(Chile Atacama)
আবারও এক দেশ ছেড়ে আরেক দেশে আমাদের অভিযান। বাক্স-প্যাঁটরা গুছিয়ে নিয়ে যাত্রা শুরু হল। এবার আমরা চললাম পেরু থেকে চিলির উদ্দেশ্যে। সান্তিয়াগো আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নেমে ক্লোকরুমে প্রধান ব্যাগ ও ব্যাগেজভর্তি ঢাউস বাক্স-প্যাঁটরা গচ্ছিত রেখে আগে থেকে গোছানো যৎসামান্য জিনিস নিয়ে আরেকটি ছোট্ট বিমানে কালামায় ল্যান্ড করলাম। মাত্র দেড় ঘণ্টার আকাশপথ। সেখান থেকে বাসে ‘সান পেড্রো ডি আতাকামা’। প্লেনের একফালি জানলা দিয়েই প্রথম আন্দিজ ঘেরা আতাকামা মরুভূমি দৃষ্টিগোচর হল। ফ্লাইট লেট করায় সেই মরুপ্রান্তরে পৌঁছতে বেশ রাত হয়ে গেল। মধ্যরাতে হোটেলে ঢুকলাম সকলে।
আরও পড়ুন: মাচু পিচুর পিছুপিছু
রিসেপশনে নীল পাসপোর্ট হাতে আমাদের চেক-ইন করতে দেখে রিসেপশনের সবাই হতভম্ভ। তারা জন্মে ইন্ডিয়ান পাসপোর্ট চোখে দেখেনি। একদল লোকজন এই মরুভূমি ‘সান পেড্রো’তে এসেছে সুদূর ইন্ডিয়া থেকে! ভারতীয় অভিবাসীরা বিভিন্ন দেশ থেকে চিলিতে এলেও, ভারতবর্ষ থেকে কাউকে আসতে দেখেনি তারা। বেশ আনন্দ হল শুনে। কনকনে ঠান্ডা সেই মরুভূমি। আলো জ্বলছিল শুধু হোটেলে। সেই আলোতেই এক ঝলক ঘুটঘুটে অন্ধকার মরু রিসর্টটির আশপাশ দেখে নিয়ে ঠান্ডায় জড়ভরত হয়ে গেলাম।

দক্ষিণ আমেরিকার চিলির উত্তর অংশে প্রশান্ত মহাসাগরের উপকূল ঘেঁষে প্রায় ১,৬০০ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত এই মরুভূমি। একপাশে ভাঁজে ভাঁজে বিশাল আন্দিজ পর্বতমালা এবং অন্যপাশে চিলির উপকূলীয় পর্বতমালা। পৃথিবীর সবচাইতে শুষ্কতম এই মরুভূমিতে বছরে গড়ে মাত্র ১-১৫ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়। গাছপালাও তথৈবচ! তবে কোনও এক অদ্ভূত ভৌগোলিক কারণে সান পেড্রো শহরে বৃষ্টির আশীর্বাদ ঝরে পড়ে বৈকি। আর তাই বুঝি সেখানে শহরায়ণ সম্ভব হয়েছে।
পরদিন ভোরে মরুশহরের সেই হোটেলটির দিকে তাকিয়ে মনে হল, এ কোথায় এসেছি! সূর্যের আলো তখন চুঁইয়ে পড়ছে হলদে বালি রঙের অ্যাডোবি স্টাইল কটেজগুলোয়। প্রতিটি কটেজের টালির চাল আর পাথরের দেওয়াল। এখানে সব একতলা বাড়ি এভাবেই বানানোর রীতি।
শহরের স্থাপত্যে আধুনিক বহুতল বাড়ি বানানোতে নিষেধাজ্ঞা থাকায় পুরনো অ্যাডোবি স্টাইলের বাড়িকেই তারা প্রাধান্য দিয়ে পেট্রিয়ার্কি প্রতিষ্ঠা করে। এই অ্যাডোবি স্টাইলেই ঘরদোর, হোটেল, রেস্তরাঁ, দোকানপাট সবকিছু গজিয়ে উঠেছে সেখানে।
পেট্রিয়ার্কি শব্দটি চিলিতে দু’ভাবে ব্যবহৃত হয়। সাধারণত যাকে আমরা পুরুষতন্ত্র বলি, সেটাই ওই দেশের হেরিটেজ বা ঐতিহ্য বলেও মানা হয়। যেমন শহরের স্থাপত্যে আধুনিক বহুতল বাড়ি বানানোতে নিষেধাজ্ঞা থাকায় পুরনো অ্যাডোবি স্টাইলের বাড়িকেই তারা প্রাধান্য দিয়ে পেট্রিয়ার্কি প্রতিষ্ঠা করে। এই অ্যাডোবি স্টাইলেই ঘরদোর, হোটেল, রেস্তরাঁ, দোকানপাট সবকিছু গজিয়ে উঠেছে সেখানে। সোনার বালির রং চারিদিকে। মনে পড়ে সোনার কেল্লার কথা। একফোঁটা কৃত্রিমতা নেই। পুরোপুরি শহুরে সাহেবি কেতাদুরস্ত, কিন্তু তারই মধ্যে যেন একটা মরুশহরের আটপৌরে নিপাট কৌলীন্য।
ব্রেকফাস্ট সেরে নিয়েই বেরিয়েছি মরুভূমি অভিযানে। বাস ছুটে চলেছে শীতল মরুভূমির উপর দিয়ে। সুন্দর রাস্তা। পাহাড়ের নততলে সদর্পে ক্যাকটাস মনের সুখে ইতিউতি মাথা তুলে আছে। এই ক্যাকটাসের নাম কারডন (Cardón cactus)। মাইলের পর মাইল ধূ ধূ বালির রাজ্যে এমন সবুজ ক্যাকটাস চোখের পক্ষে বেশ আরামদায়ক।

লাদাখ আর কৈলাস-মানস সরোবর যাত্রাকালে তিব্বতে শীতল মরুভূমি চাক্ষুষ দেখেছি। আমাদের হিমালয় পেরিয়ে জলীয় বাষ্প পৌঁছতে পারে না সেখানেও। কিন্তু পেরু থেকে চিলি পৌঁছে, ‘সান পেড্রো ডি আতাকামা’তে গিয়ে মনে হল, আগে কিছুই দেখিনি। আতাকামার শীতল মরুভূমি এতই বিশাল, দূষণমুক্ত আর নির্জন যে, নাসার বিজ্ঞানীরা সেখানে জ্যোতির্বিজ্ঞানের (অ্যাস্ট্রোনমিকাল) নানাবিধ পরীক্ষানিরীক্ষা চালান। মঙ্গলগ্রহের মতো লালচে রং মাটির, একফোঁটা জল কোথাও নেই। মাইলের পর মাইল আছে বিচিত্র স্যান্ড ডিউনস (বালির টিলা)। আন্দিজ পাহাড়ের ভাঁজে ভাঁজে যেন রামধনু রং খেলে বেড়াচ্ছে। সে এক বিচিত্র অভিজ্ঞতা।
ভোরের সূর্যের আলোয় সে মরুপাহাড়ের এক রূপ। প্রদোষকালে সূর্যাস্তের সময় হবে তার আরেক রূপ। ঈশ্বরের কার্পণ্যের চরম উৎকর্ষ সে মরুশহরের বুকে উপচে পড়ছে। একপাশে আন্দিজ এবং অন্যপাশে চিলির উপকূলীয় পর্বতশ্রেণি থাকায় এখানে বৃষ্টির মেঘ পৌঁছাতে পারে না। প্রশান্ত মহাসাগরের জলীয় বাষ্প পাহাড়ে ধাক্কা খেয়ে বৃষ্টি ঝরানোর আগেই শুষ্ক হয়ে যায়।
সারা বিশ্বের ভ্রমণপিপাসুদের কাছে এই অনন্য মরুভূমি এত স্পেশাল কারণ, প্রথমত, এটি পৃথিবীর সবচেয়ে শুষ্ক শীতল মরুভূমি। দ্বিতীয়ত, মহাকাশ গবেষণার স্বর্গরাজ্য এই আতাকামা।
দুই পাশের পর্বতমালার ঘেরাটোপে বন্দী হয়ে বৃষ্টিবাহী মেঘকে হয়তো সে বরণ করতে পারে না। কিন্তু অনাবৃষ্টির জন্য সৌন্দর্য কিছু কম পড়েনি। ভূগোলের পরিভাষায় বৃষ্টিচ্ছায় অঞ্চল একেই বলে। আন্দিজের জেদের কাছে সত্যিই পরাজিত এই বিধ্বস্ত ও প্রত্যন্ত টেরেইন (ভূমি অ়ঞ্চল)। রূপসী আন্দিজের একই অঙ্গে এত রূপ! দিন ও রাতের তাপমাত্রার ফারাকও এখানে অনেক বেশি।
সারা বিশ্বের ভ্রমণপিপাসুদের কাছে এই অনন্য মরুভূমি এত স্পেশাল কারণ, প্রথমত, এটি পৃথিবীর সবচেয়ে শুষ্ক শীতল মরুভূমি। দ্বিতীয়ত, মহাকাশ গবেষণার স্বর্গরাজ্য এই আতাকামা। খুব কম আর্দ্রতা, মেঘমুক্ত পরিষ্কার আকাশ এবং সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে অনেক উঁচুতে বলে মহাকাশ পর্যবেক্ষণের জন্য এটি পৃথিবীর সেরা জায়গা। বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী টেলিস্কোপগুলোর বেশ কয়েকটি এখানে বসানো হয়েছে, যার মধ্যে ALMA (Atacama Large Millimeter/submillimeter Array) এবং VLT (Very Large Telescope) অন্যতম। রাতের গহীন অন্ধকারে টেলিস্কোপে চোখ রাখার অভিজ্ঞতাও হল।

নাসার বিজ্ঞানীরা মনে করেন, আতাকামা মরুভূমির মাটি ও পরিবেশের সঙ্গে মঙ্গলগ্রহের মাটির বহু মিল রয়েছে। মঙ্গলগ্রহে কোনও রোভার বা রোবট পাঠানোর আগে নাসা (NASA) সেগুলোর চাকা এবং যন্ত্রপাতি পরীক্ষার জন্য এই আতাকামা মরুভূমিকে বেছে নেয়। এখানকার মাটি এতটাই চরমভাবাপন্ন যে, অনেক জায়গায় কোনও ব্যাকটেরিয়া বা অণুজীবও বেঁচে থাকতে পারে না।
তৃতীয়ত, এখানকার ল্যান্ডস্কেপ বা ভূপ্রকৃতি একদম অন্য কোনও গ্রহের মতো। বিশেষ করে এর ‘ভ্যালে দে লা লুনা’ (Moon Valley) দেখতে হুবহু চাঁদের পৃষ্ঠের মতো। এছাড়া এখানে রয়েছে বিশাল ‘সালার দে আতাকামা’ বা লবণের হ্রদ, যেখানে মাইলের পর মাইল শুধু ধবধবে সাদা লবণের আস্তরণ প্রত্যক্ষ করলাম সেদিন সূর্যোদয়ের ভোরে। আর, এই মরুভূমির চতুর্থ বিশেষত্ব হল রেইনবো মাউন্টেন। তবে আতাকামার প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে, তার প্রেমে হাবুডুবু খাওয়ার পঞ্চম কারণ হল বিখ্যাত এল তাতিও গিজারস (El Tatio Geysers)। তার কথায় পরে আসব।

প্রথমদিনের অভিযান তালিকায় ছিল ভ্যালে ডেল আরকোইরিস (Valle del Arcoíris) বা রেইনবো ভ্যালি আর সল্ট মাউন্টেন। এটি সান পেড্রো ডি আতাকামা থেকে প্রায় ৯০ কিলোমিটার দূরে, করডিলেরা ডোমেইকো (Cordillera Domeyko) পর্বতমালায়, সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে বেশ উঁচুতে।
সাধারণত, দূরের ঘনসবুজ পাহাড়ের সামনে হালকা সবুজ রং দেখতে আমরা অভ্যস্ত। কিংবা গাছপালা না থাকলে পাথুরে পাহাড় মানে কালচে বা ধূসর বা বাদামি পাহাড় দেখি। কিন্তু এসব রঙের একফোঁটা অস্তিত্ব নেই এখানে। এই উপত্যকা ও তার চারপাশের পাহাড়গুলো লাল, সবুজ, সাদা আর হলুদের এক অদ্ভুত রঙের মেলায় সেজে রয়েছে। আর সে রঙের বৈচিত্র্যের মূলে খনিজ ও লবণের খেলা।

মাটিতে হয়ে রয়েছে হলুদাভ এক গুল্ম। আতাকামার হোটেলের রিসেপশনেই সুন্দর করে সাজিয়ে রাখা ছিল শুকনো এই গুল্মলতা। গাইডের মুখে মরুভূমিতে গিয়ে শুনলাম স্থানীয়দের কাছে নানা ভেষজগুণসম্পন্ন সে গাছের নাম কাচিয়ুয়ো (Cachiyuyo বা katchiyouyoa)। এটি দক্ষিণ আমেরিকার স্থানীয়, লবণাক্ত মাটিতে জন্মানো কষ্টসহিষ্ণু এক গুল্ম, যার লবণ সহ্য করার ক্ষমতা অসীম।

রামধনু পাহাড়ের এই বিচিত্র রঙের পিছনে রয়েছে কোটি কোটি বছরের টেকটনিক মুভমেন্ট, আগ্নেয়গিরির লাভা উদগীরণ এবং বিভিন্ন খনিজের রাসায়নিক বিক্রিয়া। যেমন মাটিতে প্রচুর পরিমাণে আয়রন অক্সাইড থাকার কারণে পাহাড়ের রং কোথাও লাল। এরপর আশ্চর্য হলাম জেনে যে, আতাকামা তামার জন্য বিখ্যাত। তাই পাহাড়ের কোথাও দীর্ঘ এলাকা জুড়ে শুধু নীলচে বা সবুজ। কপারের নানা ‘সল্ট’ (রাসায়নিক যৌগ) রয়েছে এই পাহাড়ে। মনে পড়ে গেল, ইনঅরগ্যানিক কেমিস্ট্রি (অজৈব রসায়ন) বইতে পড়া ‘আটাকামাইট’ নামে কপারের একটি মিনারেলের নাম। তার সঙ্গে আতাকামার সম্পর্ক এদ্দিনে বোঝা গেল।

সবুজ ও নীলচে আভার পাহাড় শ্রেণি। কপার বা তামা অক্সিডেশনের (জারণ) ফলে সবুজ রং ধারণ করেছে। গাইড সঠিক বলতে না পারায়, হাতের মুঠোয় থাকা গুগলকে জিজ্ঞেস করতে সদুত্তর পেলাম। ১৮০২ সালে চিলির বিখ্যাত এই আতাকামা মরুভূমিতেই প্রথম এই মিনারেল আবিষ্কৃত। তাই এর নাম রাখা হয় ‘আটাকামাইট’। রাসায়নিকভাবে এটি একটি হাইড্রেটেড কপার ক্লোরাইড খনিজ (যার রাসায়নিক সংকেত Cu₂Cl(OH)₃)। এবার বোঝা গেল আতাকামার এক অংশের এই পাহাড় শ্রেণির এমন পান্না-সবুজ রঙের মাহাত্ম্য।

প্রথমে কেবলই ম্যালাকাইট গ্রিনের কথা মনে হচ্ছিল, কিন্তু ম্যালাকাইটের জন্য এমন শুষ্ক পরিবেশ তো লাগে না। পরে বুঝলাম অক্সিজেন, সল্ট ও জলের রাসায়নিক বিক্রিয়ায় আটাকামাইট এমন রং ধারণ করে। বোঝা গেল, পেরুতে লামা নামক চতুষ্পদের যে আইকনিক ধাতব রেপ্লিকা কিনেছি, তার পিঠে কেন তামার পাতের উপর বোঝা চড়ানো।

এরপরেই চিত্ত বিগলিত ধবধবে সাদা পাহাড় দেখে। আর তার মূলে পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে জমে থাকা ক্যালসিয়াম সালফেট (Gypsum) এবং লবণের আস্তরণ। কবির ভাষায়, সেই জিপসামের আস্তরণ পাহাড়ের গায়ে ‘calcium’s sleeping feet.’ মূর্ত তখন চোখের সামনে। যেন লবণ হ্রদের চোরাস্রোত অন্তঃসলিলা হয়ে বয়ে গেছে পাহাড়ের মধ্যে দিয়ে। কখনও কখনও রোদ পড়ে তা মাইকার মতো চকচক করলেও মোটেও মাইকা বা অভ্র নয়। ভূতত্ত্ববিদদের কাছে চোখ ধাঁধানো এই রামধনু পাহাড় যে গবেষণার বিষয়, তা বলাই বাহুল্য। আতাকামার এই রূপ উঠে এসেছিল পাবলো নেরুদার কবিতায়।

অনুবাদক Jack Schmitt-এর ভাষায় আজ বড় প্রাসঙ্গিক মনে হল কবিতাটি সেই মরুভূমির রঙিন রূপরহস্যের কথা লিখতে গিয়ে।
‘Atacama’
‘Insufferable voice, disseminated
salt, substituted
ash, black bouquet
on whose extreme dewdrop the blind moon
rises, through grieving galleries of copper.’
আহা! তখনই মনে পড়ে রম্যাণি বীক্ষ্য! কী দেখিলাম! জন্মজন্মান্তরেও ভোলা মুশকিল!
‘O mother of the ocean!, maker
of blind jasper and golden silica’
অথবা যেখানে কবি নেরুদার অনুবাদে রয়েছে,
‘Land, land
above the sea, above the air, above the gallop
of the horsewoman full of coral’
আহা! তখনই মনে পড়ে রম্যাণি বীক্ষ্য! কী দেখিলাম! জন্মজন্মান্তরেও ভোলা মুশকিল!
‘O mother of the ocean!, maker
of blind jasper and golden silica’
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত