(Bongaon er Bunglow)
“আমি ওসবের মধ্যে নেই”, আমি কড়া প্রতিবাদ করি।
“আরে চল না, কিছুই হবে না… জাস্ট যাব আর আসব। একাই যেতাম, নেহাত হাতে ক্যামেরা, নোটবুক, পেনসিল হ্যানাত্যানা থাকবে, তাই কেউ থাকলে সুবিধে হয়। আর যাচ্ছি তো দিনের বেলায়… তেনারা যদি থেকেও থাকে, দিনের বেলায় কেউ বেরোয় না। আর তুই তো এমন ভীতু ছিলিস না”- পবিত্র নাছোড়বান্দা।
আসলে হয়েছে কি, পবিত্র পার্টিশন আর রাডক্লিফ লাইন নিয়ে একটা ডকুমেন্টরি বানাচ্ছে। ছোটখাটো ইউটিউব চ্যানেলে রিলিজ করার মতো ওর বাজেট। সেই জন্য বনগাঁর দিকে, ইছামতী নদীর ধারে একটা বড় পোড়ো, ভাঙা পরিত্যাক্ত বাংলোতে ও রেকি করতে যাবে। কঙ্কালসার বাড়ি। অনেকটা পুরনো দিনের জমিদার বাড়ির আদলে। কিন্তু বদনাম আছে ভূতুড়ে বাড়ি বলে। রাতে তো নয়ই, দিনের বেলাতেও ওদিকে কেউ পা মাড়ায় না।
ভূত-প্রেত না থাকুক, যা আগাছার জঙ্গল রয়েছে চারিদিকে, তাতে বিষাক্ত সাপ নিশ্চয়ই আছে। এদিকে পবিত্রর টিম বলতে একজন ক্যামেরাম্যান মাত্র। সে ব্যাটা এক নম্বরের ভীতু। তার মাসির বাড়ি বনগাঁতে। তার নাকি ওই বাংলো বাড়ি সম্মন্ধে ভালই জানা আছে। ওই বাড়িতে একবার ঢুকলে নাকি বেঁচে ফেরার আর আশা নেই। দিনের বেলাতেও নাকি ওই বাড়ি জম্পেশ ভূতেদের আড্ডা। একেবারে ‘হন্টেড হাউস’ বলতে যা বোঝায় আর কি।
তাই কাউকে না পেয়ে, পবিত্র আমাকেই পীড়াপীড়ি করতে শুরু করেছে। আমি আবার ভূত নিয়ে একটু নির্লিপ্ত। মানে কখনও সেভাবে ভূতের অস্তিত্ব নিয়ে বিশেষ মাথা ঘামাইনি। অবিশ্বাস করি, তাও হলফ করে বলতে পারি না। তাই বলে জেনেশুনে বিপদের সামনে যাব, সেরকমও কখনও অভিপ্রায় হয়নি। কী দরকার বাবা! খেয়েদেয়ে কাজ নেই, না কি।

ওদিকে পবিত্র চিরকালই যাকে বলে ডেয়ারডেভিল। ডাকাবুকো। ভয় জিনিসটাই ওর মধ্যে নেই। এক সময় মানুষের অন্ধবিশ্বাস ভাঙার জন্য একটা সোসাইটি তৈরি করেছিল। তখন ডাইনি, ভূত-প্রেত ইত্যাদি বিষয় নিয়ে লোক ঠকানো অনেক বুজরুকদের পসার ভেঙেছিল। তারপর কিছুকাল একজন হারপেটোলজিস্টের সাথে থেকে সরীসৃপের বিষয়ে কিছু কাজ করেছিল। সেই সময় অনেক বিষধর সাপ নিয়ে ও নাড়াচাড়া করেছে। আর ও যখন কিছু একটা ঠিক করে, তখন ওকে থামানো দুষ্কর।
আমাকে ও আরও লোভ দেখানোর চেষ্টা করে, “আরে চল চল, তুই এত বিভূতিভূষণের লেখার ভক্ত, দেখতে যাবি না তাঁর ছোটবেলাটা কোথায় কেটেছে? বিভূতিভূষণের ‘বনগ্রাম’ হল এখনকার ‘বনগাঁ’। আর আমার ডকুমেন্টরিটার জন্য জায়গাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৪৭ সালে বঙ্গভঙ্গের সময়, রাডক্লিফ লাইন যশোর জেলার বনগাঁ এবং গাইঘাটা থানা এলাকাগুলিকে ভারতে অন্তর্ভুক্ত করে এবং এই এলাকাটিকে ২৪ পরগনা জেলার অংশ করা হয়।”
“দেখ্ ভাই, ইতিহাসের থেকে আমি বর্তমানকে বেশি গুরুত্ব দিই সবসময়। তুই কি জানিস এখন ওটা আর ২৪ পরগনা জেলা নয় বরং নতুন ইছামতী জেলা হচ্ছে। অতএব ইতিহাস ঘাঁটার ইচ্ছে থাকে তো তুই একাই যা”, আমি অনড় থাকার বৃথা চেষ্টা করি। বলা বাহুল্য, ফলপ্রসু হয় না। অবশেষে রবিবার দু’জনে মিলে বনগাঁ লোকালে বসি, সেই বাংলোটা রেকি করতে যাব বলে। বেরোতে একটু দেরি হয়ে গিয়েছিল, তারপর ট্রেন লাইনে কী কারণে একটা অবরোধ থাকায়, বনগাঁ পৌঁছতে দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়ে গেল।
স্টেশন থেকে টোটো ধরে বাড়িটার বর্ণনা দেওয়াতে টোটো ড্রাইভার যেন আকাশ থেকে পড়ল। “ওই বাংলোর কাছাকাছি তো কোনও বাড়িঘর নেই। তাহলে কোথায় যাবেন?”

যখন বললাম, ওই বাড়িটিতেই কিছু ফোটো তুলতে যাব, সে চোখ-পাকিয়ে অনেক বারণ করল। পবিত্রর জেদ দেখে যখন বুঝল কাজ হবে না, তখন বহু দূরে, ইছামতী নদীর ধারে আমাদের নামিয়ে সে চলে গেল। সেখান থেকে পায়ে হেঁটে, দুই বন্ধু মিলে, একে-ওকে জিজ্ঞেস করতে করতে, (তাদের অনেক বারণকে পাত্তা না দিয়ে), আমরা পৌঁছে গেলাম সেই বাংলো বাড়িতে।
বিকেলের পড়ন্ত রোদে বাড়িটিকে মায়াবী লাগছিল। যেন কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সামনে এক বিশাল সিংহদুয়ার। অন্তত তাই মনে হল। তবে পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছিল না। হয়তো একসময় সিংহের মূর্তি ছিল, যা এখন বিলুপ্ত। চুন-সুড়কির পলেস্তারা খসে ইটের পাঁজর বেরিয়ে পড়েছে বহু আগেই, গা বেয়ে নেমেছে ঘন শ্যাওলার আস্তরণ। ফটকটি খিলান আকৃতির, যা একসময় হয়তো অপূর্ব টেরাকোটা বা ইউরোপীয় স্টাকো ওয়ার্ক দিয়ে সাজানো ছিল। এখন সেই সূক্ষ্ম কাজগুলো ধূলিমলিন এবং ভাঙাচোরা অবস্থায় আছে। খিলানের ফাটলে বট-পাকুড়ের শিকড় অক্টোপাসের মতো জড়িয়ে ধরেছে প্রাচীন স্থাপত্যকে। এক সময়ের গুমোর করা লোহা আর কাঠের তৈরি বিশাল গেটটি মরচে ধরে জরাজীর্ণ, সামান্য বাতাসে ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দ করে ওঠে। দুই পাশের প্রকাণ্ড থামগুলো যেন ক্লান্ত বৃদ্ধের মতো ঝুঁকে পড়েছে।
আমি আর পবিত্র হাঁ করে অনেকক্ষণ বাড়িটিকে দেখছিলাম। খেয়াল করিনি কখন পাশে এক আগুন্তুক এসে উপস্থিত হয়েছে। হুঁশ এল, ওঁর সম্ভাষনে, “জনাবদের কী অভিপ্রায়ে এখানে আগমন?”
বিশাল প্রবেশপথ। দুই পাশে দুটি বিশাল, প্রাচীন কংক্রিটের থাম। আমার কেমন জানি মনে হল, এই ফটক দিয়ে হয়তো একসময় হাতির পিঠে চড়ে জমিদারবাবু আসতেন, সানাই বাজত। আর আজ শুধু শুকনো পাতার মর্মরধ্বনি আর শূন্যতার হাহাকার।
ফটকের ভেতর দিয়ে ভেতরের প্রাঙ্গণ আবছা দেখা যাচ্ছে। এক সময় হয়তো বাড়িটা একটা অট্টালিকা সমান ছিল। সময়ের সাথে লড়াই করে এখন তার জৌলুস হারিয়েছে। বাড়িটির চূড়া পর্যন্ত অশ্বত্থ, বট গাছের শিকড় ছড়িয়ে পড়েছে, যা দেওয়ালগুলোকে চিরে ফেলেছে। জানলাগুলো ভাঙা, আর সদর দরজাটি মরচে ধরা লোহার শিকল দিয়ে আটকানো। ছাদের কিছু অংশ ভেঙে পড়েছে, আর বাকি অংশটি বর্ষার ভারী বৃষ্টিতে যেকোনও সময় ধসে পড়ার অপেক্ষায়।

আমি আর পবিত্র হাঁ করে অনেকক্ষণ বাড়িটিকে দেখছিলাম। খেয়াল করিনি কখন পাশে এক আগুন্তুক এসে উপস্থিত হয়েছে। হুঁশ এল, ওঁর সম্ভাষনে, “জনাবদের কী অভিপ্রায়ে এখানে আগমন?”
ঘুরে দেখি মাঝারি গড়নের এক ব্যক্তি দাঁড়িয়ে আছেন। বিকেলের ডুবন্ত সূর্যের দিকে পিঠ করে দাঁড়ানোর ফলে ওঁর সিলুয়েটটাই শুধু দেখা যাচ্ছিল। মাথায় মনে হল নমাজ পড়ার টুপি, পরনে আফগানি কুর্তা-পাজামা স্যুট, দু-কাঁধে জায়নামাজ ফেলা, পায়ে টাটবাফি বুট।
“ও আচ্ছা, আচ্ছা… না, মানে আমরা ঠিক ইতিহাসবিদ, বা স্থাপত্য নিয়ে পারদর্শী কোনওটাই নই। একটা তথ্যচিত্রের জন্য এরকম একটা জায়গা বা বাড়ির দরকার ছিল। তাই নিতান্ত রেকি করতে আসা। দু-একটা ছবি তুলেই চলে যাব।”
পবিত্র প্রশ্নের উত্তরে প্রশ্ন করল, “আপনি? এই ভাঙা জমিদার বাড়িতে তো কেউ আসতেই চাইছিল না। তাহলে…”
আগুন্তুকও প্রশ্নের উত্তরের বদলে আমাদের ভুল শোধরানোর চেষ্টা করেন, “এটা জমিদার বাড়ি আপনাদের কে বলল?”, তারপর যেন আমার মনের কথা জেনে বললেন, “কোথাও কি সিংহদুয়ার জাতীয় কিছু দেখলেন? কী দেখে আদৌ এটা হিন্দুদের বাড়ি বলে মনে হল আপনাদের? বরং বাঁকানো কার্নিশ, বড় গোল গম্বুজ, এবং খিলানযুক্ত প্রবেশপথ দেখে আপনাদের পারস্য সংস্কৃতির সঙ্গে মিল পাওয়া উচিত ছিল, মানে যদি আপনাদের এই বিষয়ে কোনও ধারনা থেকে থাকে আরকি…”।

“ও আচ্ছা, আচ্ছা… না, মানে আমরা ঠিক ইতিহাসবিদ, বা স্থাপত্য নিয়ে পারদর্শী কোনওটাই নই। একটা তথ্যচিত্রের জন্য এরকম একটা জায়গা বা বাড়ির দরকার ছিল। তাই নিতান্ত রেকি করতে আসা। দু-একটা ছবি তুলেই চলে যাব।”
“বেশ তো, তবে এক সঙ্গেই যাওয়া যাক”, বলে আমাদের অপেক্ষা না করে ভদ্রলোক এগিয়ে গেলেন। আমি আর পবিত্র মুখ-চাওয়াচায়ি করে পেছন পেছন গেলাম।
মেঝেতে হয়তো ইতালীয় মার্বেল বা টেরাকোটার টাইলস ছিল, যা এখন ধুলোয় ধূসর। ভেন্টিলেটরগুলোতে বসানো বেলজিয়ান রঙিন কাচ। নীল, সবুজ, লাল আর হলদেটে কাচগুলো ভেঙে গেলেও, জানালার ফ্রেমে লেগে থাকা বাকি অংশগুলোতে আজও বিকেলের সূর্য পড়ে অদ্ভুত রঙিন আলোর খেলা তৈরি হয়েছে।
বাড়ির ভেতরে ঢুকে এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা আর ভ্যাপসা গন্ধ পাওয়া গেল। ধুলোমাখা মেঝেতে পড়ে আছে পুরনো আসবাবের ভাঙা অংশ। দেয়ালগুলোতে একসময় চমৎকার টেরাকোটা বা পোড়ামাটির কাজ ছিল, যা এখন জরাজীর্ণ। ভেতরে বিশাল হলরুমের অনেকটা ছাদ ভাঙা, সেখান থেকে আকাশ দেখা যায়। ধুলোয় ঢাকা বড় বড় ঘরগুলো সত্যি খেয়াল করলে, বোঝা যায় পারস্য সংস্কৃতির প্রভাব যা এখন চামচিকের বাস।
মেঝেতে হয়তো ইতালীয় মার্বেল বা টেরাকোটার টাইলস ছিল, যা এখন ধুলোয় ধূসর। ভেন্টিলেটরগুলোতে বসানো বেলজিয়ান রঙিন কাচ। নীল, সবুজ, লাল আর হলদেটে কাচগুলো ভেঙে গেলেও, জানালার ফ্রেমে লেগে থাকা বাকি অংশগুলোতে আজও বিকেলের সূর্য পড়ে অদ্ভুত রঙিন আলোর খেলা তৈরি হয়েছে। ধূলিময় ভাঙা ঘরে সেই রঙিন আলো এসে এক মায়াবী, বিষাদগ্রস্ত পরিবেশ সৃষ্টি করেছে।

আগুন্তুক আমাদের সামনে একটা ঘরের সামনে হঠাৎ থেমে গিয়ে খানিকটা স্বগোতোক্তির মতন বলল, “এককালের বিলাসবহুল এই হাভেলি এখন নিঝুম। এখনও কান পাতলে জেনানা মহলে চুড়ির শব্দ পাওয়া যাবে। সারেঙ্গির সুর ভেসে আসবে”, তারপর আমাদের দিকে ঘুরে বলল, “এটা জমিদারবাড়ি নয় জনাব, এটা ফৌজদার নুরুল্লা খাঁর বংশের হাভেলি”।
লোকটার মুখটা এখনও অস্পষ্ট।
পবিত্র খুব একটা পাত্তা দেয় না। ক্যামেরা বার করে ছবি তুলতে শুরু করে। বিড়বিড় করে আমাকে বলে- “লোকটাকে সাবজেক্ট করে, ব্যাকগ্রাউন্ডটা হেব্বি আসছে। এরকম সেপিয়া টোনে শুট করব বুঝলি, পুরোনো আসবাবপত্র, ভাঙা আয়না আর রঙিন কাচের ভাঙা টুকরো মিলে এক বিষণ্ণ ও রোমান্টিক ধ্বংসাবশেষের রূপ ধারণ করেছে”।
কিন্তু এ কী করে সম্ভব! এত বছর পরেও এই ভগ্নস্তূপ হাভেলিতে কে-ই বা ঝাড়বাতিতে আলো জ্বালাতে আসবে! আমার বারণ করার আগেই পবিত্র দরজা পার হয়ে ভেতরে ঢুকল। আমিও যেন কোনও মন্ত্রবলে ওই ব্যক্তি ও পবিত্রকে অনুসরণ করে হলঘরটায় ঢুকলাম।
আগুন্তুক সেই ঘরের দরজাটা ঠেলে খুলল। ক্যাঁচ করে আওয়াজ করে বহুদিনের না-খোলা দরজাটা আসতে আসতে যখন খুলে গেল, ভেতরে একটা বিরাট মহল খুলে গেল। যেন সম্পূর্ণ একটা আলাদা দুনিয়া। আলো ঝলমল। কিন্তু ঝাড়লণ্ঠনের। বাইরের আলো এখানে ঢুকছে না। বড় একটা ঝাড়বাতিতে টিমটিম করে আলো জ্বলছে।
কিন্তু এ কী করে সম্ভব! এত বছর পরেও এই ভগ্নস্তূপ হাভেলিতে কে-ই বা ঝাড়বাতিতে আলো জ্বালাতে আসবে! আমার বারণ করার আগেই পবিত্র দরজা পার হয়ে ভেতরে ঢুকল। আমিও যেন কোনও মন্ত্রবলে ওই ব্যক্তি ও পবিত্রকে অনুসরণ করে হলঘরটায় ঢুকলাম।

ঢোকা মাত্রই এক হিমশীতল হাওয়া যেন গা ঘেঁষে চলে গেল। অদ্ভূতুড়ে একটা শব্দ আসছিল, যেন কেউ পুরনো আরবি ভাষায় বিড়বিড় করে কিছু পড়ছে। আর আসছিল একটা ঝুমকোর আওয়াজ। পবিত্র ক্যামেরা টপাটপ ছবি তুলতে ব্যস্ত। এমন সময় লোকটা বলল, “মাত্র পাঁচ হপ্তায় এক লালমুখো সাহেব এই রেড-ক্লিফ লাইন এঁকে কত শত মানুষের ভাগ্য নির্ধারণ করলে, আর আপনারা সেই নিয়ে আবার ছবি বানাচ্ছেন?”
পবিত্র ঠান্ডা মাথায় শুধরে দেয়, “ওটাকে রাডক্লিফ লাইন বলে, রেড-ক্লিফ নয়। স্যার সিরিল রাডক্লিফ ছিলেন একজন ব্রিটিশ আইনজীবী, যিনি ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের সময় পাঞ্জাব ও বাংলা বিভাজনের জন্য গঠিত সীমানা কমিশনের চেয়ারম্যান ছিলেন। হ্যাঁ ঠিকই, মাত্র পাঁচ সপ্তাহে তাঁর এবং কমিশনের পক্ষে এই কাজটি করা একদমই সহজ ও সঠিক ছিল না।”
এমন সময় কোথা থেকে দৌড়ে ঘরে ঢুকল এক যুবক। চমকে উঠে দেখি এ তো সেই আগুন্তুক। যে আমার পিছনে ছিল, কোনও এক মায়াবলে যেন সে এই দৃশ্যপটে ঢুকে পড়েছে।
“আর ভেবে দেখুন তাতেই ভাগ্য বদলে গেল কত শান্তিপ্রিয় নিরপরাধ মানুষের”, লোকটার গলায় যেন কেমন ক্ষোভ, হিংসামিশ্রিত এক করুণ আর্তনাদ। ঘরে ঢোকার আগে অব্দি ইছামতী নদীর শব্দ পাওয়া যাচ্ছিল। এখন আর তা আসছে না। বরং আবছা একটা দৃশ্যপট যেন কোথা থেকে চোখের সামনে পলেস্তারা খসা দেওয়ালে ভেসে উঠতে শুরু করল। যেন পর্দায় একটা ছায়াছবি। হাল্কা সুরোধ্বনিও কানে আসে। সারেংগী ও এষরাজের সুর লহরী। তবলার বোল।
আধশোওয়া হয়ে, ভারি তাকিয়ায় হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করে হাতে হাত দিয়ে তাল দিচ্ছেন যিনি, সম্ভবত তিনিই গৃহস্বামী। পেছন থেকে যেন খেই ধরিয়ে দিলেন সেই আগুন্তুক, “উনি এই হাভেলির মালিক। ফৌজদার সিরাজ খাঁ। ফৌজদার নুরুল্লা খাঁর পোতা।” এমন সময় কোথা থেকে দৌড়ে ঘরে ঢুকল এক যুবক। চমকে উঠে দেখি এ তো সেই আগুন্তুক। যে আমার পিছনে ছিল, কোনও এক মায়াবলে যেন সে এই দৃশ্যপটে ঢুকে পড়েছে।

চেঁচিয়ে বলল, “চাচাজান, আমাদের এখনি এই হাভেলি ছেড়ে পালাতে হবে। দাঙ্গা লেগে গেছে। ওরা একদল লোক কাস্তে, শাবল নিয়ে ধেয়ে আসছে, আমাদের সবাইকে কোতল করবে বলে। আপনি এখনই জেনানা মহল থেকে সবাইকে সঙ্গে নিয়ে, কিছু লোক-লস্কর, পেয়াদা নিয়ে যশোর-সদরে পালিয়ে যান। পারলে ঢাকায় ফুফাজানের বাড়িতে কিছুদিন গা-ঢাকা দিয়ে থাকুন। আমি কিছু লেঠেল দিয়ে দেখছি হাভেলি রক্ষা করতে পারি কি না। ঝামেলা থামলে আপনাদের এত্তালা করব।”
হঠাৎ কেমন একটা চরম বিশৃঙ্খলতা দেখা দিল ঘরে। হুড়োহুড়ি, দৌড়াদৌড়ি। আমার কেমন জানি দিশেহারা লাগছিল, বুক ধড়ফড় করছিল। পবিত্রকে আর দেখতে পেলাম না। তারপর কোথা থেকে যেন ঘূর্নিঝড়ের মতন কিছু একটা সামনের দৃশ্যপটটাকে একটা ব্ল্যাক-হোলের মতো গিলে ফেলল। সাঁ, সাঁ করে শব্দ শুরু হল, সঙ্গে দামামা ধ্বনি।
জ্ঞান ফিরতে দেখলাম আমি হাসপাতালে বেডে শুয়ে। জিজ্ঞেস করে বুঝলাম এটা বনগাঁর সাব-ডিভিশনলান হাসপাতাল। আমার মাথায় ব্যান্ডেজ করা। সারা গায়ে ব্যথা।
হঠাৎ কোথা থেকে পেঁচা ডেকে উঠল। এবং তার পরে পরেই, কোনও এক পুরুষের কণ্ঠে এক অনন্ত যন্ত্রণার শব্দ ভেসে এল, “হায় আল্লা”। চমকে উঠে ঘুরে দাঁড়াতেই চোখে পড়ল দেয়ালে রাখা একটা বিশাল আয়নায় অস্পষ্ট কারও অবয়ব।
আয়নায় সেই ছায়ামূর্তিটা দুম করে ঘুরে তাকাল, যেন দু’টো জ্বলন্ত কয়লার মতো চোখ! চেঁচিয়ে উঠল, “ইন্তেকাম! বদলা, তবে আমার কলিজা কো সুকুন মিলবে”। সেই কান ফাটানো আর্তনাদ সারা ঘরে প্রতিধ্বনি করে উঠল। আমি জ্ঞান হারালাম।

জ্ঞান ফিরতে দেখলাম আমি হাসপাতালে বেডে শুয়ে। জিজ্ঞেস করে বুঝলাম এটা বনগাঁর সাব-ডিভিশনলান হাসপাতাল। আমার মাথায় ব্যান্ডেজ করা। সারা গায়ে ব্যথা। সামনে ডাক্তার, নার্স আর সেই টোটো চালকটি যে আমাদের স্টেশন থেকে নিয়ে এসেছিল। পরবর্তী ঘটনা তাদের মুখ থেকেই শোনা।
সেই টোটো-চালকের নাকি আমাদের ওই বাড়ির উদ্দেশ্যে যাওয়া মোটেই ভাল ঠেকেনি। তাই সে কাছেই একটা ক্লাবে গিয়ে জানায়। সেখান থেকেই কিছু ক্লাবের ছেলেপুলেদের নিয়ে নাকি তারা আবার ফিরে আসে বাংলোটার কাছে। উদ্দেশ্য ছিল, আমাদের একটু গালমন্দ করে ওই অভিশপ্ত বাড়িতে যাওয়া থেকে বিরত করবে, যাতে গ্রামে কোনও অঘটন না ঘটে।
আর পবিত্র? একটা ভাঙা ভারী থাম নাকি তার গায়ে পড়ে তার মাথা প্রায় থেঁতলে দিয়েছে। স্পট-ডেড! তার সাধের ক্যামেরাটাও আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। শুনেই আমার গা গুলিয়ে উঠল। ওয়াক তুলে আবার সংজ্ঞা হারালাম।
বাড়ির কাছে এসে নাকি তারা আমার গোঙানির আওয়াজ শুনতে পায় ভেতর থেকে। সঙ্গে সঙ্গে হৈ-হৈ করে সবাই আওয়াজ করতে করতে ঘরে ঢুকে দেখে আমি মেঝেতে পড়ে আছি। ধরাধরি করে আমাকে বাইরে নিয়ে আসা হয়। আমার কপাল ফেটে নাকি গলগল করে রক্ত পড়ছিল।
আর পবিত্র? একটা ভাঙা ভারী থাম নাকি তার গায়ে পড়ে তার মাথা প্রায় থেঁতলে দিয়েছে। স্পট-ডেড! তার সাধের ক্যামেরাটাও আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। শুনেই আমার গা গুলিয়ে উঠল। ওয়াক তুলে আবার সংজ্ঞা হারালাম।
সেই ঘটনার পরে প্রায় দু-বছর কেটে গেছে। বর্তমানে এক সাইকিয়াট্রিস্টের তত্ত্বাবধানে আছি। পবিত্রর কথা ভাবলে মনটা যেমন দুঃখে ভারাক্রান্ত হয়, তেমন কুঁকড়ে যাই এই ভেবে যে আমারও ভবিতব্য একই হতে পারত। আজও দিনটার কথা মনে পড়লে গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে। মাঝরাতে কখনও কখনও আধঘুমে সেই আর্তনাদ শুনতে পাই যেন- “ইন্তেকাম!”
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
