(World Photography Day)
ক্যামেরার ভিউফাইন্ডার থেকে চোখ সরাতেই দেখি, পাখিটা ফুরুৎ। পর মুহূর্তেই বুঝলাম, পায়ের নিচের মাটি একটু অচেনা, চেনা পথ আর নেই।
আগের রাতে একটা ছোট দলের সঙ্গে পৌঁছেছিলাম হোটেলে; ইছামতী নদীর ধারে। ভোর সোয়া পাঁচটায় চোখ মেলতেই মনে হল, আলো ফোটার সময়টা নষ্ট করা অনুচিত। রুমমেটকে বিরক্ত না করে ক্যামেরায় মাঝারি মাপের টেলিলেন্স লাগিয়ে একাই বেরোলাম। গেটে দারোয়ানের জিজ্ঞাসু চোখ। বললাম, “একটু হেঁটে আসছি, নদীর ধারে।”
মোরামের সরু রাস্তা, দু’পাশে ধানখেত, মাছের ভেড়ি। শ্রাবণের বাতাসে ভেজা মাটির গন্ধ। দূরে কোথাও একটা মোরগ ডেকে উঠল। খানিকটা এগোতেই দেখি একজন বয়স্ক মানুষ, হাতে কোদাল। ভেড়ির জলের গেট খুলবেন। লুঙ্গি হাঁটু অবধি তোলা, পায়ের গোছ পর্যন্ত কাদা। আমায় দেখে কাজ থামিয়ে তাকালেন।
“একলা এই ভোরে বাইর হইলেন বাবু? সাবধানে হাঁটবেন, বাঁধের ওই পাশে মাটিটা নরম।” বলতে বলতে কোদাল দিয়ে ঠেলে একটা কাঠের ছোট গেট খুলে দিলেন, ভেড়ির জল কলকল শব্দে ঢুকতে লাগল ভেতরে।

নাম বললেন, যতীন সরকার। জানালেন, এই জমিতে আগে ধান হত, এখন নোনা জল ঢুকে জমি নষ্ট, অগত্যা চিংড়ির ভেড়ি। “আগে ধানের গন্ধে ভোর হইত বাবু, এখন হয় লোনা জলের গন্ধে।” আঙুল তুলে দেখালেন একটা পোড়ো জলা জমি, যেখানে আগাছাভর্তি একটা ইঁটের ভাঙা দেওয়াল, গায়ে নোনা মাটির সাদা ছোপ।
“পরপর দু’বচ্ছর আমফান হইল (আসলে আমফান ও ইয়াস), মাটির বাঁধ ভাঙি সব বরবাদ।” গলায় ক্লান্ত অভিমান।
মনটা একটু ভারী হয়ে গেল। পথের ধারে ধারে পাখির ডাক শুরু হয়ে গেছে। আমি পা চালালাম নদীর দিকে। আশেপাশে গাছের সংখ্যা বাড়ছে। দৃষ্টি উপরদিকে থাকায় দু’বার পাথরে হোঁচট খেলাম, একবার নরম মাটিতে পা ঢুকে গেল। বাধ্য হয়ে গতি কমালাম।
নাবাল জমিতে লাল রঙের ফিডলার কাঁকড়ার দল, একদিকের দাঁড়াটা অস্বাভাবিক বড়, রোদে সেগুলো যেন কাদার বুকে লাল ফুলের মতো ফুটে উঠছিল। তার মধ্যেই খ্যাপাটে ভঙ্গিতে লাফিয়ে বেড়াচ্ছিল কয়েকটা মাডস্কিপার, পাখনায় ভর দিয়ে হাঁটছিল কাদার উপর দিয়ে, মাঝে-মধ্যে ছোট্ট লাফ দিয়ে আবার কাদায় ডুবে যাচ্ছিল।
হঠাৎ চোখে পড়ল একটা পাখি— লম্বা সাদা লেজ, মাথায় কালচে ঝুঁটি, ডালে বসে। লেজটা দুলছে হাওয়ায়। দুধরাজ! এত কাছ থেকে আগে কখনও দেখিনি। সঙ্গের লেন্স বার্ড ফটোগ্রাফির জন্য নিতান্তই সাধারণ, ক্যামেরাও পুরোনো। কিন্তু যার সূত্রে ছবি তোলায় হাতেখড়ি, সেই অশোকদার মতে ডকুমেন্টেশনের গুরুত্ব নান্দনিক ছবির থেকে কিছু কম নয়। তাই পিছু নিলাম দুধরাজের। যেই ও একটু ভেতরের দিকে সরল, আমিও কিছু না বুঝে রাস্তা ছেড়ে কাদায় নেমে পড়লাম, ঝোপ ফাঁক করে এগোতে লাগলাম। লুকোচুরি— ডাল থেকে ডালে, আর পিছনে আমি! কতক্ষণ এভাবে হেঁটেছি খেয়াল নেই, যখন থামলাম, বুঝলাম নদীর কলতান আর কানে আসছে না।
একটু দূরে নাবাল জমিতে লাল রঙের ফিডলার কাঁকড়ার দল, একদিকের দাঁড়াটা অস্বাভাবিক বড়, রোদে সেগুলো যেন কাদার বুকে লাল ফুলের মতো ফুটে উঠছিল। তার মধ্যেই খ্যাপাটে ভঙ্গিতে লাফিয়ে বেড়াচ্ছিল কয়েকটা মাডস্কিপার, পাখনায় ভর দিয়ে হাঁটছিল কাদার উপর দিয়ে, মাঝে-মধ্যে ছোট্ট লাফ দিয়ে আবার কাদায় ডুবে যাচ্ছিল। দৃশ্যটা এতই মজার যে, আমি ক্যামেরা নামিয়ে খানিকক্ষণ শুধু তাকিয়েই রইলাম।

একটা কাঠের সরু ওয়াকওয়ে চোখে পড়ল, এরকম দেখেছি ইউরোপে, বিভিন্ন ক্যানোপি ওয়াকে। এদেশে আগে দেখিনি। ওই পথে উঠে হাঁটতে লাগলাম, দু’পাশে ম্যানগ্রোভের জট। কোথাও ঝিঁঝির একটানা ডাক, কোথাও পাতার আড়ালে অচেনা পোকার খসখস শব্দ। ভাগ্য ভাল— একটা ছোট মাছরাঙা, নীল-সবুজ রঙের, কেওড়ার ডালে বসে জলের দিকে তাকিয়েছিল অনেকক্ষণ, আমি নিঃশ্বাস বন্ধ করে পরপর শাটার মারলাম। স্বল্প দূরেই সাদা বকের সারি, জলার ধারে দাঁড়িয়ে। মাথার উপর চক্কর দিয়ে উড়ে গেল একটা শঙ্খচিল, ডানার ছায়া পড়ল কাদায়। গাছের আড়ালে দোয়েলের ডাক, সঙ্গে পাল্লা দিয়ে টুনটুনি পাখির টিউ-টিউ। নদীর ওপারে দূরের গ্রাম দেখা যাচ্ছিল।
পরিস্থিতি যে একটু জটিল, সেটা এবার বুঝতে পারলাম। আমি তাহলে ঢুকে পড়েছি এখানকার বিখ্যাত গোলপাতার জঙ্গলে। ওপারে তাহলে বাংলাদেশ। কিন্তু বিএসএফ-এর চেকপোস্ট তো চোখে পড়ল না! আর এখানে ঢোকা বা বেরোনোর সময়ও নির্দিষ্ট।
যতীনবাবুর এক সাবধানবাণী এতক্ষণে কানে বাজতে লাগল— নোনা জলের কথা বলার সময় তিনি তো জোয়ারের কথাও বলেছিলেন, নিজের ছোটবেলার হারিয়ে যাওয়ার গল্পটাও। বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। মাথায় ভিড় করল একের পর এক প্রশ্ন।
‘গোল নয় যার পাতা, তার নাম গোলপাতা।’ নাম গোলপাতা হলেও গোলাকার পাতা কিংবা বৃত্তাকার কোনও গুঁড়ির অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া দায় গোলপাতার ঝোপঝাড়ে। বাংলায় গোলপাতা, আর ইংরেজিতে, নিপা পাম বা নিপা ‘ফ্রুটিক্যানস’। গোলপাতার জঙ্গল নামটা এমনি এমনি হয়নি। পুরো জঙ্গল জুড়ে ওই গাছেরই ভিড়, মাটির খুব কাছ থেকেই লম্বা লম্বা পালকের মতো পাতাগুলো ঝাড়ের আকারে ছড়িয়ে। এর ফাঁকে ফাঁকে কিছু সুন্দরী গাছ, যাদের গোড়ায় বোর্ডের মতো চ্যাপ্টা শেকড় মাটি থেকে উঁচু হয়ে আছে, যেন গাছটা হাঁটু গেড়ে বসে আছে কাদায়। নদীর ধার ঘেঁষে সার দিয়ে কেওড়া গাছ, তার নিচে কাদায় সরু সরু অসংখ্য শ্বাসমূল পেনসিলের মতো উঁচু হয়ে আছে।
জায়গায় জায়গায় কাঁটাযুক্ত হেঁতাল ঝোপ, পায়ে লাগলেই টেনে ধরে। বাতাসে একটা কষটা-নোনতা ঘ্রাণ, তাতে মিশে আছে পচা পাতা ও কাদার উৎকট গন্ধ। চারদিকে একই রকম গোলপাতার ঝাড়, একই রকম কাদা— কোন দিক থেকে এসেছি বোঝার উপায় নেই। মোবাইলে নেটওয়ার্ক নেই। আর তখনই খেয়াল হল, পায়ের নিচের কাদাটা আগের চেয়ে অনেকটাই নরম, জলে ভেজা। জোয়ার আসছে।

যতীনবাবুর এক সাবধানবাণী এতক্ষণে কানে বাজতে লাগল— নোনা জলের কথা বলার সময় তিনি তো জোয়ারের কথাও বলেছিলেন, নিজের ছোটবেলার হারিয়ে যাওয়ার গল্পটাও। বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। মাথায় ভিড় করল একের পর এক প্রশ্ন— হোটেলের দারোয়ানকে শুধু বলেছিলাম নদীর ধারে যাচ্ছি, ঠিক কোন দিকে তা তো বলিনি; আমার বাকি সঙ্গীরা নিশ্চয়ই চা খাচ্ছে এতক্ষণে। ঘড়ি দেখলাম, সাড়ে সাতটা বাজে, কিন্তু আমি কোথায় আছি তা নিজেই জানি না।
পা চালিয়ে হাঁটতে শুরু করলাম; দিশাহীন চলা, কাদা এড়িয়ে এড়িয়ে। এমন সময় ঠিক পাশের ঝোপে হঠাৎ একটা ভারী কিছুর নড়াচড়া আর খসখস শব্দ, কাদায় ভারী কিছু হড়কে যাওয়ার আওয়াজ। বুক ধড়ফড় করে উঠল, আমি লাফিয়ে সরে গেলাম। ঝোপ ফাঁক করে উঁকি দিতেই দেখি, একটা বড়সড় গোসাপ— হাত দেড়েক লম্বা, হলদেটে-কালো ডোরাকাটা গা— কাদায় হড়কাতে হড়কাতে গোলপাতার আড়ালে ঢুকে গেল। হাসিও পেল নিজের অজান্তে— ভেবেছিলাম সাপ বা বাঘ, অথচ বেরোল নিরীহ গোসাপ।
খানিকটা এগোতেই কাদার উপর একজনকে দেখলাম, কোমর জলে দাঁড়িয়ে কাঁকড়ার ফাঁদ তুলছে। কাছে গিয়ে ডাকলাম। লোকটা ঘুরে তাকিয়ে হেসে ফেলল, দাঁতে পানের ছোপ। “কী গো দাদা, একলা একলা এই দিকে কী করতাসেন? পথ হারাইসেন নাকি?”
মিনিট পাঁচেক পর দূর থেকে মানুষের গলার আওয়াজ ভেসে এল, সঙ্গে ভারী বুটের শব্দ। ভয় আর স্বস্তি একসঙ্গে ফিরে এল মনে। ঝোপের ফাঁক দিয়ে দেখলাম দু’জন বিএসএফ জওয়ান টহল দিচ্ছে, রাইফেল কাঁধে। এগিয়ে গিয়ে নিজের পরিচয় দিলাম, ক্যামেরা দেখিয়ে বললাম, পথ হারিয়েছি। একজন জওয়ান একটু গম্ভীর গলায় বলল, “আপনারা ছবি তোলার নেশায় ভুলে যান সীমানার কথা। গত মাসেই একজন টুরিস্ট এখানে জোয়ারের জলে আটকে গিয়েছিল, রাতে লঞ্চ পাঠিয়ে উদ্ধার করতে হয়েছিল।” তারপর একটু নরম হয়ে দিক দেখাল— “সোজা গেলে খাল পাবেন, খাল ধরে ডানদিকে যাবেন।”

দেখানো পথে হাঁটতে লাগলাম, প্রতি পদে কাদায় পা ঢুকে যাচ্ছে। খানিকটা এগোতেই কাদার উপর একজনকে দেখলাম, কোমর জলে দাঁড়িয়ে কাঁকড়ার ফাঁদ তুলছে। কাছে গিয়ে ডাকলাম। লোকটা ঘুরে তাকিয়ে হেসে ফেলল, দাঁতে পানের ছোপ। “কী গো দাদা, একলা একলা এই দিকে কী করতাসেন? পথ হারাইসেন নাকি?”
আমি হাঁপাতে হাঁপাতে বললাম যে, দুধরাজ পাখির পিছে পিছে হাঁটতে গিয়ে পথ হারিয়ে ফেলেছি। লোকটা— নাম নিতাই হালদার, এপারের মানুষ, তবে পূর্বপুরুষ এসেছিল ওপার বাংলার খুলনা থেকে— হো হো করে হেসে উঠল। “পাখির পিসে দৌড়াইলে এমনই হয় দাদা। এই জঙ্গল তো বেশি বড় না, কিন্তু জোয়ারের সময় ভুল কইরা খালের ওপারে গেলেই বিপদ। গত বচ্ছর আমার শালা রাইতে আটকা পড়সিল, সাপে-বাঘে যা ভয় পাইসিল, সারা রাইত গাছে বইসা কাটাইসে।” বলেই আবার হাসল, যেন এসব রোজকার গল্প। “চলেন, আমি লইয়া যাই। এই কাঁকড়ার ফাঁদগুলা তুইলা লই আগে।”

হাঁটতে হাঁটতে নিতাই বলে গেল এই বনের হাজারটা গল্প— কীভাবে গোলপাতার পাতা কেটে ছাউনি বানানো হয় দু’পারেই, কীভাবে বর্ষায় মেছো বাঘ বেরোয় খালের ধারে মাছ ধরতে, আর কীভাবে বিজয়া দশমীর দিন এই নদীতেই দু’দেশের নৌকো মুখোমুখি হয়ে ঠাকুর ভাসান দেয়। “ওপারের মানুষ, এপারের মানুষ, নদীর মইধ্যে খানিকক্ষণের লাইগা কোনও সীমানা থাকে না দাদা।” কথাগুলো বলার সময় তার গলায় একটা মায়া মেশানো ছিল, যেটা মানচিত্রে দেখা যায় না।
হোটেলের গেট প্রায় এসে গেছে, এমন সময় ঠিক বাঁধের ধারের একটা কেওড়া গাছে, নিঃশব্দে এসে বসল এক দুধরাজ— হয়তো একেই ধাওয়া করতে গিয়ে আমি সারা সকালটা হারিয়ে গেছিলাম। ওর সাদা লেজ তখন সকালের আলোয় ঝলমল করছে, চারপাশে আবার সেই চেনা শব্দগুলো ফিরে এসেছে।
চেকপোস্ট পেরিয়ে বাঁধের পথে ফিরতি হাঁটা শুরু করতেই দূর থেকে দেখলাম, যতীনবাবু কোদাল হাতে দাঁড়িয়ে, চোখ কুঁচকে এদিকেই তাকিয়ে। কাছে যেতেই বললেন, “কই গেসিলেন বাবু, এতক্ষণ? হোটেলের ছেলেটা আইসা জিগাইছিল আপনেরে দেখসি কি না। খাওয়ার সময় পার হইয়া যাইতেসে তো।” তাঁর গলায় বকুনির চেয়ে বেশি ছিল স্বস্তি। মাথা নিচু করে বললাম, পথ হারিয়েছিলাম। তিনি হাসলেন, প্রথমবার হাসতে দেখলাম তাঁকে।
হোটেলের গেট প্রায় এসে গেছে, এমন সময় ঠিক বাঁধের ধারের একটা কেওড়া গাছে, নিঃশব্দে এসে বসল এক দুধরাজ— হয়তো একেই ধাওয়া করতে গিয়ে আমি সারা সকালটা হারিয়ে গেছিলাম। ওর সাদা লেজ তখন সকালের আলোয় ঝলমল করছে, চারপাশে আবার সেই চেনা শব্দগুলো ফিরে এসেছে— দোয়েলের শিস, দূরে কলকল করে ভেড়িতে জল ঢোকার আওয়াজ, যতীনবাবুর কোদাল মাটিতে পড়ার মৃদু শব্দ। কাঁপা হাতে ক্যামেরা তুললাম, শাটার টিপলাম— আর সেই মুহূর্তে মনে হল, দিনের সবচেয়ে ভাল ছবিটা তোলার জন্যই বোধহয় হারিয়ে গেছিলাম এতটা পথ।
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
3 Responses
Excellent
ম্যানগ্রোভের গন্ধে ভরা নোনা মাটির আখ্যান যেন মেঠো আলপনা!
খুব ভালো লাগলো প্রান্তিক বিশ্বাসের এই লেখাটি। গল্প বলার দলটি খুব সুন্দর। লেখার মুন্সিয়ানা আছে। শুভেচ্ছা রইল।