(SD Burman Memoir)
সকাল থেকেই মনটা কেমন যেন বাউল বাতাসের মতো উচাটন হয়ে ছিল শচীনকর্তার। ভেতরের সুরটা কিছুতেই পর্দায় বাঁধতে পারছিলেন না। সামনের টেবিলে ধোঁয়া-ওঠা এক কাপ চা জুড়িয়ে জল, অথচ সেদিকে খেয়াল নেই। আর মাত্র ক’টা দিন, তারপরেই আবার সেই পশ্চিমের অচেনা সমুদ্রতীর— বম্বে। যাওয়ার আগে গুছিয়ে রেখে যেতে হবে অনেক কিছু। সবচেয়ে বড় দায়িত্ব, পুত্র পঞ্চমকে এবার স্কুলে ভর্তি করানো। সুরের দুনিয়ায় পা রাখার আগে ওর জীবনের একটা শক্ত ভিত তৈরি হওয়া চাই। সিদ্ধান্ত পাকা— আপাতত পঞ্চম তার মা মীরার কাছে এই কলকাতাতেই থাকবে।
ওদের জন্য একটা সুনির্দিষ্ট আশ্রয়ের ব্যবস্থাও এতদিনে তিনি করে উঠতে পেরেছেন। যাযাবর শিল্পীর দীর্ঘদিনের ভাড়াটে জীবনের চড়াই-উতরাই পেরিয়ে এবার মাথা গোঁজার নিজস্ব একটা ঠাঁই হয়েছে। দক্ষিণ কলকাতার ঢাকুরিয়া লেকের কোল ঘেঁষে এই শান্ত, ছায়াসুনিবিড় পাড়াটিকে প্রথম দর্শনেই বড় ভাল লেগে গিয়েছিল তাঁর। লেকের জলে আলোছায়ার লুকোচুরি, ভোরের শান্ত হাওয়া আর পাখিদের কলকাকলিতে কেমন যেন এক ধরনের স্বস্তি জড়িয়ে আছে— যা মুম্বইয়ের তীব্র যান্ত্রিক কোলাহলে বিরল।
আরও পড়ুন: ক্যামেরা থেকে মাইক্রোফোন- লতায় ঘেরা এক যাত্রাপথ
অথচ, বুকের গভীরের নির্জনতায় হাত রাখলে তিনি স্পষ্ট বুঝতে পারেন, এই ভালবাসার শহরকে কোনওদিনই ছাড়তে চাননি। কেনই বা চাইবেন? এই কলকাতা শহরই তো তাঁর পুনর্জন্মের তীর্থভূমি! এই শহর তাঁকে যেমন নির্মমভাবে ফিরিয়ে দিয়েছে, তেমনই পরমুহূর্তে দুই বাহু মেলে নিবিড় স্নেহে বুকে টেনে নিয়েছে। আজ তাঁর নামের আগে-পরে যেটুকু প্রতিষ্ঠা, যশ আর সুখ্যাতির দ্যুতি, তার প্রায় সবটুকুই তো এই তিলোত্তমার আশিসধন্য।
মাঝে মাঝে তিনি ভাবেন, মেঘনা আর গোমতীর পলিমাটি মাখা পায়ে এই শহরে পা না রাখলে তাঁর ভবিতব্য ঠিক কী হত? হয়তো সুদূর আগরতলার রাজপ্রাসাদের লালফিতের বাঁধনে কিংবা মহকুমার প্রশাসনিক নথিপত্রের আড়ালেই অপচয় হয়ে যেত বাকি জীবনটা। হয়তো বা গোধূলির ম্লান আলোয় রাজবাড়ির এক নির্জন অলিন্দে বসে কেবল শূন্যে মিলিয়ে যেত তাঁর বাঁশির উদাসী তান। অথচ এই কলকাতায় এসেই তিনি সুরের দিশা পেলেন, পেলেন দিকপাল সঙ্গীতগুরুদের দুর্লভ সান্নিধ্য। শুধু সুর নয়, এই শহরের শ্যামল প্রাঙ্গণেই তিনি খুঁজে পেয়েছিলেন তাঁর জীবনের মানবীকে, জীবনসঙ্গিনী মীরাকে। পেয়েছিলেন অজস্র অনুরাগীর নিঃশর্ত ভালবাসা।

তাই ভেতরের একটা চোরা কুঠুরিতে প্রচ্ছন্ন এক অপরাধবোধ কাঁটার মতো বিঁধছিল। তবে কি তিনি এই শহরকে প্রতারণা করছেন? কলকাতা কি ভাববে, তার বরপুত্র আজ তাকে ছেড়ে মুখ ফিরিয়ে চলে যাচ্ছে? কিন্তু নিয়তির এমন কিছু অলঙ্ঘ্য টান থাকে, যার বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাধ্য মানুষের নেই। অবশ্য অন্ধ নিয়তি বা ভাগ্যের খেলায় শচীন দেববর্মন কোনওদিনই খুব একটা বিশ্বাসী ছিলেন না। শেক্সপিয়রের সেই অবিস্মরণীয় উচ্চারণটি তাঁর মনের মণিকোঠায় সারাক্ষণ গুঞ্জরিত হত— “It is not in the stars to hold our destiny, but in ourselves.” আসলে শচীনকর্তা কোনও দৈবের ইঙ্গিতে নয়, বরং সাড়া দিচ্ছিলেন তাঁর নিজের শিল্পীসত্তার নিবিড়, অন্তর্গত এক তাগিদেই।
ইতিহাসের পাতায় তখন কালান্তকের পদধ্বনি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কালবৈশাখী ঝড়ে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের মানচিত্র তখন ওলটপালট। সেই অভিঘাতের কালো ছায়া ভারতবর্ষের পূর্বাঞ্চলীয় এই প্রাণকেন্দ্রের ওপরও পড়েছে। কলকাতার আকাশে তখন জাপানি যুদ্ধবিমানের গর্জন, ডক অঞ্চলে অতর্কিত বোমা হামলা— সব মিলিয়ে এক অভূতপূর্ব সন্ত্রাস। সাধারণ নাগরিক জীবন সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত, ব্যবসা-বাণিজ্যের চাকা শ্লথ, রাজনীতি ফুটন্ত কড়াইয়ের মতো টগবগ করছে। আর এই সামগ্রিক অস্থিরতার সর্বগ্রাসী ঢেউ এসে আছড়ে পড়েছিল কলকাতার সবে ডালপালা মেলা ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির ওপরও।
বোম্বাইয়ের বস্ত্রশিল্পের আকাশছোঁয়া বাড়বাড়ন্ত তখন পশ্চিম ও মধ্য ভারতের বিস্তীর্ণ অঞ্চল থেকে লক্ষ লক্ষ মানুষকে শহরের দিকে টানছিল। এই অভিবাসনের একটি সুদূরপ্রসারী প্রভাব গিয়ে পড়ল চলচ্চিত্রের দর্শককুল ও অর্থনীতির ওপর।
যে কলকাতা শহরটি একদিন নিঃশব্দে এদেশের চলচ্চিত্রের সূতিকাগার হয়ে উঠেছিল, নিউ থিয়েটার্সের হাত ধরে গোটা ভারতকে পথ দেখিয়েছিল; সেই শিল্পই ধীরে ধীরে যেন গঙ্গার মায়াবী কোল ছেড়ে আরব সাগরের তীরে নিজের আসন পাততে শুরু করল। এর পেছনে অবশ্য বাস্তবসম্মত একাধিক কার্যকারণ ছিল। যুদ্ধোত্তর পরিস্থিতিতে বম্বে তখন ব্যবসা-বাণিজ্যের বিপুল সমৃদ্ধিতে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছিল।
বিশেষ করে খিদিরপুর ডকে জাপানি বোমাবর্ষণের পর, বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের ক্ষেত্রে বোম্বাই বন্দর কলকাতার চেয়ে অনেক বেশি সুরক্ষিত এবং সুবিধাজনক বলে গণ্য হতে লাগল। ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক দিক থেকেও দেশের রাজধানী দিল্লির দূরত্ব কলকাতার তুলনায় বম্বের থেকে অনেক কম। তাছাড়া চলচ্চিত্রের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামাল, আধুনিক ক্যামেরা, শব্দগ্রহণের অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতির আমদানি-রপ্তানি— সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠল ওই বন্দরনগরী। প্রযোজক, পরিবেশক এবং হল-মালিক— সবার চোখেই বম্বে তখন নতুন যুগের স্বর্ণভূমি।

তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল যুদ্ধের বাজারের কালো টাকার বেপরোয়া অনুপ্রবেশ, যা সিনেমার মতো ঝুঁকিপূর্ণ ব্যবসায় ঢালতে পুঁজিদারদের কোনও দ্বিধা ছিল না। তার ওপর ছিল ভাষার সমীকরণ। তৎকালীন অবিভক্ত ভারতের বিশাল হিন্দিভাষী বলয়ের দর্শকদের কাছে পৌঁছনোর অসীম সম্ভাবনা বম্বের হাতেই ছিল সবচেয়ে বেশি। জলপথে বহির্বিশ্ব আর রেলপথে গোটা উপমহাদেশের সাথে যোগাযোগের নেটওয়ার্কে বম্বে তখন অপ্রতিদ্বন্দ্বী। দূরদর্শী শচীন স্পষ্ট উপলব্ধি করছিলেন— ভারতীয় চলচ্চিত্রের মূল স্রোতটি ক্রমশ তার বিষয়বস্তু ও ভাষার নিরিখে বৃহত্তর হিন্দি বলয়ের চাহিদাকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হতে চলেছে। কলকাতা সেই সর্বভারতীয় বাণিজ্যের রাশটা একটু একটু করে নিজের হাত থেকে হারিয়ে ফেলছিল।
এর পাশাপাশি ছিল এক সুবিশাল সামাজিক রূপান্তর। বোম্বাইয়ের বস্ত্রশিল্পের আকাশছোঁয়া বাড়বাড়ন্ত তখন পশ্চিম ও মধ্য ভারতের বিস্তীর্ণ অঞ্চল থেকে লক্ষ লক্ষ মানুষকে শহরের দিকে টানছিল। এই অভিবাসনের একটি সুদূরপ্রসারী প্রভাব গিয়ে পড়ল চলচ্চিত্রের দর্শককুল ও অর্থনীতির ওপর। কোঙ্কন, নাসিক, বেলগাঁও, সুরাট কিংবা আহমেদাবাদের মতো বহু অঞ্চলকে নিয়ে গঠিত তৎকালীন ‘বম্বে প্রেসিডেন্সি’ কেবল মারাঠি, গুজরাতি বা কোঙ্কনিদের মিলনমেলা ছিল না— উত্তর ভারতের এক বিশাল কর্মসন্ধানী মানুষের উপস্থিতির কারণে এই শহরের দৈনন্দিন যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম হয়ে উঠেছিল হিন্দুস্তানি— হিন্দি আর উর্দু। এই মিশ্র সাংস্কৃতিক স্রোতই বম্বের চলচ্চিত্রকে দিল এক সর্বভারতীয় গণচরিত্র, যার ফায়দা ওই শহর পুরোপুরি তুলে নিয়েছিল।
এই শহরই তো দেশকে দিয়েছিল রামমোহন, বিদ্যাসাগর, বঙ্কিমচন্দ্র, স্বামী বিবেকানন্দ, রবীন্দ্রনাথ আর কাজী নজরুলের মতো যুগপুরুষদের। যে আলোকোজ্জ্বল নবজাগরণ গোটা দেশের চিন্তাধারাকে নাড়িয়ে দিয়েছিল, তার আঁতুড়ঘর তো এই রাজপথগুলোই!
নদীর স্বভাবই তো এই— এক কূল সে নির্মমভাবে ভাঙে, আর অন্য কূলে গড়ে তোলে নতুন পলিমাটির চর। পদ্মাপাড়ের মাটির সুরকে বুকে লালন করা শচীনকর্তার চেয়ে এই সত্য আর কে-ই বা ভাল উপলব্ধি করবেন! বম্বের ঔদ্ধত্য আর প্রতিপত্তি যখন ডালপালা মেলছে, কলকাতার চলচ্চিত্রের একচ্ছত্র সাম্রাজ্য তখন ভাঙনের মুখে দাঁড়িয়ে।
তবুও বুকের ভেতর কোথায় যেন একটা খটকা লাগত তাঁর। এমনটা কেন হবে? যে কলকাতা একসময় ছিল গোটা ভারতের রাজধানী, সেই শহরের আভিজাত্য কি তবে সময়ের ধুলোয় ফিকে হয়ে আসছে? রাজধানী দিল্লি স্থানান্তরিত হয়েছে প্রায় তিন দশক পেরিয়ে গেল, কিন্তু ভারতবর্ষের সাংস্কৃতিক সিংহাসনে কলকাতার স্থান তো চিরকালই অটুট, সবার ওপরে।

এই শহরই তো দেশকে দিয়েছিল রামমোহন, বিদ্যাসাগর, বঙ্কিমচন্দ্র, স্বামী বিবেকানন্দ, রবীন্দ্রনাথ আর কাজী নজরুলের মতো যুগপুরুষদের। যে আলোকোজ্জ্বল নবজাগরণ গোটা দেশের চিন্তাধারাকে নাড়িয়ে দিয়েছিল, তার আঁতুড়ঘর তো এই রাজপথগুলোই! তাহলে সময়ের সাথে পা মেলাতে গিয়ে ইতিহাসের কোন বাঁকে এসে সুরের ছন্দটা কেটে গেল?
শচীনকর্তা বুঝতে পেরেছিলেন, তাঁর মনের ভেতরের যে সুরের ঝর্নাধারা, তাকে আর ক্ষুদ্র গণ্ডিতে আটকে রাখা চলবে না— তাকে পৌঁছে দিতে হবে কোটি কোটি মানুষের কানে। আর আধুনিক যুগে সেই সর্বব্যাপী যোগাযোগের একমাত্র শক্তিশালী সাঁকো হয়ে উঠেছে চলচ্চিত্র। প্রযুক্তি তখন আশ্চর্য এক বিপ্লব এনে দিয়েছে—প্লেব্যাকের আবির্ভাবের পর থেকে চলচ্চিত্রের গান মানুষের ড্রয়িংরুম ছাড়িয়ে হাটে-ঘাটে-মাঠে রাজত্ব করতে শুরু করেছে।
শচীনকর্তা চেয়েছিলেন কলকাতার মাটিতে বসেই এই নতুন তরঙ্গের সারথি হতে। পরিচালক হিসেবে নিজের সুরের সাম্রাজ্য বিস্তার করতে। কিন্তু বিধি বাম! যে শহরের বাতাসে তিনি গান শিখেছিলেন, সেই শহরই তাঁকে সঙ্গীত পরিচালনায় প্রত্যাশিত আঙিনা ছেড়ে দিল না।
তাঁর দূরদৃষ্টি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিল, আগামী দিনে এই মাধ্যমটি সমাজমানসে কী গভীর আলোড়ন সৃষ্টি করবে। তিনি আন্দাজ করছিলেন, গ্রামোফোন রেকর্ড কিংবা রেডিওর জনপ্রিয়তা যতই থাকুক না কেন, চলচ্চিত্রের এই অমোঘ দৃশ্য-শ্রাব্য আকর্ষণকে তারা কোনওদিনই পুরোপুরি টেক্কা দিতে পারবে না।
শচীনকর্তা চেয়েছিলেন কলকাতার মাটিতে বসেই এই নতুন তরঙ্গের সারথি হতে। পরিচালক হিসেবে নিজের সুরের সাম্রাজ্য বিস্তার করতে। কিন্তু বিধি বাম! যে শহরের বাতাসে তিনি গান শিখেছিলেন, সেই শহরই তাঁকে সঙ্গীত পরিচালনায় প্রত্যাশিত আঙিনা ছেড়ে দিল না।

তখন কলকাতার চলচ্চিত্র-সঙ্গীতের আকাশে মধ্যাহ্নসূর্যের মতো জ্বলজ্বল করছেন রাইচাঁদ বড়াল আর পঙ্কজকুমার মল্লিক। নিউ থিয়েটার্সের সেই দুর্ভেদ্য দুর্গের অলিন্দে পা রাখা তো দূরের কথা, পায়ের বুড়ো আঙুলটুকু ছোঁয়ানোর সুযোগও ছিল না। তাছাড়া, সুরকার হিসেবে আগরতলার এই রাজপুত্রকে কলকাতার প্রথাগত ঘরানা ঠিক কতটা সাদরে বরণ করবে, তা নিয়েও সন্দেহের দোলাচল ছিল।
সেসব কথা মনে পড়লে আজও একটা দীর্ঘশ্বাস পড়ে তাঁর। যখন স্বনামধন্য কুন্দনলাল সায়গল ‘রঞ্জিত মুভিটোন’-এর চন্দুলাল শাহের আহ্বানে বম্বে পাড়ি জমালেন, তার ঠিক পরের বছরই— ১৯৪২ সালে— সেই চন্দুলাল শাহের কাছ থেকে ডাক এসেছিল শচীনকর্তার কাছেও। বিপুল অর্থের মোহ ছিল তাতে, কিন্তু অবলীলায় সেই প্রস্তাব তিনি ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। নিজের প্রাণপ্রিয় কলকাতাকে ছেড়ে সুদূরে যাওয়ার কথা তখন তিনি দুঃস্বপ্নেও ভাবতে পারেননি।
ভাবলে বড় আশ্চর্য লাগে! সুদূর কুমিল্লার গোমতী নদীর ছোট্ট মিষ্টি জলের একটি ধারা যেন ধীর পায়ে এসে মিশেছিল কলকাতার পুণ্যতোয়া গঙ্গায়। আর তারপর, সময়ের এক অদ্ভুত বাঁকে উল্টো স্রোতে ভেসে সেই ধারা সোজা গিয়ে আছড়ে পড়ল পশ্চিমের উত্তাল আরব সাগরে— এক সোনালি ঢেউ হয়ে।
কিন্তু সুযোগ সবসময় একই দরজায় বারবার করাঘাত করে না। কিছুদিন বাদে বম্বে টকিজের অন্যতম স্থপতি শশধর মুখোপাধ্যায়ের পক্ষ থেকে এক প্রস্তাব এল। শশধরবাবু তখন নিজের নতুন প্রযোজনা সংস্থা ‘ফিল্মিস্তান’ গড়ে তুলছেন। তাঁর বাণিজ্যিক অংশীদার রায়বাহাদুর চুনীলাল মারফত বার্তা পৌঁছাল শচীনকর্তার কাছে। এবার আর দ্বিধা করেননি তিনি। প্রস্তাবে সায় দিলেন। ফিল্মিস্তানের হাত ধরে সেই যে পাড়ি জমালেন, সেখানে গিয়ে পাশে পেলেন তাঁর বহু পরিচিত সহযাত্রীকে— যাঁরা তাঁর মতোই কলকাতার শিকড় ছেড়ে ওই অচেনা সাগরে নোঙর ফেলেছেন।
ভাবলে বড় আশ্চর্য লাগে! সুদূর কুমিল্লার গোমতী নদীর ছোট্ট মিষ্টি জলের একটি ধারা যেন ধীর পায়ে এসে মিশেছিল কলকাতার পুণ্যতোয়া গঙ্গায়। আর তারপর, সময়ের এক অদ্ভুত বাঁকে উল্টো স্রোতে ভেসে সেই ধারা সোজা গিয়ে আছড়ে পড়ল পশ্চিমের উত্তাল আরব সাগরে— এক সোনালি ঢেউ হয়ে।

হাতে গোনা আর কয়েকটা দিন মাত্র বাকি। চেনা কলকাতার এই ধুলোবালি, আড্ডা, বন্ধুদের আন্তরিকতাকে যতটা সম্ভব দু’চোখ ভরে শুষে নিতে চাইছিলেন তিনি। অষ্টপ্রহর বুকপকেটে আগলে রাখা এই শহর তো সারা বছর দেখা দেয় না— বছরে বড়জোর একবার কি দু’বার। মন চাইলেই তো আর হুট করে হেমেনদার বাদ্যযন্ত্রের দোকানে বা রাসবিহারী-র মোড়ে ‘মেলডি’তে বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আড্ডা বা সঙ্গীত নিয়ে তর্কে মেতে ওঠা যাবে না!
চায়ের কাপে একটা শেষ চুমুক দিয়ে তিনি আপনমনেই মাথা দোলাচ্ছিলেন। পাশের কাঠের শেলফে রাখা রেডিওটা সকাল থেকেই ঘরোয়া সুরে বেজে চলেছে, সেদিকে এতক্ষণ তাঁর মনসংযোগ ছিল না। বম্বে পৌঁছলেই অশোককুমারের সেই নতুন ছবির কাজ শুরু করতে হবে। কলকাতার ট্রেনে ওঠার ঠিক ক’দিন আগেই অশোক তাঁকে আশ্বস্ত করেছিলেন— তিনি নিজে সেই ছবির মূল চরিত্রে আছেন।
ঠিক সেই মুহূর্তে রেডিওর সম্প্রচারে একটা ছোট্ট বিরতি দিয়ে পরবর্তী গানের সুরটি ভেসে এল ঘরে। বেজে উঠল সেই চেনা মেঠো সুরের মায়াজাল— অল ইন্ডিয়া রেডিওতে বাজছে তাঁরই স্বকণ্ঠে গাওয়া গান:
যখন বম্বের একের পর এক ধাক্কায় হতাশ হয়ে শচীনকর্তা তাঁর সুরের বাক্সপ্যাঁটরা গুটিয়ে কলকাতায় ফিরে আসার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিলেন, তখন অশোককুমারই তাঁর কাঁধে হাত রেখে অনুরোধ করেছিলেন, “কর্তা, আর একটা শেষ লড়াই লড়ে দেখুন। এই শেষ ছবিটা করুন, তারপরেও যদি মন না বসে, তখন চলে যাবেন— আমি নিজে গিয়ে স্টেশনে তুলে দিয়ে আসব।”
শচীন সেই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেছিলেন। মনে একটা চাপা উত্তেজনা, তার সাথে বুক কাঁপানো উৎকণ্ঠা। নতুন একটা অচেনা সাম্রাজ্যে নিজের অস্তিত্ব প্রতিষ্ঠা করা তো চাট্টিখানি কথা নয়! গায়ক হিসেবে বম্বে তাঁকে কিছু চিনেছে বটে, কিন্তু সুরকার হিসেবে নিজের রাজদণ্ড প্রতিষ্ঠা করা এখনও বাকি। সুরকার হিসেবে ‘শিকারী’ কিংবা ‘এইট ডেজ’ তাঁকে কিছুটা পরিচিতি এনে দিলেও তাঁর পায়ের তলার জমিকে শক্ত করতে পারেনি।
সামনে এবার সেই অগ্নিপরীক্ষা— ছবির নাম ‘মশাল’। তিনি মনে মনে স্থির করে ফেলেছেন, এই আলো যদি তাঁর ভাগ্যের অন্ধকার দূর করে বম্বের বুকে স্থায়ী আসন তৈরি করে দিতে না পারে, তবে নিঃশব্দে ফিরে আসবেন ঢাকুরিয়া লেকের শ্যামল নিভৃতে। তিনি অবশ্য তখন জানতেন না, সেই ‘মশাল’-এর আলোই একদিন তাঁর জয়যাত্রার পথকে রাজপথে পরিণত করতে চলেছে।
ঠিক সেই মুহূর্তে রেডিওর সম্প্রচারে একটা ছোট্ট বিরতি দিয়ে পরবর্তী গানের সুরটি ভেসে এল ঘরে। বেজে উঠল সেই চেনা মেঠো সুরের মায়াজাল— অল ইন্ডিয়া রেডিওতে বাজছে তাঁরই স্বকণ্ঠে গাওয়া গান:
ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে স্বামীর কাঁপতে থাকা কাঁধে স্নেহের হাত রাখলেন মীরা। জিজ্ঞেস করলেন, “কী হয়েছে আপনার? আপনি কাঁদছেন! টুবলুকে কলকাতায় রেখে যেতে কষ্ট হচ্ছে বুঝি? অত ভাববেন না তো, ওর কোনও অযত্ন হবে না, আমি তো রইলাম।”
“তুমি যে গিয়াছ, বকুল বিছানো পথে…”
মুহূর্তের মধ্যে চারপাশের বাস্তব উবে গেল। যেন এক পলকে এক যুগ পিছিয়ে গেলেন শচীনকর্তা। মাত্র বছর ছয়েক আগে নিজের সুরে এই গানটি রেকর্ড করেছিলেন তিনি। মুক্তির পরেই যা প্লাবনের মতো ভাসিয়ে নিয়ে গিয়েছিল বাংলার সঙ্গীতপ্রেমীদের। আর সেই অবিস্মরণীয় কথাগুলো কে লিখে দিয়েছিলেন? তাঁর জীবনের সবচেয়ে অন্তরঙ্গ, অভিন্নহৃদয় সখা— অজয়। অজয় ভট্টাচার্য।
অজয় কেবল বিরহের এই অমর কথামালাই উপহার দেননি; শেষ পর্যন্ত শচীনকে এক অপার, অতল বিরহসাগরে একা ভাসিয়ে দিয়ে চিরদিনের মতো চলে গেলেন। যে মানুষটার কলম থেকে শচীনের কণ্ঠে প্রাণ পেয়েছিল বহু মণিমুক্তোতুল্য গান, সেই শৈশবের কুমিল্লার স্মৃতিকে এক লহমায় ধূসর করে দিয়ে ১৯৪১ সালের ২৪ ডিসেম্বরের মহাপ্রস্থানের পথে পা বাড়িয়েছিলেন প্রিয় বন্ধু অজয়।
ঘরে ঢুকতেই থমকে দাঁড়ালেন মীরা। দেখলেন, শচীনকর্তা জানলার বাইরে দৃষ্টি মেলে স্থাণুর মতো বসে আছেন, আর তাঁর চশমার ফাঁক গলে গড়িয়ে পড়ছে নিঃশব্দ অশ্রুধারা। মীরা শিউরে উঠলেন— এমন সংবেদনশীল, আত্মনিমগ্ন আর ভেঙে পড়া রূপে তো মানুষটাকে কখনও দেখেননি!
ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে স্বামীর কাঁপতে থাকা কাঁধে স্নেহের হাত রাখলেন মীরা। জিজ্ঞেস করলেন, “কী হয়েছে আপনার? আপনি কাঁদছেন! টুবলুকে কলকাতায় রেখে যেতে কষ্ট হচ্ছে বুঝি? অত ভাববেন না তো, ওর কোনও অযত্ন হবে না, আমি তো রইলাম।”
“থাক না… সুরটা ঘরের বাতাসে কিছুক্ষণ খেলা করুক। গানের সেই ভেজা রেশটুকু মিলিয়ে যেতে দিও না,” চোখ বুজে যেন বুক ভরে নিঃশ্বাস নিলেন তিনি। ঘরের ওই নিবিড় নীরবতার ভেতর অজয়ের উপস্থিতিকে স্পর্শ করতে চাইছিলেন তাঁর শিল্পী-হৃদয় দিয়ে।
শচীন এক মুহূর্ত কথা বলতে পারলেন না। চশমাটা খুলে কাপড়ের খুঁট দিয়ে ভেজা চোখ মুছলেন। তারপর থরথর করে কাঁপা আঙুল তুলে রেডিওর দিকে নির্দেশ করে ভগ্ন গলায় বললেন, “ছেলেটা আমাকে একেবারে রিক্ত, উজাড় করে দিয়ে অসময়ে চলে গেল গো মীরা…”
মীরাও স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে শুনছিলেন। রেডিওর ট্রানজিস্টার বেয়ে ঘরের বাতাসে তখন ছড়িয়ে পড়ছে গানের শেষ অন্তরার সেই বুকচেরা আর্তি—
“সে খেলা ফুরালো, সে সুর মিলালো,
নিভিলো কনক আলো—
দিয়ে গেছ মোরে শত পরাজয়
জয়ী হয়ে কোনও মতে…
তুমি যে গিয়াছ, বকুল বিছানো পথে।”
গানটা শেষ হতেই শচীনকর্তা ধীরপায়ে উঠে গিয়ে রেডিওর নবটা ঘুরিয়ে শব্দ স্তব্ধ করে দিলেন।
মীরা খানিক অবাক হয়েই শুধোলেন, “হঠাৎ রেডিওটা বন্ধ করে দিলেন কেন?”
“থাক না… সুরটা ঘরের বাতাসে কিছুক্ষণ খেলা করুক। গানের সেই ভেজা রেশটুকু মিলিয়ে যেতে দিও না,” চোখ বুজে যেন বুক ভরে নিঃশ্বাস নিলেন তিনি। ঘরের ওই নিবিড় নীরবতার ভেতর অজয়ের উপস্থিতিকে স্পর্শ করতে চাইছিলেন তাঁর শিল্পী-হৃদয় দিয়ে।
মনটা আরও ভারী হয়ে উঠল। শুধু কি অজয়? সুরের আকাশে আরও কত তারা তো একে একে খসে গেল! মনে পড়ল হিমাংশু দত্তের কথা। সুরসাগর হিমাংশু দত্ত। ১৯৪৪ সালের অক্টোবর মাসে শচীন যখন প্রথম বম্বের মাটি ছুঁয়েছিলেন, তার ঠিক এক মাসের মাথায় সাগরপাড়ের অচেনা শহরে খবর পৌঁছাল— কলকাতায় সুরসাগরের ইহলীলা সাঙ্গ হয়েছে। যেন তাঁর ফেলে আসা প্রিয় কুমিল্লার যে ছোট্ট সংস্কৃতির টুকরোটি কলকাতার বুকে গড়ে উঠেছিল, তা একে একে খসে পড়ে আরও নিঃসঙ্গ, আরও একা হয়ে গেল।
স্মৃতির মিছিল তখন শচীনের চোখের সামনে দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। ১৯৩১ সালে নিঃশব্দে চলে গেলেন পিতা নবদ্বীপচন্দ্র দেববর্মন— যাঁর আশ্রয়ে সঙ্গীত ছিল তাঁর একমাত্র ধ্যানজ্ঞান। মা নিরুপমা দেবী তো শৈশবেই ফাঁকি দিয়ে চলে গেছেন দূর দিগন্তে। আর রাজপরিবার? রক্তের আত্মীয়দের অধিকাংশই তো তাঁর জীবনে থেকেও নেই; সুরকে আপন করার দায়ে রাজঐশ্বর্যের সাথে সম্পর্কচ্ছেদ তিনি নিজেই একটু একটু করে করে নিয়েছিলেন।
জানলার ওপারে তখন রোদ চড়েছে। শচীনকর্তা আনমনে নিজের মনেই যেন এক চূড়ান্ত সান্ত্বনা খুঁজে নিলেন। অজয় নেই, হিমাংশু নেই, ফেলে আসা অতীতের সেই সোনালি দিনগুলোও আর কোনওদিন ফিরবে না। তবে আর কীসের মায়ায় তিনি এই শহরে বাঁধা থাকবেন?
আজ তাঁর জীবনে পড়ে রয়েছে সাকুল্যে এই তিনটি সম্পদ— মীরা, তাঁর স্নেহের পঞ্চম, আর মাটির খাঁটি মেঠো সুরের উত্তরাধিকার।
জানলার ওপারে তখন রোদ চড়েছে। শচীনকর্তা আনমনে নিজের মনেই যেন এক চূড়ান্ত সান্ত্বনা খুঁজে নিলেন। অজয় নেই, হিমাংশু নেই, ফেলে আসা অতীতের সেই সোনালি দিনগুলোও আর কোনওদিন ফিরবে না। তবে আর কীসের মায়ায় তিনি এই শহরে বাঁধা থাকবেন?
হয়তো যা হয়েছে, ভালর জন্যই হয়েছে। বম্বের ওই রুক্ষ, উন্মাতাল সমুদ্রের তীরেই হয়তো তাঁর সুরের এক নতুন সূর্যোদয় অপেক্ষা করে আছে। গোমতীর শান্ত স্রোতকে এবার আরব সাগরের তুফানে মিলিয়ে দিতেই হবে— পেছন ফিরে তাকানোর আর কোনও পথ নেই।
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত