(Tobuo Ful Fote)
প্রতি রাতে, দরজার ওপাশ থেকে নির্মলেন্দু একটা শব্দ শোনেন— মাটির টবে জল পড়ার টুপটাপ শব্দ; ঠিক যেন কারও নিঃশ্বাসের ছন্দ! অথচ বহুকাল ঘরটায় কোনও জানলাই খোলা থাকে না। বালিগঞ্জে রেললাইনের ধারে এই আধভাঙা রায়বাড়ির পিছনের ঘরটায় সূর্য ঢোকেনি অনেকদিন।
দেশভাগের পরে বাড়ির আদ্ধেকটা বিক্রি হয়ে গেছিল, আর নতুন মালিক জানলার গায়ে গা ঘেঁষে তুলেছিলেন তিনতলা উঁচু দেওয়াল। তারপর থেকে ওই একটা ঘরে সকাল হয় না, সন্ধে নামে না— শুধু থাকে এক ধূসর ছায়া। বাকি বাড়িটা তখনও আলোয় ভরা, ফাটা মোজাইকের মেঝেয় রোদ পড়ে, দেওয়ালে ঝুলে থাকা পূর্বপুরুষের ছবিগুলোর কাচ চিকচিক করে। রাত এগারোটার বারুইপুর লোকাল যখন পাশ দিয়ে চলে যায়, বাড়ির এই ঘরটা যেন অন্য ঘরগুলোর তুলনায় একটু বেশি কেঁপে ওঠে।
নির্মলেন্দু আর তাঁর স্ত্রী প্রতিভা এই বাড়িতেই আছেন পঁয়তাল্লিশ বছর ধরে। ছেলে ব্যাঙ্গালোরে, মেয়ে দিল্লিতে; বাকি ঘরগুলো ভাড়া দিয়েই দুজনের চলে যায়। ওই অন্ধকার ঘরটা সস্তায় ভাড়া দেন— বেশিরভাগ সময় নতুন প্রেমে পড়া বা সদ্য বিয়ে হওয়া তরুণ-তরুণীদের, যাদের হাতে টাকা কম, স্বপ্ন বেশি।
তারা আসে, থাকে, চলেও যায়। এক বছর, ছ’মাস, কখনও মাত্র কয়েক সপ্তাহ। নির্মলেন্দু লক্ষ করেছেন, প্রত্যেকেই কিছু না কিছু ফেলে যায়— দেওয়ালে আঁচড় কেটে লেখা দুটো নাম, একটা ভাঙা চুড়ি, টিপের পাতা, ট্রেনের পুরনো টাইমটেবিল, একটা আধপোড়া প্যাকিং কেস যাতে কালি দিয়ে লেখা ‘তুমি ছাড়া এই শহর ফাঁকা’। যেন প্রত্যেকেই ওই অন্ধকারে নিজের একটা চিহ্ন রেখে যায়, প্রমাণ করে— আমি এখানে ছিলাম, আমি ভালবেসেছিলাম।

একজোড়া দম্পতি রোজ রাতে পুরনো গান শুনত, ভলিউম কমিয়ে, যাতে বাড়িওয়ালা না শোনে। আরেক মেয়ে প্রতি সন্ধেয় নিঃশব্দে কাঁদত, কেন কে জানে। এক মাঝবয়সী দম্পতি দেওয়ালে পেনসিল দিয়ে মেপে মেপে দাগ কেটে লিখেছিল— ‘প্রথম দিন’, ‘একমাস পরে’— যদিও সেখানে কোনও বাড়ন্ত বাচ্চা ছিল না। শুধু দু’জন মানুষ, আর বড় হতে চাওয়া একটা সম্পর্ক!
নির্মলেন্দুর মনে পড়ে যায় নিজের বিয়ের প্রথম বছরগুলো। প্রতিভা তখন হাসতেন খুব জোরে, মাথা পিছনে হেলিয়ে। ইচ্ছে করে বৃষ্টি ভিজে বাড়ি ফিরতেন। একবার রাগ করে তিনদিন কথা বলেননি, তারপর নিজেই সেধে বলেছিলেন, “রাগ করে থাকাটাও তো একরকম ভালবাসা, বোঝো না?” নির্মলেন্দু ব্যবসার সূত্রে প্রায়ই বাইরে থাকতেন— মাসের পর মাস, প্রতিভা একাই সামলাতেন সংসার, দুই ছেলেমেয়ে, আর এই ভাঙাচোরা বাড়ির প্রতিটা ফাটল। ফিরে এসে নির্মলেন্দু কখনও জিজ্ঞেস করেননি, একলা থাকতে কেমন লাগত। এখন, এই বয়সে এসে, সেই না-করা প্রশ্নগুলো তাঁকে জাগিয়ে রাখে রাতে।
প্রথম প্রথম এই কথাগুলো শুনলে বুকের ভেতরটা মুচড়ে উঠত, এখন তিনি অভ্যস্ত— আর সেটাই তাঁকে সবচেয়ে বেশি ভয় পাওয়ায়। কারণ, ভালবাসার মানুষটার ভুলে যাওয়া সহ্য করা যায়, কিন্তু নিজের ভিতরের যন্ত্রণাও যখন সহনীয় হয়, তখন বোঝা যায়— কিছু একটা চিরতরে হারিয়ে গেছে।
তিন বছর আগে ডাক্তার বলেছিলেন, “স্মৃতিভ্রংশ শুরু হয়েছে, একে আটকানো যায় না, শুধু গতি কমানো যায়।” নির্মলেন্দু প্রথম দু’বছর কথাটা মানতেই চাননি। প্রতিভা তখনও তরকারিতে নুন দিতে ভুলতেন মাঝেমধ্যে, ব্যস্, এইটুকুই তো। কিন্তু এখন তিনি সকালের খাওয়া বিকেলে ভুলে যান, একই প্রশ্ন সাতবার জিজ্ঞেস করেন এক ঘণ্টায়, সন্ধ্যে নামলেই অস্থির হয়ে ওঠেন— যেন ভিতরে কোথাও আলো আর অন্ধকারের একটা অলিখিত লড়াই চলে, আর প্রতিদিন অন্ধকারই জেতে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের প্রতিবিম্ব দেখে মাঝেমধ্যে চমকে ওঠেন, “ঘরে ওই মেয়েটা কে?”— নির্মলেন্দু তখন আয়নাটা ঘুরিয়ে রাখেন দেওয়ালের দিকে, যেমন করে ছোট বাচ্চাকে ভয় থেকে আড়াল করা হয়।
এখন প্রতিভা বেশিরভাগ সময় জানলার ধারে বসে থাকেন, চুপ করে। কোনও কোনওদিন নির্মলেন্দুকে চিনতে পারেন না। জিজ্ঞেস করেন, “আপনি কে? আমার স্বামী এক্ষুনি আসবেন। একটু চা দেবেন?” নির্মলেন্দু চা বানিয়ে নিজেই হাতে ধরিয়ে দেন, প্রতিভা তাঁকেই বলেন, “থ্যাংক ইউ দাদা।”

প্রথম প্রথম এই কথাগুলো শুনলে বুকের ভেতরটা মুচড়ে উঠত, এখন তিনি অভ্যস্ত— আর সেটাই তাঁকে সবচেয়ে বেশি ভয় পাওয়ায়। কারণ, ভালবাসার মানুষটার ভুলে যাওয়া সহ্য করা যায়, কিন্তু নিজের ভিতরের যন্ত্রণাও যখন সহনীয় হয়, তখন বোঝা যায়— কিছু একটা চিরতরে হারিয়ে গেছে।
মাঝেমধ্যে নির্মলেন্দুর মনে হয়, তিনিও বুঝি একজন ভাড়াটে— এই বাড়িতে, এই সংসারে, এই মহিলার স্মৃতিতে। তাঁদের নিজেদের ভালবাসাটাও যেন ওই অন্ধকার ঘরের মতো— একদিন আলো ছিল, এখন শুধু অভ্যেস আর ছায়া। ভাড়াটে দম্পতিরা অন্তত দেওয়ালে নাম লিখে যায়, চুড়ি ফেলে যায়, প্যাকিং কেসে প্রেমের কথা লিখে যায়— কিছু না কিছু চিহ্ন থেকে যায় তাদের।
গত বর্ষায় ঘরটা ভাড়া নিয়েছিল অর্ক আর মেঘা— দু’জনেই নতুন চাকরি করে। ঘর খুঁজছিল, লুকিয়ে থাকার মতো একটুকরো জায়গা, যেখানে কেউ প্রশ্ন করবে না। মেঘা আসার দিনই একটা মাটির টবে ছোট্ট চারা এনেছিল— সন্ধ্যামালতীর গাছ।
পঁয়তাল্লিশ বছর স্থায়ী বিয়ের পর নির্মলেন্দুর কী আছে? এই প্রশ্নটাই তাঁকে রাতের পর রাত ওই অন্ধকার ঘরের সামনে দাঁড় করিয়ে রাখে, যেখানে অন্তত কিছু মানুষ তাদের ভালবাসার চিহ্ন রেখে গেছে, যদিও তারাও হয়তো একে অপরকে ভুলে গেছে।
গত বর্ষায় ঘরটা ভাড়া নিয়েছিল অর্ক আর মেঘা— দু’জনেই নতুন চাকরি করে। ঘর খুঁজছিল, লুকিয়ে থাকার মতো একটুকরো জায়গা, যেখানে কেউ প্রশ্ন করবে না। মেঘা আসার দিনই একটা মাটির টবে ছোট্ট চারা এনেছিল— সন্ধ্যামালতীর গাছ।
“এখানে তো আলো নেই,” নির্মলেন্দু সেদিন বলেছিলেন, “গাছটা বাঁচবে না।”

মেঘা হেসে বলেছিল, “বাঁচুক না বাঁচুক, রাখি তো। কিছু জিনিস তো শুধু আশাতেই বাঁচে, কাকু।”
তিন মাস পরে অর্ক বদলি হয়ে গেল চেন্নাইতে। মেঘা যায়নি সঙ্গে— সম্পর্কটা আর টেকেনি, এটুকুই নির্মলেন্দু আন্দাজ করেছিলেন দরজার আড়াল থেকে শোনা শেষ রাতের চাপা কথাগুলো থেকে। পরদিন সকালে ঘর খালি। বিছানার চাদর গোটানো, চাবি টেবিলে রাখা, আর জানলার কোণে পড়ে আছে সেই টব— সন্ধ্যামালতীর গাছ, শুকনো পাতা, একটাও ফুল নেই।
তারপর একদিন, অক্টোবরের এক ভোরে, নির্মলেন্দু জল দিতে গিয়ে থমকে দাঁড়ালেন। শুকনো ডালের ফাঁকে একটা কুঁড়ি। পরদিন বিকেলে সেই কুঁড়ি ফুটে উঠল— ছোট্ট, বেগুনি-সাদা একটা ফুল, ঠিক যেন অন্ধকার ফুঁড়ে কেউ আলোর হাত বাড়িয়ে দিয়েছে।
নির্মলেন্দু টবটা ফেলে দিতে পারেননি। কেন, তা নিজেও বলতে পারবেন না। রোজ সকালে একটু জল দিতেন, প্রায় অভ্যেসের মতো, যেমন প্রতিভাকে ওষুধ খাওয়ানো, যেমন সকালে তাঁর কপালে হাত রাখা। গাছটা বাঁচবে না জানতেন, তবু জল দেওয়া বন্ধ করেননি।
ঘরটা এবার আর ভাড়া দেওয়া হল না। প্রতিভার শরীর ভাল যাচ্ছিল না, তাই নতুন ভাড়াটে খোঁজার ইচ্ছেটাই যেন হারিয়ে গিয়েছিল।
তারপর একদিন, অক্টোবরের এক ভোরে, নির্মলেন্দু জল দিতে গিয়ে থমকে দাঁড়ালেন। শুকনো ডালের ফাঁকে একটা কুঁড়ি। পরদিন বিকেলে সেই কুঁড়ি ফুটে উঠল— ছোট্ট, বেগুনি-সাদা একটা ফুল, ঠিক যেন অন্ধকার ফুঁড়ে কেউ আলোর হাত বাড়িয়ে দিয়েছে।

তিনি প্রায় দৌড়ে গেলেন প্রতিভার কাছে। “দেখো, দেখো, ফুল ফুটেছে! ওই ঘরে, যেখানে আলো কোনওদিন ঢোকেনি, সেখানে ফুল ফুটেছে!”
প্রতিভা প্রথমে কিছু বললেন না। তারপর ধীরে ধীরে উঠে এসে টবটার সামনে দাঁড়ালেন, অনেকক্ষণ চেয়ে রইলেন। নিজের হাতে ফুলটা ছুঁলেন, আর হঠাৎ, বহুদিন পর, নির্মলেন্দুর দিকে তাকিয়ে বললেন— “নীলু, মনে আছে, আমাদের বিয়ের রাতেও বারান্দায় একটা সন্ধ্যামালতী ফুটেছিল?”
সেই রাতে নিত্যদিনের মতো তাঁর ঘুম এল না। জানলাহীন ঘরে গাছ কীভাবে ফুল ফোটাল, কোথাও তার উত্তর পেলেন না। মোমবাতি জ্বালিয়ে তিনি আবার গেলেন দেখতে। ফুলটা তখনও সেখানে, ঠিক তেমনই ফুটে আছে।
নির্মলেন্দুর বুকের ভেতর কিছু একটা ভেঙে পড়ল, আর একই সঙ্গে নিঃশব্দে জোড়াও লাগল।
সেই রাতে নিত্যদিনের মতো তাঁর ঘুম এল না। জানলাহীন ঘরে গাছ কীভাবে ফুল ফোটাল, কোথাও তার উত্তর পেলেন না। মোমবাতি জ্বালিয়ে তিনি আবার গেলেন দেখতে। ফুলটা তখনও সেখানে, ঠিক তেমনই ফুটে আছে। এই বয়সে চোখ দুটো আর আগের মতো নেই। প্রতিভার স্মৃতিও তো এখন সত্যি-মিথ্যে গুলিয়ে ফেলে। যদি ফুলটা সত্যিই না ফুটে থাকে? জবাব তিনি জানেন না। শুধু জানেন, পরদিন সকালেও জল দেবেন সেই টবে। কিছু কিছু ভালবাসা বেঁচে থাকে শুধু এই বিশ্বাসে যে, অন্ধকারেও, কোথাও না কোথাও, একটা ফুল ঠিকই ফুটবে— সত্যি হোক বা না হোক।
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত