদার্পণ করে, তখন আপামর বাঙালির মনে এক অভূতপূর্ব আত্মবিশ্বাস জাগ্রত হয়। বাংলার বিপ্লবী ঐতিহ্য নেতাজীর রাজনৈতিক চিন্তাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল, একথা ঐতিহাসিক লিওনার্ড আব্রাহাম গর্ডন তাঁর “ব্রাদার্স এগেইনস্ট দ্য রাজ- অ্যা বায়োগ্রাফি অফ ইন্ডিয়ান ন্যাশনালিস্ট লিডারস”- এ স্পষ্ট ভাষায় উল্লেখ করেছেন।
ব্রিটিশদের বিভাজন নীতির বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ, স্বদেশি আন্দোলনে বিদেশি পণ্য বর্জন, শিল্প-সাহিত্য-রাজনীতিতে নিজস্বতার চর্চা বাঙালিদের মধ্যে জাতীয়তাবাদকে দৃঢ় করে তোলে। নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর “আজাদ হিন্দ ফৌজ” গঠন, “অনুশীলন সমিতি” এবং “যুগান্তর” দলের মতো সংগঠনগুলোর মাধ্যমে ব্রিটিশবিরোধী সশস্ত্র সংগ্রাম জাতীয়তাবাদের চরম রূপ ধারণ করে, সঙ্গে অবিভক্ত বাংলায় ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলন বা ‘তেভাগা’ আন্দোলনের মতো ঘটনা বাংলার সামাজিক ও রাজনৈতিক পটভূমিকে আরও জটিল করে তোলে।
বাংলার জাতীয়তাবাদের একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে এক ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিক অখণ্ডতার আকাঙ্ক্ষা। ১৯০৫ সালের সেই বঙ্গভঙ্গ বিরোধী ঐক্য থেকে শুরু করে নেতাজীর ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয়তাবাদ সর্বত্রই বাঙালিকে একটি স্বতন্ত্র চিন্তাধারার জাতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা ছিল। এই চেতনার মূলে ছিল সাংস্কৃতিক ঐক্য ও অভিন্ন ইতিহাসবোধ।

দুর্ভাগ্যবশত, ক্ষমতার রাজনীতি, মতাদর্শগত পার্থক্য এবং ব্রিটিশদের সুচতুর সাম্প্রদায়িক উসকানির ফলে বাংলার সেই গৌরবময় জাতীয়তাবাদী ঐতিহ্য পরবর্তীতে অনেকটাই ক্ষুণ্ণ হয়। দেশভাগের ক্ষত বাঙালির অখণ্ডতার স্বপ্নকে ভেঙে চুরমার করে দেয়।
তবে আজ অবধি বাঙালির রাজনৈতিক মনস্তত্ত্বে সেই প্রতিবাদী সত্তা, প্রশ্ন করার মানসিকতা এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির আকাঙ্ক্ষা এক অনন্য বৈশিষ্ট্য হিসেবে টিকে আছে। বাংলার এই দীর্ঘ লড়াই আমাদের শেখায় যে, জাতীয়তাবাদ একমাত্র ভূখণ্ডের ওপর ভিত্তি করে হয় নয়, সেটা গড়ে ওঠে ত্যাগ, সংস্কৃতি এবং অবিরাম সংগ্রামের মধ্য দিয়ে।
(ক্রমশ)
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত