(Mithu Mukherjee Obituary)
আমার জীবনের প্রথম হলে গিয়ে সিনেমা দেখা, শ্যামবাজার-হাতিবাগানের সেই রাধা সিনেমা হলে।
সেদিনের কথা তেমন কিছু মনে নেই, কিন্তু ওপেনিং সিনের সেই ঝাড়ু হাতের নাচ আর ‘চিচিং ফাঁক’, কেমন যেন রুপালি রং নিয়ে এখনও চকচকে। ছবিটা ছিল পরিচালক দীনেন গুপ্তর ‘মর্জিনা আবদাল্লা’, সলিল চৌধুরীর সংগীত পরিচালনা। রাধা সিনেমা হলটা আজ আর নেই, আমাদের ছোটবেলার অজস্র সিঙ্গল স্ক্রিন থিয়েটারের মতোই হারিয়ে গেছে কালের গর্ভে। মাথার উপরের মানুষগুলোও আজ আর কেউ নেই।
আরও পড়ুন: যোগমায়া থেকে স্টাইনেম, ও আমাদের মায়েরা
কেমন একটা ‘নেই’ রাজ্যের বাসিন্দা হয়ে গেছি এখন, অথচ চারিদিকে ‘আছের’ সংখ্যা অনেক অনেক বেশি। চারিদিকের এত ‘আছে’র হট্টগোলের মাঝে আছে আমাদের পিছুটান, আছে ফেলে আসা দিনের জমিয়ে রাখা গল্পগুলো, যা মাঝে মাঝে খবরে না-থাকা গল্পদের ভিতর থেকে হঠাৎ ঝুলি থেকে বেরিয়ে পড়ে। ভাসিয়ে নিয়ে যায়।

স্মৃতিটুকুর কাছে যখন ফিরে আসি, তখন জলছবির মতো কতকিছু আস্তে আস্তে পরিষ্কার হয়ে ওঠে। তখন আমরা less is more জগতের বাসিন্দা ছিলাম। আজকের মতো জাঁকজমক ছিল না, কিন্তু গল্প শোনা আর পড়ার একটা অদ্ভুত আনন্দ ছিল। ঘরে বড়দের মুখে আরব্য রজনীর আলিবাবা ও চল্লিশ চোরের গল্প শুনছি। তারই আশেপাশের সময়ে যখন রূপোলি পর্দায় মর্জিনাকে দেখলাম, আবদাল্লা ও সেই বিশাল বিশাল চল্লিশটা জালা দেখলাম; আমাদের গল্পে শোনা রাজকাহিনি সত্যি হয়ে উঠল। আমাদের চোখে তখন নতুন আলো এসে পড়ল।
মিঠু মুখোপাধ্যায় চলে গেলেন। আর তাঁর সঙ্গে সঙ্গে যেন চিরকালের মতো নিভে গেল আমাদের শৈশবের সেই একফালি রঙিন আলো। সকালে খবরটা শোনার পর থেকেই মন কেমন। না, শুধু মিঠু মুখোপাধ্যায়ের জন্য নয়, আমাদের জীবনের হারিয়ে যাওয়া প্রিয়জনদের জন্যেও। কেউ ডাকেনি, তাও পিছু ফিরে দেখা। মনে হচ্ছে, শুধু একজন অভিনেত্রী চলে যাননি, আমাদের বড় হয়ে ওঠার পুরো সময়টা, নিষ্পাপ ছোটবেলার সেই সোনাঝরা দিনগুলো একঝটকায় কিছুটা ওপারে চলে গেল।

সত্তরের দশকে বাংলা সিনেমায় তাঁর রূপ ও ব্যক্তিত্ব ছিল একদম আলাদা। শুধু ‘ভলপচুয়াস’ বা লাস্যময়ী সুন্দরীই ছিলেন না, তাঁর চোখের কোণে লেগে থাকত এক দুরন্ত দুষ্টুমি, মুখে এক অদ্ভুত বুদ্ধিমত্তা ও কৌতূহল। একদিকে রাখি, সুপ্রিয়া দেবী বা অপর্ণা সেনের মতো অভিনেত্রীদের নিজস্ব ধারা; অন্যদিকে সুমিত্রা মুখার্জি, আলপনা গোস্বামী, লিলি চক্রবর্তী, আরতি ভট্টাচার্যদের মতো সমসাময়িকদের ভিড়ে মিঠু ছিলেন এক ফুরফুরে হাওয়া। হাসিখুশি, খুনসুটিতে ভরপুর মজাদার।
তবুও ‘পাগলা গারদ কোথায় আছে’ কিংবা ‘তা বলে কি প্রেম দেবে না’ গানগুলো আমাদের পুরো প্রজন্মকে এক অন্য জগতে নিয়ে গিয়েছিল। চঞ্চল চোখ আর আবেদনময়ী চেহারার মিঠু মুখোপাধ্যায় তখন আমাদের থেকে একটু বড় দাদাদের ক্রাশ, তরুণ হৃদয়ের স্বপ্নসুন্দরী।
সাফল্য সত্ত্বেও, ইন্ডাস্ট্রির প্রতি হয়তো এক গভীর অভিমান তাঁর মনে জমা হয়েছিল। কারণ বাংলা ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি অনেক সময়ই মৃত্যুর আগে শিল্পীর সঠিক মূল্য দেয় না। হয়তো সেই অভিমান আর অবহেলা থেকেই, সুচিত্রা সেনের মতো তিনিও নিজেকে গ্ল্যামারের আলো থেকে একদম গুটিয়ে নিয়েছিলেন, অন্তরালের এক নিভৃত কোণে ঢেকে ফেলেছিলেন। মুম্বইয়ের নির্জনতায় কাটিয়েছিলেন বহু বছর। আর ইন্ডাস্ট্রি থেকে শুরু করে আমরা পুরনো দর্শকেরাও— সময়ের নিয়মে তাঁকে প্রায় ভুলতেই বসেছিলাম। আজ ৭১ বছর বয়সে, ক্যানসারের কাছে হেরে যখন তিনি নিঃশব্দে চলে গেলেন, তখন হঠাৎ আবার সব পুরনো দিনের কথা, পুরনো সিনেমা, পুরনো যাপনের কথা মনে পড়ল।
বাড়িতে আমাদের একটা কনসোল গ্রামোফোন ছিল। তাতে এলপি রেকর্ড ঘুরত, আর প্রথম গানটাই, মনে পড়ে, মর্জিনা আবদাল্লার ‘ও ভাই রে ভাই’। পঞ্চাশ পেরিয়ে এসে আজও গানগুলো কত সজীব, প্রাণবন্ত! ‘চিচিং ফাঁক’ তো আমাদের রোজকার জীবনে এখনও আম-দুধের মতন মাখামাখি করে দিব্যি বেঁচে আছে। সেই যে ‘মার ঝাড়ু মার ঝাড়ু মেরে ঝেটিয়ে বিদেয় কর’, আমাদের প্রজন্মের জীবনে যা কিছু অশুভ আর অপ্রয়োজনীয়, তাকে ঝেঁটিয়ে বিদায় করার এক চিরন্তন অ্যান্থেম! প্রায় দুই দশক হল নেই আমাদের যুবরাজ ‘আবদাল্লা’ রবি ঘোষ! কয়েক বছর আগে আমাদের ছেড়ে গেছেন আলিবাবার পুত্র ‘হোসেন’, দেবরাজ রায়, ইন্ডাস্ট্রি থেকে যোগ্য সম্মান না পাওয়ার একবুক অভিমান নিয়ে। আজ মর্জিনাও গেলেন তাঁর পিছু পিছু।
‘মর্জিনা আবদাল্লা’র পর এল পরিচালক অরবিন্দ মুখোপাধ্যায়ের ‘মৌচাক’। ওফ, সে যেন এক উন্মাদনা! শিয়ালদার ছবিঘর সিনেমা হলের কাছের সেই ‘সেন্ট্রাল সাইকেল স্টোর’, যেখান থেকে আমরা ক্যাসেট আর রেকর্ড কিনতাম, মনের ফ্রেমে বাঁধানো যেন। যত দূর মনে পড়ে, পূরবী সিনেমা হলে গিয়ে ‘মৌচাক’ দেখেছিলাম বাড়ির সবাই মিলে।
গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের লেখা গান আর নচিকেতা ঘোষের জাদুকরী সুর, কণ্ঠে আশা ভোঁসলে ও মান্না দে। ঠাকুমাকে রাগাতে হলে আমার একটা অস্ত্র ছিল, ‘এবার মলে সুতো হবো, তাঁতের ঘরে জন্ম নেব, পাছা পেরে শাড়ি হয়ে দুলবো তোমার কোমরে’ বা আশা ভোঁসলের কণ্ঠে ‘বেশ করবো প্রেম করবো করবই তো’। গান শুরু করলেই শুনতে হত, ‘গানের এই ডা কি ভাষা! আজকালকার পোলাপাইনগুলা দেহি আজেবাজে শুনতাছে, কানে আঙুল দেওন লাগে। আমাগো সময়ে কত সুন্দর সুন্দর গান আছিল…! পোলাপানদের মুখে এইসব গান এক্কেবারে মানায় না।’
হিন্দিতে বাসু চ্যাটার্জি পরিচালিত ওঁর ‘সফেদ ঝুট’ ছবিটাও দেখেছিলাম টিভিতে, কোনও এক রোববারে, তারপর আমরাও বড় হয়ে গেছি, আর উনিও কীভাবে যেন মিলিয়ে গেলেন গ্ল্যামারের আলো থেকে দূরে, একেবারে আড়ালে।
তবুও ‘পাগলা গারদ কোথায় আছে’ কিংবা ‘তা বলে কি প্রেম দেবে না’ গানগুলো আমাদের পুরো প্রজন্মকে এক অন্য জগতে নিয়ে গিয়েছিল। চঞ্চল চোখ আর আবেদনময়ী চেহারার মিঠু মুখোপাধ্যায় তখন আমাদের থেকে একটু বড় দাদাদের ক্রাশ, তরুণ হৃদয়ের স্বপ্নসুন্দরী।
আরেকটা ছবির কথা না বললেই নয়, ব্যারাকপুরের অতীন্দ্র সিনেমা হলে গিয়ে দেখা পরিচালক সুশীল বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘স্বয়ংসিদ্ধা’। যৌথ পরিবারের সেই হাই-ড্রামা, মিঠু মুখোপাধ্যায়ের সেই চাবুক হাতে দুরন্ত গৃহবধূর চরিত্রায়ন আজও স্মৃতিতে অমলিন। রঞ্জিত মল্লিক অভিনীত সেই ‘কিচিমিচি কিচিমিচি’ গানটাও কাল্ট হয়ে বেঁচে রইল। আমরা বড় হয়েছি less is more জমানায়, অল্পেতেই আমাদের আনন্দ ছিল বেশি।
মনে পড়ছে, মা আর বড়মানি যখন পরিচালক যাত্রিক-এর ‘হোটেল স্নো ফক্স’ দেখতে গিয়েছিলেন আমাদের ফেলে রেখে, গল্প শোনানো হয়েছিল ‘ডাক্তার দেখাতে যাচ্ছি’! ছোট ছিলাম বলে সেই ‘এ’ মার্কা সার্টিফিকেটের ছবি দেখতে দেওয়া হয়নি। তবে দুধের স্বাদ ঘোলে মিটেছে পরে, টিভিতে। আমাদের ড্রয়িংরুমে যখন ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট টিভি এল, বৃহস্পতিবারের বিকেলটা হয়ে উঠল সপ্তাহের সবচেয়ে বিশেষ দিন, ‘চিত্রমালা’র সময়! পড়ার টেবিলের পড়া তাড়াতাড়ি শেষ করার তাগিদ থাকত একটাই, যাতে টিভিতে দারুণ দারুণ গান দেখতে পাই। মিঠু মুখোপাধ্যায়ের অভিনীত গানগুলো দেখে চিনেছি অনেক সিনেমার নাম।
হিন্দিতে বাসু চ্যাটার্জি পরিচালিত ওঁর ‘সফেদ ঝুট’ ছবিটাও দেখেছিলাম টিভিতে, কোনও এক রোববারে, তারপর আমরাও বড় হয়ে গেছি, আর উনিও কীভাবে যেন মিলিয়ে গেলেন গ্ল্যামারের আলো থেকে দূরে, একেবারে আড়ালে।
আড়ালে থেকেও তো তিনি আমাদের মতো অনেকের কৈশোর আর যৌবনের রঙমশাল হয়ে ছিলেন। আমাদের স্মৃতির অ্যালবামে, সেই পুরনো রেকর্ড প্লেয়ারের ঘুরপাকে আর রূপোলি পর্দায় চিরকালের জন্য ‘স্বয়ংসিদ্ধা’ হয়েই বেঁচে থাকবেন।
তবে এভাবেই বেঁচে থাকেন শিল্পীরা। ফোনে স্ক্রোল করতে করতে আবার কোথাও থেমে যাব, পুরনো দিনে পুরনো সিনেমায়। কাল রাতে মুম্বইয়ের ব্রিচ ক্যান্ডি হাসপাতালে যখন শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন, তখন মনে হল সুচিত্রা সেনের মতোই এক নিঃশব্দ রহস্যের যবনিকাপাত ঘটল। চন্দ্র বারোট পরিচালিত মিঠু মুখোপাধ্যায়ের শেষ ছবি ‘আশ্রিতা’ ছিল বক্স অফিসে দারুণ সফল। সেই সাফল্যের শিখরে থেকেই তাঁর এই অদ্ভুত সংযম, নিজেকে একেবারে গুটিয়ে নেওয়া।

হাসিখুশি জীবন, রান্নাবান্নার শখ আর নিজের জগত নিয়ে আড়ালেই কেটেছে ওঁর জীবনের বাকি সময়টা। সাহসের সঙ্গে ‘বেশ করেছি প্রেম করেছি’ গানে চোখে দুষ্টুমি নিয়ে তিনি থেকে যাবেন আমাদের স্মৃতি রোমন্থনে।
আড়ালে থেকেও তো তিনি আমাদের মতো অনেকের কৈশোর আর যৌবনের রঙমশাল হয়ে ছিলেন। আমাদের স্মৃতির অ্যালবামে, সেই পুরনো রেকর্ড প্লেয়ারের ঘুরপাকে আর রূপোলি পর্দায় চিরকালের জন্য ‘স্বয়ংসিদ্ধা’ হয়েই বেঁচে থাকবেন। প্রেমের যৌবন সরসীতে দাঁড়িয়ে তিনি যে বলে গিয়েছেন, ‘রাধার মতো মরতে হলে মরবই তো’!
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
3 Responses
Darun laglo
Bhalo lekha
ভীষণ ভালো স্মৃতি চারণ। আমাদের সময়ের হাটথ্রব মিঠু মুখার্জি কেন যে অন্তর্ধানে চলে গেলেন সে রহস্যের কিনারা পাইনা।