(Rustic Cooking 30)
এবারে কার্তিক পড়তে না পড়তেই গ্রাম দেশে হাওয়া ঘুরে গেছে। সে হাওয়ায় আদুরে কাঁথা কম্বল উত্তাপ মাখে, পিঠে রোদ পেতে নিতে নিতে কিশোরীবেলা কদবেল মাখা খায়। এদিক সেদিকে খেজুর গাছ ঝাড়া হয়ে গেছে। প্যাকাটি দিয়ে ঘর বানাতে ব্যস্ত শিউলিরা। তাদের লম্বাটে উনোনের চারিধার নিকিয়ে টানটান।
আরও পড়ুন: বনজ কুসুম: পর্ব – [১] [২] [৩] [৪] [৫] [৬] [৭] [৮] [৯] [১০] [১১] [১২] [১৩] [১৪] [১৫] [১৬] [১৭] [১৮] [১৯] [২০] [২১] [২২][২৩], [২৪], [২৫], [২৬], [২৭], [২৮], [২৯]
এবারের কোজাগরী জোছনা তাই হিমের ওড়না জড়িয়ে অস্বচ্ছ মায়াবী হয়েছিল রাতভোর। একা একা তেমন জোছনার মাঝখানটিতে দাঁড়ালে ঘোর লেগে যায়। মনে হয় এই পৃথিবীখানা ঠিক মানুষের হাতে গড়া নয় যেন। একদিন এই মাটি চাঁদ আর শিশির ফেলে কোথাও চলে যেতে হবে সে কথা যেন প্রত্যয় হয় না এমন রাতে।

চাষনালায় চাঁদের আলো পড়ে মনে হয় সে কোনও অলকানন্দা যেন। ইন্দ্রিয় দিয়ে যেন ওকে ছোঁয়া যাবে না ইচ্ছে করলেই। তবুও সে চাঁদের রাত পেরিয়ে শিশিরের শব্দে ভোর হয়। বুলবুলি আর দোয়েলেরা এ ডাল থেকে ও ডাল উড়ে গেলে টুপটাপ করে জল পড়ে। বৃষ্টির জলের চেয়ে সে শব্দ আলাদা, অন্যরকম।
ঘরে ঘরে তখন কেটলিতে কেটলিতে চায়ের জল চাপে। পাতার জ্বাল ঠেলে ঠেলে চায়ের জল ফুটে উঠলে ধোঁয়ার গন্ধ হয়, সে চা অন্য রকমের। তবু, এমন জবুথবু ভোরে সে যেন কোন ঘুম ভাঙানিয়া।

মাঠে মাঠে ধানের শিস দেখা দিয়েছে এতদিনে। ঘরে ঘরে ধলিকচু উঠেছে ধামা ভরে। মানুষেরা এখন টক দিয়ে কচুর ডাল খাবে। মাঠে মাঠে চ্যাং ল্যাটা কই হারিয়ে গেছে। এত বিষ দিলে কি আর মাছ থাকে! তবুও দু-চারটে জুটে গেলে ল্যাটা মাছ দিয়ে কচুর তরকারি রান্না করে মানুষেরা। এসবই তো কার্তিকের রান্না। সেই নবান্নের কার্তিক এখন পিছিয়ে গেছে।
কেউ আবার বলবে ঝাল কেন! দুধ মান বাটায় খানিক মিষ্টি না দিলে ঠিক খোলে না। এই ঝাল-মিষ্টির স্বাধীনতাটুকু মানুষের থাক। কার কী ভাল লাগে সে কি বলা যায়!
মুখীকচুর ডালে কেউ কেউ আবার এক মুঠো মুসুরি কলাই দেয়। বর্ষা পেরিয়ে এসে কচু রান্নার কত যে তরিজুৎ। একেকজনের ঘরের এক পাশে দুধকচুর গাছ ওঠে ছাতার মতো পাতা ছড়িয়ে। এই হালকা শীতের দুপুরে দুধ মানকচু বাটা খেতে বেশ লাগে। আর শুধু বাটায় যদি মন না ওঠে, তবে পাতায় মুড়ে চাটুতে ভেজে নাও না! শুকনো ভাতে টানটান ঝাল দিয়ে দুধমান বাটা অপূর্ব।
কেউ আবার বলবে ঝাল কেন! দুধ মান বাটায় খানিক মিষ্টি না দিলে ঠিক খোলে না। এই ঝাল-মিষ্টির স্বাধীনতাটুকু মানুষের থাক। কার কী ভাল লাগে সে কি বলা যায়! কার্তিকের নদীতীরে কেউ দ্যাখো ওই বসেছে ছিপ ফেলে, কেউ বা পটলের গোড়া লাগাচ্ছে যত্ন করে– কার যে কোন দিকে টান কেউ কি বলতে পারে!

তাই শেষ পর্যন্ত এত ভিড়ের মাঝেও মনে হয় প্রত্যেকটা জীবনই ব্যক্তিগত। সে জীবন কেবলই ফুরিয়ে ফেলছে আর ভরিয়ে তুলছে প্রতিদিন। অন্তত রান্নাঘরের আনাজপাতির ঝুড়িটির দিকে তাকালেই আপনিও সে কথা টের পাবেন। এই কদিন আগেও বর্ষার আনাজে পরিপূর্ণ ছিল যে ঝুড়িখানা, সে আজ শরতের সদ্য ওঠা কচু জলপাই আর কাঁচা তেঁতুলে ভরে উঠেছে।
এই হাড়ি-পাতিল ভাতের থালায় কী আশ্চর্য করে জীবনেরই ছায়া পড়ে নিদাঘে বর্ষায় শরতে। সকলেই জানে এইসব, তবুও ওই হিমের জোছনায় কেবলই মনে হয় এই অপার্থিব পৃথিবীখানা আমার চিরজীবনের সঙ্গী, অনন্তকাল ধরে আমরা এমনই রয়ে যাব কোজাগরী পেরিয়ে আসা রাতে। কিন্তু হয় না এসব, হতে নেই বোধহয়।
সময়ের ছায়া ডালে ঝোলে অম্বলে যদি না-ই পড়ল তবে আর জীবনের সুখ কী! মুখীকচুর ডাল এসব জানে। গরম ভাতে মিলেমিশে যেতে যেতে এমন কার্তিকের রোদকে ছুঁয়ে যাওয়ার কী প্রচণ্ড ওর পার্থিব বাসনা তাই।
আর কদিন পরেই চোদ্দশাকে আর প্রদীপে যে আলোর পার্বণ সেখানে হিম-জোছনা কই! সে তো নেই! পৃথিবীর এ নিয়ে কোনও আক্ষেপ নেই, থাকার কথাও নয়। রান্নাঘরের ঝুড়িখানা আর কদিনেই ভরে উঠবে বেতোশাকে, কচি বেগুনে আর শিমে। বর্ষার ঝাল চচ্চড়ি বদলে যাবে কার্তিকের নিরামিষ টকে। মানুষেরা সেই তো চায়। সময়ের ছায়া ডালে ঝোলে অম্বলে যদি না-ই পড়ল তবে আর জীবনের সুখ কী! মুখীকচুর ডাল এসব জানে। গরম ভাতে মিলেমিশে যেতে যেতে এমন কার্তিকের রোদকে ছুঁয়ে যাওয়ার কী প্রচণ্ড ওর পার্থিব বাসনা তাই।
দুধকচুর পাতুরি
উপকরণ: দুধকচু (একান্তই না পেলে মানকচু), কালো সর্ষে, নারকেল কোরা, কাঁচালঙ্কা, নুন, মিষ্টি, সর্ষের তেল, কলাপাতা।

পদ্ধতি: কচুর খোসা মোটা করে ফেলে কুরিয়ে নিন। এই কুরিয়ে নেওয়া কচুটা খুব ভাল করে চিপে দুধটা ফেলে দিন। এবার কোরানো নারকেল একটু বেশিই নিন, কচুবাটায় যা দেন তার চেয়ে আরেকটু বেশি। সর্ষে, নারকেল, কচু, লঙ্কা, নুন, মিষ্টি সব দিয়ে মিহি করে বেটে নিন। এই বাটায় সর্ষের তেল মাখিয়ে কিছুক্ষণ রাখুন। তারপরে কলাপাতা আগুনে সেঁকে নরম করে নিন। কলাপাতায় কচুবাটা দিয়ে পাতুরির মতো করে মুড়ে চাটুতে সেঁকে নিন। ভাতের পাতে গরম গরম পরিবেশন করুন কচুর পাতুরি।
গাঠিকচুর ডাল
উপকরণ: গাঠিকচু, নুন, হলুদ, সর্ষের তেল, রসুন, পেঁয়াজ, টমেটো, জলপাই, নারকেল (ঐচ্ছিক), ধনেপাতা, পাঁচফোড়ন, শুকনো লঙ্কা।

পদ্ধতি: কচু খুব ভাল করে সেদ্ধ করে অল্প জল দিয়ে মেখে নিন। এবার পুরোটা ভাল করে ছেঁকে নিন যেন দলা দলা কিছু না থাকে। অল্প নুন আর হলুদ দিয়ে জ্বাল দিয়ে রাখুন। অন্য দিকে, তেলে পাঁচফোড়ন শুকনো লঙ্কা ফোড়ন দিয়ে রসুন কুচি দিন। ভাজা ভাজা হলে পেঁয়াজ কুচি দিন, একটু পরে টমেটো দিন। সব বেশ ভাজা হয়ে গেলে সিদ্ধ করে রাখা জলপাই দিন। এবং উপর থেকে সিদ্ধ করে ফুটিয়ে রাখা ডালটি ঢেলে দিন। পুরোটা একটু সময় নিয়ে জ্বাল দিন। উপরে কয়েকটা কাঁচালঙ্কা, ধনেপাতা কুচি ছড়িয়ে দিন। সামান্য গুড় আর নারকেল কোরা দিতে পারেন। তাতে স্বাদ বাড়ে। এই সময়ের নতুন ওঠা কচুর ডাল খেতে ভাল।
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
