(Ujjhomanush 9)
দিন কিছু আগে একটা রিল এল ফিডে, মিনিট দেড়েক দেখে খুঁজলাম সেটি পডকাস্টের (বা ভিডিয়োকাস্টের) লিঙ্ক। ‘অল দেয়ার ইজ় উইথ অ্যান্ডারসন কুপার’ পডকাস্টে অতিথি ছিলেন শ্যারন স্টোন। গোটা অনুষ্ঠান দেখার সুযোগ হয়নি, স্রেফ মিনিট ৮-৯ পেয়েছি দেখতে এবং মনে হয়েছে, ভাগ্যিস আর দেখতে পাইনি, ঠিক করে নিয়েছি আপাতত, আর খুঁজেও ফিরব না সে এপিসোডে। কারণ আমার দেখতে বা শুনতে পাওয়া অংশে শ্যারন কেমন আগলহীন দিয়ে চলেছিলেন অন্তরের অজস্র বিস্ফোরণের ফিরিস্তি। একটি বিশেষ বিধ্বস্ততার অন্তিম ক্ষণ তিনি বড় কষ্টে, বড় যত্নেও, খোদাই করছিলেন সর্বসমক্ষে। বলছিলেন, তাঁর মায়ের মৃত্যুমুহূর্তের কথা।
আরও পড়ুন: ফুটবল ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো
ডরোথি, তাঁর মা, ৯১ তখন। শ্যারন বলছেন, কেমন তিনি একটি বারের জন্যে মায়ের মুখ থেকে শুনতে চাইছিলেন, যা কোনও কালেও শুনতে পাওয়ার, হয়তো বুঝতে পারারও সৌভাগ্য হয়নি, যে— হ্যাঁ, তোকে বড় ভালোবাসতাম রে, তুই বড় আদরের ছিলি রে, বোঝাতে পারিনি হয়তো, কিন্তু সত্য এই… বিশ্বাস কর মা…
মৃত্যুশয্যায় ডরোথি আর সামনে হয়তো অল্প ঝুঁকে কন্যা শ্যারন, অমন সাংঘাতিক হলিউড স্টার শ্যারন, অপেক্ষা করছেন, মনে মনে মিনতিও করছেন বোধহয় যে, একবার শুধু চলে যাওয়ার আগে এই কথাগুলো বলে যাও মা…

হে পাঠক, এতক্ষণ ভাবছিলেন, গল্প আসলে শ্যারনকে নিয়ে? হ্যাঁ তা বটে, কিন্তু এ গল্প আসলে ডরোথিকে নিয়েও। ডরোথি’র একটি সংলাপ ঘিরে।
শ্যারন বলছেন পডকাস্টে, যে— মা দেখলাম কিছুতেই লড়াই ছাড়ছে না। ওষুধ তার মতো করে কাজ করছে, খানিক জিইয়ে রাখছে মা’কে, তারপর তো এক সময়ে সে ওষুধেরও জোর কমে আসছে, কিন্তু মা তবুও আঁকড়ে থাকছে শেষ নিঃশ্বাস। তারপর আচমকা আমায় ধরে মা বলে ওঠে, আমি কিছুতেই যাব না। এই তীব্র বেঁচে থাকার আর্তি খুব যে আগে মায়ের মধ্যে দেখেছি, তেমন নয়, তাই ভেবে মরছিলাম, কী এমন হল এখন? ঠিক তখনই, মা বলে উঠেছিল, আমি যাব না, ওখানে তো বাবা দাঁড়িয়ে থাকবে… আর মা-ও…
কত উহ্যমানুষ, কত উহ্য সত্তা এ ভাবেই টিকে থাকতে চায় শেষ খড়কুটো আঁকড়ে, আবার এভাবেই মরে গিয়ে মিলিয়েও তো যায় আগুনে আগুনে বা ক’ফুট মাটির মধ্যেও…
তখনও তো আমি বুঝিনি, পডকাস্টের পরবর্তী অংশে শ্যারন কী বলবেন। তিনি ব্যাখ্যা করেছিলেন, ডরোথি’র এই অতলান্ত ভয়ের। কেন কেউ মৃত্যুকে ঠেকিয়ে রেখে বলছে, যে ওখানে তো বাবা থাকবে? যাঁরা মৃত্যু-পরবর্তী কোনও বিশেষ অবস্থানে বিশ্বাস রাখেন, তাঁদের থেকে তো বরং উল্টোটাই শুনে থাকি আমরা, তাই না? যে, শেষমেশ ফের দেখা হবে প্রিয়জনের সঙ্গে, ইত্যাদি… কিন্তু ডরোথি প্রাণপণ চাইছেন সে মিলন স্থগিত থাকুক। কেন? এ কী ভয়?
ডরোথি’র বাবা, অর্থাৎ শ্যারন-এর দাদু, এমনই এক ভয়াবহ চরিত্র ছিলেন, যে কুৎসিততম আচরণ করেছিলেন সারাজীবন, যে রূপ অত্যাচার করেছিলেন পরিবারের ওপর, যে সে ক্ষতচিহ্ন তালু ছিঁড়ে স্থায়ী আস্তানা গড়ে নিয়েছিল ডরোথি’র অন্তরমহলে। এবং সেখান থেকেই ঘুণপোকার মতো কুড়ে কুড়ে খেয়ে পচন ধরাচ্ছিল ডরোথি’র ইহকালে। বুঝতে পারছেন নিশ্চয়ই, ডরোথি যে খুব করে বাঁচতে চাইছিলেন, তা আদৌ নয়, তিনি স্রেফ যেনতেনপ্রকারেণ এড়াতে চাইছিলেন মৃত্যু-পরবর্তী সে দুঃস্বপ্নের সাক্ষাৎ। কারণ তাঁর ভয়, বাবা অন্য কোনওখানে সামনে পেলে, আবার শুরু করবে অকথ্য অত্যাচার…

অতএব ৯১ বছর বয়সী এক ‘মৃত্যুপথযাত্রী’ নিজের ৬৮ বছর বয়সী কন্যার কাছে মিনতি করছেন, যে, না এখন নয়… কিছুতেই নয়…
কত উহ্যমানুষ, কত উহ্য সত্তা এ ভাবেই টিকে থাকতে চায় শেষ খড়কুটো আঁকড়ে, আবার এভাবেই মরে গিয়ে মিলিয়েও তো যায় আগুনে আগুনে বা ক’ফুট মাটির মধ্যেও…
শ্যারন বুঝেছিলেন, আর মা’কে ধরে রেখে লাভ নেই, ছেড়ে দিতেই হবে। হ্যাঁ, কখনও হিসেবনিকেশ হবে না, কখনও জানা হবে না, কেন অদ্ভুত আচরণ করেছিলে অমুক সময়ে, কেন কাছে টেনে নাওনি, ইত্যাদি।
শ্যারন, নিজেও তো দাদুর দেওয়া সে ঘা লুকিয়ে ফিরেছেন বহুকাল, এতটাই যে, তিনি মারা যাওয়ার পর, ফিউনারাল-এ, ছোট শ্যারন ও তাঁরও ছোট বোনের মধ্যে ফিসফিসিয়ে কথা হয়েছিল, যে দেখ না, লোকটা সত্যিই আর ঘুম থেকে উঠবে না তো? শ্যারন এমনকী সবার অলক্ষ্যে এক বার খোঁচা মেরে দেখেওছিলেন, সত্যি লোকটা গেছে তো? তার পর দুই বোনের অপার নিশ্চিন্তি।

ফলে, মা ডরোথি যখন ঠিক সে ভয়ে ঠেকিয়ে রাখছেন মৃত্যু, শ্যারন তাঁকে বলেন— চিন্তা করো না মা, তুমি সাবধানে যাও, ওরা ওখানে কেউ নেই। দাদু জেলে বন্দি আর দিদা, মেন্টাল অ্যাসাইলাম-এ। ডরোথি, কে জানে, এ শুনে খানিক ধাতস্থ হয়েছিলেন কি না…
এক সময়ে, শ্যারন বুঝেছিলেন, আর মা’কে ধরে রেখে লাভ নেই, ছেড়ে দিতেই হবে। হ্যাঁ, কখনও হিসেবনিকেশ হবে না, কখনও জানা হবে না, কেন অদ্ভুত আচরণ করেছিলে অমুক সময়ে, কেন কাছে টেনে নাওনি, ইত্যাদি। থেকে যাবে অব্যক্ত অনেক কিছু। চিরকালীন বন্দোবস্ত হয়ে থেকে যাবে ক্যানসারসম এ অনুভূতি… উপায় নেই, যাবে থেকে… তবু ছেড়ে তো দিতেই হবে।

তাই এক সময়ে শ্যারন, ঘর থেকে মা’কে ছেড়ে বেরিয়ে যান। থামিয়ে দেন মায়ের সঙ্গের ‘শেষ’ সে আলাপ-পর্ব। উহ্য করে রেখে দেন শ্যারন, একশোটা প্রশ্ন, উত্তরের সামান্যতম আশা। ডরোথি-ও যান ছেড়ে এ হাওয়া, এ পড়ন্ত রোদবেলা। শ্যারন এখানে বসে থাকেন না-শুকোনো ঘা নিয়ে, ডরোথি-ও শূন্য হন, সমপরিমাণ না-শুকোনো আরও এক দগদগে ঘা সমেত। উহ্যমানুষের সংখ্যা বাড়ে এভাবে, অলক্ষ্য।
শোনা হয় না কথা, জানা হয় না যুক্তি বা ঘোর অযুক্তি, গত দিনের মানুষ খোলস বদলে আবার আগামী দিনের মানুষে রূপান্তরিত হয়, এভাবেই চলতে থাকে, আর কারও কারও উহ্য এ সত্তা
ঘায়ের অংশকে রেখেঢেকে রাজপথে বেরিয়ে পড়ে তাঁরা, এরপর। শোনা হয় না কথা, জানা হয় না যুক্তি বা ঘোর অযুক্তি, গত দিনের মানুষ খোলস বদলে আবার আগামী দিনের মানুষে রূপান্তরিত হয়, এভাবেই চলতে থাকে, আর কারও কারও উহ্য এ সত্তা, ধীরে ডরোথি’র মতো দান ছেড়ে দেয়।
এক জন উহ্যমানুষের এভাবেই বিলোপ ঘটে।
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত