(Ujjhomanush 13)
আজ একটু পার্সোনাল লেখা লিখছি। আমার ফোনের গ্যালারিতে এই ভিডিয়োটা আছে, দেখতাম আগে প্রায়ই, এখন কমে গেছে সে দেখা। কমে গেছে, কারণ এখন অনেকটাই মুখস্থ। মা হাঁটা শিখছে। মায়ের পর পর দু’বছর দুটো সাংঘাতিক বিপন্নতা এসেছিল। প্রথমটা অতি বিরল এক অটো-ইমিউন রোগ, ডাক্তার দেখেই বলেছিলেন, শেষ ২০ বছরে ভারতে মায়ের প্রথম হল, আর দ্বিতীয় বার বড় একটা স্ট্রোক।
মা ওই অটো-ইমিউন রোগ থেকেও অদ্ভুতভাবে জেগে উঠল, তারপর প্রায় স্তব্ধ করে দেওয়া এক স্ট্রোক। স্ট্রোক রিহ্যাব সেন্টারে যখন মা’কে অতি যত্নে, শিশুদের মতো করে ফের হাঁটা শেখানো শুরু হল, কেন জানি না, ঠিক বিশ্বাস হয়নি, মা পারবে। ইন ফ্যাক্ট আমি তখন ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলছি, যে আদৌ এটা প্রয়োজন আছে, কারণ আমি বুঝেই গেছি, যে ফের হাঁটতে শিখলেও, হাঁটতে-চলতে তো আর পারবে না। ফলে…
কিন্তু ওই রিহ্যাব সেন্টারের দক্ষ কর্মীরা ও বিশেষ করে একজন— তীর্থ, হাত ধরে এক ষাট অতিক্রান্ত প্রায় ছারখার হয়ে যাওয়া মানুষকে এগিয়ে নিয়ে গেলেন, পয়েন্ট এ থেকে পয়েন্ট বি অবধি। এবং ওইটিরই ভিডিয়ো তীর্থ আমায় পাঠিয়েছিলেন। আমি রেখে দিয়েছি, রয়ে গেছে, ওই যে বললাম, এখন দেখি না, মুখস্থ হয়ে গেছে। বা বলি, উহ্য হয়ে রয়ে জীবন কাটাচ্ছে সে ভিডিয়ো, ফোনের কোণে।

তারপর মা বাড়ি এল, সেই রিহ্যাব সেন্টারের তীর্থ-র সঙ্গে কথা বললাম— যে পারলে আসবেন, যদি বাড়িতেও ফিজ়িও করাতে পারেন। তীর্থ, অপূর্ব জানে কাজ। কিন্তু ধীরে ধীরে দেখলাম, তীর্থ একটা কথা আমায় বা আমার স্ত্রীকে বলেন না। ওই উহ্য রাখেন অন্দরে। ঠিক করে নেওয়া দিনে আসেন, মা-কে ফিজ়িও করান, বুঝিয়ে সুঝিয়ে, বাবা-বাছা করে আবার মৃদু বকুনি দিয়েও মা-কে হাঁটা শেখাতে থাকেন।
তারপর আমার ভুল হল এক দিন। মা চলে গেল আর আমি তীর্থকে জানাতেই ভুলে গেলাম। জানি লজ্জার, খুব লজ্জার। তালেগোলে, নানা দৌড়োদৌড়িতে গেলাম বেমালুম ভুলে।
আর চলে যাওয়ার সময় অস্ফুটে বলেছিলেন, নিজের মধ্যে চেপে রাখা সেই কথাটা, একটা সারপ্রাইজ়ের কথা। তীর্থ আসলে বলতে শুরু করেছিলেন— আমি তো ভেবেছিলাম দাদা, তোমাদের (আমি ও আমার স্ত্রী) একটা…
তীর্থ একদিন এল, বেল টিপল, তারপর শুনল, মা নেই। ওই ঘরের দিকে, ওই যেখানে শুয়ে থাকত মা, সে দিকে তাকিয়ে তীর্থ কেঁদে ফেলেছিলেন, আমি জড়িয়ে ধরে কিছুটা সামলেছিলাম, শেষ একদিনের ফি অনেক জোর করাতেও নিলেন না, মনে আছে বলেছিলেন তীর্থ— দাদা তা হলে তো মাসিমার সঙ্গে, তোমাদের সঙ্গে মিটেই যাবে কাজ, ওটা থাক, আমি নিতে পারব না।
আর চলে যাওয়ার সময় অস্ফুটে বলেছিলেন, নিজের মধ্যে চেপে রাখা সেই কথাটা, একটা সারপ্রাইজ়ের কথা। তীর্থ আসলে বলতে শুরু করেছিলেন— আমি তো ভেবেছিলাম দাদা, তোমাদের (আমি ও আমার স্ত্রী) একটা…

বাকিটা সেই উহ্যই রেখে দিয়েছিলেন তীর্থ, এখনও অবধি। আমি মাঝেমাঝে ভাবি, বাক্যের শেষটা কোথায় গিয়ে হত। যে আমি তো ভেবেছিলাম তোমাদের একটা সারপ্রাইজ় দেব, যে মাসিমাকে নিয়ে একদিন হাঁটিয়ে একটু বাইরে নিয়ে যাব আর তোমরা ফিরে দেখবে…
এমনই কি বলতে চেয়েছিলেন তীর্থ? কেমন যেন মনে হয়, ঠিক এটাই। অনেক দিন যোগাযোগ নেই তীর্থর সঙ্গে। তাঁর কি এখনও মনে আছে মাকে? আমাদের? মনে হয় আছে। কিন্তু আমার কাছে অধিক জরুরি জানা, ওই উহ্য রাখা কথা, ভাবনা নিয়ে কী করলেন তীর্থ? কেনই বা রেখে দিলেন কথাগুলো না-বলা? বা ওই যে তিনি শেষ দিনের কিছুটা বাকি রেখে দিয়েছিলেন, কেন? তীর্থ ঠিক কোন জিনিসটা জিইয়ে রাখতে চাইলেন? উহ্য থেকে যায় এ সব কিছুই। ভাগ্যিস। সব কি খোলসা হওয়ার কোনও মানে আছে?
আমিও কি দেখিনি, জলের মধ্যে উহ্য সে জলেরই কঙ্কাল? দেখেছিলাম। কতটা বুঝেছিলাম, এখনও ভেবে মরি, খুঁজে মরি। কিন্তু সত্যি খুঁজে ফেরার আদৌ কোনও অর্থ হয় কি? দুই কন্যার মধ্যেকার আশ্চর্য উপত্যকা কি সত্যিই নো-ম্যানস ল্যান্ড নয়?
যেমন, ওই শেষ রাত। তখনও জানি না ওইটেই শেষ। ঈশ্বরসম ডাক্তার জানিয়েছিলেন যদিও। তিনি আমায়, আমার স্ত্রীকে বড় মায়া নিয়ে, যত্ন করে বুঝিয়েছিলেন অবস্থা। দেখিয়েছিলেন খাদের কতটা কিনারে আমরা দাঁড়িয়ে। তারপর আমায় পরম স্নেহে প্রশ্ন করেছিলেন, কী করবেন, জোর করে আটকে রাখবেন? আমরা সে চেষ্টা, আপনি বললে চালিয়ে যাব, নাকি…
যখন বুঝেছিলাম জোর করে ধরে রাখা হচ্ছে, অবধারিত যা, তাকে স্রেফ কিছুটা বিলম্বিত করাটাই হবে মাত্র, তখন আমি সায় দিয়েছিলাম, যে থাক, ইনভেসিভ কিছু আর না করা হোক, মা নিজে থেকে নিভে যাক। আমার বাড়ির গুরুজনেদের জানাই আমার সিদ্ধান্ত। তারপর আমি আর আমার স্ত্রী রাত অবধি বসে থাকি নার্সিং হোমের করিডোরে। কিছু পর সই করব আমি অমোঘ এক বাক্যের নীচে।

কত কথা আমরা নিজেদের মধ্যে বলে চলি অনর্গল আর কত অন্তরের ঝড়কে কাঁথাচাপাও দিই দু’জনে। তারপর যখন চলে আসছি, আমার স্ত্রী গিয়েছিল মায়ের কাছে। মা প্রায় নিথর। আমার স্ত্রীয়ের সঙ্গে আত্মীক যোগে কোন অদৃশ্য কথা হয়েছিল জানতে চাইনি, শুধু ও দেখেছিল চোখ দিয়ে একটা সরু জলের ধারা গড়িয়ে পড়েছিল।
আমিও কি দেখিনি, জলের মধ্যে উহ্য সে জলেরই কঙ্কাল? দেখেছিলাম। কতটা বুঝেছিলাম, এখনও ভেবে মরি, খুঁজে মরি। কিন্তু সত্যি খুঁজে ফেরার আদৌ কোনও অর্থ হয় কি? দুই কন্যার মধ্যেকার আশ্চর্য উপত্যকা কি সত্যিই নো-ম্যানস ল্যান্ড নয়?
নিজের মধ্যে বয়ে নিয়ে বেড়াতে এ ভার, খানিক অপূর্বও বোধ হয়। ঝুরঝুর করে পড়ে গিয়ে ছত্রখান হওয়া বালিধুলো কাঁচিয়ে নিয়ে ফের এক বেদনার ইমারত নির্মাণ করাই বোধহয় ভবিতব্য। করে যাই সেটুকু আপাতত।
ওই নো-ম্যানস ল্যান্ডই আসলে ব্যাপক এক বা অনেক উহ্যভূমি। যে উহ্যভূমিতে কোনওকালে ভেসে বেরিয়েছিলেন হয়তো টোবা টেক সিং, আপন উহ্য-উপন্যাস প্রাণে ভরে আবার কখনও হয়তো সেখানেই আয়লান কুর্দি-ও গুটিসুটি মেরে শুয়ে ছিল চিরতরে, ফুরিয়ে যাওয়া নিঃশ্বাসে ভর করে কেঁপে যাওয়া কোনও স্মৃতিলেখ রচনা-অবস্থায়।
আমাদের, আমার তো বটেই, হয়েছে এক মস্ত বিড়ম্বনা। জেনেও যে বৃথা এ সমুদ্রলঙ্ঘন, আঁক কেটে যাই এ চৌহদ্দিতে। পেরোব বলে এ উহ্যপ্রান্তর। পেরোনো আর হয় না, প্রতিবার শুধু ধাক্কা খেয়ে মাঝপথেই বসে পড়ি, হাঁফাতে হাঁফাতে ফিরে আসি ডাঙায়। আগামী দিনে ফের পেরিয়ে যেতে প্রয়াসী হব বলে সে উহ্যদ্বীপে। এই এত কসরত কেন করি? কারণ, এই উহ্যকাল, এই উহ্যদেশ কি আসলেই আমার সন্ধ্যাফেরত পর্ব?

যেমন সব পাখি ফেরে ঘরে, তেমনই আমিও কি অন্তরে চেপে রাখা দীঘিতেই সাঁতরে পার হব বলে, বেরোই প্রতি সকাল? ওই যে মায়ের চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়া ‘শেষ’ জল, বা আমার ফোনে থাকা হাঁটতে শেখার ভিডিয়ো, তা কি আমি মনে করি, না দেখেও ফিরে দেখি, শুধুমাত্র জিইয়ে রাখব বলে, সেই তীর্থর মতো, কোনও এক অমোঘ বন্ধন?
নিজের মধ্যে বয়ে নিয়ে বেড়াতে এ ভার, খানিক অপূর্বও বোধ হয়। ঝুরঝুর করে পড়ে গিয়ে ছত্রখান হওয়া বালিধুলো কাঁচিয়ে নিয়ে ফের এক বেদনার ইমারত নির্মাণ করাই বোধহয় ভবিতব্য। করে যাই সেটুকু আপাতত। লিখে যাই, উহ্যমানুষের ১৩ নম্বর পর্ব মাকে নিয়ে, ১৩ সেপ্টেম্বর, আমাদের সেই নার্সিং হোমের করিডোরে বসে থাকার রাত। বাড়ি ফিরে আসার কিছুক্ষণ পর, ফোন আসবে, চলে আসুন…
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত