আইঢাই: মাঁছ…কঁই…!

মেছো ভূত

শাশুড়ির অসুখ শুনে জামাই চলেছে ভিন গাঁয়ে তাঁকে দেখতে। মেয়ে তার বরটিকে বার বার করে বলে দিয়েছে, পা চালিয়ে বেলাবেলি চলে যেও বাপু। জলার ধারে, বনে বাদাড়ে মায়ের কুঁড়েটি। দিনের আলো নিবলেই তেনারা কিন্তু এসে পড়েন। তো, জামাই পা চালিয়েই এসেছে। পথে একটু চিঁড়ে মাখা খেয়ে গাছের ছায়ায় জিরোতে গিয়েই চোখ দু’খান একটু যা লেগে গিয়েছিল। তাই বাকি পথটুকু  হুড়মুড় ছুটেও সূর্য ডুবে গেল। সন্ধ্যের মুখে ঘরে ঢুকে জামাই দেখে যে শাশুড়ি ঠাকরুন বসে আছেন মাথা মুড়ি দিয়ে। মুখ ঢেকেই বললেন, হাতে মুখে জল দিয়ে দুটি খেয়ে নাও বাবা! জামাই ভাবল যে, জ্বরো গা বলেই শাশুড়ির গলাটা বোধহয় একটু কেমন খোনা খোনা শোনালো।পুকুর থেকে হাত মুখ ধুয়ে এসে জামাই দেখল,এক থালা ভাত বেড়ে, শাশুড়ি মা তার পিঁড়িরই উল্টো দিকে মুখ ঢেকে উবু হয়ে বসে আছেন। দু ‘গ্রাস পান্তা মুখে দিয়েই জামাই বলল, মা, একটু লেবু হবে? আর শাশুড়িমা ওমনি, তাঁর লম্বা কঙ্কাল হাতখানি বাড়িয়ে বাদার বাগান থেকে লেবু এনে উধাও হয়ে গেলেন। জামাই তো আঁ..আঁ করেই দে ছুট। হাফাঁতে হাঁফাতে রাস্তায় নেমে শুনলো যে, তিনি নাকি দু’দিন আগেই মারা গেছেন। তো, এই গল্প শোনার পর দাদামশায়ের বাগান দেওয়া বাড়ির, লেবু-পাড়ের রান্নাঘরে রাতের খাওয়ার সময় আর কোনও দিন লেবু চাইনি। আমাদের এ বাড়ির ঠাকুমা এই গপ্পোটা বলতেন। সেখানেও  গ্রিল ঘেরা তিনতলায় জ্যাঠামনিদের ন্যাড়া ছাদের কানে ঠেকানো কোণে আমাদের রান্না খাওয়া। তাই গা ছম ছম থেকেই যেত, ধারে কাছে লেবু গাছ না থাকলেই বা!

এই তো সেদিন শান্তিনিকেতনে বন্ধুর আলো ঝলমল ডেরায় ডিনার সাজিয়ে, ওই বাড়ির কেয়ারটেকার কাম মালি সেই চারুরামকে যেই বলেছি, গাছ থেকে একটা লেবু এনে দে না রে, । চারুর মুখ শুকিয়ে যাওয়া দেখেই আমারও বুক দুর দুর। অল্প শীতেই চাদর – মুড়ি শক্ত সমর্থ সাঁওতাল চারু যখন রান্না ঘরের পিছনেই কুয়ো পাড় থেকে লেবু এনে টেবিলে রাখলো, আমি না লেবু, না চারুর হাতের দিকে তাকাতে পারছি। মনে শুধু আঁ আঁ আঁ।

আর সেই কুনি ভূত, সেটিও তো ওই হেঁশেল কোণের গপ্পো। চাঁদের আলোয় রাম নাম জপতে জপতে জঙ্গল পার হচ্ছে বামুন। এমন সময় শোনে, এক ছনছনে গলায় কে যেন তাঁকেই বলছে, ‘ও ঠাকুর, কুনিকে বোলো বুনির খোকা হয়েছে’।  বাড়ি ফিরে রাতের খাওয়া খেতে খেতে বামুন যেই না সে কথা বামনীকে বলেছে, ওমনি খনা গলায় হাসির ছররা। হেঁসেল কোণের যে দিকটায় ভাঙা হাঁড়ি আর ছেঁড়া চ্যাটাইয়ের তাগাড় সে জায়গাটায় শুরু হলো তুমুল লম্ফ ঝম্প আর ধেই ধেই। দুদ্দাড় পড়ে ঝরে গড়াগড়ি পেতে লাগল সব। দেখা গেল যে একটা ছায়া নাচছে আর খনা গলায় গাইছে,  ‘ক্যায়া মজা – ক্কেয়া মজা’ ! বামুন বুঝতে পারলো যে রান্না ঘরের কোণে জমা ময়লায় পেত্নির বাসা হয়েছে। সকাল হতেই ঝেঁটিয়ে সাফ করতে গেলে, কুনি ভূতের সে কি কাতরানি। শেষে রফা হলো এই, যে ওই কোণে ঝোলানো ছিকের মধ্যে সে থাকবে, আর বামনিকে সব কাজে হাতে হাতে সাহায্যও করবে। রান্না ঘরে ভাঙাচোরা, ছেঁড়া ছুটো দেখলেই ঠাকুমা টান মারে সব ফেলে কুনি ভূতের বাসা ভাঙতেন।

                             *******

তাই ভাবতে বসেছি যে বেশিরভাগ পেত্নি আর শাঁখচুন্নি  সবাই কেন এই হেঁশেল ঘিরে! মেয়েরা কি মরেও রান্না ঘর ছাড়তে পারে না? বেশির ভাগই তো সাদা থান পরা সেজ ঠাকুমা  বা মেজ জেঠিমা বা অকাল বিধবা বটঠাকুরঝি! কোনও হেঁসেলে প্রতিদিন নিয়ম করে দেখা যেত সাদা আঁচলে ছায়া শরীর। জীবিত গিন্নীরা কিছুক্ষণ থমকে থেমে বলতেন,  বৌমারা এবার যেতে পারিস, বড় গিন্নী সরেছেন। কোনও বাড়িতে উনুন পাড়ে বিকেলের এক গ্লাস চা রাখা হতো। অন্ধকার ঘন হলে ঠক করে শব্দ হতো, কাঁসার গ্লাস ঝনঝনানির। মানে আর কী! কনে ঠাকুমা সেবা পেলেন। খালি গ্লাসটা তাই উনুন পাড় থেকে পড়ে মাটিতে গড়াচ্ছে। ভর দুপুরের ছায়া মেখে গামছা সরে যাওয়া মানেই  দিদি শাশুড়ি গঙ্গা নেয়ে এসে দেখা দিয়ে গেলেন এই মনে করিয়ে দিতে যে, গৃহ দেবতা কৃপানাথের মাথায় জল পড়েনি। ওমনি বড় গিন্নির হাঁক – যা যা, মন্দিরে যা, আজ ‘কালো ‘ বোধহয় পুজোয় ডুব মেরেছে । গঙ্গাজল দিয়ে দুটো বেলপাতা চড়িয়ে দে। সধবারা মরে পেত্নি হলেই তাঁদের তুষ্ট করতে সেবা দেওয়া হত কাঁচা মাছ। পুকুরে জাল দেওয়ার সময় থেকেই  তা মনেও থাকতো। রান্নার আগে একটা কচি মাছ পুড়িয়ে কলাপাতায় সাজিয়ে রাখা হতো পাছ – উঠোনে, যেখানে আঁশ ফেলা হয়। কাক এসে খেয়ে গেলেও মনে করা হতো যে তিনিই খেলেন।

কোনও কারণে ভুলে গেলেই গিন্নি নাকি দেখতেন যে রাঙা রঙের শাড়িতে মুখ ঢেকে লম্বা হাতে কেউ মাছ তুলে নিচ্ছে তাঁর থালা থেকে।

এইসব চেনা শাড়ি, গামছা, থানের পাশাপাশি ছিল অচেনা ফিস ফিস আর মড়া কান্নার বহর। আর তার সবটুকু ছিল রান্না ঘরের আশে পাশে। বাগানে বাঁশপাতা শির শির মানেই হেঁসেলে তাঁদের আনাগোনা। নিশ্চয়ই মাছের আঁশ বা এঁটো ভাত পড়ে আছে। ন্যাতা কানি না ধুয়ে রাখলেও পেত্নির চাষ। বেড়ালের বা কাকের ঠোঁট থেকে পড়ে মাছের কানকো ছিটিয়ে থাকলেও ভাবা হতো পেত্নি – কান্ড ঘটেছে। সঙ্গে সঙ্গে সোরগোল – ওরে ধুনো দে, লোহা গরম করে রাখ, ভালো করে দেখ যে উঠোনে মেলা শাড়ির খুঁটটা খুবলে ছেঁড়া কিনা, আদুড় গায়ে খেলে বেড়ানো খোকার পিঠে শয়তানের আঁচড় পড়ল কি!

তবে মাঝে মাঝে ফলস্ ফায়ার যে হতো না  তা নয়। বাড়িতেই থাকা রান্নাদিদি বিবাহিত সেই রানু আর  রূপবান নেপালি পরিচারক বাহাদুরের, খিড়কির কাঁঠাল তলায় ফিসফিস শুনে, সকলের বুক দুর দুর। একে পেত্নি তায় সঙ্গে ভূত এবং মাঝে মাঝে  আবার খিল খিল আর চুড়ির শব্দ! দিন কতক শোনার পর সবাই যখন রান্নাঘরে থেকে থেকে ধুনো চড়িয়ে প্রণাম সারছে তখন রানুদিও কিন্তু সকলের সঙ্গে দিব্যি ভয় পাচ্ছে। তবে ধরা পড়ার আগেই  এ বাড়ি ছেড়ে তারা পালাল। আর, ফিসফিস ভূতও তার পেত্নি সমেত, হেঁসেল ছেড়ে হওয়া। 

সে যা হোক, তবে জ্যোৎস্না রাতে রান্নাঘরের পিছনে কলাবাগানে বহু মানুষই কলাভূত দেখেছেন। কখনও চুল খোলা রঙিন শাড়িতে, কখনও বা উবো ঝুঁটি নরুণ পেড়ে সাদা থানে। তাদের কেউ কেউ আবার আঁশ গন্ধ ছিটিয়ে জানান দিয়েছে। কেউ বা দাউ দাউ চুলোর ছাই মুখে গিলে। রান্নাঘরের ঝিম মানে শুনসান দুপুর বা রাত, পেত্নি  সেখানে আসবেই। নিদেন পক্ষে তাঁদের সরে যাওয়া ছায়া বা হাঁচি মাখা হাসি বা কান্নায় ছাঁত ছাঁত তো করবেই।

আমার জ্ঞাতি ঠাকুমা গীতারানী  ওরফে ‘বোম ‘ (বউমা) থাকতেন গিরিডির কাছে ‘ফুলিয়া টাঁড় ‘ এ। তাঁর শ্বশুর ও শাশুড়ি মায়ের গড়া আদরের বনবসত। জনশূন্য বিজলী বিহীন, বেরি নদীর পাড়ে সেই মাটির ঘর দালান এককালে ছেলে পিলে, মেয়ে, জামাই, নাতি, নাতনিতে ভর ভর্তি থাকলেও একই সঙ্গে ছিল ডাকাতের ভয়। আর ছিল ভূতের বাস। তো অসম সাহসী ‘বোম ‘ শুধু যে বন্দুক উঁচিয়ে ডাকাত তাড়াতেন তাই নয়, গদাম গদাম করে ফাঁকা বন্দুক দেগে ভূত পেত্নি সব্বার গতি করে ছাড়তেন।তাঁর সংগ্রহে পেত্নির সংখ্যাই বেশি। তাদের পছন্দের জায়গাও ওই  হাটখোলা রান্নার দাওয়া ও সংলগ্ন উঠোন। সাপ, ব্যাঙ, মাছ, মুরগি, হাঁস, গরু, মহিষ রূপধারী সব ভূতেরাই পেত্নি হয়ে তাঁর হেঁসেলে সরে সরে জানান দেয়। আর তিনি থেকে থেকেই চেঁচিয়ে ওঠেন – তবে রে! ফের বিরক্ত করছিস? গামছার আভাস বা থানের ঘোমটা অথবা রাঙা পেড়ে শাড়ি কোনও কিছুকেই ডরাতেন না। ‘হাম ভি আছি – তুম ভি আছো’ গোছের মনোভাব। আর ভরসন্ধ্যে বেলা পিঠে ভাজতে বসে যদি দেখেন যে, কালো ঠ্যাং ঠেঙ্গে পশম ওঠা লম্বা কোনও হাত নিঃশব্দে এগিয়ে এসে পিঠে চাইছে তো একটুও ভয় না পেয়ে সটান খুন্তি ছ্যাঁকা। তাঁর মতে লোহার কড়াই আর খুন্তিতে রান্না করলেই তো  তা একেবারে ভূত শুদ্ধি হয়ে যায়। বোমের সাহসিকতার গপ্পো শুনতে শুনতে, আর সেই দাওয়ায় বসে লিটটি খেতে খেতে নেমে আসা ঝুঁঝকো অন্ধকারকেই আমার পেত্নিপুরীর দেওয়াল মনে হয়েছিল। জলজ্যান্ত মহিষ, গরু, কুকুর, শেয়াল এমনকি ওই মুড়ি দেওয়া মারাঙ্গো ও সোমরাকেও মনে হচ্ছিল যে এরা বোধহয় সেই তাঁরা, আমাকে দেখা দিতে থ্যাপন জুড়ে হেঁসেলে এয়েছেন। ‘বেটি আয়ী’ বলে, পড়ন্ত আলোয়, বেরি নদী ছেঁকে পাথুরে মৌরলা গামছায় ঝুলিয়ে, গুট গুটিয়ে হেঁটে আসা বুড়ো ” লাড়কা ” আদর জানিয়ে উঠোনে এসে দাঁড়াতেই আমি তার গোড়ালি দেখছি – সোজা না উল্টো ! বাপের নাম বাবাজি করে-  রাম রাম রাম বলতে বলতে, অজ্ঞান হওয়া ঠেকিয়েছি। সে রাতে ” মশারিতে লিখি শুধু রাম রাম রাম ” আর ভয়ে কাঁপা গলায় একটাই গান -” জু- উ, জু”।।

তবে,সে এক জমজমাট  ভূতের চাষ ছিল বটে আলিগড়ে থাকা আমার বড়ো মাসির রান্নাঘরে! সেখানে আবার বাঙালি ভূতের সঙ্গে অবাঙালি এবং হিন্দু মুসলমান সম্প্রীতি। নিজাম, জয়দেবী মুন্নি, রাণী সব একযোগে। ভাঁড়ার ঘরে ঠুক ঠাক, বস্তা ভর্তি চাল বেমালুম পড়ে যাওয়া, নুন দেবার পরেও আলুনি তরকারি, এক হাঁড়ি মাংস কেউ খাবার আগেই তলানিতে ঠেকা – কী না ঘটতো! তার সঙ্গে লাগাতার মল ছুমছুম্ আর অদৃশ্য খিল খিল হাসি। ঘাড়ে ফুঁ আর আঁচলে টান তো নস্যি মাত্র। বড়মাসি অবশ্য বর্ণনাই করতেন। বোমের মতো তাঁর কোনও বীরত্ব প্রদর্শন ছিল না। কিন্তু  সে সব শুনতে হতো আমাদের প্রাণ হাতে করে। মাসির বাড়ি বেড়াতে গিয়ে ওই প্রাসাদের মতো বাড়িতে তো এমনিই হারিয়ে যেতাম। তার ওপর রান্নাঘরের থেকে ওইসব ঝামুর ঝুমুর!কোথায় লাগে কোপ্তা – কাবাব আর ক্ষীরের মিষ্টি বা কেক – পুডিং, মনে হতো এক ছুটে পালাই। বাঁশঝাড় আর কলাগাছ ঘেরা খড়দার চেনা রান্নাঘরের অন্ধকারে পেত্নির আনাগোনাও যেন অনেক আরামের বোধ হতো।

কলকাতায় ছোট পিসি বা আনু দিদার হেঁসেলে  ওসবের চল ছিলনা। তবে মায়ের মতিঝিলের বাসায় তাঁরা বেশ জমিয়ে গুছিয়ে থাকতে শুরু করেছিলেন। মায়ের ইস্কুলের গঙ্গাদা যতদিন না ইস্কুল কোয়ার্টার পেয়েছে, তত দিন সে আমাদের বাড়িতে থাকত । রান্না এবং বাজারের দায়িত্বে থাকায় দু’একটি একঘেঁয়ে পদ ছাড়া আর কিছুই পাতে পড়ত না। কারণ জানতে চাইলে বলতো, আলু কুমড়ো আর তেলাপোকা  (তেলাপিয়া ) মাছ ছাড়া আর সব সবজি এবং মাছেই নাকি ভূত পেত্নির বাস। ওগুলো কিনে আনলেই নাকি তাঁরা সোজা হেঁসেলে এসে ঢুকবেন। তার মতে, লঙ্কা গাছে বামনী ভূত, বেগুন গাছে আঁকশি ভূত, শাকের ক্ষেতে ছাগল ভূত, পটল, ঝিঙে, লাউ, চাল কুমড়ো এসব সবুজ সবজিতে ঝোলা ভূত আর খাল, বিল, নদী, পুকুরে ঘোড়া ভূতের বাস। তা ছাড়া তো গ্যাস – কড়াই এক করে ছ্যাঁক করলেই নাকি তেনাদের ঘুম চটকায়। তাই কোনও রকমে জল ঢেলে কুমড়োর ঘ্যাঁট আর লপসি ভাত। শুতে যাবার আগে, রান্নাঘরের আলো নিভিয়ে, ডাইনিং স্পেসের দিকে পা ছড়িয়ে, দরজায় হেলান দিয়ে যুত করে বসে, কাঠের পাটায় পিঠ ঘষতে ঘষতে এই সব আজগুবি ভূত পেত্নির সমাবেশ ঘটাতো গঙ্গদা। ডাইনিং স্পেসের আলো তার পায়ে পড়লেও মুখ আর পিঠ আবছা অন্ধকারে। ঢুলতে ঢুলতে সে বোধহয় ভূতের ঘোরে ঘুরে বেড়াতে চাইতো বালেশ্বরের কাছে তার গ্রামের বাড়ি, লক্ষণনাথের বনে বাদাড়ে। আর তাকে দেখে আমার মনে হতো ন্যাড়া বাদার ঘোড়া ভূত,  টপাটপ মাছ ধরছে আর গপাগপ খাচ্ছে। গঙ্গাদা কোয়ার্টার পেয়ে যেতেই আমাদের সন্ধ্যে গুলো ম্যাড়মেড়ে করে দিয়ে ভূত পেত্নির দলও উধাও হলে গেল।

                             ********

তবে তাঁরা সবাই যে ভয় দেখাতেন তা কিন্তু নয়।

অনেক জরুরি কাজ মনেও করিয়ে দিতেন। যে তরুণীটি সন্ধ্যে লাগলেই নিয়ম করে ধুনো দিত  গোয়ালঘরে জলে ডুবে মরে পেত্নি হবার আগে, সে ঠিক ধুনোর গন্ধ ছড়িয়ে যেত সময় মতো। আর গিন্নীমায়েরও টনক নড়ে উঠত – শিগগির যা, গোয়ালে ধুনো পড়েনি রে! মশার কামড় খাবে গাই বাচুরগুলো!  কুয়ো পাড়ে গা ধুতে গিয়ে যার লম্পের আগুন কাপড়ে লেগে মৃত্যু, তাকেও মাঝে মাঝেই দেখা যেত, রান্নাঘরের কুলুঙ্গিতে প্রদীপ জ্বেলে দিতে। যে ঠাকুমা গঙ্গা নেয়ে, কপালে গঙ্গা মাটির টিপের ওপর একটা তুলসী পাতা লাগিয়ে ভোরের আঁচ পড়বার আগে হেঁশেল উঠোনে গোবর জল ছিটে দিতেন, তিনিও তাঁর ভিটের টানে  প্রায়ই ভেসে ভেসে আসতেন। গোবর ছড়া দিতে এসে জীবিত কনে ঠাকুমা, রাম রাম বলতে বলতে দেখতেন যে তাঁর সে কাজটি ভোর রাতেই সারা। এভাবেই টেবিল ঘড়িতে ছোটকাকু ভোরের এলার্ম দিতে ভুলে গেলেও, এলার্ম কিন্তু ঠিক সময় বেজে উঠত, স্বর্গবাসী সেজ ঠাকুমার কল্যাণে। কারণ ছোটো কাকুই জনতা জ্বেলে ভোরের চা বানাতো। আরও  কিছু ছোটো খাটো টুকিটাকি তো ছিলই। যেমন রান্নাঘরের দরজায় শিকল তুলতে গিয়েও কে যেন মনে করিয়ে দিত যে শ্বশুর মশায়ের ইসবগুল ভেজানো বাকি; সারাদিন লুকিয়ে লুকিয়ে তন্ন তন্ন করে খুঁজেও গরম চাদর – কম্বল রাখা ট্রাংকের যে চাবি কোত্থাও খুঁজে পায়নি ছোটো বউ, হঠাৎ করে তা পাওয়া গেল। কোথায় ? ঝন ঝন করে পড়ল, রান্নাঘরের ছিকের ভেতর রাখা গুড়ের হাঁড়ির নিচে থেকে।

                        ********

তাঁরা যে শুধু দূর থেকে দেখা দিতেন তাই নয়, যথেষ্ট দুষ্টুমিও করতেন। পাকা রাঁধুনির রান্নাও হয়ে যেত নুনে পোড়া। নুনের ওপর নুন দিয়ে যেতেন তাঁদের কেউ একজন। চুলোর ওপর  ছড়িয়ে থাকা পোড়া কালো নুন দেখেই বোঝা যেত। থালায় খাবার বেড়ে না ঢেকে উঠোন পার হবার জো নেই। হয় বেদম হোঁচট না হলে সটান ধড়াস। হয়ে গেল! পেত্নির নজরে ছড়াবড়া একাকার বাড়া ভাত তরকারি। আ – ঢাকা দুধে ইঁদুর পড়াও নাকি তাঁদের কারসাজি। ওই ভাবেই তাঁরা তাঁদের ভাগের ভাগ মর্যাদাটি আদায় করে ছাড়েন। আর ঘাড়ে ফুঁ, চুলে টান, পিঠে ঢেলা, কপালে ঠান্ডা হাত এসব তো আছেই। তার প্রতিক্রিয়া হলো  বাবা গো, মাগো,ভূ উ উ…..। কাউকে কাউকে আবার তাঁরা জব্বর ধরতেন। তখন ওঝা ডেকে ছাড়াতেও তো সেই রান্না ঘরের জলভরা পেতলের কলসি, না হয়তো কাঁসার থালা, নয়তো লোহার কাটারি। লক্ষ্য করে দেখেছি যে কাঁসা, পেতল, লোহা এবং আগুনের কাছে এঁরা বেজায় জব্দ।

আমার ঠাকুমা এসবে বিশ্বাস করতেন কিনা জানিনা। তবে নতুন উনুনে প্রথম আঁচ ধরাবার আগে বাচ্চাদের ডেকে খুব কষে হাসতে বলতেন। এ নাকি তাঁর শাশুড়ি ঠাকরুন চারুশীলার চলন করা। যে কোনও বিরক্তিকর কাজ করিয়ে নিতে শাশুড়ির নাম নিতেন তিনি। এরকমই ছিল, কয়লার চৌবাচ্চা পরিষ্কার করানো, ছবির মতো ঘুঁটে সাজানো। আর হীরের মতো ঝকঝকে কয়লাগাদা না হলেই এক যুগ আগে সধবা যাওয়া শাশুড়ির অদৃশ্য লালপেড়ে শাড়ির আভাস নাকি উড়তে থাকতো। ভাতের থালে নাকি ছাই পাওয়া যেত। ফলে এসব না মানলে, রাতে তাঁকে দেখতে পেতেন কিনা জানিনা। তবে, এ কথাটা  ঠাকুমা প্রায়ই বলতেন যে, খাওয়া নিয়ে ঝঞ্ঝাট বাধালেই মরেও কিন্তু দেখতে পাব। চোখ চকচক করে, কেমন করে তা হবে জানতে চাইলে বলতেন, চোখদুটো উনুনে গেঁথে যাব। কলকাতার আস্তানায় গ্যাস জমানায় তাই আমি মজা করে বলতাম, কি গো চোখ দুটো কোন উনুনে গাঁথবে! তুমি চোখ বুজলেই তো দিনরাত ফুচকা খেয়ে কাটাব, আর বিছানায় বসে ভাত।

                             *******

দোষারোপ করবার এক ভারি সুবিধেও ছিল। অসাবধানে দুধ উথলে ধোঁয়া গন্ধ, বেমক্কা হাত কেঁপে ফ্যান গালতে গিয়ে হাঁড়ির ঢাকা সরে ফ্যান ছড়িয়ে গেল, বিকেলে গা ম্যাজম্যাজ করছে  – চা চড়াতে কুঁড়েমি, তো সব দোষ পড়তো ওই সেই তাঁদের ওপর। মায়ের দোষে খোকা খুকু যেমন চড় চাপাটি খেত তেমনই পেত্নিকুলেরও শ্রাদ্ধ করে ছাড়তেন গিন্নিরা। বিনা দোষে মুরগি হতো যত অদৃশ্য ছায়া শরীর। হেঁসেল ঘিরে গিন্নীর প্রমাদ মানেই,  মায়া ছাড়তে না পারা পেত্নির চুলে টান। মুখের কথাই ছিল – দেখ আবার পেত্নি ধরেছে কিনা! জানা লোক সর তুলে খেয়ে যেমনকার ঢাকা তেমন দিয়ে রেখে গেছে, গিন্নি তবু বলবেনই যে পেত্নির নজর লেগেছে। রান্না খারাপ, সবাই ঠেলছে কিন্তু দোষ হবে পেটের, যে ‘পেঁচোয় ‘ পেয়েছে নিশ্চিত। আজ করছি কাল হবে করে – হেঁসেল পাড়ের না ছাঁটা শিউলি গাছটা যখন ঝড়ে হুড়মুড় পড়ে টালি ভাঙবে, কর্তা গম্ভীর হয়ে খুঁজে বেড়াবেন প্রেতাত্মার পায়ের ছাপ। আদুরে মেনি পাখি মেরে খেয়ে হেঁসেলে পালক ছিটিয়ে রেখে গেলেও সে পার পাবে আঁশ খেকো পেত্নির অজুহাতে। রান্নাঘরের না মেরামত দেওয়ালের নিচে সিঁধ কেটে চোরে সব কাঁসা পেতলের বাসন চুরি করে পালাল তো কি! কর্তা যাবেন পুলিশ ডাকতে! তার থেকে অপেক্ষা করা সহজ যে  পেত্নি ঠিক চোরের ঘাড় মটকে মারবে!

ভুল কেউ স্বীকার করে! তার থেকে অনেক সুবিধের চারপাশে পেত্নি জাগিয়ে আলো ছায়ার সংসার।

                           ******

তবে হেঁসেল ঘিরে তাঁদের মাহাত্ম্য কিছুটা হলেও  এখনো কিন্তু রয়ে গেছে। খোকা খুকুর খামোকা জ্বর, সর্দি, বমি মানে নজর লাগা ঘটলেই  গনগনে আঁচে বিকট গন্ধ ছড়িয়ে লঙ্কা এবং কালো সরষে পোড়া – এ নাকি অব্যর্থ। আগে নেভা উনুনে দুটি প্যাকাটি জ্বালিয়ে এসব হতো। একালের আধুনিক মায়েরা গ্যাস জ্বালিয়েই কাজ সারে। মায়েদের মনে ভূত – ভরসা থাকলেই হলো। আঁচ মানেই ভূত শুদ্ধি। ওই আঁচটুকুই যা রয়ে গেছে। এখনকার ঝকঝকে ওপেন কিচেন এ কোথায় অন্ধকার! কোথায় ন্যাতা কানি! কোথায় বা পলেস্তারা খসা দেওয়ালে নানা মুখের ছাপ! আর কোথায় বা সেই সব ছায়ার আভাস! খোলা চুলে গিঁট, এলো আঁচলের খুঁটে থু থু থু  আর আঁশ মাড়িয়ে কোমর অবধি গা পা না ধুয়ে আসনে বা পিঁড়িতে খেতে বসা! এসব এখন ঝাপসা হতে হতে দিগন্ত পার হওয়া গপ্পো।

না হাঁড়ি না হেঁসেল – সবটাই হোম ডেলিভারি।

1 COMMENT

  1. পড়ে ভালো লাগলাম তাই শেয়ার করলাম নিজের ফেসবুকের টাইম লাইনে……

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.