(Uttamkumar Rahasya)
বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে ‘মহানায়ক’ শব্দটা শুধুমাত্র একজনকেই নির্দেশ করে, তিনি উত্তমকুমার। প্রয়াণের প্রায় পাঁচ দশক পেরিয়েও তাঁর নাম বাঙালির হৃদয়ে সমানভাবে রঙিন এবং উজ্জ্বল। কিন্তু যে মানুষটাকে আমরা রুপোলি পর্দায় হাসিমুখে দর্শকের মন জয় করতে দেখেছি, তাঁর জীবনের অন্তরালে লুকিয়ে আছে এমন অনেক অধ্যায়, যা প্রকাশ্যে খুব কম আলোচিত হয়েছে। তাঁর খ্যাতির এই ঝলমলে আলোর পেছনে ছিল কঠিন সংগ্রাম, করুণ ব্যর্থতা, জটিল সম্পর্ক এবং গভীর নিঃসঙ্গতা। সেইসব মিলেমিশে গড়ে ওঠে ‘রহস্যের আড়ালে উত্তম’।
নামের আড়ালে ব্যর্থতার অন্ধকার অধ্যায়
‘উত্তমকুমার’ নামটি আসলে এক নির্মিত পরিচয়। আমরা সবাই জানি তাঁর প্রকৃত নাম ছিল অরুণকুমার চট্টোপাধ্যায়। উত্তর কলকাতার এক মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম নেওয়া সেই তরুণ অরুণ কীভাবে ‘উত্তমকুমার’ হয়ে উঠলেন, সেই গল্পটাই তাঁর জীবনের প্রথম রহস্য।
আজ যাঁকে ভাবা হয় বাংলা সিনেমার সবচেয়ে সফল নায়ক, তাঁর যাত্রা শুরু হয়েছিল একের পর এক ব্যর্থতা দিয়ে। আজ প্রায় সব বাঙালি জানেন, প্রথম দিকের ছবিগুলি বক্স অফিসে সুবিধা করতে না পারায় ইন্ডাস্ট্রি তাঁকে বিদ্রুপ করে বলেছিল ‘ফ্লপ মাস্টার জেনারেল’। এই সময়টা ছিল তাঁর জীবনের সবচেয়ে কঠিন এক অধ্যায়। আত্মবিশ্বাস হারানোর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও তিনি অভিনয়ের প্রতি আস্থা রেখে যে সংগ্রাম করেছিলেন, প্রকৃত অর্থে সেই সংগ্রামের মধ্যে দিয়েই ‘মহানায়ক’ হয়ে ওঠার অঙ্কুর তখন থেকে তাঁর অন্তরের গভীরে প্রতিপালিত হয়েছে।

চলচ্চিত্র জগতে পা রেখে তিনি নিজে একাধিকবার পর্দায় তাঁর আত্মপরিচয় নিয়ে ভাঙাগড়া করেছেন। পরিচালক নীতিন বসুর ‘দৃষ্টিদান’ (১৯৪৮) উত্তমকুমারের প্রথম ছবি, সে ছবির প্রচারপত্রে বা পোস্টারে কোথাও কিন্তু তাঁর নামের উল্লেখ নেই, অথচ তাঁর বিপরীতে অভিনেত্রী কেতকী দত্তের নাম দেখা যায়। পরবর্তী ছবি ‘কামনা’ (১৯৪৯), সেখানে ‘উত্তম চট্টোপাধ্যায় (অ্যামেচার)’ এভাবেই ছবির প্রচারপত্রে তাঁর নাম লেখা রয়েছে। আবার ‘মর্যাদা’ (১৯৫০) ছবিতে তিনি ‘অরূপকুমার’।
এই প্রসঙ্গে ‘আমার আমি’-তে উত্তমকুমার লিখেছেন, ‘প্রদীপকুমারকে আমরা শৈলদা বলে ডাকতাম। একসঙ্গে থিয়েটারও করেছি…। সেই প্রদীপকুমার এই ছবির নায়ক মনোনীত হয়েছেন শুনে আমার উৎসাহ স্তিমিত হয়ে গেল। তবুও সরোজবাবুর ছবিতে অভিনয় করার ইচ্ছে একেবারে বর্জন করতে পারলাম না। নাই বা পেলাম নায়কের মর্যাদা!
আমার মনে তখন নতুন আকাঙ্ক্ষার উন্মেষ, অন্যদিকে ‘কামনা’র ব্যর্থতার গ্লানি। সরোজবাবু বললেন, এই ছবিতে কাজ দেওয়ার ব্যাপারে আমার কোনও অমত নেই, তবে— সরোজ মুখার্জীর কণ্ঠস্বর দ্বিধাজড়িত।
সুযোগের অপেক্ষায় আছি। ওদিকে শুনতে পাচ্ছি ‘মর্যাদা’র প্রাথমিক কাজও এগিয়ে চলেছে। গোয়েন্দার মতো আমি দূর থেকে সব খবর নিয়ে চলেছি মাত্র। এমন সময় শুনলাম প্রদীপকুমার অন্য ছবির কাজে ব্যস্ত থাকার জন্যে জানিয়ে দিয়েছেন যে ‘মর্যাদা’ ছবিতে তিনি অংশ নিতে পারবেন না।
সুযোগের অপব্যবহার করলাম না। সরাসরি চলে গেলাম সরোজবাবুর কাছে। আমাকে দেখে সরোজবাবু যে মনে মনে খুব খুশি হলেন তা তাঁর মুখের রেখাগুলো দেখে সহজেই অনুমান করতে পারলাম।

আমার মনে তখন নতুন আকাঙ্ক্ষার উন্মেষ, অন্যদিকে ‘কামনা’র ব্যর্থতার গ্লানি। সরোজবাবু বললেন, এই ছবিতে কাজ দেওয়ার ব্যাপারে আমার কোনও অমত নেই, তবে— সরোজ মুখার্জীর কণ্ঠস্বর দ্বিধাজড়িত। এমন কিছু তিনি বলতে চান যাতে আমি হয়তো অখুশি হতে পারি। সেই চিন্তা করেই তিনি যেন ভেতরকার কথাগুলো স্পষ্ট করে ব্যক্ত করতে পারছেন না। ওঁর মুখে ভাষা ফোটার আগে আমি দৃঢ়তার সঙ্গে বললাম, কিছু দ্বিধা করবেন না, আপনি যা বলতে চান বলুন না। সরোজবাবু বললেন, তোমার নামটা পাল্টাতে হবে, যদি রাজী থাকো বল—আমি তখনই রাজী হয়ে গেলাম।
সরোজ মুখার্জীও আমাকে ‘মর্যাদা’ ছবির নায়ক স্থির করবেন বলে প্রতিশ্রুতি দিলেন। যথাসময়ে আমার নতুন নাম হ’ল— অরূপকুমার। এ যেন আমার নবজন্ম। নাম পরিবর্তন করায় মনটা যে আমার ভারাক্রান্ত হয়নি, তা নয়। নিজেকে নানাভাবে সান্ত্বনা দিলাম। বাড়িতে এসে মাকে আমি সব কথাই খুলে বললাম। বন্ধুরাও সেদিন আমাকে নিরুৎসাহ করেনি। পোর্ট কমিশনার্সের চাকরিটা আমার তখনও বিদ্যমান। ছুটির পর ছুটি…’
উত্তমকুমারের ব্যক্তিজীবন নিয়ে জল্পনার শেষ নেই। তিনি বিয়ে করেছিলেন গৌরী দেবীকে, এবং তাদের এক পুত্রসন্তান হয়, কিন্তু এর পাশাপাশি অভিনেত্রী সুপ্রিয়া দেবীর সঙ্গে তাঁর দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠে, যা জীবনের শেষদিন পর্যন্ত অটুট রেখেছিলেন।
এরপর ১৯৫১ সালে পরপর ‘সহযাত্রী’ এবং ‘নষ্টনীড়’ ছবিতে তিনি শুধু ‘উত্তমকুমার’ নাম নিলেও ওই বছরেই ‘ওরে যাত্রী’ ছবিতে আবার ‘উত্তম চ্যাটার্জি’ হয়েছিলেন। অবশেষে ‘সঞ্জীবনী’ ছবি থেকে পর্দায় তিনি ‘উত্তমকুমার’ নামে স্থায়ী হলেন। তাঁর এই উত্তমকুমার পরিচয়টাই ধীরে ধীরে আসল অরুণকুমার মানুষটাকে গ্রাস করে ফেলে। বাংলার মানুষ অরুণকুমারের সঙ্গে সামান্য পরিচয়ের সুযোগ লাভের আগেই তারা পরিচিত হলেন নায়ক উত্তমকুমারের সঙ্গে।
দ্বৈত সম্পর্কের জটিলতা
উত্তমকুমারের ব্যক্তিজীবন নিয়ে জল্পনার শেষ নেই। তিনি বিয়ে করেছিলেন গৌরী দেবীকে, এবং তাদের এক পুত্রসন্তান হয়, কিন্তু এর পাশাপাশি অভিনেত্রী সুপ্রিয়া দেবীর সঙ্গে তাঁর দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠে, যা জীবনের শেষদিন পর্যন্ত অটুট রেখেছিলেন। এই দুই সম্পর্কের সহাবস্থান নিয়ে সমাজে নানা কথা প্রচলিত থাকলেও উত্তমকুমার নিজে কখনও প্রকাশ্যে কোনও মন্তব্য করেননি। এই নীরবতাই তাঁর ব্যক্তিজীবনকে আজও বহু বাঙালি জীবনে রহস্যাবৃত হয়ে রয়েছে।

শুটিং চলাকালীন প্রতি দুপুরে ভবানীপুর এবং ময়রা স্ট্রিটের দুই বাড়ি থেকে নিয়ম করে স্টুডিওতে তাঁর খাবার পৌঁছে যেত। সদা স্বল্পাহারী উত্তমকুমার সেসব যৎসামান্যই খেতেন, বাদবাকি বিলিয়ে দিতেন কলাকুশলীদের মধ্যে। আলোচনা প্রসঙ্গে এই ঘটনা আমি চলচ্চিত্র পরিচালক উত্তমকুমারের সহকারী শ্রী বীরেশ চট্টোপাধ্যায়ের মুখে শুনেছি।
এখানে আরও একটা উল্লেখযোগ্য বিষয় হল যে, ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে অন্যতম শ্রেষ্ঠ জুটি হিসেবে উত্তম-সুচিত্রা স্বীকৃত, যা ছিল সম্পূর্ণভাবে পেশাগত সম্পর্কের মধ্যে আবদ্ধ। কিন্তু সেই পেশাগত আর ব্যক্তিগত সম্পর্কের মধ্যে সীমারেখা নিয়ে দর্শকমহলে প্রায়ই বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে, যা তাঁর জীবন কাহিনির রহস্যময়তায় আরেক অতিরিক্ত স্তর তৈরি করেছে।
শট শেষে বকাবকির বদলে উত্তমকুমার তাঁকে মেকআপ রুমে ডেকে নিয়ে জিজ্ঞেস করে জানতে পারেন, কালীর মেয়ের বিয়ে ঠিক হয়েছে, কিন্তু টাকার জোগাড় নিয়ে সে দুশ্চিন্তায় ছিল। এই ঘটনা শুনে উত্তমকুমার নীরবে তাঁর পাশে দাঁড়ান।
পর্দার হাসি, অন্তরের চাপ
দর্শক পর্দায় আমরা যে উত্তমকুমারকে দেখি, তিনি সদা প্রাণবন্ত, হাস্যোজ্জ্বল ও আত্মবিশ্বাসী এক ব্যাক্তি। কিন্তু তাঁর ঘনিষ্ঠজনদের বর্ণনা অনুযায়ী, ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ছিলেন অন্তর্মুখী এবং কাজের চাপে জর্জরিত মানুষ। একের পর এক ছবিতে অভিনয়, সঙ্গে প্রযোজনার দায়িত্ব, পরিচালনার দায়িত্ব এবং নিজের ভাবমূর্তি ধরে রাখার লড়াই, সবকিছু মিলিয়ে তৈরি হয়েছিল বিপুল মানসিক ও শারীরিক চাপ। পর্দার ঔজ্জ্বল্যের আড়ালে থাকা তাঁর ক্লান্ত সংগ্রামী জীবন নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে সবথেকে কম আলোচনা হয়।
জনপ্রিয়তার শিখরে থেকেও উত্তমকুমারের আরেকটা গভীর দিক হল তাঁর সহানুভূতিশীল ও উদার স্বভাব। ‘যদুবংশ’ ছবির শুটিংয়ের একটা ঘটনা এক্ষেত্রে বিশেষভাবে স্মরণীয়। শট চলাকালীন তিনি লক্ষ করেন যে, তাঁর মুখে উপরের ক্যাটওয়াক থেকে যে আলোটা পড়ার কথা ছিল, সেটা জ্বলেনি। সেই আলো জ্বালানোর দায়িত্বে ছিলেন লাইটম্যান কালী।

শট শেষে বকাবকির বদলে উত্তমকুমার তাঁকে মেকআপ রুমে ডেকে নিয়ে জিজ্ঞেস করে জানতে পারেন, কালীর মেয়ের বিয়ে ঠিক হয়েছে, কিন্তু টাকার জোগাড় নিয়ে সে দুশ্চিন্তায় ছিল। এই ঘটনা শুনে উত্তমকুমার নীরবে তাঁর পাশে দাঁড়ান।
এমনও নজির আছে যে, প্রযোজকের হাতে টাকা না থাকায় ছবির শুটিং বন্ধ হওয়ার জোগাড়, উত্তমকুমার নিজের পারিশ্রমিক থেকে টাকা দিয়ে সেই সংকট মিটিয়েছেন, যাতে কাজ থমকে না যায় আর ইউনিটের মানুষগুলোর রুজিরোজগার বন্ধ না হয়।
‘চন্দ্রনাথ’, ‘রাজলক্ষ্মী ও শ্রীকান্ত’, ‘গৃহদাহ’, ‘কমললতা’ এবং ‘পথের দাবী’ অবলম্বনে ‘সব্যসাচী’ ছবিতে সুচিত্রা সেনের সঙ্গে জুটি বেঁধে তিনি শরৎসাহিত্যের বিখ্যাত চরিত্রদের পর্দায় জীবন্ত করে তুলেছিলেন।
প্রযোজনার ক্ষেত্রে নিজের একাধিক ছবি ফ্লপ হওয়ার পরও তিনি ফের বিনিয়োগ করতে পিছপা হননি। তারকাখ্যাতির আড়ালে থাকা এই উদারতা, এই নীরব মানবিকতাই সেই সময়ের সহকর্মীদের স্মৃতিচারণে আজও বারবার উঠে আসে। অভিনেতা উত্তমকুমারের পাশাপাশি মানুষ উত্তমকুমারের এ এক গভীর অর্থবহ দিক।
তাঁর সাফল্যের মূল চাবিকাঠি
উত্তমকুমারের সাফল্যের পেছনে বাংলা সাহিত্যনির্ভর চরিত্রের অবদান অনেকটাই। এই কথা নিছক আমার আবেগের কথা নয়। তাঁর ফিল্মোগ্রাফি দেখলে কথাটির সত্যতার জোরালো প্রমাণ পাওয়া যায়। তাঁকে নির্দ্বিধায় ‘বাংলা সাহিত্যের নায়ক’ বলেও অভিহিত করা যেতে পারে।

‘চাঁপাডাঙার বউ’, ‘রাইকমল’, ‘বিচারক’, ‘উত্তরায়ণ’, ‘বিপাশা’, ‘মঞ্জরী অপেরা’, ‘শুকসারি’, ‘দুই পুরুষ’, ‘কান্না’, ‘রাজা সাহেব’— তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের একাধিক রচনা অবলম্বনে তৈরি ছবিতে তিনি অভিনয় করেছেন। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ছিল ‘সপ্তপদী’, সে ছবির প্রযোজকও ছিলেন তিনি নিজে।
‘চন্দ্রনাথ’, ‘রাজলক্ষ্মী ও শ্রীকান্ত’, ‘গৃহদাহ’, ‘কমললতা’ এবং ‘পথের দাবী’ অবলম্বনে ‘সব্যসাচী’ ছবিতে সুচিত্রা সেনের সঙ্গে জুটি বেঁধে তিনি শরৎসাহিত্যের বিখ্যাত চরিত্রদের পর্দায় জীবন্ত করে তুলেছিলেন।
সত্যজিৎ রায় পরিচালিত ‘চিড়িয়াখানা’-য় শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের সৃষ্ট গোয়েন্দা ব্যোমকেশ চরিত্রে, আবার তপন সিংহ পরিচালিত ‘ঝিন্দের বন্দী’তে একই লেখকের কাহিনি অবলম্বনে দ্বৈত চরিত্রে তাঁর অভিনয় যথেষ্ট সমাদৃত হয়।
সত্যজিৎ রায় পরিচালিত ‘চিড়িয়াখানা’-য় শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের সৃষ্ট গোয়েন্দা ব্যোমকেশ চরিত্রে, আবার তপন সিংহ পরিচালিত ‘ঝিন্দের বন্দী’তে একই লেখকের কাহিনি অবলম্বনে দ্বৈত চরিত্রে তাঁর অভিনয় যথেষ্ট সমাদৃত হয়।
আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের কাহিনি অবলম্বনে ‘জীবন তৃষ্ণা’, ‘শঙ্খবেলা’, ‘কাল তুমি আলেয়া’; শঙ্করের উপন্যাস অবলম্বনে ‘চৌরঙ্গী’; সুবোধ ঘোষের কাহিনি অবলম্বনে ‘ত্রিযামা’, ‘জতুগৃহ’; ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের রম্যরচনা অবলম্বনে (যার মূল উৎস শেক্সপিয়রের ‘কমেডি অব এররস্’) তৈরি ‘ভ্রান্তিবিলাস’-এর সৌজন্যে এই তালিকা দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর। প্রতিভা বসু, বিমল কর, প্রেমেন্দ্র মিত্র, বনফুল, নীহাররঞ্জন গুপ্তের রচনাও তাঁর ফিল্মোগ্রাফির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
এই বিপুল সংখ্যক সাহিত্যনির্ভর ছবি প্রমাণ করে, উত্তমকুমারের সাফল্য নিছক তারকা-ভাবমূর্তির ওপর নির্ভরশীল ছিল না। বাংলা সাহিত্যের সুপ্রতিষ্ঠিত চরিত্রগুলিতে প্রাণসঞ্চার করে তিনি সেই চরিত্রগুলোর প্রতি পাঠকমহলের পূর্বনির্মিত আবেগ ও আস্থাকে নিজের অভিনয়ের পুঁজি করে তুলেছিলেন।
উপন্যাসের পাতা থেকে উঠে আসা ভিন্ন ভিন্ন চরিত্রে তাঁর সাবলীল উপস্থিতি, সংলাপ বলার ভঙ্গি ও অভিব্যক্তি বইয়ের জগৎ ও পর্দার জগতের মধ্যে সেতুবন্ধন করে দিত। এভাবেই সাহিত্যনির্ভর চরিত্র তাঁকে সাধারণ নায়কের গণ্ডি পেরিয়ে ‘মহানায়ক’-এর আসনে প্রতিষ্ঠিত করে।
ক্যামেরার লেন্স নিয়ে তাঁর ধারণা এতটাই পরিষ্কার ছিল যে, সেই বুঝে চোখের সামান্য নড়াচড়া, মুখের সূক্ষ্ম পরিবর্তন দিয়ে অনেক জটিল আবেগ অতি সহজে প্রকাশ করেছেন। রোম্যান্টিক দৃশ্যে তিনি যতটা নরম এবং আবেগঘন, হাস্যরসাত্মক চরিত্রে তাঁর টাইমিং ঠিক তেমনই নিখুঁত।
রুপালি পর্দায় বৈচিত্র্যের স্বাক্ষর
উত্তমকুমার কখনই নিজেকে এক ধরনের চরিত্রে বেঁধে রাখেননি। কখনও তিনি রোমান্টিক নায়কের এক আদর্শ ভাবমূর্তি গড়ে তুলেছেন, যেখানে তাঁর সংলাপ বলার ধরন আর চোখের অভিব্যক্তিই আবেগের প্রধান বাহক। আবার অন্যদিকে ‘অ্যান্টনি ফিরিঙ্গী’ বা ‘চিড়িয়াখানা’-র মতো ছবিতে তিনি সম্পূর্ণ ভিন্ন ধাঁচের চরিত্র, এক ছবিতে গায়ক কবিয়ালের সারল্য, অন্য ছবিটিতে গোয়েন্দা ব্যোমকেশের যুক্তিনিষ্ঠ ঠান্ডা মাথা।
আবার ‘নায়ক’ ছবিতে তিনি এমন একজন খ্যাতিমান অভিনেতা, যাঁর অন্তরে লুকিয়ে থাকা গভীর সংশয় আর একাকিত্ব অনবদ্য কায়দায় ফুটিয়ে তুলেছিলেন। অনেকের মতে, সত্যজিৎ রায়ের সৃষ্ট এই চরিত্র যেন উত্তমকুমারের নিজের জীবনেরই এক প্রতিচ্ছবি। আবার তিনি ‘চৌরঙ্গী’-তে হোটেল-ম্যানেজারের ভূমিকায় দেখিয়েছেন, কীভাবে সংযত অভিব্যক্তি দিয়েও চরিত্রকে জীবন্ত করে তোলা যায়।
তাঁর অভিনয়শৈলীর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হল তাঁর অভিনয়ের স্বাভাবিকতা। তৎকালীন বাংলা অভিনয়রীতির বিপরীতে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন বাস্তবধর্মী, আড়ম্বরহীন পূর্ণ অভিব্যক্তি। ক্যামেরার লেন্স নিয়ে তাঁর ধারণা এতটাই পরিষ্কার ছিল যে, সেই বুঝে চোখের সামান্য নড়াচড়া, মুখের সূক্ষ্ম পরিবর্তন দিয়ে অনেক জটিল আবেগ অতি সহজে প্রকাশ করেছেন। রোম্যান্টিক দৃশ্যে তিনি যতটা নরম এবং আবেগঘন, হাস্যরসাত্মক চরিত্রে তাঁর টাইমিং ঠিক তেমনই নিখুঁত।
সংলাপ বলার এক বিশেষ ভঙ্গি, হাঁটাচলার ধরনে নিজস্বতা, এমনকি নীরবতার ব্যবহারও তাঁকে অন্য অভিনেতাদের থেকে আলাদা করে তুলেছিল। এই বহুমুখিতার কারণে তিনি শুধুই একজন ‘রোম্যান্টিক হিরো’ তকমার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে বাংলা চলচ্চিত্রের অভিনেতাদের মধ্যে নিজেকে অন্যতম করে তুলেছেন।
তাঁর জীবনের গভীরে তাকালে দেখা যায়— ব্যর্থতা, সংগ্রাম, জটিল সম্পর্ক আর নীরব যন্ত্রণার এক জটিল মিশ্রণ। এই রহস্যময়তাই হয়তো তাঁকে আরও বেশি মানবিক করে তোলে, যার ফলে তিনি হয়ে ওঠেন আমাদের অত্যন্ত কাছের মানুষ।
আজ এ-কথা বলতেই হয় যে উত্তমকুমার শুধু একজন নায়ক বা অভিনেতা ছিলেন না, উত্তমকুমার স্বর্ণযুগের প্রতিনিধি, উত্তমকুমার বাঙালির এক আবেগের নাম। তাঁর জীবনের গভীরে তাকালে দেখা যায়— ব্যর্থতা, সংগ্রাম, জটিল সম্পর্ক আর নীরব যন্ত্রণার এক জটিল মিশ্রণ। এই রহস্যময়তাই হয়তো তাঁকে আরও বেশি মানবিক করে তোলে, যার ফলে তিনি হয়ে ওঠেন আমাদের অত্যন্ত কাছের মানুষ। ‘মহানায়ক’ শব্দের আড়ালে থাকা শতবর্ষের এই মানুষটাকে বোঝার চেষ্টা আজও তাঁর প্রতি বাঙালির ভালবাসার এক গভীরতম প্রকাশ।
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত