(Ujjhomanush 14)
ভিআইপি রোডের ধার, একটু ভিতর দিক, আসলে একটু বেশিই ভিতর দিক, অনেকটা বাঁকানো রাস্তা, অলিগলি। সেখানে সেদিন রাত। বিশ্বকর্মা পুজো শেষ হয়েছে পাশে কোথাও, মাংস-ভাতে উৎসবমুখর সে প্রান্ত। হাওয়া কেটে কেটে বৃদ্ধের জানলার পাশ দিয়ে পাঠাচ্ছে ‘জানে জিগর জানে মন, তুঝকো হ্যায় মেরি কসম…’, সেই কবেকার ‘আশিকি’ ছবির গান।
আরও পড়ুন: জলের মধ্যে উহ্য জলেই কঙ্কাল
বিছানায় বৃদ্ধ তখন বারান্দায় দেখছেন ঘোর রোদ্দুর। ছায়া বিছানো সাম্রাজ্য সে রোদের। মায়া বিছানোও কি নয়? এখন বুঝতে বাকি থাকে না, সে বৃদ্ধ আসলে দেখছেন অনেক কাল আগের কোনও এক রোদ, সে রাতে বসে। বৃদ্ধ মুখে তুলছেন না রুটি-ভাত। রাতের ওষুধ খাবে কী করে তাহলে? প্রশ্নটা দেওয়ালে ধাক্কা খেয়ে ফিরে আসার প্রশ্নও নেই, কারণ সে প্রশ্ন তো পৌঁছতেই পারেনি তাঁর কাছে।
আলো ঝলমলে বৃদ্ধের রোদে, আরও কিছুক্ষণ পর ফিরবেন সে বৃদ্ধের ঈশ্বরসম পিতা। মস্ত মানুষ তিনি। এখনও অনেকে বলেন, বাঙালির পুজো আসে তাঁরই কলম ধরে। ফিরে এসে তিনি কাছে নিয়ে বসবেন হয়তো সন্তানসন্ততিদের, বলবেন কীভাবে তৈরি হল এক আশ্চর্য! আর সে কথা শুনে গর্বে, আহ্লাদে, আবেগে ভেসে যাবে এখনকার এই বৃদ্ধ।

শুনেছে সে বাড়ির প্রতিটা মানুষ এ গল্পের সমাহার, যে কী করে তিন-চার বন্ধু মিলে রেডিও অফিসে-আপন ঘরেও অনবদ্য এক ঘোর লাগিয়ে দিচ্ছেন। একটা আনকোরা মণ্ড নিয়ে ক্রমশ, কীভাবে তাঁরা অভূতপূর্ব এক রূপ সৃষ্টি করে ফেলছেন, এমন এক রূপ, যা অনপনেয়, চিরন্তন হয়েই থেকে যাবে যেন। ও বাড়ির সব্বাই সে গল্প জানে, মুখস্থ প্রায়, যেমনটা উপরে উল্লিখিত, কিন্তু সে বৃদ্ধ? যিনি তাঁর প্রথম মুহূর্ত থেকেই দেখে এসেছেন সেই সুতো খোলতাই, সেই মহীরূহ নির্মাণ, তিনি কি সত্যই এ গল্প আদৌ ধরতে পেরেছেন পূর্ণ রূপে এখনও? নাকি তিনি এ কালেও বসে আসলে বারে বারে ফিরে যান সেই অস্ত যাওয়া রোদে, স্রেফ সে অপূর্ব অতীতকে, অভূতপূর্ব ‘বাস্তব’কে আরও একবার হাতে নিয়ে পরখ করবেন বলে। বুঝবেন বলে তাঁর জানা ‘সত্য’কে আরও আরও বিশদে। আর এমনটা করতে করতেই, তিনি আটকা পড়ে যাবেন একটা নাছোড় লুপ-এ। এমন এক চৌহদ্দিতে তিনি রয়ে যাবেন, যেখান থেকে হয়তো কখনওই তিনি বেরোতে পারবেন না, বা বেরোতে চাইবেনও না হয়তো।
যেমন সেই বৃদ্ধ বারে বারে শুধু চোখের সামনে হইয়ে নিতেন মহালয়া ভোরের আকাশবাণী-অঞ্চল, গহীন আঁধারেও ফুল ফোটাতেন সেকালের রোদের চলাচলে, সে তাতেই চলে যেত তাঁর অনন্ত-আগামী, সে মায়ার পশম জড়িয়েই তাঁর মিটে যেত একালের যাবতীয় হিসেবনিকেশ।
আশপাশ বলবে, এ বৃক্ষ অসুস্থ হল, তার প্রগাঢ় ছায়ার প্রয়োজন, ডাক্তারি ভাষায় ডিমেনশিয়া, অ্যালঝাইমার্স ইত্যাদি শুনব। তাঁর বেরনো বন্ধ হবে, ছায়ার সঙ্গে যুদ্ধ শুরু হবে, পুনরায় ফিরে যাবেন তিনি ভেবে নেওয়া সত্যে, কল্পিত বাস্তবে, আর আমরা যারা আশপাশ, আরও আরও মুষড়ে পড়ব বা জোর করে জারি রাখব এক মরণপণ লড়াই, জিইয়ে রাখার লড়াই কত কত স্মৃতি, কত কত সত্যি, কিন্তু কোথাও ঠিক মিস হয়ে যাবে আমাদের, সেই বিক্ষিপ্ত মনওলা বৃক্ষের সঙ্গে এক ভেলায় ভেসে পড়ার তাগিদ, সুযোগও। এভাবেই কেউ কেউ উহ্য হয়ে যাবে, হয়ে যায়ও। আমরা ল্যামেন্ট করব, খেদ, খেদ গ্রাস করবে আমাদের। আমাদের সে খেদ নিশ্চিতভাবেই ছোঁবে না তাঁদের। ‘অসুস্থ’ জনকে। একটা ডিভাইড ফুটে উঠবে দিগন্তে। আমরা বৃথাই ছুটে মরব সে দূরবর্তী রাজ্যকে নাগালে পেতে। আর আমাদের মতে অসুস্থ সে বৃক্ষ ছায়া পেয়ে নেবে আদ্যিকালের কোনও ঘটে যাওয়া ‘বর্তমানে’।

যেমন সেই বৃদ্ধ বারে বারে শুধু চোখের সামনে হইয়ে নিতেন মহালয়া ভোরের আকাশবাণী-অঞ্চল, গহীন আঁধারেও ফুল ফোটাতেন সেকালের রোদের চলাচলে, সে তাতেই চলে যেত তাঁর অনন্ত-আগামী, সে মায়ার পশম জড়িয়েই তাঁর মিটে যেত একালের যাবতীয় হিসেবনিকেশ। আর আমরা যুক্তি দিয়ে খুঁজে বেড়াতাম, কখন রাতের ওষুধটা মিস হয়ে গিয়েছিল। তাই বোধহয় এ হ্যাঙ্গাম।
আহা তাই তো বিছানা ভিজিয়ে দিল ভোর ভোর, বেচারি বুঝতেও তো পারল না বিছানা হঠাৎ জলে ভেজেনি, কী মুশকিল ডায়াপার পরিয়েই এর পর কি শোয়াতে হবে… এমনই ভাবনাজগত হয়তো তখন আমাদের আশপাশের। ভুল তো নয়, মোটেও ভুল নয়। আসলে বুঝতে অসুবিধে হয় আমাদের, হয়ই, যে ওষুধ খাইয়ে ওই শুধুমাত্র কিছুটা পথ পাড়ি দেওয়া যায়, অতিক্রম করা যায় না ক্রমে হয়ে যাওয়া উহ্যমানুষের এ দীর্ঘ ছায়াপথ। কারণ, উহ্য যা কিছু, তার হদিশ পাওয়ার শিক্ষা কবেই বা পেয়েছি আমরা? দুই পঙক্তির মধ্যেকার যে খোলা আল, তা ধরে হাঁটতে শেখায়নি আমাদের কোনও প্রতিষ্ঠান। বলেছে সদা হেঁটো শক্ত, বিস্তৃত জমি দিয়েই। তাই ভাঙনে এত অবজ্ঞা আমাদের।
অন্তরে অ্যাদ্দিনের গচ্ছিত ছবির দানা দানা হয়ে চরাচরে মিশে যাওয়া মেনে নিতে না পেরে মাঝে মাঝেই কালবৈশাখীতে আটকে পড়া একলা উন্মাদের মতো ছুটে ছুটে যাই, কুড়িয়ে বুকের কাছে চেপে রাখব বলে, ছড়িয়ে যাওয়া আনন্দকণা।
অতএব ছিন্নপত্র জুটিয়ে, কুড়িয়ে একটা অবয়ব নির্মাণের প্রয়াসে আমরা সহজে নেমে পড়ি না। ডেফিনিট, খুব স্পষ্ট একটা অর্থ চাই আমাদের। না হলে তা অর্থহীন, অ্যাবস্ট্র্যাক্ট। আবার দেখুন, অ্যাবস্ট্র্যাক্ট আর্ট নিয়েও তো কী উচ্ছ্বাস আমাদের। দ্বিচারিতা নয় কি তা? প্রিয় মানুষটিই যখন খোদ এক অ্যাবস্ট্র্যাক্ট আর্টের রূপ নিল, আমরা অসুখ আখ্যা দিলাম তা, বললাম ডিমেনশিয়া, ঘোর অমানিশা। ডাক্তার বলেছেন, ইরিভার্সিবল অর্থাৎ ফিরে আসার পথ নেই, তাই হও বিহ্বল, বা এ তীব্র বিষাদময় পর্বান্তরের সঙ্গে যে করেই হোক করো এক রকম বোঝাপড়া। আবেগ, মায়া, পূর্বস্মৃতি, অভ্যাস যে কী বড় বালাই…

এই ফাঁকেই কখন যে সিঁধ কেটে ঢুকে পড়ে কালান্তক অপেক্ষা, টের পাই না। অন্তরে অ্যাদ্দিনের গচ্ছিত ছবির দানা দানা হয়ে চরাচরে মিশে যাওয়া মেনে নিতে না পেরে মাঝে মাঝেই কালবৈশাখীতে আটকে পড়া একলা উন্মাদের মতো ছুটে ছুটে যাই, কুড়িয়ে বুকের কাছে চেপে রাখব বলে, ছড়িয়ে যাওয়া আনন্দকণা। আবেগ, মায়া নিশ্চিত ভাবেই মানুষকে এমন পর্যায়ে এনে ফেলে, ফেলবে।
প্রিয়তমকে, প্রিয়তম’র স্পষ্ট অবয়বকে আগলে, আঁকড়ে রেখে দেওয়ার এ বৃথা প্রয়াস হৃদয়বিদারক, নিষ্ঠুরও বটে, কিন্তু এ যে কিঞ্চিৎ স্বার্থপরতাও? নয়? ভেঙে যাওয়া দেখতে পারি না বলে, ভাঙনধরা মৃত্তিকায় আঙুল চেপে প্রাণপণ দাঁড়িয়ে যাওয়াই যায়, কিন্তু তাতে কি ভবিতব্য অর্থাৎ প্রিয় বৃক্ষতলের উহ্য হয়ে যাওয়া রোধ করা যায়? যায় না বোধ করি। তাই যদি এই ক্রমশ ভেঙে যাওয়া পর্বকেই আমরা মান্যতা দিই, মানিয়ে নিই তার সঙ্গে, সে অনুযায়ী রি-ক্যালিব্রেট করি নিজেদের, এবং শেখার চেষ্টা করি, বেগতিক দৃষ্টিকোণ দিয়ে সে এক অদ্ভুতদর্শন, কে জানে হয়তো লাভ হলেও হতে পারে। হয়তো তখন, বিশ্বকর্মা পুজোর শেষে ঘোর রাতেরবেলায়ও চেনা বারান্দায় রোদ ওঠানো সম্ভব।

কোথাও তো এক বৃদ্ধ এক বিন্দু হলেও তার মতো করে ‘বুঝবে’ যে, না, এই তো আমার রোদ অন্যরাও স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে। নিশীথসূর্য-ধোওয়া ভিআইপি রোডের ধারের সে বারান্দায় তখন নয় বৃদ্ধ ও তার আত্মজন কান পেতে শুনবে আগমনীর শঙ্খধ্বনি। ঢোকে, ঢুকে আসে রৌদ্রদিন, চিড় ধরা শরীর গলে, আমরা জাস্ট জ়ানতি পারি না। রাত কত হল, কখনও কখনও ম্যাটারই করে না, উত্তর না আসাটাও নয়। নিজ ঘড়িটা কিছুটাও যদি ডিমেনশিয়া-আক্রান্তের সময়ের সঙ্গে মিলিয়ে নেওয়া যায়…
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত