(Badalbabu Story)
সকাল সাড়ে আটটা নাগাদ রিকশাটা এসে থামল বাড়ির গেটের সামনে। এই সময়টা অর্কর চূড়ান্ত ব্যস্ততা থাকে। অফিস বেরনোর তাড়া। স্নান সেরে এসে বারান্দায় দাঁড়িয়ে গা মুছছিল।
‘মা, হয়ে গেছে, বেড়ে দাও।’ মাকে ভাত বেড়ে দেওয়ার নির্দেশ দিতে দিতেই দেখল রিকশা এসে থেমেছে, আর তারপর রিকশাওলা নিজের সিট থেকে নেমে এক বৃদ্ধকে ধরে নামাল। বৃদ্ধের যে হাঁটার ক্ষমতাও নেই, সেটা বোঝাই যাচ্ছে। রিকশাওলার কাঁধে ভর দিয়ে কোনওমতে নামল। ‘এখন আবার কে এল! উফফ!’
বৃদ্ধকে এক হাতে নিজের গায়ে প্রায় লেপটে নিয়ে অন্য হাতে অর্কদের বাড়ি ঢোকার গ্রিলের গেটটা খুলল রিকশাওলা। মুখে বলল, ‘সাবধানে আসুন।’
বৃদ্ধ কী বলল, কিছুই শোনা গেল না। অর্ক ঘরে ঢুকে দেখল, মা ডাইনিং টেবিলে ভাত বাড়ছে। থালার উপরে ধোঁয়া ওঠা ভাত। ভাতের হাঁড়ি থেকে খোসাসমেত ডিমটা হাতায় তুলে থালার পাশের বাটিতে রাখল মা। বাটিতে নুন, কাঁচালঙ্কা, পেঁয়াজ দিয়ে মাখা আলুভাতে। অর্ক বেশিরভাগ দিনই আলুভাতে, ঘি আর ডিমসিদ্ধ খেয়ে অফিসে যায়। দুপুরের খাবার হয় বাইরে অথবা মা টিফিন বাক্সে ভরে দেয়। রুটি-পরোটা চচ্চড়ি ইত্যাদি।
খেতে বসে অর্ক বলল, ‘একজন বুড়ো লোক ঢুকছে দেখলাম বাড়িতে। রিকশায় এসেছে।’
‘কে?’

‘চিনতে পারলাম না।’
‘ও।’ বলে ডিমের খোসা ছাড়াতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল অর্কর মা তপতী।
আসলে এই বাড়িতে মাঝেমাঝেই অচেনা লোক আসেন। অর্কদের বাড়িতে রাধাগোবিন্দের মন্দির রয়েছে। প্রায় নব্বই বছরের পুরনো অধিষ্ঠিত কুলদেবতা। অর্কর ঠাকুর্দা গোবিন্দলাল ভট্টাচার্য এই অষ্টধাতুর যুগল বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। শালগ্রাম শিলা-ও থাকার ফলে নিত্য তিনবেলা ঠাকুরের বাল্যভোগ থেকে মধ্যাহ্নে অন্নভোগ, সন্ধেবেলায় ভোগারতি সবই হয়। ঠাকুরদা চলে যাওয়ার পর সেই দায়িত্ব নিয়েছিল অর্কর বাবা। রাধাগোবিন্দ অন্ত প্রাণ।
কেউ রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় দুই হাত জড়ো করে প্রণাম করে যায়, কেউ ভিতরে এসে বারান্দায় উঠে প্রণাম সারে। চেনা অচেনা সবরকম মানুষই আসেন। সকলের সঙ্গে যে কথা হয়, তাও নয়। সেই জন্য অর্কর মুখে একজন বাড়িতে আসছে শুনে কোনও ভাবান্তর হল না তপতীর।
ঠাকুর থাকার কারণে অর্ক জ্ঞান হওয়া ইস্তক দেখে আসছে, এই বাড়িতে প্রতিদিন বিভিন্ন সময়ে ভক্তদের আনাগোনা লেগেই রয়েছে। কেউ রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় দুই হাত জড়ো করে প্রণাম করে যায়, কেউ ভিতরে এসে বারান্দায় উঠে প্রণাম সারে। চেনা অচেনা সবরকম মানুষই আসেন। সকলের সঙ্গে যে কথা হয়, তাও নয়। সেই জন্য অর্কর মুখে একজন বাড়িতে আসছে শুনে কোনও ভাবান্তর হল না তপতীর।
খেতে বসল অর্ক। এবার মিনিট পাঁচ-ছয়ের মধ্যে নাকে মুখে গুঁজেই বাইকে উত্তরপাড়া রেলস্টেশন। সেখান থেকে ডাউন ট্রেনে হাওড়া, তারপর বাসে ঝুলে মিন্টো পার্ক। অর্ক একটা ইন্সিওরেন্স কোম্পানির ডেটা এন্ট্রি অপারেটর। মোটামুটি স্যালারি। মা আর ছেলের চলে যায়। গরম ভাতে ঘি দিয়ে খাওয়ার অভ্যাস অর্কর মধ্যে এসেছে পারিবারিক সূত্রে। বাপ ঠাকুরদা দুইজনেই ছিলেন গাওয়া ঘি-এর ভক্ত। পাতে একটু ঘি না পড়লে তাদের ভাত হজম হত না। অর্ক সেই ট্রাডিশন এখনও টেনে চলেছে। ভাত ভেঙে ঘি ঢেলে তার মধ্যে আলুসিদ্ধর দলাটা কিছুটা মেখে নিয়ে মুখে পুরতেই শুনতে পেল, বারান্দায় কেউ একজন ফ্যাসফেসে গলায় ডাকছে। ‘বউদি আছেন নাকি? অ বউদি।’
‘ওই লোকটাই ডাকছে, দেখো তো।’ মুখে ভাত চিবোতে চিবোতে বলল অর্ক।
তপতী বিরক্ত হল। লোকের আসার আর সময় হয় না। এত কাজ পড়ে। নিজের মনে বিড়বিড় করতে করতে ঘর ছেড়ে বেরোল তপতী। অর্কদের বাড়িটা অনেক পুরনো ইংরেজি এল শেপের। লম্বা লাল সিমেন্টের বারান্দার পাশে সার দিয়ে অনেকগুলো ঘর। পূর্বমুখী বাড়িটির ঠিক মাঝের ঘরটি হল ঠাকুরঘর। ঘরের ভিতরে দরজার ঠিক মুখোমুখি সিংহাসনে রাধাগোবিন্দের অধিষ্ঠান। যাঁরা বিগ্রহকে দর্শন, প্রণাম করতে আসেন, বারান্দায় উঠে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ঠাকুরদর্শন করেন। ঠাকুরঘরের দরজা সারাদিন খোলা থাকলেও কোলাপসিবল গেটটা আটকানোই থাকে।
পাঁচ মিনিটের মধ্যে খাওয়া শেষ করে বেসিনে হাত ধুয়ে জুতো পরে বেরোতে যাবে এমন সময় তপতী এসে বলল, ‘বাদলদা এসেছে, তোকে খুঁজছে। বেরোবার সময় একবার দেখা করে যা।’
অর্ক খেতে খেতে শুনতে পেল, মা লোকটার সঙ্গে কথা বলছে। বুড়োটার গলার স্বর কিছুই প্রায় শোনা যাচ্ছে না। মায়ের গলা শোনা যাচ্ছে। মা বেশ গলা চড়িয়েই বলল, ‘এই অবস্থায় বাড়ি থেকে বেরোলেন কেন? পড়ে টড়ে গেলে… আপনি সামনের ঘরে বসুন। আমি চা দিচ্ছি।’
কে এসেছে? খুব সামান্য কৌতুহল হল অর্কর। তবে সেটা স্থায়ী হল না। গপাগপ ভাতের গ্রাস মুখে তুলতে থাকল।

পাঁচ মিনিটের মধ্যে খাওয়া শেষ করে বেসিনে হাত ধুয়ে জুতো পরে বেরোতে যাবে এমন সময় তপতী এসে বলল, ‘বাদলদা এসেছে, তোকে খুঁজছে। বেরোবার সময় একবার দেখা করে যা।’
‘কে বাদলদা?’
‘তোর বাবার বন্ধু বাদল গুপ্ত। মনে নেই? সেই যে আসত…’
মাকে আর মনে করাতে হ’ল না। ‘ওহ হ্যাঁ বুঝেছি। হেব্বি বুড়ো হয়ে গেছে তো, দূর থেকে দেখে চিনতেই পারিনি।’
মা কথাটা এমনভাবে বলল যে অর্ক এড়াতে পারল না। পায়ে জুতো গলাতে গলাতে বলল, ‘যাচ্ছি।’
‘কাছ থেকেও চিনতে পারবি না। কী চেহারা হয়েছে তাকানো যায় না। একবার দেখা করে আয়।’
‘উফফ এখন… একদম সময় নেই মা। দেখা করলেই কথা বলতে হবে।’
‘যা না একবার মুখটা দেখিয়েই বেরিয়ে যাবি। তোকে খুব ভালবাসত ছোটবেলায়।’
মা কথাটা এমনভাবে বলল যে অর্ক এড়াতে পারল না। পায়ে জুতো গলাতে গলাতে বলল, ‘যাচ্ছি।’
‘একবার প্রণাম করিস।’
‘হুঁ।’
একেবারে প্রথম ঘরটা বৈঠকখানা। বাবা যখন ছিল, তখন এই ঘরের মেঝেতে সারাক্ষণ বিছানো থাকত দুটো লালপাড় মাদুর। বাবার বন্ধুরা মিলে এই ঘরে কখনও বসাত কীর্তনের আসর, কখনও এমনিই আড্ডা। কখনও সকালে কখনও দুপুরে, অনেক সময় বিকেলে বসে সন্ধে গড়িয়ে রাত হয়ে যেত। এই ঘরে বসে বাবা ও তার বন্ধুরা কত রাত হরিবাসর করেছে, সেইসব স্মৃতি… ভাবতে ভাবতে একটু অন্যমনস্ক হয়ে যাচ্ছিল অর্ক। নিজেকে মনে মনে ফিরিয়ে এনে উঠে দাঁড়িয়ে কাঁধে অফিসের ব্যাগ নিয়ে গেল বাইরের ঘরে।
অর্ক বাদলজ্যেঠুর সামনে এসে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞাসা করতে গেল বাদলজ্যেঠু কেমন আছ? পারল না প্রশ্নটা করতে। কেমন আছ-র বদলে জিজ্ঞাসা করল ‘জ্যেঠু জল খাবে?’
গত ছয় বছর এই ঘরে আর মাদুর বিছানো থাকে না। বছর দু’য়েক আগে অর্ক একটা রট আয়রনের সোফা আর টি-টেবিল কিনে এই ঘরে রেখেছে। বন্ধুবান্ধব পরিচিতদের কেউ এলে এই ঘরেই বসে। অর্ক ঢুকে দেখল সেই বাদলজ্যেঠু সোফাতে প্রায় এলিয়ে বসে রয়েছে। পা দুটো সামনে টান করে ছড়িয়ে পুরনো অভ্যাসমতো নাচাচ্ছে আর মাথাটা হেলিয়ে চোখ বন্ধ রেখে বিশ্রীভাবে শ্বাস নিচ্ছে। শ্বাসের মধ্যে কেমন একটা ঘরঘরে শব্দ।
মা বলে না দিলে সত্যিই বোঝা কঠিন ছিল, এ সেই বাদলজ্যেঠু মানে বাদল গুপ্ত। মানুষের সুন্দর স্বাস্থ্য যে কী ভয়ংকর হয়ে যেতে পারে, তা প্রথমবার দেখেছিল অর্ক নিজের বাবার সময়। বিশাল চেহারাওলা লোকটা মাত্র দুই বছরের মধ্যে শুকিয়ে গুটিয়ে এইটুকু হয়ে গিয়েছিল, নিজের বাবাকেই চেনা যেত না, গোল মুখে ফোলা গাল দুটো এমনভাবে চুপসে গিয়েছিল যে, পুরো মুখটাই হয়ে উঠেছিল বীভৎস। তাকাতে কষ্ট হত।

বাবা চলে যাওয়ার পর অনেক রাত দুই চোখের পাতা এক করতে পারত না অর্ক। বারবার ওই করুণ চেহারাটা চোখের সামনে ভেসে উঠত। চোখে সামান্য ঘুম এলেও স্বপ্নে চলে আসত কেমো নিতে নিতে কঙ্কাল হয়ে ওঠা বাবা। অর্ক ভাবত, বাবার সেই চিরপরিচিত সুন্দর চেহারাটা কেন যে একবারের জন্যও মনে পড়ে না!
অর্ক বাদলজ্যেঠুর সামনে এসে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞাসা করতে গেল বাদলজ্যেঠু কেমন আছ? পারল না প্রশ্নটা করতে। কেমন আছ-র বদলে জিজ্ঞাসা করল ‘জ্যেঠু জল খাবে?’
বাদল চোখ খুললেন। দুই চোখের কোণে অল্প পিচুটি জমে। সোজা হয়ে বসে ফ্যাসফেঁসে গলায় বললেন, ‘এই তো। তোকেই খুঁজছিলাম। অফিস যাচ্ছিস? বাহ ভাল ভাল। এই বয়সেই তো রোজগার করতে হবে, তা বিয়ে থা করেছিস?’
‘নরেনদার খুব শখ ছিল ছেলের ধুমধাম করে বিয়ে দেওয়ার। বারবার বলত সেই কথা। মেনুও ঠিক করে ফেলেছিল। ডায়েরিতে লেখা ছিল সেই মেনু। যাক, বিয়ে করলে চেষ্টা করিস সেই মেনু রাখতে, নরেনদা খুশি হবে।’
না বলার আগেই ওর পাশে এসে দাঁড়াল তপতী, বলল ‘মেয়ে খুঁজছি।’
‘আজকাল আবার বাপ-মাকে মেয়ে খুঁজতে হয় নাকি? নিজে খুঁজিসনি?’ হেসে জিজ্ঞাসা করল বাদল। গালে বিজিবিজি সাদা দাড়ি, মাথায় কয়েকগাছা সাদা চুল খাড়া হয়ে রয়েছে। শুকনো তোবড়ানো গাল দুটো হাসির কারণে দুইপাশে সরতেই ভিতর থেকে দু-তিনটে মাত্র কালচে দাঁত বেরিয়ে এল। বাকি কটা আর নেই। মুখে ছোপছোপ কালো দাগ।
তপতী বলল, ‘নাহ তার অফিস ছাড়া আর কোনও কিছুরই সময় নেই।’
‘নরেনদার খুব শখ ছিল ছেলের ধুমধাম করে বিয়ে দেওয়ার। বারবার বলত সেই কথা। মেনুও ঠিক করে ফেলেছিল। ডায়েরিতে লেখা ছিল সেই মেনু। যাক, বিয়ে করলে চেষ্টা করিস সেই মেনু রাখতে, নরেনদা খুশি হবে।’
অর্কর আবার মনে পড়ল বাবার মুখটা। শেষ দিকের সেই যন্ত্রণাক্লিষ্ট মুখটা। সারাজীবন হাসিখুশি আমুদে মানুষটার শেষ দুটো বছর যে কী অভিশপ্ত হয়ে উঠেছিল। চলে যাওয়ার দিন সাতেক আগের এক রাতের কথা বারবার মনে পড়ে। অর্ক তখনও চাকরি পায়নি। সারাদিন টিউশন আর চাকরির অ্যাপ্লিকেশন করে। একদিন রাত দশটা নাগাদ রাতের খাবার খেয়ে নিজের ঘরে ঢুকে ক্লান্ত শরীরে বিছানায় সবে গা এলিয়েছে, মা এসে বলল ‘দেখ তো বাবা ডাকছে?’
‘কেন?’ সামান্য বিরক্তই হয়ে উঠেছিল ও।
মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে অর্ক বলেছিল ‘আচ্ছা যাচ্ছি।’ বাবা যে ঘরের বিছানায় প্রায় মিশে গিয়ে সারাদিন শুয়ে থাকত, সেখানে গিয়ে টাঙানো মশারির সামনে জিজ্ঞাসা করেছিল, ‘বলো কী বলছ?’
‘দেখ না, কী যেন বলবে তোকে। আমি বলেছিলাম তুই ক্লান্ত…’
মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে অর্ক বলেছিল ‘আচ্ছা যাচ্ছি।’ বাবা যে ঘরের বিছানায় প্রায় মিশে গিয়ে সারাদিন শুয়ে থাকত, সেখানে গিয়ে টাঙানো মশারির সামনে জিজ্ঞাসা করেছিল, ‘বলো কী বলছ?’
মশারির ভিতর থেকে মিনিটখানেক পর একটা শুকনো চামড়া ঝুলে পরা হাত বেরিয়ে এসেছিল বাবার। ‘আমার হাতটা একটু ধরবি।’

অর্ক গিয়ে বাবার ঠান্ডা হাতটা ধরেছিল। হাত কাঁপছিল অল্প অল্প। ‘কী হয়েছে তোমার? শরীর খারাপ লাগছে?’
‘আমি মরতে চাই না অর্ক।’ মশারির ভিতরে আবছা বাবা ফুঁপিয়ে উঠেছিল সেই রাতে।
উফফ কেন যে… কেন যে সেই অসহ্য দৃশ্যগুলো বারবার মনে পড়ে।
অর্ক ঝুঁকল বাদলজ্যেঠুকে প্রণাম করার জন্য। ময়লা, বহু পুরনো সাদাটে একটা পায়জামার নিচে শীর্ণ দুটো পায়ের পাতা। আঙুলে বিশ্রী বড়বড় ট্যারাব্যাকা নখ। হাত ছুঁয়ে প্রণাম করতে একটু ঘেন্নাই লাগল অর্কর। বাবা যতদিন অসুস্থ ছিল, যখন আর নিজের পরিচর্যা করতে একেবারেই পারত না, তখনও একবেলার জন্যও এমন নোংরা হয়ে ওঠেনি। তার কারণ অবশ্যই মা। বাবা যেদিন বিকেলে চলে গেল, সেদিন সকালেও মা যত্ন করে বাবার পায়ের নখ কেটে দিয়েছিল নেলকাটার দিয়ে।
অর্ক সরে এসে মাকে ইশারায় ডাকল। তপতী কাছে আসতেই অর্ক নীচু গলায় বলল ‘মা আমি কিন্তু এর অবস্থা খুব সুবিধার বুঝছি না। কঠিন কোনও অসুখ হয়েছে। একেবারে শেষ অবস্থা।’
লম্বা একটা শ্বাস ছাড়ল অর্ক। আবার ভাল করে তাকাল বাদলজ্যেঠুর দিকে। যেভাবে শ্বাস নিচ্ছে, তাতে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে আর বেশিদিন আয়ু নেই। বেশিদিন কেন, বেশিক্ষণও না থাকতে পারে।
‘বস, তোকে কতদিন দেখি না, একটু কথা বলি।’
‘ওর এখন বসার সময় নেই বাদলদা। অফিস রয়েছে। দেরি হয়ে যাবে।’ বলল তপতী।
‘অহ আচ্ছা যা, আমি আছি… আমি আছি…’ কয়েকবার বলল বাদল।
অর্ক সরে এসে মাকে ইশারায় ডাকল। তপতী কাছে আসতেই অর্ক নীচু গলায় বলল ‘মা আমি কিন্তু এর অবস্থা খুব সুবিধার বুঝছি না। কঠিন কোনও অসুখ হয়েছে। একেবারে শেষ অবস্থা।’
তপতী বলল, ‘হ্যাঁ দেখে চেনা যাচ্ছে না। কী শৌখিন মানুষ ছিল আর কী… তুই আর দেরি করিস না, যা।’
ট্রেনে যেতে যেতে পুরনো দিনের কথা মনে পড়ছিল অর্কর। সেইসব দিনগুলো। ঠাকুরদাকে ও চোখে দেখেনি, কিন্তু বাবার আমলে বাড়িতে রাধাগোবিন্দের দোল উৎসব হত। প্যান্ডেল, উদয়াস্ত নামকীর্তন, ভোগারতি, কর্পূর, ধুপধুনোর গন্ধ, সঙ্গে মাইকে শ্রীখোল, হারমোনিয়াম, বেহালা, করতাল আর লীলাকীর্তনের পদ… আহা সেইসব দিনগুলো। এই সাতাশ বছরের জীবনে অন্তত পনেরো-ষোল বছর পর্যন্ত এমন ধুমধাম উৎসব নিজের বাড়িতে দেখেছে অর্ক। বাবা অসুস্থ হওয়ার বছর কয়েক আগে থেকে উৎসবের জাকজমকে ভাঁটা পড়েছিল, কারণ বাবা এত পরিশ্রম করে উঠতে পারছিল না। আসলে শরীর যে তার ভিতরে ভিতরে খারাপ হতে শুরু করেছে, সেটা একেবারে শেষবেলা পর্যন্ত গোপন রাখার চেষ্টা করেছিল।
বাবার বন্ধু মানেই ছিল কীর্তন, কৃষ্ণনামগানের বন্ধু। নারায়ণজ্যেঠু, প্রদীপকাকা, মানিকজ্যেঠু, প্রিয়লালজ্যেঠু, ভদ্রেশ্বরজ্যেঠু আরও অনেক অনেক বন্ধু ছিল। এরা কেউ গাইতে পারত, কেউ বা হারমোনিয়াম বাজাত বা শ্রীখোল অথবা আড়বাঁশি। বাদলজ্যেঠুর উপস্থিতিটা সবথেকে বেশি নজরকাড়া। একেবারে বাবুয়ানি মেজাজ ছিল। মাইনে করা রিকশাওলা ছিল।রিকশাওলার নাম ছিল তপন।
হাফপ্যান্ট অর্ক সঙ্গে সঙ্গে এসে দাঁড়াত জ্যেঠুর গা ঘেঁষে, সিগারেট আর চন্দন মেশানো একটা অপূর্ব গন্ধ! পাঞ্জাবির পকেট থেকে জ্যেঠু বার করে দিত অর্কর জন্য আনা জিনিসটা। তারপর বলত, ‘যা মাকে বল গিয়ে ভাল করে চা বানাতে।’
চাটগাঁ-র বাঙাল বাদলজ্যেঠুর কথাবার্তার মধ্যে সেই টোন ছিল। রিকশা যখন এসে থামত অর্কদের বাড়ির সামনে, অর্ক দেখত ধবধবে সাদা পাঞ্জাবি আর চোস্তা পরে বাদলজ্যেঠু নামছে। দামি পাতলা ফিনফিনে সুতোর কাপড়ের সেই পাঞ্জাবির দুই হাতায় গিলে করা। গলায় নীল সুতোর কাজ, গা থেকে ভুরভুর করে চন্দনের গন্ধ বেরোচ্ছে। পাঞ্জাবিতে সোনার বোতাম, গলায় সরু সোনার চেন, গোল্ডেন ফ্রেম চশমা। কলপ করা কুচকুচে কালো চুল পরিপাটি ব্যাকব্রাশ। ঘিয়ে রঙের কোলাপুরি চটি।
বাদলজ্যেঠু ধীরে সুস্থে বাড়িতে ঢুকত, এক হাতে ধরা থাকত দই বা মিষ্টির বড় হাড়ি, অন্য হাতে ফিলটার উইলস। জ্যেঠুকে দেখলেই মন খুশি হয়ে উঠত অর্কর। কারণ তিনি যখনই আসতেন, অর্কর জন্য কিছু না কিছু নিয়ে আসতেন। কখনও চকলেট, কখনও শোনপাপড়ি অথবা কখনও ক্রিম বিস্কুটের প্যাকেট। এসেই ডাক দিতেন ‘কই আমার বাবা কই?’

হাফপ্যান্ট অর্ক সঙ্গে সঙ্গে এসে দাঁড়াত জ্যেঠুর গা ঘেঁষে, সিগারেট আর চন্দন মেশানো একটা অপূর্ব গন্ধ! পাঞ্জাবির পকেট থেকে জ্যেঠু বার করে দিত অর্কর জন্য আনা জিনিসটা। তারপর বলত, ‘যা মাকে বল গিয়ে ভাল করে চা বানাতে।’
খুব সুন্দর গানের গলা ছিল বাদলজ্যেঠুর। হারমোনিয়াম নিয়ে মাইকে যখন কৃষ্ণওও… বলে সুর বসাত, শ্রোতারা আহা করে উঠতেন। গাইতে গাইতে ভাবের ঘোরে দুই চোখ দিয়ে জল গড়াত। আর অর্কর কষ্ট হত, ভাবত জ্যেঠুর এত কষ্ট কেন? অবশ্য গানের সময় শুধু বাদলজ্যেঠু নয়, বাবাও কখনও কখনও কাঁদত ফুঁপিয়ে। কাঁদত আর গাইত।
প্রতি বছর দুর্গাপুজোর কয়েকদিন আগে জ্যেঠু এসে মাকে একটা শাড়ি দিয়ে বলত ‘বউদি দেখুন পছন্দ হয় কি না।’ মা হাসিমুখে বলত, ‘খুব সুন্দর।’ বাবার থেকে কম করে বছর সাত আষ্টেকের বড় বাদলজ্যেঠু। অর্ক অনেকবার শুনেছে, কখনও বাবা কিংবা মা বাদলজ্যেঠুকে বলছে বাদলদা এবার আর বাছাবাছি করবেন না, বিয়েটা করে ফেলুন। অনেক বয়স হল কিন্তু। এখন যাও বা সম্বন্ধ আসছে, এরপর কিন্তু আর পাবেন না। আপনার দাদা-বউদিদেরও তো বয়স হচ্ছে, তারা আর কদিন দুইবেলা খাওয়াবে আপনাকে?
তিন ভাইয়ের যৌথ পরিবার। বাদলজ্যেঠুই কনিষ্ঠ। বিয়ে-থা না করায় দুই দাদার ঘরেই দুইবেলা আহার। তবে সম্পর্ক তিক্ত হচ্ছিল দিনে দিনে।
বাদলজ্যেঠু সঙ্গে সঙ্গে হাত তুলে বলত, ‘না না এইবছর এক্কেবারে ফাইনাল। ঘটককে বলেছি একটু যেন গায়ের রংটা ফর্সা হয়, আর মুখটা যেন… বউদি বিয়ে ফাইনাল হলে আপনাকে একটা ভাল শাড়ি দেব। একটু রাধাগোবিন্দকে বলুন যেন এবার হয়ে যায়।’
এমনই সহজ মন ছিল বাদলজ্যেঠুর। নাহ বিয়ে শেষ পর্যন্ত আর হয়নি। মেয়ে খুঁজতে খুঁজতে তাঁর খোঁজার বয়সও পেরিয়ে গিয়েছিল। বাবার কাছে অর্ক জেনেছিল, বাদলজ্যেঠুর খরচের হাত যত দরাজ ছিল রোজগারে তেমন মন ছিল না। পৈতৃক সম্পত্তির ভাগ আর নিজে টুকটাক বিজনেস, সেই বিজনেসেরও কোনও ঠিক-ঠিকানা নেই। কখনও ইমারতী কখনও কীর্তনের দল, আবার কখনও মাছ ধরার ট্রলার ভাড়া নেওয়া। মন কোনও কিছুতেই স্থির না থাকার কারণে প্রতিটা বিজনেসেই লস। পকেটে টাকা থাকলেই দেদার খরচ আর শেষ হলেই ধারদেনা করতে পিছপা হত না।
তিন ভাইয়ের যৌথ পরিবার। বাদলজ্যেঠুই কনিষ্ঠ। বিয়ে-থা না করায় দুই দাদার ঘরেই দুইবেলা আহার। তবে সম্পর্ক তিক্ত হচ্ছিল দিনে দিনে। মাঝে মাঝে অর্ক শুনত, বাদলজ্যেঠু খুব আফশোস করে বাবা আর মাকে বলছে বুঝলেন ‘এই বাড়িতে আর থাকতে ইচ্ছে করে না। আমার দুটো দাদাই হাড়ে বজ্জাত।’
বাবা যখন অসুস্থ হয়ে পড়ল, তখনও মাঝে মাঝে বাদলজ্যেঠু আসত বাবাকে দেখতে। হাতে ফলের প্যাকেট। তবে বাবা চলে যাওয়ার পর ওর আসাও কমে গেছিল। শুধু ওর নয়, বাবার বন্ধুরা আর কেউই তেমন আসত না। উৎসবগুলো সবই একে একে বন্ধ হয়ে গেল। কে করবে?
রাত সাড়ে আটটা নাগাদ বাড়ি ফিরতেই রীতিমতো চমকে গেল অর্ক। মা দরজা খুলতে খুলতে নিচু গলায় বলল ‘একটা কান্ড হয়েছে।’
শেষবার বাদলজ্যেঠু সেদিন বাড়িতে এসেছিল সেটাও কম করে বছর চারেক আগে হবে। সেবারও দেখা হয়েছিল অর্কর সঙ্গে। চেহারা-বেশভূষা সেবারেও যথেষ্ট মলিন ছিল, কিন্তু এবারের মতো নয়। এমন অবস্থা কী করে হ’ল কে জানে…!
রাত সাড়ে আটটা নাগাদ বাড়ি ফিরতেই রীতিমতো চমকে গেল অর্ক। মা দরজা খুলতে খুলতে নিচু গলায় বলল ‘একটা কান্ড হয়েছে।’
‘কী?’
‘বাদলদা যায়নি। রয়ে গেছে।’

‘মানে!’ জুতোটা খোলার আগেই থমকে গেল অর্ক। ‘কেন যায়নি?’
‘জানি না। প্রথমে বলল, দুপুরে ভোগ খাবে। না তো বলতে পারি না। ঠিক এই কটা ভাত আর সামান্য তরকারি মুখে দিলেন। কোনওকালেই বেশি খেতেন না। এখন একেবারে পাখির আহার। খেয়ে উঠে বললেন, বুঝলেন বউদি আমি কটা দিন এখানে থাকব। সাতটা দিন আমি একটু থেকে তারপর চলে যাব।’
‘মানেটা কী? তুমি রাজি হয়ে গেলে?’ বিরক্ত হয়ে উঠল অর্ক।
‘আরে আমি বললাম, আপনার শরীর এমন অসুস্থ এখানে কে দেখাশোনা করবে? তো বললেন আমাকে কোথাওই কেউ দেখার নেই বউদি। কিচ্ছু দেখাশোনা করতে হবে না। আমাকে ওই সকালে আর বিকেলে এককাপ করে চা দেবেন। দুপুরে একটু ভাত আর রাতে বাতাসা দিয়ে একটু মুড়ি ব্যাস। বলে তোর বাবার ঘরে শুয়ে পড়ল।’
তপতী বলল ‘আসলে কী করে বলি বলতো চলে যান? ভাল করে কথা পর্যন্ত বলতে পারে না এমন শ্বাসকষ্ট। সন্ধেবেলা এইটুকু মুড়ি দিয়েছিলাম তাও পুরোটা খেতে পারেনি। সারাদিন ধরেই শুয়ে রয়েছে।’
‘বাহ শুয়ে পড়ল আর তুমি কিছু বললে না!’ বিরক্ত হয়ে উঠল অর্ক। ‘কী অবস্থা দেখেছ চেহারার? আজ আছে কাল নেই অবস্থা। শরীরে কী রোগ ধরেছে কেউ জানি না, কেন এতদিন পর আচমকা এসেছে তাও জানা নেই।’
তপতী বলল ‘আসলে কী করে বলি বলতো চলে যান? ভাল করে কথা পর্যন্ত বলতে পারে না এমন শ্বাসকষ্ট। সন্ধেবেলা এইটুকু মুড়ি দিয়েছিলাম তাও পুরোটা খেতে পারেনি। সারাদিন ধরেই শুয়ে রয়েছে।’
‘তোমাকেও বলিহারি! ধরো আজ রাতেই যদি মরে যায়, তখন সেই ঝামেলা কে পোহাবে? দেখে মনে তো হয় না আর সাতকুলে কেউ রয়েছে বলে। তখন কোথায় দৌড়ব আমি?’
তপতী কী বলবে বুঝতে না পেরে হাঁ করে মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘না না মরবে কেন? অত খারাপও নয়, তাহলে নিজে নিজে এলেন কী করে…’ বলেই একটু থামল তারপর যেন নিজের মনেই বলল, ‘সন্ধেবেলায় যখন চা দিলাম আমাকে বললেন, বুঝলেন বউদি নরেনদার বড় সৌভাগ্য রাধাগোবিন্দের চরণের কাছে নিজের প্রাণটা গিয়েছে। আহা আমারও যদি নরেনদার মতো ভাগ্য হত…’
‘মা তুমি এটা শোনার পরেও থাকতে দিলে!’ প্রায় আর্তনাদ করে উঠল অর্ক। ‘এবার বুঝতে পেরেছ তো ওর এখানে আসার কারণ? এখানে মরতেই এসেছে। সকালে চেহারা দেখেই বুঝেছি ঘরবাড়িও গেছে, কিচ্ছু নেই। হায় ভগবান!’
‘দাঁড়া দাঁড়া তুই অত অস্থির হস না। আমার মনে হয় না এসব কিছু… খারাপও লাগে অর্ক। একসময় কী ছিলেন মানুষটা। তোর বাবাকে খুব ভালবাসতেন।’
তপতী এবার আর কিছু বলার মতো খুঁজে পেলেন না। বরং ছেলের যুক্তির কাছে হেরে গিয়ে অসহায়ভাবে বললেন ‘দেখ কী করবি। তুই কথা বল। তবে… আজ রাত্তিরটা ছেড়ে দে। এত রাতে কোথায় যাবে বল?’
‘মা এখন এসব ভেবে লাভ নেই। বরং এটা ভাব যদি কিছু একটা হয়ে যায়…’
‘আরে বারবার একই কথা বলছিস! দুম করে কি কেউ মরে যায়? দেখছিস তো কথা বলছে, হাঁটছে…’
‘যদি নিজে নিজে মরতে চায়?’ এতক্ষণ ধরে মাথার ভিতর ঘুরপাক খেতে থাকা কথাটা মাকে বলেই ফেলল অর্ক।
ছেলের কথা শুনে কেমন যেন চমকে উঠল তপতী। ‘কী বলছিস?’
‘খুব ভুল কি বলছি? এমন সম্ভাবনা কি থাকছে না?’
তপতী এবার আর কিছু বলার মতো খুঁজে পেলেন না। বরং ছেলের যুক্তির কাছে হেরে গিয়ে অসহায়ভাবে বললেন ‘দেখ কী করবি। তুই কথা বল। তবে… আজ রাত্তিরটা ছেড়ে দে। এত রাতে কোথায় যাবে বল?’
অর্ক কিছু বলল না। নিজের ঘরে ঢুকে জামা
কাপড় ছেড়ে আগেই সোজা গেল বাদলজ্যেঠু যে ঘরে শুয়ে রয়েছে সেখানে। জ্যেঠু বাবার খাটটায় চিৎ হয়ে শুয়ে রয়েছে। পরনে একটা হলদেটে স্যান্ডো গেঞ্জি আর লুংগি। মানে এই দুটো জিনিস ওর সঙ্গেই ছিল। চেহারাটা বিছানায় মিশে গিয়েছে। অর্ক একবার মনে করার চেষ্টা করল, বাবার চেহারা কি শেষ দিকে এতটাই খারাপ হয়েছিল? না বোধহয়। হলেও অন্তত এর মতো হতভাগ্য ছিল না বাবা।
বাদলজ্যেঠু চিৎ হয়ে শুয়ে পা নাচাচ্ছে। চোখ বন্ধ এবং হাতদুটো বুকের উপরে জড়ো করা। বিছানার পাশে রাখা জলের বোতল, গ্লাস, খালি চায়ের কাপ প্লেটের উপর রাখা।
চোখ মেলল বাদল। অর্কর দিকে তাকিয়ে কয়েক সেকেন্ড ভুরু কুঁচকে তাকিয়ে তারপর বলল ‘না না ঘুম কই? বোস। অফিস থেকে কখন এলি?’
‘জ্যেঠু ঘুমোচ্ছ?’ জিজ্ঞাসা করল অর্ক।
চোখ মেলল বাদল। অর্কর দিকে তাকিয়ে কয়েক সেকেন্ড ভুরু কুঁচকে তাকিয়ে তারপর বলল ‘না না ঘুম কই? বোস। অফিস থেকে কখন এলি?’
‘এই একটু আগে।’
‘চা খেয়েছিস?’
‘না খাব।’ বলেই অর্ক সরাসরি জিজ্ঞাসা করল ‘তুমি আজ বাড়ি ফিরলে না?’
‘নাহ বউদিকে বলেছি এখানে কটাদিন থাকব। তারপর ফিরব।’
‘তুমি কি ওই পুরনো বাড়িতেই থাক?’
‘না না সেসব কবে চলে গেছে এখন… ওই থাকি…’

অর্ক যা বোঝার বুঝে নিল। বলল, ‘কিন্তু জ্যেঠু আমি তো মাকে নিয়ে কাল সকালে বেরোবো। মামাবাড়ি মানে বর্ধমানে যাব কয়েকদিনের জন্য। মা তোমাকে কিছু বলেনি?’
‘নাহ বউদি কিছু…’
‘মা… ও মা…’
তপতী বাইরেই দাঁড়িয়েছিল। অর্কর ডাক শুনে ঘরে এসে বলল, ‘কী বলছিস?’
অর্ক বাকিটা ট্যাকল করল, ‘জ্যেঠু, তুমি এক কাজ কোরো, তাহলে কাল সকালে চলে যেও। আমরা ফিরে আসি তারপর আবার নাহয় এসে কয়েকদিন থেকে যেও কেমন… আসলে ওখানে বলা রয়েছে।’
‘তুমি জ্যেঠুকে বলোনি তোমাকে নিয়ে কাল বর্ধমানে যাব।’
‘কই… আমাকে…’
‘আরে তোমাকে বলেছিলাম না কয়েকদিন আগে? ভুলে গেছ?’ বলতে বলতে মাকে চোখ টিপে ইশারা করল অর্ক।
‘ও হ্যাঁ বলেছিলি না… তাই তো…’ কোনও মতে কথাগুলো বলেই ঘর থেকে বেরিয়ে গেল তপতী। অর্ক বাকিটা ট্যাকল করল, ‘জ্যেঠু, তুমি এক কাজ কোরো, তাহলে কাল সকালে চলে যেও। আমরা ফিরে আসি তারপর আবার নাহয় এসে কয়েকদিন থেকে যেও কেমন… আসলে ওখানে বলা রয়েছে।’
‘চলে যাব? আমি যে কয়েকটা দিন…’
‘তুমি তো কিছু বলেও আসোনি। আমাদের কাল যেতেই হবে, খুব দরকার রয়েছে…’ মিথ্যে কথাগুলো বলতে সত্যিই খারাপ লাগছিল অর্কর। আজ সারাদিন ধরে পুরনো জীবনের ছোট ছোট মুহূর্তগুলো মনে এসেছে ওর। অনেকদিন পর স্মৃতির টুকরোগুলো নাড়াচাড়া করতে বড় ভাল লেগেছে, কিন্তু স্মৃতি-ভাবনা আর বাস্তবে বড় ফারাক।
‘তুমি তাহলে কাল সকালে চা-টা খেয়েই যেও।’ বলতে বলতে অর্ক দেখছিল বাদলের আশেপাশে কোনও ওষুধের স্ট্রিপ বা ব্লেড ইত্যাদি কিছু রয়েছে কি না। নাহ কিছুই নেই।
‘আচ্ছা…। চলে যাব তাহলে।’ শান্তভাবে উত্তর দিল বাদল। তারপর আবার চোখ বুজে ফেলল।
সকাল সাতটা নাগাদ রোজ ঘুম থেকে ওঠে অর্ক। আজও উঠল। ওঠামাত্রই মনে পড়ল বাদলজ্যেঠুর কথা। মনে পড়তেই বুকের ভিতরটা গুরগুর করে উঠল।
অর্ক ঘর থেকে বেরিয়ে দেখল মা রান্নাঘরে। হাড়ি থেকে গরম ভাত ঢালছে নতুন একটা থালায়। অর্ক কিছু বলার জন্য একবার থামল, তারপর কিছু না বলেই ঘর পেরিয়ে চলে গেল।
সকাল সাতটা নাগাদ রোজ ঘুম থেকে ওঠে অর্ক। আজও উঠল। ওঠামাত্রই মনে পড়ল বাদলজ্যেঠুর কথা। মনে পড়তেই বুকের ভিতরটা গুরগুর করে উঠল। ধড়মড় করে উঠে ওই ঘরে দেখতে যেতে গিয়ে দেখল, পাশের ঘরে মা স্টিলের আলমারি খুলে বসেছে। এই সকালে জামাকাপড়ের আলমারি খুলে মা কী করছে?
‘মা।’ ডাকল অর্ক।
‘উঁ’ মুখ না ফিরিয়েই উত্তর দিল তপতী। তারপর শুধু বলল, ‘দেখেছি, ঠিক আছে। একটু পরে চা দেব। চা খেয়ে চলে যাবেন বলেছেন। তুই চিন্তা করিস না। মায়ের গলা যেন সামান্য ভারী।’
শুনে কিছুটা নিশ্চিন্ত হল অর্ক। তারপর আবার জিজ্ঞাসা করল ‘তুমি সকালে আলমারি খুলে কী করছ?’
তপতী উত্তর না দিয়ে শুধু বলল ‘রান্নাঘরে চা-টা বসানো রয়েছে একটু ছেঁকে নিবি। তুই তোরটা শুধু নিয়ে নে, আমি আমার আর বাদলদারটা নিয়ে নেব।’
‘খুঁজছি।’ আলমারির ভিতরে হাত ঢুকিয়ে জামা কাপড়ের স্তুপের মধ্যে কী যেন খুব মনোযোগ দিয়ে খুঁজছিল তপতী…। ‘কোথায় যে গেল… এখানেই তো ছিল…’ নিজের মনেই বলতে বলতে আবার বলে উঠল ‘এই তো এতক্ষণে পেয়েছি… বাব্বাহ!’ বলে স্বস্তির শ্বাস ফেলল তপতী।
‘কী ব্যাপার বলো তো। কী পেলে?’
তপতী উত্তর না দিয়ে শুধু বলল ‘রান্নাঘরে চা-টা বসানো রয়েছে একটু ছেঁকে নিবি। তুই তোরটা শুধু নিয়ে নে, আমি আমার আর বাদলদারটা নিয়ে নেব।’

‘হুঁ’ বলে রান্নাঘরের দিকে এগোল অর্ক।
প্রায় আধঘণ্টা পরে অর্ক দেখল বাদলজ্যেঠু তৈরি হয়ে বেরোচ্ছে। ঠাকুরঘরের সামনে এসে রাধাগোবিন্দকে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করল, সম্বল বলতে একটা ছোট পুরনো প্লস্টিক ক্যারিব্যাগ। ওর মধ্যে গতকালকের লুংগি আর একটা গামছা। প্রণাম সেরে মেঝেতে-দেওয়ালে ভর দিয়ে কোনওমতে উঠে দাঁড়াল। মা এসে সামনে দাঁড়িয়েছে।
‘বউদি চলি তাহলে’ ফ্যাসফেসে গলায় বলল বাদলজ্যেঠু।
‘একটু দাঁড়ান বাদলদা। অর্কর বাবা খুব শখ করে এই তসরের পাঞ্জাবিটা বানিয়েছিল। পরতে পারেনি, অর্ক তো পাঞ্জাবি পরে না। আপনি পরবেন? নিন এটা।’ বলে হাতে ধরা একটা পাট করা গোলগলা পাঞ্জাবি বাদলজ্যেঠুর দিকে এগিয়ে দিল মা।
‘আমাকে দিচ্ছেন?’ আবার কোঁচকানো গালে টান দিয়ে হাসল বাদলজ্যেঠু। চোখ দুটো জুলজুল করে উঠল উটকো আনন্দে। হাতের প্লাস্টিকটা মেঝেতে নামিয়ে রেখে পরম যত্নে দুই হাত বাড়িয়ে পাঞ্জাবিটা নিয়ে বড় আদরে দেখল তারপর বলল ‘পরেই নিই কী বলেন?’
পাঞ্জাবি পরতে গিয়েও যেন হাঁফিয়ে উঠল। তারপর পুরনো পাঞ্জাবিটা পাকিয়ে প্লাস্টিকে ভরে নিয়ে বলল, ‘চলি বউদি। আসি রে অর্ক, মাকে সাবধানে নিয়ে যাস।’
‘হ্যাঁ যা ইচ্ছে আপনার।’
ওখানে দাঁড়িয়েই নিজের গায়ের ময়লা কোঁচকানো প্রাচীন পাঞ্জাবিটা গা থেকে ছেড়ে শতছিন্ন স্যান্ডোগেঞ্জির উপর ওই নতুন ঝকঝকে ঘিয়ে রঙের পাঞ্জাবিটা পরল বাদলজ্যেঠু। পাঞ্জাবি পরতে গিয়েও যেন হাঁফিয়ে উঠল। তারপর পুরনো পাঞ্জাবিটা পাকিয়ে প্লাস্টিকে ভরে নিয়ে বলল, ‘চলি বউদি। আসি রে অর্ক, মাকে সাবধানে নিয়ে যাস।’
বারান্দার নিচে রাখা অর্ধেক ক্ষয়ে যাওয়া চটিতে পা গলিয়ে খুব ধীরে ধীরে পা ফেলে বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে গেল বাদলজ্যেঠু। অর্ক আর তপতী দুজনেই চুপ করে তাকিয়ে থাকল, যতক্ষণ না সেই পাঞ্জাবিটা ওদের দৃষ্টির আড়ালে চলে যায়।
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত