(Rustic cooking 24)
বৈশাখের ভোর বড় সুন্দর। কী যেন এক রকমের শান্ত একটা ভাব আছে ওর মধ্যে। বহুদিন ধরে দেখেছি এই ভোরকে। গাছের তলায় পড়ে থাকা আম, ইতস্তত ফুটে থাকা মধুমালতী আর সবুজ হয়ে থাকা তিলখেত– এইসব নিয়ে গ্রীষ্মের একটা চেহারা আছে মনের মধ্যে। সেসব মিলিয়ে নিতে ইচ্ছে করে আসলে। এই মিলিয়ে নেওয়াগুলো আসলে ব্যক্তিগত অভ্যাসের মতো। এই গাঁ-গঞ্জে বড় হয়ে ওঠার সঙ্গে জুড়ে থাকা ছবি। এই ছবির পেলবতাটুকু মনের মধ্যে যারা খুব যত্নে সঞ্চিত করে রাখে, তাদের মনে পড়ে রান্নাঘরের দাওয়াটিতে বসে কে যেন চালুনি পেতে বেলের শরবত বানাচ্ছে। ছেঁকে ছেঁকে বীজ বের করছে। ঘন মোলায়েম শরবত, গ্রীষ্মের সকালগুলো ভরিয়ে রেখেছে কত কত বছর ধরে। আম ডাল বা পাতলা শুক্তানির চেয়ে তার গৌরবও কিছু কম নয়।
আরও পড়ুন: বনজ কুসুম: পর্ব – [১] [২] [৩] [৪] [৫] [৬] [৭] [৮] [৯] [১০] [১১] [১২] [১৩] [১৪] [১৫] [১৬] [১৭] [১৮] [১৯] [২০] [২১] [২২] [২৩]
আসলে সত্যি কথা বলতে কি, রান্নাঘরে গৌরব আর অগৌরব মিলেমিশে থাকে। কত ফেলে দেওয়ার মতো জিনিসও কবে কখন কাজে লাগবে বলে মানুষ জমিয়ে রাখে সযতনে। সেসব নিয়ে কখনও আলাদা করে হয়তো চর্চা হয় না, তবু এরকম কতকিছু মিলেমিশে থাকে রান্নাঘরে। গ্রীষ্মের ঝাঁ ঝাঁ রোদ্দুরে রান্নাঘর বসে বসে শরবত বানায়, পাট শাকের ঝোল রাঁধে। যাদের খানিক অবসর আছে, তারা বসে বসে গিঁট বেঁধে বেঁধে গিট-পাটও রাঁধে। আসলে এসব অবসর করে নিতে হয় রান্নাঘরকে। গ্রীষ্মে বর্ষায় তার একেক রকম চেহারা, একেক রকম চর্যা। এসব চর্যা ঋতুভেদে কতরকম করে মানুষ আত্মস্থ করেছে।

গরমের দিনে তেতেপুড়ে যারা রান্না করেন, তারা তো কেবল খুন্তি নাড়েন না, গ্রীষ্মদিনের তেতে ওঠা জীবনের সুশ্রূষাও জানেন তারা। এপাড়া সেপাড়ায় ঘুরে ঘুরে বুড়ি মাসি পুরনো তেঁতুল বিক্রি করে। সেই তেল চুকচুকে কালো তেঁতুল। কেউ কেউ খানিক বেশি দাম দিয়েই সে তেঁতুল কেনে গ্রামদেশে। কেউ বা বটি পেতে বীজ ছাড়িয়ে তেল মাখিয়ে মাখিয়ে সে তেঁতুল বছরভর জমিয়ে রাখে। এই পুরনো তেঁতুল না হলে কি গরমের দিনের রান্নায় যুত হয়? এ তেঁতুলে টক কম, কিন্তু উপকার ঢের। রাঢ়বঙ্গে এ তেঁতুল না হলে মাছের টক তেমন জমে না। তাও আবার কারওর পছন্দ পাতলা টক, কেউ বা গা মাখা টক না হলে খেতে চায় না।

দেশ গাঁ ভেদে মাছ ভেদে এসব পছন্দ অদলবদল হয়ে যায়। রান্নাঘর এসব জানে। তাই তো সে একেকদিন লেবু তুলে এনে লেবু দিয়ে, আর এক মুঠো চিংড়ি দিয়ে ঢ্যাঁড়সের টক রাঁধে। বুড়ো হয়ে আসা সজনে খাড়া এখন আর কেউ খেতে চায় না। তবু কুমড়ো আর বড়ি দিয়ে নিরামিষ টক হলে সেও আরেক রকম।
এই অনেক রকমের মধ্যে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে চলতে হয় রান্নাঘরকে, না হলে আবার বাড়িশুদ্ধ লোক বলবে– কী যে একঘেয়ে রান্না করো! তেতেপুড়ে ওঠা জীবনে তাই অভিযোগ আর প্রশংসা হাত ধরাধরি করে চলে। এসব নিয়েই রান্নাঘরের একটা গতানুগতিক ছন্দ আছে। সেই ছন্দে সপ্তাহে ক’দিন পোস্ত হবে, ক’দিন তিলের অম্বল হবে, ক’দিন কাঁচকলার ঝোল হবে, তার একটা অঙ্ক আছে। এই অঙ্ক গ্রীষ্মদিনের, বর্ষা এলে কিন্তু এই অঙ্কের নিয়ম বদলে যাবে। যাঁরা খাতা-কলমের অঙ্কে ভারী কাঁচা, তারাও কতজন দেখেছি রান্নাঘরের এসব ঐকিক নিয়মে পটু। সেসব দেখে দেখে বুঝেছি মাসকাবারির একটা আলাদা অঙ্ক আছে। সে ঋতুচক্রের আবর্তনে বদলে বদলে যায়, আসলে এও এক রকমের সুশ্রূষা। এও এক রকমের ম্যানেজমেন্ট।

এই যে রোদ্দুরে মেলে দেওয়া আমসির কুলো, শুক্তোপাতার ডালা– এরাও তো সঞ্চিত অর্থের মতোই মূল্যবান। এসব মাইক্রো ব্যাঙ্কিং সিস্টেম আমাদের তলিয়ে দেখার সময় হয় না আসলে। অথচ গ্রীষ্মের ভোরের মতো, কেমন শান্ত তার ভঙ্গিটি। একে আমার একাকিত্ব বলতে ইচ্ছে করে না। অথবা একাকিত্বের মধ্যে যে বিষাদ আছে, তাকেও আমি বোঝাতে চাইছি না। বরঞ্চ একেকটা রান্নাঘর এই বিচ্ছিন্নতার জীবনেও ডালা কুলো আর তেতে ওঠা খরার দিনে যে জীবনকে ছুঁতে চাইছে বারবার, ঋতু বৈচিত্র্যের যে বর্ণমালা আঁকতে চাইছে বারবার, তাকে ভালবাসতে ইচ্ছে করে। ভালবেসে দেখি, এই ঝাঁ ঝাঁ রোদ্দুরের দিনেও সে একা একা, এক মনে অঙ্ক করছে।
পাকা পটলের ভর্তা

উপকরণ: পাকা পটল, রসুন, পেঁয়াজ, নারকেল কোরা অল্প, সর্ষের তেল, শুকনো লঙ্কা, নুন।
পদ্ধতি: এই গরমে অনেক সময়েই পটল পেকে যায়। পাকা পটল ভাল করে ধুয়ে নিয়ে মুছে নিন। নিভু আঁচে (যদি কাঠের উনোন থাকে) বা চাটুতে পুড়িয়ে নিন। পোড়া পটলের শাঁস একটি চামচ বা কিছু দিয়ে কুরে বের করে নিন। কড়াইতে সর্ষের তেল দিন। তেল গরম হলে শুকনো লঙ্কা ভেজে তুলে নিন। ওই তেলেই রসুন ফোড়ন দিন। রসুন বেশ ভাজা হলে কুরে রাখা পটল দিয়ে দিন। স্বাদমতো নুন হলুদ দিয়ে বেশ নেড়েচেড়ে নিন। অল্প নারকেল কোরাও দিন।

সব বেশ ভাজা ভাজা হয়ে এলে রান্না বন্ধ করুন। অন্যদিকে খুব পাতলা পাতলা করে একটা পেঁয়াজ কুচিয়ে নিন। ভাজা শুকনো লঙ্কাটি নুন দিয়ে মেখে নিন। নুন লঙ্কা বেশ মিশে গেলে পেঁয়াজ কুচি দিয়ে ভাল করে মাখুন। সব বেশ মিশে গেলে কড়াইয়ের পটলের মিশ্রণটি দিয়ে ভাল করে মাখুন। প্রয়োজন মনে হলে আরেকটু সর্ষের তেল দিন। পাকা পটলের ভর্তা পরিবেশন করুন গরম বা ঠান্ডা ভাতের সঙ্গে।
লেবুপাতা দিয়ে কাঁচা মুগের ডাল
উপকরণ: মুগের ডাল, আমাদা, লেবুপাতা, গন্ধরাজ লেবু, কাঁচালঙ্কা, নুন, মিষ্টি, অল্প সর্ষের তেল।

পদ্ধতি: মুগের ডাল ধুয়ে ভিজিয়ে রাখুন। ভেজানো ডাল নুন আর খুবই সামান্য হলুদ দিয়ে সেদ্ধ করে নিন। কড়াই বসিয়ে সামান্য তেল দিন। কাঁচালঙ্কা ফোড়ন দিন। ফোড়নের গন্ধ বেরোলে ডাল ঢেলে দিন। অল্প আমাদা বাটা দিন। ডাল ফুটে বেশ সুন্দর হয়ে গেলে, অল্প লেবুর রস আর মিষ্টি দিন। বেশ কিছু লেবুপাতা আর কাঁচালঙ্কা ছড়িয়ে রান্না শেষ করুন। এই ডাল ঘরের তাপমাত্রায় খান। গরমের দিনে আরামদায়ক।
ছবি সৌজন্য: লেখক, AI
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত