(Japan Travel 4)
পরের গন্তব্য ৪০০ বছর আগে (১৬০৩ খ্রিস্টাব্দ) সোগুন ইয়া-সুতোগাওয়ার তৈরি করা নিজো দুর্গ, এটি স্থাপত্য শিল্পের জন্য প্রসিদ্ধ। কাঠের তৈরি একতলা বাড়ি। ঢালু ছাদে টালি বসানো। প্রবেশপথে ত্রিভুজের মতো তিনটি স্তর, প্রত্যেক স্তরে রয়েছে কারুকার্য করা জাফরি। ভিতরে নীল রঙের কাঠের কাঠামো। ১৭ শতকের জাপানি চিত্রকলা আর শিল্পসম্ভারের অপূর্ব সমাবেশ হয়েছে দুর্গ-প্রাসাদের দেয়ালে দেয়ালে। অন্যতম এক ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট। জাপানের রাজনৈতিক ইতিহাস বহন করে চলেছে এই প্রাসাদ-দুর্গ। আর রয়েছে সামুরাইদের ইতিহাস।
শেষ বিকেলে মজার অভিজ্ঞতা হল মাচা চা প্রস্তুতির ইতিবৃত্ত নিয়ে এক ওয়ার্কশপে। ১৯১৬ সালে রবীন্দ্রনাথ জাপানে এসে চা-পান উৎসবের কথা লিখেছেন। আমাদের জন্য চা প্রস্তুতির ওয়ার্কশপে প্রথমেই বিভিন্ন বয়সের জাপানি মেয়েরা কিমোনো পরে অভ্যর্থনা জানালেন। বসতে দিলেন বেঞ্চে। সামনে টেবিলে জাপানি ফুলদানিতে সুন্দর করে সাজানো ফুলের গুচ্ছ।
আরও পড়ুন: নিপ্পণ দেশে কয়েকটি দিন – ১ম পর্ব, ২য় পর্ব, ৩য় পর্ব
প্রথমে চা-পানের ইতিহাস ইংরেজিতে বললেন এক বয়স্ক জাপানি মহিলা। অষ্টম শতকে যখন নারা শহরে প্রথম দেশের স্থায়ী রাজধানী স্থাপিত হয়, তখন থেকেই এই চা-পান প্রথা ছিল অভিজাত সম্প্রদায়ের মধ্যে। তারপর ১২ থেকে ১৪ শতকে কামাকুরা যুগে এটি সাধারণের মধ্যে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। এরপর মুরোমাচি যুগে সামুরাইরা আরও প্রসারিত করে।
১৫ শতকে জেন বৌদ্ধরা এই অনুষ্ঠানের সঙ্গে ধর্মকে যুক্ত করে। বর্তমান পদ্ধতিতে চা-পান অনুষ্ঠানের প্রবর্তক সেন–নো-রিক্কু। তিনি নিয়ম করেন, নির্দিষ্ট মাপের ঘরে চা-পান করার সময় প্রধান লক্ষ্য ওয়বি। যার মানে শান্ত, বিনয়াবনত থাকা।

আমাদের সবার সামনে জাপানি তরুণীরা মহা উৎসাহে প্লেটে রেখে গেল মিহি চালবাটার একটি করে মোদক। ইঙ্গিতে খেতে বলল। তারপর বাঁশের হাতায় করে কিছু সবুজ রঙের গুঁড়ো চায়ের পাতা একটা হাতলবিহীন সুদৃশ্য পোর্সিলিনের কাপে ঢেলে দিল। তাতে গরম জল ঢেলে দিল।
তারপর প্রত্যেকের সামনেই রাখা দাড়ি কামানোর ব্রাশের মতো একটা ছোট বাঁশের ঝাঁটা দিয়ে চা-টা নাড়াতে বলল। এরপরে ডান হাতে কাপটি তুলে, ক্রমে দুহাতে ধরে কাপটি ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে তার গঠন কারুকার্য নিয়ে কিছু প্রশংসা বাক্য বলে চায়ে চুমুক দিতে হবে। বেশ নিয়মতান্ত্রিক বিষয়। কিন্তু চা ছিল বড়ই তেতো। বুঝলাম চা-পান এদেশে শিল্প আর ধর্মীয় আবেগে মাখামাখি হয়ে আছে।
ছেলেমেয়ে ভাই-বোন বন্ধু-স্বজন নিরাবরণ হয়ে একত্রে অসংকোচে স্নান করে। কোনও হৈ চৈ নেই। এই হোটেলে তেমনি পাবলিক বাথ আছে। নিজের টাওয়েল নিয়ে চললাম সেখানে।
জাপানের সপ্তম দিনের সকাল। ঘুম ভাঙতেই মনে হল আজই তো কিয়োতোর এই হোটেল ছাড়তে হবে। কিন্তু এখানে যে চমৎকার একটি অভিজ্ঞতার সুযোগ আছে, সেটা নেব না কেন? ভাবা মাত্রই তড়িঘড়ি বিছানা ছেড়ে রেডি হয়ে নিলাম। সকালে ভিড় থাকবে না। ব্রেকফাস্টের আগেই ব্যাপারটা সেরে আসতে হবে।
বেশ নতুন ধরনের অভিজ্ঞতাই হল। জাপানে সাধারণের জন্য একত্রে স্নানাগার বা সেন্টোর ব্যবস্থা থাকে। সেন্টোতে স্নান করার সময় কেউ কারুর শরীরের প্রতি কোনও আকর্ষণ বোধ করে না। ছেলেমেয়ে ভাই-বোন বন্ধু-স্বজন নিরাবরণ হয়ে একত্রে অসংকোচে স্নান করে। কোনও হৈ চৈ নেই। এই হোটেলে তেমনি পাবলিক বাথ আছে। নিজের টাওয়েল নিয়ে চললাম সেখানে।

সময় সকাল সাড়ে ছ’টা। স্নানাগারের দরজা বন্ধ। ঘর থেকে বেরোনোর আগে পাস-কোডটা মুখস্থ করে রেখেছিলাম। তাই টিপলাম 1234E, দরজা খুলে গেল। জামা জুতো খুলে নগ্ন হয়ে বিশাল চৌবাচ্চায় স্নান করতে হবে। তখনই বেশ কয়েক জন এসে গেছে। চৌবাচ্চায় নামার আগে পার্টিসান দেওয়া জায়গায় সাবান মেখে স্নান সেরে নিতে হবে।
রবীন্দ্রনাথের ‘জাপানযাত্রী’ লেখাটা মনে পড়ে গেল। জাপানে স্ত্রী-পুরুষ একত্রে নিঃসংকোচে স্নান করে। এর মধ্যে তারা কোনও কলুষ বা মালিন্য অনুভব করে না। জাপানে হয়তো এককালে স্নানের জলকষ্ট ছিল। তখন হয়তো এর উদ্ভব হয়। স্নানের ইচ্ছে যে ছিল না তা নয়, তবে শেষ পর্যন্ত আশৈশব সংস্কারে পেরে উঠলাম না। দেখা তো হল, তাই বা কম কী?
দ্বীপের জনবসতি কম। ট্যুরিস্টদের জন্য আছে প্রচুর দোকান, আর চেরি ফুলে ভরা পথ। ইতস্যুকুশিমা মন্দির জাপানিদের এক পবিত্র ক্ষেত্র। সমুদ্রের ধারে এই মন্দিরটি কাঠের তৈরি, রঙ গাঢ় লাল। বেশ পুরোনো মন্দির। গড়ে উঠেছিল ৫৯৩ খ্রিস্টাব্দে, সম্রাট সুজিকোর আমলে।
আজ কিয়োতো থেকে বুলেট ট্রেনে যাচ্ছি আবাল্যশ্রুত এক অভিশপ্ত শহর হিরোশিমাতে। দূরত্ব ৩১১ কিলোমিটার। এই প্রথম এদেশে বুলেট ট্রেন চড়ছি। নিয়মকানুন মেনে সংরক্ষিত সিটে বসলাম। দেড় ঘণ্টায় চলে এলাম গন্ত্যব্যে। জাপানের প্রধান শহরগুলোর মধ্যে হিরোশিমা বয়সে সব চেয়ে নবীন। ১৫৮৯ সালে এর প্রতিষ্ঠা করেন যুদ্ধবাজ সামুরাই পরিবারের সামন্তপ্রভু, মোরি গোষ্ঠীর নেতা মোরি তেরুমোটো। ‘ওটা’ নদীর ধারে তিনি হিরোশিমা দুর্গ তৈরি করে হিরোশিমাকে দুর্গ-শহর বানিয়ে তোলেন।
হিরোশিমা স্টেশনে পৌঁছে চললাম মিয়াজিমা দ্বীপে। মিনিট কুড়ি-পঁচিশ বাসে যাওয়ার পর এলাম হিরোশিমা পোর্টে। তারপর ফেরিতে যাত্রা প্রশান্ত মহাসাগরের ওপরে মাত্র দশ মিনিটের জন্য। মিয়াজিমা বেশ ছিমছাম দ্বীপ, এর অন্য নাম ইতস্যুকুশিমা। এই দ্বীপ বিখ্যাত তার ইতস্যুকুশিমা মন্দির, জলে ভাসমান বিখ্যাত লাল রঙের তোরি গেট আর ইতস্তত চরে বেড়ানো বুনো হরিণের জন্য।

দ্বীপের জনবসতি কম। ট্যুরিস্টদের জন্য আছে প্রচুর দোকান, আর চেরি ফুলে ভরা পথ। ইতস্যুকুশিমা মন্দির জাপানিদের এক পবিত্র ক্ষেত্র। সমুদ্রের ধারে এই মন্দিরটি কাঠের তৈরি, রঙ গাঢ় লাল। বেশ পুরোনো মন্দির। গড়ে উঠেছিল ৫৯৩ খ্রিস্টাব্দে, সম্রাট সুজিকোর আমলে। তারপর অনেকবার এর সংষ্কার হয়েছে। মন্দিরের ভিতরে কাঠের বেদীর ওপর ওদের একাধিক দেব-দেবীর মূর্তি রয়েছে। তারা কেউ সমুদ্র দেবী, কেউ পুরুষ দেবতা।
গ্র্যান্ড তোরি গেটটি অপেক্ষাকৃত নতুন, ১৮৭৫ সালে তৈরি। এই গেটের উদ্দেশ্য মানুষের পৃথিবীর থেকে ঈশ্বরের সাম্রাজ্যের সীমারেখা চিহ্নিত করা। এখানে পাহাড়ের ওপরে রোপওয়ে চড়া যায়। আমরা অবশ্য দ্বীপে বেড়িয়েই খুশি। আছে প্রচুর বুভুক্ষু ল্যাজবিহীন, শিং ভাঙা হরিণ। শিন্টো মতবাদ অনুযায়ী, এরা নাকি ঈশ্বরের দূত।
এই টেম্পুরা অনেকটা আমাদের গুলি কাবাবের মতো। চিংড়ি মাছ-আলুর পুর ময়দা ও ডিমের গোলায় ভাজা। কয়েকটা চাখার পর খেলাম পাউরুটি, চিকেন সসেজ, চিকেন কারি, রকমারি ফল। শেষ পাতে পুডিং।
এদের শিং ভেঙে দেওয়া হয় যাতে মানুষের গায়ে আঘাত না লাগে। ভ্রমণার্থীদের আইসস্ক্রিম খেতে দেখলেই এসে গাল বাড়িয়ে জিভ বার করে চেটে দেয় মুখ। আমার নিজের এবং সহযাত্রীদের অনেকেরই সেই অভিজ্ঞতা হল। সমুদ্র পথে ফেরার সময় বিকেল শেষ হয়ে আসছিল। ক্রুজে দাঁড়িয়ে পাহাড়ের মাথায় সুন্দর সূর্যাস্ত দেখলাম।
রাতে থাকার জায়গা হল হিরোশিমাতে, একেবারে নতুন চার তারকা বিশিষ্ট হোটেলের নাম ‘ভেসেল হোটেল হিরোশিমা পীস বুলেভার্ড’। জাপানি আর পশ্চিমা রীতির সুন্দর সহাবস্থান এখানে নজরে এল। রাতে খাবারের মধ্যে ছিল জাপানি ঘরানার ভাত, মিসো স্যুপ, গ্রিল করা ঝিনুক, মাছ ভাজা, প্যান কেক, টেম্পুরা আরও কত কি।

এই টেম্পুরা অনেকটা আমাদের গুলি কাবাবের মতো। চিংড়ি মাছ-আলুর পুর ময়দা ও ডিমের গোলায় ভাজা। কয়েকটা চাখার পর খেলাম পাউরুটি, চিকেন সসেজ, চিকেন কারি, রকমারি ফল। শেষ পাতে পুডিং।
পরদিন সকালে ঘুম ভাঙতেই দেখি দশ তলার ঘরের জানালার ওপারে সূর্য হাসিমুখে প্রভাতী শুভেচ্ছা জানাচ্ছে। ব্রেকফাস্টে আজ শুধুই জাপানি খাবার। কাল রাতে ওসব বিশেষ খাইনি। আজ আমি সর্বার্থেই এ ব্যাপারে বেশ সাহসী এবং অভিযানপ্রিয়।
হোটেলের কাছেই হিরোশিমা ন্যাশানাল পার্ক, আটমিক বম্ব ডোম, পীস মেমোরিয়াল মিউজিয়াম, পীস অব ফায়ার অহোরাত্র জ্বলছে। বাসে চড়ে তিন-চার কিলোমিটার দূরে সেই নির্দিষ্ট অঞ্চলে এলাম। হিরোশিমা প্রিফেকচারাল ইন্ড্রাস্ট্রিয়াল প্রোমোশনাল হল।
সব রকমের সামুদ্রিক মাছ, ঝিনুক, সুশির প্রকারভেদ, মিষ্টি হিরোশিমা স্পেশাল তোফু ফ্রাই, হরেক রকমের স্যুপ, ভাত সব অল্পবিস্তর খেয়ে ফেললাম। আর খেলাম সুকিয়াকি, যা খেতে হয় গরম গরম। সুশি বস্তুটি অনেকের কাছে বেশ প্রিয় মনে হলেও আমার তেমন কিছু লাগেনি। কাঁচা মাছের একটা ব্যঞ্জন পাতলা রাইস-পেপারে মোড়া। খাবার সময় জাপানিরা চপস্টিক দিয়ে খায়, আমাদেরও তাই দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু অভ্যস্ত নই বলে ছুরি, কাঁটা, চামচ সহযোগে খেলাম।
হোটেলের কাছেই হিরোশিমা ন্যাশানাল পার্ক, আটমিক বম্ব ডোম, পীস মেমোরিয়াল মিউজিয়াম, পীস অব ফায়ার অহোরাত্র জ্বলছে। বাসে চড়ে তিন-চার কিলোমিটার দূরে সেই নির্দিষ্ট অঞ্চলে এলাম। হিরোশিমা প্রিফেকচারাল ইন্ড্রাস্ট্রিয়াল প্রোমোশনাল হল। সকালের নরম আলোয় চারপাশ কী স্নিগ্ধ দেখাচ্ছে! সেখানে দাঁড়িয়ে রয়েছে আটমিক বোম্ব ডোম বা জেনবাকু ডোম।

আমাদের জাপানি গাইড কোজি বলে চলে হিরোশিমায় বোমা ফেলার ইতিহাস। ১৯৪৫ সালের আগস্ট মাস, বি উনত্রিশ নম্বর বোমারু বিমান পরমাণু বোমা নিয়ে হিরোশিমার দিকে রওনা হল। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ট্রুম্যান বলেছিলেন জাপান আত্মসমর্পণ করেনি, যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। তাই ৩রা আগস্টের পর তাদের ওপর পরমাণু-বোমা ফেলা হবে।
৬ই আগস্ট জাপানের মালভূমির ওপর একটি শহর হিরোশিমার ৩২ হাজার ফুট উপরে আকাশে সকালে দেখা গেল তিনটি বিমান। হিরোশিমার উত্তর-পশ্চিমে পাহাড় আর দক্ষিণে সমুদ্র। তখন অনেকেই ঘুম থেকে উঠে ব্রেকফাস্টে ব্যস্ত, ছোট ছেলে-মেয়েরা স্কুলে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে, বড়রা কাজে যাওয়ার জন্য, হঠাৎ সাবধান-ধ্বনি সাইরেন শোনা গেল। কেউ গ্রাহ্য করল না।
শহরের চারদিকে আগুন। বেলা বারোটা পর্যন্ত টোকিও কোনও খবর পায়নি। সেই দিনের কথা বলতে বলতে কোজি কেঁদে ফেলল। তার ঠাকুরদা নাকি সেদিন এখানে ছিলেন। ওর জলে ভেজা চোখ দেখে আমাদের চোখও অশ্রু সজল হয়ে উঠল।
সকাল আটটা বেজে ১৫ মিনিট ১৫ সেকেন্ড। বিমান থেকে নামিয়ে দেওয়া হল প্যারাসুট আর তার ৪৩ সেকেন্ড পর হিরোশিমার আকাশে বিশ্বের প্রথম পরমাণু-বোমা ‘লিটল বয়’-এর বিস্ফোরণ হল। স্থানীয় লোকেরা দেখল নীল বেগুনি আলোর ঝলক আর কান ফাটানো শব্দ। মুহূর্তেই নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল একটা শহর, কয়েক সেকেন্ডের ভেতর প্রায় লক্ষাধিক মানুষ মারা গেল, আর কয়েক লক্ষ আগুনে, পারমাণবিক রশ্মির বিকিরণে হল বিকলাঙ্গ।
চারদিকে আগুন। বোমার দৈর্ঘ্য ছিল ৩ মিটার প্রস্থ ৭১ সেন্টিমিটার, ওজন তিন টন, আর বিশ হাজার টন টিএনটি শক্তিসম্পন্ন। সেদিনের পর্যবেক্ষণকারী বৈমানিকদের অভিজ্ঞতায়, সারা শহর আলোয় উদ্ভাসিত হয়েছিল নীল কমলা বেগুনি ধূসর রঙের আলোতে, ব্যাঙের ছাতার আকৃতির ধোঁয়া আকাশে উঠল, নিচে ধুলো আর বালির ঘূর্ণিঝড়।

শহরের চারদিকে আগুন। বেলা বারোটা পর্যন্ত টোকিও কোনও খবর পায়নি। সেই দিনের কথা বলতে বলতে কোজি কেঁদে ফেলল। তার ঠাকুরদা নাকি সেদিন এখানে ছিলেন। ওর জলে ভেজা চোখ দেখে আমাদের চোখও অশ্রু সজল হয়ে উঠল। কোজি তখনও থামেনি, আবেগায়িত গলায় বলে চলেছে, বিস্ফোরণের পরেও জাপান আত্মসমর্পণ করেনি। তিনদিন পর নাগাসাকিতে ফাটানো হল ফ্যাটমান, তার শক্তি ছিল বাইশ হাজার টিএনটি।
আমাদের জাপানিদের মনোবল অনেক জোরালো। আজকের হিরোশিমা শহর সেদিনের ধ্বংসের স্মৃতি ভুলে আবার নতুন সাজে জেগে উঠেছে, আর সেদিনের স্মৃতি বহন করছে, দেখো, সামনের ওই শান্তি-সৌধ। সেখানে সযত্নে রাখা আছে সেদিনের পোড়া ছাদের টালি আরও অনেক বস্তু। স্মৃতিসৌধের চারপাশে ফুলে বিছানো পার্ক, সামনেই আছে ফোয়ারা। পরমাণু বিস্ফোরণে যারা অকালে প্রাণ হারিয়েছে তাদের স্মৃতিতে উৎসর্গীকৃত।
ওসাকা সুন্দর ছিমছাম শহর। কত স্কাইস্ক্র্যাপার। বড় একটি বিল্ডিং টিকেপি, তার মাঝে চলে গেছে হাইওয়ে। সে এক অদ্ভুত দৃশ্য, ১৯৯২ সালে তৈরি। জায়গাটার নাম ফুকুশিমা কু।
হিরোশিমা মিউজিয়ামে সংরক্ষিত দৃশ্যগুলো চোখে জল এনে দেয়। ভিজিটার্স নোটবুকে নিজের মনোভাব লিখে দিলাম, কর্তৃপক্ষ হাতে ধরিয়ে দিল আগামী প্রজন্মের মানুষের জন্য শান্তির বার্তা সমেত বই ও বুকলেট, দেশে ফিরে তোমাদের শিশুদের পড়তে দিও। ফুলের সমারোহে, বাইরের রাস্তায় ট্রামের মসৃণ গতি, জানিয়ে দিচ্ছে জীবন কোথাও থেমে থাকে না। তাই যুদ্ধের মুখে দাঁড়িয়েও যুদ্ধ বিরতির জন্য এত আকুলতা।
মধ্যাহ্ন ভোজনের পর আবার বুলেট ট্রেন চড়া হল। এলাম ওসাকা স্টেশনে। জাপানের প্রধান শহরগুলোর মধ্যে ওসাকাই সবচেয়ে পুরোনো, আদিতে তার নাম ছিল ওসুমি, তারপরে নানিওয়া। এখানে লক্ষ্যণীয় জনবসতি আর প্রথম সাম্রাজ্য গড়ে ওঠে ৩৯০ খ্রিস্টাব্দে। এশিয়ার অন্যান্য দেশের সঙ্গে বাণিজ্য আর সংস্কৃতি বিনিময়ের দরজা খুলে দেয় এই ওসাকা।

ওসাকা সুন্দর ছিমছাম শহর। কত স্কাইস্ক্র্যাপার। বড় একটি বিল্ডিং টিকেপি, তার মাঝে চলে গেছে হাইওয়ে। সে এক অদ্ভুত দৃশ্য, ১৯৯২ সালে তৈরি। জায়গাটার নাম ফুকুশিমা কু। আজ আমাদের থাকার জায়গা ওসাকার হোটেল আগোরা ওসাকা মোরিগুচি। আগামী দু’দিন এখানেই থাকব।
ভ্রমণের নবম দিন সকালে ঘুম থেকে উঠেই মনে হল আজ জাপানের সভ্যতার আদিপর্ব চাক্ষুষ করব। ব্রেকফাস্ট সেরে ওসাকা শহর ভ্রমণের জন্য রেডি হতেই আমাদের নির্দিষ্ট কোচ হোটেলের সামনে এসে হাজির। জাপানি ড্রাইভার হাসি মুখে বলল, ও-হা-য়ো! অর্থাৎ গুড মর্নিং। প্রত্যুত্তর দিয়ে হাসি।
(ক্রমশ)
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
