(Puja Special Recipe)
বাঙালির পুজো যখন, তখন নতুন ও পুরনো স্বাদের বাঙালি রান্না তো থাকেই। তবে বাঙালি নিজের স্বকীয়তা বজায় রেখেও নানা পরীক্ষানিরীক্ষা করতে থাকে অনবরত।
যখন প্রথম প্রথম স্কুলের গণ্ডির শেষ ধাপে রান্না শুরু করি। তখন হাতের মুঠোয় এত ইন্টারনেট আর গোটা জগতের রান্নার সম্ভার সন্ধান ছিল না। তবে মন টানত অন্য প্রদেশ, অন্য দেশের রান্নার স্বাদ কেমন, তা জানার জন্য। বছরে একবার আসত বইমেলা। ঘুরে ঘুরে নানা বই দেখতে দেখতে হাতে আসে এই অমূল্য বইটি— ‘কুকিং ডিলাইটস অফ দ্য মহারাজাস’, অধুনা মধ্যপ্রদেশ-এর প্রিন্সলি হাউজ অব সাইলানার রাজা দিগ্বিজয় সিং-এর লেখা বই।
হাতে তো আসে, কিন্তু যা সব উপকরণ, বহু বহু বছর আগে সেসব হাতের নাগালে পাওয়া দুষ্কর ছিল। অতএব, মানসচক্ষে দেখতাম আর স্বাদ গ্রহণ করতাম। কিছু উপকরণ বাদ দিয়ে কখনও কখনও ট্রাইও করতাম। যদিও তাতে রান্নাগুলোর প্রতি ইনজাস্টিস হত। আস্তে আস্তে দিন বদলাতে বদলাতে এখন দেশবিদেশের সব মশলাই প্রায় হাতের মুঠোয়। তবু আজ থেকে প্রায় ৩০-৩২ বছর আগে রান্নার পারফেকশন আনার প্রথম পাঠ এই বইয়ের হাত ধরেই। তাই এবারের পুজোর রেসিপি বেছে নিলাম এই বই থেকেই।
রাজা দিগ্বিজয় সিং-এর কথায়, ওঁর বাবা রাজা দিলীপ সিংজি ছিলেন পারফেকশনিস্ট… তখনকার দিনে রান্নার বইগুলো গৃহিণীদের চটজলদি ভাল রান্নার রেসিপি শেখানোর ব্যাপারে পটু ছিল। সেখানে এই বইটি স্বতন্ত্র কারণ, রাজা দিলীপ সিং নিজে রান্না শিখে বারবার এক্সপেরিমেন্ট করে একদম এলিট পারফেকশনে নিয়ে যেতেন। সংস্কৃত, উর্দু, ফার্সি ও নানা ভাষার পুরনো রান্নার বই থেকে রেসিপি জোগাড় করে, নানা প্রদেশের নানা অথেনটিক রান্না শিখে ও রীতিমতো নিক্তির ওজনে মশলা মেপে তবে রান্না করতেন। এই রেসিপি বইতে সমস্ত রেসিপি তাই একদম পারফেক্ট মাপে লেখা, যাকে বলে ‘ফাইন আর্ট অব কুকিং’।
কোনও রান্না শেষ হলে তার মধ্যে একটা ছোট বাটি বসিয়ে তাতে জ্বলন্ত কাঠকয়লা ও ঘি দিয়ে আধ ঘণ্টা ঢাকা দিয়ে রাখা। কখনও কখনও এতে গোটা গরম মশলাও দেওয়া হয় ঘি-র সঙ্গে। এ ছাড়াও খুঁটিনাটি কত কিছু শেখা এই বই থেকে!
কোথাও একটা পড়েছিলাম যে, রাজা দিলীপ সিংজি শিকার করতে গিয়ে রাস্তা হারিয়ে ফেলেন, রাঁধুনিদের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়। তখন উনি অনুধাবন করেন, নিজে রান্না জানার প্রয়োজনীয়তা। সেই থেকে ওঁর রান্না শুরু, আর আস্তে আস্তে পারফেকশন এর চূড়ায় পৌঁছানো!
বইয়ের শুরুতেই যেমন রয়েছে কোন পাত্রে কী রান্না করা ভাল সেসব কথা। লেখা ও ছবি সহযোগে, রয়েছে কিছু সাধারণ রান্নার নাম ও বিবরণ।
ভুনাও- গুঁড়ো মশলা বেশি আঁচে দিয়ে কষিয়ে অল্প অল্প জল বা দইয়ের ছিটে দিয়ে সিজল করার পদ্ধতি। এতে মশলার ফ্লেভার আসে কিন্তু পুড়ে যায় না। ভুনা মোগলাই রান্নার মুখ্য একটি বিষয়।
বাঘার- এটি আমাদের ফোড়ন দেওয়ার পদ্ধতি। তেল গরম করে সুগন্ধি স্পাইস কিংবা রসুন লঙ্কা ফোড়ন দেওয়া।
এই বইয়ের হাত ধরে যেমন সিরাজী রান্না ঘরে প্রবেশ, তেমনই পারস্য, নিজাম, নেপাল, কাশ্মীর আরও কত জায়গার স্বাদ নেওয়া। কিছু রান্না খুব মশলাদার, আবার কিছু একদম শরীর সুস্থ করার জন্য, হালকা মশলা দেওয়া।
ধুঙ্গার- কোনও রান্না শেষ হলে তার মধ্যে একটা ছোট বাটি বসিয়ে তাতে জ্বলন্ত কাঠকয়লা ও ঘি দিয়ে আধ ঘণ্টা ঢাকা দিয়ে রাখা। কখনও কখনও এতে গোটা গরম মশলাও দেওয়া হয় ঘি-র সঙ্গে। এ ছাড়াও খুঁটিনাটি কত কিছু শেখা এই বই থেকে!
এই বইয়ের হাত ধরে যেমন সিরাজী রান্না ঘরে প্রবেশ, তেমনই পারস্য, নিজাম, নেপাল, কাশ্মীর আরও কত জায়গার স্বাদ নেওয়া। কিছু রান্না খুব মশলাদার, আবার কিছু একদম শরীর সুস্থ করার জন্য, হালকা মশলা দেওয়া। যাইহোক আর কথা না বাড়িয়ে কিছু নির্বাচিত রান্না পেশ করি, পুজোর দিনগুলোর জন্য।
কোরমা সিরাজী
সময় – রান্না করতে লাগে দেড় ঘণ্টা, ৪ জনের জন্যে
উপকরণ – ১/২ কেজি মাটন ঘাড় বা পা থেকে, ১৭৫ গ্রাম ঘি, ৬০ গ্রাম পেঁয়াজ সরু করে স্লাইসড, ১৫ গ্রাম নুন, ১২ গ্রাম ধনে গুঁড়ো, ১২ গ্রাম রেড চিলি পাউডার, ৩ গ্রাম হলুদ, ৩ গ্রাম গোল মরিচ গুঁড়ো, ১৮ গ্রাম আদা বাটা, দেড় গ্রাম এলাচ গুঁড়ো, ১২ গ্রাম আমন্ড ব্লাঞ্চড, ১২ গ্রাম পেস্তা ব্লাঞ্চড, ১২ গ্রাম খুবানি (অ্যাপ্রিকট) বীজ ছাড়ানো আর ভেজানো, ১২ গ্রাম কিসমিস, এক চুটকি জাফরান ভেজানো, ৪ টে ডিম হার্ড বয়লেড আর অর্ধেক করে কাটা।

প্রণালী – ঘি গরম করে স্লাইসড পেয়াঁজ দিয়ে একদম বাদামি করে ভাজতে হবে। তারপর তাতে মাংস, নুন, লঙ্কা গুঁড়ো, ধনে গুঁড়ো, হলুদ, আদা, মরিচ সব দিয়ে ভুনাও করতে হবে ৪-৫ বার, যাতে মাংস বাদামি হয়ে ভাজা ভাজা হয়। তারপর উষ্ণ জল দিয়ে ঢেকে রান্না করতে হবে। মাংস সিদ্ধ হলে বাকি সবকিছু দিয়ে আঁচ কমিয়ে রান্না হবে যতক্ষণ না জল শুকিয়ে যায়। ঢাকনার উপরে গরম কাঠকয়লা দিয়ে রাখতে হবে, যাতে কাঠ কয়লার গন্ধ রান্নায় মজে যায়।
ডিম সেদ্ধ দুই ভাগ করে সার্ভ হবে।
দহি কা হালওয়া
সময় – ১ ঘণ্টা রান্নার সময়, ৮/১০ জনের জন্যে
উপকরণ – ১ কেজি ঘন দই, ১২০ গ্রাম ঘি, ১২০ গ্রাম সুজি, ২৫৯ গ্রাম চিনি, দেড় গ্রাম এলাচ গুঁড়ো, দেড় গ্রাম জয়িত্রী গুঁড়ো, এক চিমটে জাফরান গরম জলে ভেজানো, ৬০ মিলিলিটার গোলাপ জল, ৩৬ গ্রাম আমন্ড আর ৩৬ গ্রাম পেস্তা ব্লাঞ্চড আর কুচোনো।

প্রণালী – দই থেকে জল ঝরিয়ে নিতে হবে ৪-৫ ঘণ্টা। অলমোস্ট আদ্ধেক হয়ে যাবে দই। কড়াইতে ঘি গরম করে সুজি দিয়ে কম আঁচে বাদামি করে নাড়তে হবে। আঁচ থেকে নামিয়ে দই দিয়ে নাড়াতে হবে, তারপর যাবে চিনি। আবার আঁচে দিয়ে নাড়াতে হবে যাতে কড়াইয়ের গা থেকে ছেড়ে আসে। ব্যস, তারপর আমন্ড আর পেস্তা দিয়ে সার্ভ করতে হবে।
মালাই কি বিরিয়ানি
উপকরণ– মাটনের জন্যে: ১ কেজি পা থেকে মাংস, ১১৫ গ্রাম ঘি, ২৫০ গ্রাম দই, ২৫ গ্রাম নুন, ১৮ গ্রাম লঙ্কা গুঁড়ো, ১২ গ্রাম ধনে গুঁড়ো, ৬ গ্রাম গোটা জিরে, ৬ গ্রাম গরম মশলা গুঁড়ো, দেড় গ্রাম এলাচ গুঁড়ো, ১৮ গ্রাম শুকনো ডুমুর ভিজিয়ে বেটে রাখা, ১৮ গ্রাম কিসমিস বাটা, ৩০ গ্রাম খোয়া, একটা বড় চিমটে হিং জলে গোলা, ৩০ মিলিলিটার ভিনিগার। ভাতের জন্যে: বাসমতি চাল ১/২ কেজি, ৩৬ গ্রাম নুন, ৬ গ্রাম ফটকিরি।

লেয়ারের জন্য: ১২০ মিলিলিটার দুধ, ৬০ গ্রাম ঘি, ১/২ কাপ রাবড়ি, ১৫ মিলিলিটার কেওড়া জল, ৬টা সিলভার তবক।
প্রণালী- মাংস রান্নার জন্যে সমস্ত উপকরণ মাখিয়ে ম্যারিনেট করে রাখতে হবে, কম করে ঘণ্টাখানেক। তারপর ঘি গরম করে জিরে ফোড়ন দিয়ে মাংস বসিয়ে ঢিমে আঁচে, দমে রান্না হবে। মাংস সেদ্ধ হবে আর জলও শুকিয়ে যাবে। সেদ্ধ করতে জল দেওয়া যাবে না।
চাল আধ ঘণ্টা ভিজিয়ে জল ঝরিয়ে নিতে হবে। ফটকিরি আর নুন দিয়ে ভাত সেদ্ধ করতে হবে। ৩/৪ অংশ সেদ্ধ হলে জল ঝরিয়ে ঠান্ডা করে রাখতে হবে।
মোটা পাত্রে ঘি গরম করে, পাত্রে চার দিকে ঘি মাখিয়ে ১/৩ ভাত বিছিয়ে দিতে হবে। তারপর দুধ ছড়িয়ে তার ওপর মাংসের লেয়ার দিয়ে আবার ভাত দিয়ে আবার মাংস, এভাবে ভাতের লেয়ার দিয়ে শেষ করে, ঘি ছড়িয়ে পাত্রের মুখ ভাল করে বন্ধ করে দমে রাখতে হবে এক ঘণ্টা। এরপর এটি সার্ভ করা হবে রাবড়ি আর তবক ছড়িয়ে!
মাহি কাবাব কালিয়া
উপকরণ- কাবাবের জন্য: ১/২ কেজি মাছের পিস, নুন ৬/৭ গ্রাম, ১২ গ্রাম লঙ্কা গুঁড়ো, ৩ গ্রাম জিরে গুঁড়ো, ৩ গ্রাম মৌরি, ১/২ গ্রাম গরম মশলা গুঁড়ো, ৬০ গ্রাম পেয়াঁজ বাটা, ২৫ গ্রাম ময়দা, ১টি ডিম। গ্রেভির জন্য: ৬০ গ্রাম দই, ২৫ গ্রাম ভেজানো আমন্ড, ৬ গ্রাম চাল গুঁড়ো, গ্রেভির জন্যে নুন, ১২ গ্রাম ধনে গুঁড়ো, দেড় গ্রাম গরম মশলা গুঁড়ো, ৬ গ্রাম আদা বাটা, ১৫ মিলিলিটার গোলাপ জল।

বাগারের জন্য (আমরা যাকে ফোড়ন দেওয়া বলি): ১০০ গ্রাম ঘি ১ বা ১/২ গ্রাম গোটা এলাচ
প্রণালী – মাছ ভাপিয়ে ছাল আর কাঁটা বাদ দিয়ে ভাল করে হাত দিয়ে মেখে কাবাবের সব উপকরণ দিয়ে আবার মেখে নিতে হবে। এর থেকে ১৬টা টুকরো করে যত্ন করে চ্যাপ্টা, গোল আকার দিয়ে আবার ভাপাতে হবে। দু’বারই ভাপানো হবে জলের ওপরে, জলে লেগে না যায় যেন। কাবাব শক্ত হলে নামিয়ে রাখতে হবে। একটা অন্য প্যানে গ্রেভির সমস্ত উপকরণ ভাল করে মিশিয়ে প্যানটাকে আঁচে বসিয়ে ক্রমাগত নাড়াতে হবে। ফুটে উঠলে কাবাব দিয়ে গাঢ় করে নিতে হবে। আলাদা ছোট পাত্রে ঘি প্রায় ধোঁয়া ওঠার মতো হলে এলাচ দিয়ে গন্ধ বেরোলে ওটা কাবাবে ঢেলে দিতে হবে। ব্যস তৈরি, প্রথম পাতে স্টার্টার হিসেবেও খুবই ভাল লাগবে এটি।
পুজো জমে উঠুক আমিষ নিরামিষ রসনা তৃপ্তিতে আর সবার ভালবাসায়। ঘরের মেয়ে উমা আসুক তার নিজের বাড়িতে। শক্তি রূপ থেকে মাতৃ রূপে বিরাজ করুক, বাঙালির মনন আর চিন্তনে জেগে থাকুক নবীন ও চিরন্তনের বন্ধন!
মুগ কাবাব
উপকরণ- ২৫০ গ্রাম মুগ ডাল, ১২ গ্রাম নুন, ৬ গ্রাম হলুদ, ৩৬ গ্রাম আদা বাটা, ২৫০ গ্রাম ঘি ভাজার জন্য, ১ কেজি দই তাজা আর ঘন, ১৫ গ্রাম নুন, ৬০ গ্রাম ঘি বাঘার-এর জন্যে। বাঘারের জন্যে: ৫টি লবঙ্গ, ২ ইঞ্চি দারচিনি দুটো, ২টো বড় এলাচ গুঁড়ো, ২০ টা গোল মরিচ, দেড় গ্রাম জিরে গুঁড়ো

মুগ ডাল ভিজিয়ে বেটে রাখতে হবে মিহি করে। ২৫ গ্রাম মতো আলাদা রাখতে হবে দইতে মেশানোর জন্য। ডাল বাটাতে নুন হলুদ আর আদাবাটা ছাঁকার জল মিশিয়ে দিতে হবে। তাতে চার কাপ জল মিশিয়ে আঁচে বসিয়ে পেস্টটা শক্ত হতে শুরু করলে গ্রিজড প্লেটে সমানভাবে ছড়িয়ে, ১ ইঞ্চি পুরু ৪”x৪” চৌকো করে কেটে ঠান্ডা হলে, ঘি-তে ভাজতে হবে। বাকি ২৫ গ্রাম ডাল বাটা দইতে মিশিয়ে ফেটিয়ে নিতে হবে।
ঘি গরম করে বাঘার বা ফোড়ন দিয়ে দইতে মিশিয়ে দিতে হবে। দই ফুটলে কাবাব আলতো করে ঢেলে নরম আঁচে ১৫ মিনিট রেখে নামিয়ে নিতে হবে। তাহলেই তৈরি মুগ কাবাব।
পুজো জমে উঠুক আমিষ নিরামিষ রসনা তৃপ্তিতে আর সবার ভালবাসায়। ঘরের মেয়ে উমা আসুক তার নিজের বাড়িতে। শক্তি রূপ থেকে মাতৃ রূপে বিরাজ করুক, বাঙালির মনন আর চিন্তনে জেগে থাকুক নবীন ও চিরন্তনের বন্ধন!
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
