(Kishore kumar Life)
এক মাথা চুল যা কাঁধ পর্যন্ত লতিয়ে পড়েছে আর তার সঙ্গে এক অদ্ভুত পোশাক— সাদা পাজামা আর কালো একটা ওভারকোট। গলায় মাফলার আর পায়ে চামড়ার চটি। ক্লাসরুম হোক বা হোস্টেল, যেখানেই যেতেন, এই অদ্ভুত পোশাকেই যেতেন। যার ফলে, তিনি যেখানেই যান না কেন, ভিড়ের মধ্যেও সহজেই চোখে পড়ে যান। পড়তেন ইন্দোরের ক্রিশ্চান কলেজে। সহপাঠীরা হাসাহাসি করত। তারা জিজ্ঞেস করত- ‘ওয়ে কিশোরিয়া, ইয়ে তু পাগলোঁ কি তরহ কপড়ে পেহেনকে কিউ ঘুমতা হ্যা?’
‘কিশোরিয়া’ নামটা কলেজে সবাই জেনেছিল অনুপের কাছে। কিশোরকুমারের মেজদাদা অনুপ কুমার গাঙ্গুলিও পড়তেন ওই একই কলেজে। মেজদা ভাইকে কিশোরিয়া বলে ডাকতেন, যার ফলে পোষাকি নাম আভাস কুমার গাঙ্গুলির চেয়েও বাড়ির ডাক ‘কিশোরিয়া’ বেশি জনপ্রিয় হয়ে গেল।
আরও পড়ুন: হলুদ জার্সি লাল কার্ড
যাই হোক, বন্ধুদের প্রশ্নের উত্তরে, খান্ডোয়ার কুঞ্জলাল গাঙ্গুলির সর্বকনিষ্ঠ পুত্র, বন্ধুদের বোঝানোর চেষ্টা করতেন যে, ওই কালো ওভারকোটটা নাকি তাঁর জন্য একেবারে “লাকি চার্ম”। ওটা খুললেই নাকি খারাপ কিছু হয়ে যাবে। তাই, কেউ ওভারকোট খুলতে বললেই তিনি নানারকম গল্প বানিয়ে ফেলতেন— কখনও বলতেন, ওটা খুললেই তিনি অসুস্থ হয়ে পড়বেন, কখনও বলতেন একবার ওটা খোলার ফলে দুর্ঘটনায় পড়েছেন, কখনও পরীক্ষায় ফেল করেছেন, আবার কখনও নাকি গুন্ডাদের হাতে মারও খেয়েছেন— এসব নানা কথা।
মূল কারণটা ছিল অন্য। আসলে ১৭ বছর বয়সী কিশোরকুমার ছিলেন খুবই রোগা। নিজের চেহারা নিয়ে সহপাঠীদের ঠাট্টা-তামাশার ভয়েই সবসময় ওভারকোট পরে থাকতেন। এর ফলে এমন অবস্থা হয়েছিল যে, হয়তো টানা কয়েকদিন স্নানই করতেন না। সপ্তাহে একবার, সেটাও গভীর রাতে— যখন নিশ্চিত হতেন হোস্টেলের সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে— তখন চুপিচুপি বাথরুমে যেতেন। তাড়াহুড়ো করে স্নান সেরে আবার দৌড়ে ফিরে আসতেন ঘরে, পরে ফেলতেন তাঁর সেই কালো ওভারকোট আর সাদা পাজামা। ওই পোষাকেই যেন স্বস্তি পেতেন।

একবার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেছিলেন, “আমার খুব ইচ্ছে ছিল কলেজের ফুটবল দলে খেলব। কিন্তু কেউ আমাকে সিরিয়াসলি নিত না। সবাই বলত, ‘আগে ওভারকোটটা খোলো, তারপর খেলবে’। তবে আমি তো সে কাজ করব না, তাই আমার ফুটবল খেলাও হত না । একদিন ভাগ্যক্রমে দলের একজন খেলোয়াড় অসুস্থ হয়ে পড়ল। দল পড়ল মহা মুশকিলে। কাকে খেলানো যায়? অধিনায়ক বাধ্য হয়ে আমাকে দলে নিল, এবং আমি ওভারকোট পরেই খেলব— সেই শর্তেও রাজি হল। উনি ভেবেছিলেন আমি হয়তো কিছুই করতে পারব না। কিন্তু উল্টোটা হল— কয়েক মিনিটের মধ্যেই সবাইকে অবাক করে কালো ওভারকোট আর সাদা পাজামা পরেই একটা গোল করে ফেললাম!” এরপর তিনি হেসে যোগ করেছিলেন, “অ্যাথলেটিক্সেও একই কাণ্ড। ট্র্যাক ইভেন্টে ওভারকোট পরেই নেমেছিলাম, আর পুরস্কারও জিতেছিলাম।”
এমনই মজার মানুষ ছিলেন কিশোরকুমার। পরবর্তী সময়েও— যখন খ্যাতির শীর্ষে— তখনও নানা মজার ঘটনা ঘটাতেন। কখনও লুঙ্গি আর পাঞ্জাবি পরে স্টুডিওতে হাজির হওয়া, কখনও দু-পায়ে দুটো আলাদা রঙের স্লিপার পরে বাড়ি থেকে বের হওয়া, কিম্বা অর্ধেক গোঁফ কামিয়ে শুটিং ফ্লোরে হাজির হওয়া, এমনকি শুটিংয়ের সময় হঠাৎ মাথা কামিয়ে ফেলা— এসবও করেছেন নানা সময়। সব সময় এমন কিছু করতেন যা দেখে আশেপাশের লোক চমকে যেত। একদম আলাদা ধাঁচের, এক অদ্ভুত কিন্তু ভীষণ সরল একজন মানুষ ছিলেন তিনি।
মাস্টার ভিট্টল কিংবা রাজা স্যান্ডোর মতো দাপুটে নায়কেরা একাই অনায়াসে ডজন ডজন খলনায়ককে কাবু করে ফেলতেন। ফলে অশোক কুমারের ছবি নিয়ে তাঁর বন্ধুদের প্রত্যাশা ছিল ঠিক তেমনই।
পরিবারে তাঁর দাদা অশোক কুমার প্রথম খ্যাতি অর্জন করেছিলেন, এবং বোম্বেতে (অধুনা মুম্বাই) গিয়ে ফিল্ম জগতে গায়ক-অভিনেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলেন। তাঁর প্রথম ছবি ‘জীবন নৈয়া’ নিয়েও একটি মজার ঘটনা আছে। ছবিটি যখন কিশোরের ছেলেবেলার শহর খণ্ডোয়ায় মুক্তি পেল, তখন কিশোরের বয়স মাত্র সাত। দাদার প্রথম সিনেমা দেখানোর উৎসাহে তিনি ঠিক করলেন, পাড়ার সব বন্ধুদেরকে নিয়ে ফার্স্ট-ডে ফার্স্ট-শোর ছবিটি দেখতে যাবেন। নিজের খরচেই বন্ধুদের সিনেমা দেখানোর ব্যবস্থা করেছিলেন তিনি।
তবে সেই সময় ছেলেদের সিনেমা-রুচি গড়ে উঠেছিল মূলত স্টান্ট ছবির নায়কদের দেখে। তখনকার দিনে ‘’হান্টারওয়ালি’’, “মিস ফ্রন্টিয়ার মেল”, “হারিকেন হান্সা”— এই সব ছবি খুব চলত। মাস্টার ভিট্টল কিংবা রাজা স্যান্ডোর মতো দাপুটে নায়কেরা একাই অনায়াসে ডজন ডজন খলনায়ককে কাবু করে ফেলতেন। ফলে অশোক কুমারের ছবি নিয়ে তাঁর বন্ধুদের প্রত্যাশা ছিল ঠিক তেমনই।
কিন্তু ছবিটি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্নধরনের। পরে সেই ঘটনার কথা স্মরণ করে কিশোর কুমার বলেছিলেন, “তিন ঘণ্টা পরে আমার বন্ধুরা যখন হল থেকে বেরোল, তখন তাদের মুখে বিরক্তি আর ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট। সবাই গজগজ করছে, আর আমার দিকে এমনভাবে তাকাচ্ছে, যেন সমস্ত দোষ আমারই। আমি তাদের চোখ এড়িয়ে চলছিলাম। নিজেও ভীষণ অস্বস্তিতে ছিলাম। ছবিতে দাদাকে আমরা যে ধরনের লড়াকু নায়ক হিসেবে দেখতে চেয়েছিলাম, তিনি মোটেই তেমন নন, বরং ছিলেন অত্যন্ত কোমল ও সংবেদনশীল চরিত্র। এমনকি ছবির এক জায়গায় অন্য একটি চরিত্রের চড়ও চুপচাপ সহ্য করে নিলেন!”
সেই রাতেই কিশোর বোম্বেতে থাকা দাদা অশোক কুমারকে একটি চিঠি লিখেছিলেন। সেখানে তিনি পরামর্শ দিয়েছিলেন, পরের ছবিতে যেন দাদা অন্তত একটু ঘুষি-টুসি চালান। নইলে খণ্ডোয়ায় আর না ফেরাই ভাল! কারণ ‘জীবন নৈয়া’-র জন্য তাকে এবং তার বন্ধুদের নাকি প্রবল লজ্জার মুখে পড়তে হয়েছে।
পড়াশোনার ক্ষেত্রেও কিশোরের নিজস্ব এক অভিনব পদ্ধতি ছিল। পাঠ্য বইয়ের কঠিন বিষয়ও তিনি সুরে বেঁধে মুখস্থ করতেন। এমনকি শোনা যায়, অর্থনীতির জনসংখ্যা তত্ত্বও তাঁর কাছে নিছক একটি অধ্যায় ছিল না; সেটিও গানের ছন্দে রূপ দিয়ে গেয়ে গেয়ে মুখস্থ করতেন।
কিশোরকুমারের শৈশবের কথা বলতে গিয়ে অশোক কুমার একবার এক মজার স্মৃতিচারণ করেন। তিনি বলেছিলেন— ‘ছোটবেলায় কিশোরের গলা ছিল খুবই চড়া। সর্দিকাশি লেগেই থাকত বলে কথাও স্পষ্ট করে বলতে পারত না। কিন্তু গান গাওয়ার নেশা ছিল প্রবল। অবশ্য তখন তার গানকে ঠিক গান বলা যায় না, বরং অনেকটা চিৎকারের মতোই শোনাত। আমি নিজে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের তালিম নিয়েছিলাম এবং নিয়মিত গান গাইতাম। কিন্তু কিশোর যে একদিন গায়ক হবে, এমন কথা তখন স্বপ্নেও ভাবিনি। তবু জন্মদিনে তাকে একটি ছোট্ট হারমোনিয়াম উপহার দিয়েছিলাম। সেই হারমোনিয়াম বগলদাবা করে সে প্রায়ই বাড়ির ছাদে উঠে যেত। ঘণ্টার পর ঘণ্টা একা একা গান গাইত। নির্জনতা ওর খুব প্রিয় ছিল।
আরেকটি ব্যাপারে ও ছিল অসাধারণ— মানুষের গলা ও ভঙ্গি নকল করতে ওস্তাদ ছিল। বিশেষ করে কে. এল. সায়গলের প্রতি ছিল অগাধ ভক্তি। কেউ গান শোনাতে বললে কিশোর প্রথমেই জিজ্ঞেস করত, ‘কার গান শুনবেন?’ তারপর সেই অনুযায়ী পারিশ্রমিকও ঠিক করত! সায়গলের গান গাইতে হলে চার আনা, আর আমার গান হলে এক আনা। পরে অবশ্য সায়গলের ‘ফি’ বেড়ে দাঁড়ায় এক টাকা। তবে আমার গানের দর আর কখনও বাড়েনি— সেটা এক আনাতেই আটকে ছিল!’

কিশোরকুমারের কলেজজীবন ছিল সংক্ষিপ্ত, কিন্তু ঘটনাবহুল। তিনি কলেজের ডিগ্রি সম্পূর্ণ করতে পারেননি। মাত্র বছরখানেকের কিছু বেশি সময় ইন্দোরের ক্রিশ্চিয়ান কলেজে পড়াশোনা করার পরই শিক্ষাজীবনের আনুষ্ঠানিক পর্ব শেষ হয়ে যায়। বড় ভাই অশোক কুমার পরে স্মৃতিচারণ করে বলেন, “কিশোরের পড়াশোনায় কখনও তেমন মন বসেনি। বিশেষ করে অর্থনীতি বিষয়টি তাঁর কাছে ছিল অত্যন্ত নীরস।”
পড়াশোনার ক্ষেত্রেও কিশোরের নিজস্ব এক অভিনব পদ্ধতি ছিল। পাঠ্য বইয়ের কঠিন বিষয়ও তিনি সুরে বেঁধে মুখস্থ করতেন। এমনকি শোনা যায়, অর্থনীতির জনসংখ্যা তত্ত্বও তাঁর কাছে নিছক একটি অধ্যায় ছিল না; সেটিও গানের ছন্দে রূপ দিয়ে গেয়ে গেয়ে মুখস্থ করতেন। ক্লাস শেষে বন্ধুদের সামনে সেই গান গেয়ে তিনি যেমন নিজে আনন্দ পেতেন, তেমন অন্যদেরও মাতিয়ে রাখতেন। তখনই তাঁর মধ্যে শিল্পীসত্তার স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশ স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল।
কিছুদিন পর স্থানীয় সংবাদপত্রে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। সেখানে দাবি করা হয়, ইন্দোর ক্রিশ্চিয়ান কলেজের ছাত্রাবাস নাকি গভীর রাতের হইচই ও উচ্ছৃঙ্খলতায় শান্ত পরিবেশ হারিয়েছে। সংবাদটি হোস্টেলের কোনও ছাত্রই সংবাদমাধ্যমে পৌঁছে দিয়েছিলেন।
হোস্টেলে কিশোর ও তাঁর দাদা অনুপ কুমার— দু’জনেরই একটি করে হারমোনিয়াম ছিল। প্রতিদিন রাতের খাবারের পর তাদের হোস্টেল রুম ছোট্ট এক সঙ্গীতসভায় পরিণত হত। বিভিন্ন ঘরের ছাত্ররা এসে জড়ো হতেন। নানা রকমের গানবাজনা আর তাৎক্ষণিক কৌতুক— সব মিলিয়ে গভীর রাত পর্যন্ত চলত প্রাণখোলা আড্ডা।
স্বাভাবিকভাবেই, এত রাত পর্যন্ত চলা এই সঙ্গীত আসর সকলের ভাল লাগত না। যার ফলে কিছু ছাত্র কলেজ কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ করে যে, এই হইচই-এর জন্য তাদের পড়াশোনা ব্যাহত হচ্ছে। অভিযোগ পেয়ে একদিন রাতে তদন্ত করতে হোস্টেলের সুপারিনটেনডেন্ট এসে উপস্থিত হন। প্রথমে তিনি নিয়মরক্ষার খাতিরে ছাত্রদের সতর্ক করলেও, অল্পক্ষণেই গানের আকর্ষণে সেই আসরের একজন উৎসাহী শ্রোতা— এমনকি অংশগ্রহণকারী হয়ে ওঠেন। ফলে ছাত্রদের উৎসাহ আরও বেড়ে যায়, রাতের সঙ্গীতসভা আরও জমজমাট হতে থাকে।
কিছুদিন পর স্থানীয় সংবাদপত্রে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। সেখানে দাবি করা হয়, ইন্দোর ক্রিশ্চিয়ান কলেজের ছাত্রাবাস নাকি গভীর রাতের হইচই ও উচ্ছৃঙ্খলতায় শান্ত পরিবেশ হারিয়েছে। সংবাদটি হোস্টেলের কোনও ছাত্রই সংবাদমাধ্যমে পৌঁছে দিয়েছিলেন।
ঘটনাটি শেষ পর্যন্ত বোম্বেতেও পৌঁছে যায়। খবর শুনে অশোক কুমার অত্যন্ত বিরক্ত হন। তিনি খণ্ডোয়ায় বাবা-মাকে একটি দীর্ঘ চিঠি লিখে উদ্বেগ প্রকাশ করেন যে, কিশোর পড়াশোনার প্রতি সম্পূর্ণ উদাসীন হয়ে পড়েছে; তার সমস্ত মনোযোগ এখন গান আর বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে উচ্ছৃঙ্খল আড্ডায়।
মাত্র আঠারো বছর বয়সেই কিশোরের আত্মসম্মানবোধ ছিল বিস্ময়কর। তিনি বিশ্বাস করতেন, মানুষের সাফল্য নিজের যোগ্যতায় অর্জিত হওয়া উচিত, অন্যের প্রভাব বা পরিচয়ের জোরে নয়। বাবা-মাকেও তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন, বড় ভাইয়ের আশ্রয়ে থাকবেন ঠিকই, কিন্তু নিজের কর্মজীবনের পথ নিজেই তৈরি করবেন।
বাবা-মাও ইতোমধ্যে কিশোরের নানা কীর্তিকলাপের কথা শুনছিলেন, ফলে তাঁরাও উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। বড় ছেলে অশোককে খণ্ডোয়ায় ডেকে পাঠানো হয় এবং কিশোরের অনুপস্থিতিতেই পরিবারের প্রবীণ সদস্যরা একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেন। কলেজে সময় নষ্ট না করে তাঁকে বোম্বে পাঠানো হবে। সেখানে দাদার সহযোগিতায় চলচ্চিত্র জগতে নিজের ভাগ্য পরীক্ষা করার সুযোগ অন্তত থাকবে।
এই সিদ্ধান্তের কথা শুনে কিশোর আপত্তি তো করলেনই না, বরং উৎসাহের সঙ্গে তা গ্রহণ করলেন। তবে শুরুতেই দুটি শর্ত জানিয়ে দিলেন। প্রথমত, তিনি বড় ভাই অশোক কুমারের পথ অনুসরণ করে চলবেন না। দ্বিতীয়ত, তাঁর জন্য অশোক কুমার যেন কখনও কারও কাছে সুপারিশ না করেন বা কাজের ব্যবস্থা করে দেওয়ার চেষ্টা না করেন। তিনি যা করবেন, সেটা নিজের প্রচেষ্টায় করবেন।

মাত্র আঠারো বছর বয়সেই কিশোরের আত্মসম্মানবোধ ছিল বিস্ময়কর। তিনি বিশ্বাস করতেন, মানুষের সাফল্য নিজের যোগ্যতায় অর্জিত হওয়া উচিত, অন্যের প্রভাব বা পরিচয়ের জোরে নয়। বাবা-মাকেও তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন, বড় ভাইয়ের আশ্রয়ে থাকবেন ঠিকই, কিন্তু নিজের কর্মজীবনের পথ নিজেই তৈরি করবেন।
তবে মনের গভীরে একটি ইচ্ছা তিনি লালন করতেন। সুযোগ এলে একদিন বড়দা যেন তাঁর শৈশবের আরাধ্য শিল্পী, কিংবদন্তি অভিনেতা-গায়ক কুন্দনলাল সায়গলের সঙ্গে তাঁর পরিচয় করিয়ে দেন।
পর্দায় কিশোরকুমার-এর অভিনয় ছিল তাঁর বাস্তব জীবনেরই প্রতিচ্ছবি। কখনও তিনি দারুণ হাস্যরসিক, কখনও গম্ভীর— কিন্তু সব সময়ই প্রাণচঞ্চল, উচ্ছ্বসিত এবং স্বতঃস্ফূর্ত।
বোম্বেতে এসে অশোক কুমারও ভাইয়ের ইচ্ছাকে সম্মান করেছিলেন। দুই ভাই একই বাড়িতে থাকলেও বাইরে তাঁদের সচরাচর একসঙ্গে দেখা যেত না। কিশোর নিজেই তা চাইতেন। কারণ, তিনি চাননি কেউ কখনও বলুক যে, অশোক কুমারের প্রভাবেই তিনি চলচ্চিত্রজগতে প্রবেশের সুযোগ পেয়েছেন। ওইরকম আমুদে মানুষটার গভীরে যে এক সিরিয়াস কিশোরকুমারও বাস করত সেটা ভাবতে অবাক লাগে! আর তাই বুঝি আমরা তার কণ্ঠে নানা রঙের গান পেয়েছি- তাঁকে কোনওদিন “স্ট্যাম্পড” করা যায়নি।
পর্দায় কিশোরকুমার-এর অভিনয় ছিল তাঁর বাস্তব জীবনেরই প্রতিচ্ছবি। কখনও তিনি দারুণ হাস্যরসিক, কখনও গম্ভীর— কিন্তু সব সময়ই প্রাণচঞ্চল, উচ্ছ্বসিত এবং স্বতঃস্ফূর্ত।
১৯৫৭ সালে ‘মুসাফির’ ছবিতে কিশোরকুমারকে প্রথমবার পরিচালনা করেছিলেন হৃষিকেশ মুখোপাধ্যায়। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি বুঝে গিয়েছিলেন, কিশোরকে অন্য অভিনেতাদের মতো নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। হৃষিকেশবাবুর কথায়, “কিশোর যদি নিজে থেকে অভিনয় করতে না চায়, তাহলে তাকে জোর করে কোনও লাভ নেই। তাতে অভিনয় আরও খারাপ হবে। সে কখনও পুরোপুরি চিত্রনাট্য মেনে চলত না। তাকে জোর করলে নিষ্প্রাণ অভিনয় পাওয়া যেত। বরং তার স্বাভাবিক প্রতিভাকে কাজে লাগাতে হত। প্রয়োজনে দৃশ্য বা সংলাপও তার সুবিধামতো বদলে নিতে হত।”
এই মন্তব্যের পিছনে ছিল তাঁর নিজের বাস্তব অভিজ্ঞতা। যেমন, ১৯৭০ সালে ‘আনন্দ’ ছবির নামভূমিকায় অভিনয়ের জন্য হৃষিকেশ মুখোপাধ্যায়ের প্রথম পছন্দ ছিলেন কিশোরকুমার। কারণ আনন্দ নামক চরিত্রের জন্য তিনি খুঁজছিলেন একজন প্রাণোচ্ছল অভিনেতা। শুটিং-এর জন্য সব ব্যবস্থা প্রস্তুত। কিন্তু নায়ক কিশোরকুমার হঠাৎ বেঁকে বসলেন। ক্যানসারে আক্রান্ত এক মৃত্যুপথযাত্রী মানুষের চরিত্রে অভিনয় করতে কিশোরকুমার রাজি নন। মহা সমস্যায় পড়লেন হৃষিকেশবাবু— কারণ তিনি তো চরিত্রটি কিশোরকে ভেবেই লিখেছিলেন!
‘মুসাফির’ ছবির শেষ দিনের শুটিংয়ে সবাই কিশোরের জন্য অপেক্ষা করছে, কিন্তু সে আর আসছে না। অপেক্ষা করে এক সময় বাধ্য হয়ে হৃষিকেশ তার বাড়িতে গিয়ে হাজির হলেন। গিয়ে দেখলেন, সে এক অবাক কান্ড! কিশোরকুমার পুরো মাথা কামিয়ে ফেলেছেন!
হৃষিকেশ মুখার্জি বুঝিয়ে সুঝিয়ে কোনওরকম রাজি তো করালেন তাঁকে, কিন্তু শুটিংয়ের প্রথম দিন কিশোরকুমার যা করলেন, সেটা যেন এক বজ্রপাত ঘটাল! তিনি হঠাৎ মাথা পুরো ন্যাড়া করে সেট-এ এসে হাজির হয়ে বললেন, “চলুন… আমি প্রস্তুত।”
নিজের নায়কের সেই অবস্থা দেখে হৃষিকেশ মুখোপাধ্যায়ের তো মাথায় হাত! আর কোনও উপায় রইল না। সেদিনের শুটিং বাতিল তো করতেই হল, এবং পরে সেই চরিত্রের প্রস্তাব যায় রাজেশ খান্নার কাছে, আর তিনিই ছবিতে অভিনয় করেন। তবে মজার বিষয়, এই ন্যাড়া মাথার কিশোরকে নিয়ে হৃষিকেশ মুখোপাধ্যায়কে এই প্রথম বিপাকে পড়তে হয়নি। এর আগেও এমনটা হয়েছে।

হৃষিকেশ তাঁর স্মৃতিচারণে আরেকটা ঘটনা বলেছিলেন। ‘মুসাফির’ ছবির শেষ দিনের শুটিংয়ে সবাই কিশোরের জন্য অপেক্ষা করছে, কিন্তু সে আর আসছে না। অপেক্ষা করে এক সময় বাধ্য হয়ে হৃষিকেশ তার বাড়িতে গিয়ে হাজির হলেন। গিয়ে দেখলেন, সে এক অবাক কান্ড! কিশোরকুমার পুরো মাথা কামিয়ে ফেলেছেন! আসলে তিনি তখনই মাদ্রাজে ‘মিস মেরি’ নামক একটি ছবির শুটিং সেরে ফিরেছেন। সেখানে নাকি পারিশ্রমিক নিয়ে প্রযোজকদের সঙ্গে তার ঝামেলা হয়েছিল। প্রতিবাদস্বরূপ তিনি নিজের মাথা ন্যাড়া করে ফেলেছেন। যদিও ওই ছবির ইউনিট তাকে কোনওরকম টুপি পরিয়ে অভিনয় করিয়েছিল, কিন্তু হৃষিকেশ-এর ছবিতে সেটা সম্ভব ছিল না। শেষ পর্যন্ত মেকআপ শিল্পী কোনওরকমে একটি পরচুলা তৈরি করলেন। সেই পরচুলা পরিয়েই ‘মুসাফির’-এর শেষ দৃশ্যগুলোর শুটিং শেষ করা হল। ছবির শেষের দৃশ্যগুলোতে কিশোরকে যে চুলে দেখা যায়, সেটি আসলে অস্থায়ী পরচুলা ছিল।
ভারতীয় চলচ্চিত্র ও সঙ্গীতজগতের ইতিহাসে কিশোরকুমার এক বিরল ব্যক্তিত্ব। তিনি শুধু একজন অসাধারণ গায়ক বা অভিনেতা ছিলেন না, ছিলেন এক বিস্ময়কর মানুষ। তাঁর জীবনকে যত বেশি জানা যায়, ততই স্পষ্ট হয় যে, বাইরের হাসিখুশি, দুষ্টুমি-ভরা মানুষটির অন্তরে বাস করত এক গভীর সংবেদনশীল, নিঃসঙ্গ এবং চিন্তাশীল শিল্পী।
মুম্বইয়ের চলচ্চিত্রশিল্পে সাফল্যের পাশাপাশি ছিল প্রবল প্রতিযোগিতা, অনিশ্চয়তা এবং মানসিক চাপ। কিশোরকুমার এই চাপকে নিজের উপর চেপে বসতে দেননি। বরং হাস্যরসকে ব্যবহার করেছিলেন মানসিক ভারসাম্য রক্ষার এক কার্যকর মাধ্যম হিসেবে।
কিশোরকুমারকে যাঁরা কাছ থেকে দেখেছেন, তাঁদের অধিকাংশই বলেছেন— রেকর্ডিং স্টুডিওতে ঢুকলেই যেন তিনি সম্পূর্ণ অন্য মানুষ হয়ে যেতেন। কাজের সময় ছিলেন অবিশ্বাস্য রকমের মনোযোগী। একটি শব্দের উচ্চারণ, একটি শ্বাস নেওয়ার মুহূর্ত, একটি আবেগের সূক্ষ্ম ওঠানামা— সবকিছু নিয়ে তিনি অত্যন্ত সচেতন ছিলেন। কিন্তু রেকর্ডিং শেষ হওয়ার পরই সেই গম্ভীর শিল্পী যেন মুহূর্তে রূপ নিতেন এক দুষ্টু, কৌতুকপ্রিয় মানুষে। তিনি সহকর্মীদের সঙ্গে রসিকতা করতেন, অদ্ভুত কাণ্ড ঘটাতেন, কখনও কখনও এমন আচরণ করতেন যে তাঁকে অনেকেই “খামখেয়ালি” বলে মনে করতেন।
বলা হয়, অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং সৃজনশীল মানুষের মধ্যে এই ধরনের বৈপরীত্য নাকি অস্বাভাবিক নয়। অনেক সৃজনশীল মানুষ তাঁদের গভীর আবেগ সরাসরি প্রকাশ করতে পারেন না। হাস্যরস, ব্যঙ্গ, অভিনয় বা কৌতুকের মাধ্যমে সেই আবেগকে অন্য রূপ দেন। কিশোরকুমারের ক্ষেত্রেও সম্ভবত তাই ঘটেছিল। তাঁর হাসি ছিল আনন্দের প্রকাশ, আবার অনেক সময় আত্মরক্ষার ঢালও।
তাঁর শৈশব ও পারিবারিক পরিবেশও এই ব্যক্তিত্ব গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল। দাদা অশোক কুমার ছিলেন প্রতিষ্ঠিত অভিনেতা, মার্জিত ও সংযত ব্যক্তিত্ব। সেই পরিবারের ছোট ছেলে হিসেবে কিশোর নিজের স্বতন্ত্র পরিচয় তৈরি করতে চেয়েছিলেন। তাই প্রচলিত নিয়ম ভেঙে নিজের আলাদা পথ তৈরি করেছিলেন। হয়তো তাঁর অদ্ভুত আচরণ অনেকাংশেই ছিল সমাজের তৈরি ছাঁচকে অস্বীকার করার এক অভিনব উপায়।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল, চলচ্চিত্রজগতের কঠিন বাস্তবতা। মুম্বইয়ের চলচ্চিত্রশিল্পে সাফল্যের পাশাপাশি ছিল প্রবল প্রতিযোগিতা, অনিশ্চয়তা এবং মানসিক চাপ। কিশোরকুমার এই চাপকে নিজের উপর চেপে বসতে দেননি। বরং হাস্যরসকে ব্যবহার করেছিলেন মানসিক ভারসাম্য রক্ষার এক কার্যকর মাধ্যম হিসেবে। সহকর্মীদেরও তিনি সেই হাসির জগতে টেনে আনতেন।
তিনি ছিলেন এক জটিল, সংবেদনশীল এবং সৃজনশীল মানুষ, যিনি হাসিকে নিজের মানসিক প্রতিরক্ষার ভাষা করে তুলেছিলেন। তিনি যতটা মানুষকে হাসিয়েছেন, ততটাই নিজের নিঃসঙ্গতাকে আড়াল করেছেন।
কিন্তু এটাও ঠিক যে, তাঁর জীবনের ব্যক্তিগত অধ্যায়গুলি ছিল অনেক বেশি জটিল। সম্পর্কের ভাঙন, একাধিক বিবাহ, প্রিয়জনের অসুস্থতা, আর্থিক সমস্যা এবং একাকিত্ব তাঁকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। আশ্চর্যের বিষয়, তিনি খুব কমই প্রকাশ্যে নিজের কষ্টের কথা বলেছেন। বরং গানেই সেই যন্ত্রণার প্রতিফলন বেশি দেখা যায়। “কোই হমদম না রহা”, “জিন্দগী কা সফর”, “দুখী মন মেরে” কিংবা “চিঙ্গারি কোই ভড়কে”— এই গানগুলিতে যে গভীর বিষণ্ণতা শোনা যায়, তা তাঁর অন্তর্জগতেরই এক ঝলক।
তাঁর খামখেয়ালিপনার আরেকটি দিক ছিল আত্মরক্ষা। বহু ঘটনার বর্ণনায় দেখা যায়, যাঁদের তিনি বিশ্বাস করতেন না বা যাঁদের সঙ্গে কাজ করতে চাইতেন না, তাঁদের দূরে রাখার জন্য তিনি ইচ্ছাকৃতভাবে অদ্ভুত আচরণ করতেন। ফলে অনেকেই তাঁকে “পাগলাটে” বলে এড়িয়ে যেতেন। বাস্তবে এটি ছিল তাঁর ব্যক্তিগত পরিসর রক্ষার কৌশল।

কিশোরকুমারের শিল্পীজীবনেও এই দ্বৈততা স্পষ্ট। একদিকে “এক চতুর নার” বা “খইকে পান বানারসওয়ালা”-র মতো প্রাণখোলা হাসির গান, অন্যদিকে “মুসাফির হুঁ ইয়ারোঁ”, “জিন্দগী কা সফর” বা “ইয়ে জীবন হ্যায়”-এর মতো দার্শনিক ও বিষণ্ণ সুর। একই কণ্ঠে এত বৈচিত্র্য সম্ভব হয়েছিল, কারণ তাঁর জীবনও ছিল বহু রঙে রাঙানো।
অনেকেই আবার মনে করেন, কিশোরকুমারের আচরণকে কেবল “খামখেয়ালিপনা” বলে ব্যাখ্যা করা যায় না। বরং তিনি ছিলেন এক জটিল, সংবেদনশীল এবং সৃজনশীল মানুষ, যিনি হাসিকে নিজের মানসিক প্রতিরক্ষার ভাষা করে তুলেছিলেন। তিনি যতটা মানুষকে হাসিয়েছেন, ততটাই নিজের নিঃসঙ্গতাকে আড়াল করেছেন।
এই কারণেই হয়তো কিশোরকুমারকে বোঝার জন্য শুধু তাঁর গান শোনা যথেষ্ট নয়; তাঁর নীরবতাকেও শুনতে হয়। তাঁর হাসির মধ্যে যেমন ছিল উচ্ছ্বাস, তেমনি ছিল বিপুল গোপনীয়তার মালিকানা। তাঁর কৌতুকের মধ্যে যেমন ছিল আনন্দ, তেমনি ছিল বেদনার ছায়া। সম্ভবত এই দ্বৈত সত্তাই তাঁকে ভারতীয় সঙ্গীত ও চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এক অনন্য, রহস্যময় এবং চিরকালীন শিল্পীতে পরিণত করেছে।
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত