(Ujjhomanush 12)
১৯৭৫, মে মাসের ১৯ তারিখ, ওহায়ও-র ক্লিভল্যান্ড-এ একটি গ্রসারি দোকানের সামনে হ্যারল্ড ফ্র্যাঙ্ক্স খুন হলেন। তাঁকে হত্যা করল কেউ বা কারা। শোনা গিয়েছিল, হ্যারল্ডকে দু’জন কৃষ্ণাঙ্গ পুরুষ প্রথমে মারে, তারপর তাঁর উপর অ্যাসিড ছুঁড়ে মারা হয়, তারও পর একজন হ্যারল্ডকে গুলি করে। সে গুলি ছিটকে লাগে আরও এক মহিলার গায়ে। দুই আততায়ী এরপর ব্যবসায়ী হ্যারল্ড-এর ব্রিফকেস নিয়ে ছুট লাগায় ও অপেক্ষারত একটি সবুজ গাড়িতে করে পালায়। এমন তো আকছার ঘটে, নতুন কী, তাই তো?
আরও পড়ুন: নিত্য যেথা ভয়শূন্য
আচ্ছা, এরপর যা হল, তাও জানা। তিন কৃষ্ণাঙ্গ পুরুষ, যথাক্রমে রিকি জ্যাকসন, রনি ব্রিজম্যান ও ওয়াইলি ব্রিজম্যান গ্রেফতার হলেন। ১২ বছরের এডি ভার্নন সাক্ষ্য দিয়েছিল যে, সে ‘দেখেছে’, এই তিনজনকে ওই খুন করতে। মৃত্যুদণ্ডের সাজা শোনানো হয় তাঁদের।

প্রথম সে বাজ নেমে আসে রিকি জ্যাকসনের মাথায়। রিকিই নাকি গুলিটি করেছিলেন হ্যারল্ডকে, এক অর্থে এই রিকিই নাকি ছিলেন মাস্টারমাইন্ড, নৃশংস এ ঘটনার, ফলে তাঁকেই শোনানো হয় মৃত্যুদণ্ডের কথা। সে সাজা কমিয়ে তিনজনকেই সামান্য ‘স্বস্তি’ দিয়ে, আজীবন কারাদণ্ড শোনানো হয় বছর দুইয়ের মধ্যে, কিন্তু গল্প বা এ লেখা সে সব নিয়ে নয় আদৌ।
গল্প এ নিয়েও নয়, যে ১২ বছরের এডি ভার্নন ছাড়া আর কোনও সাক্ষী পাওয়া যায়নি, পাওয়া যায়নি সেই চুরি যাওয়া ব্রিফকেস বা সবুজ গাড়িও। রিকি জ্যাকসন এবং ব্রিজম্যান ভ্রাতৃদ্বয় তবুও, বা বলি অতঃপর সেঁধিয়ে গেলেন নিকষ কালোয়, হয়তো স্যাঁতসেঁতে ছিল না গরাদের ওপার, কিন্তু তাঁদের দিনকাল, রাতবিরেতে যে পচনের প্রক্রিয়া আরম্ভ করছিল মহাসমারোহ, তা সম্পর্কে কেমন যেন নিঃসন্দেহ আমি।

কিন্তু ওই যে বললাম, এ গল্প আসলে সে দুমড়ে যাওয়া নিয়ে নয়ই। কেন দুমড়ে যাওয়া বলছি? কারণ, একটানা ৩৯ বছর কোনও প্রমাণ ছাড়াই ‘দোষী’ সাব্যস্ত হয়ে রিকি জ্যাকসনকে গরাদের পিছনে থাকতে হয়েছিল। আমেরিকায়, যদ্দুর পড়েছি মনে পড়ছে, এটিই ছিল শেষমেশ ‘নির্দোষ’ প্রমাণিত কোনও জনের সব চেয়ে দীর্ঘ কারাবাস। তা এ গল্প বা এ সত্যি আসলে কীসের, কী নিয়েই বা?
ওই যে অগাধ মিথ্যে এডি এত বছর ধরে বয়ে বেড়াচ্ছিলেন, ওই যে অন্তর থেকে ক্ষয় ধরানো প্রতিনিয়ত, তা এডিকে আত্মহননের পথেও বার কয়েক নিয়ে গিয়েছিল। এডির মনে হয়েছিল, রিকি নয়, জেলে তো থাকার কথা তাঁর নিজের।
এ অল্প গল্প ২০১৪ সালের এক মুহূর্তের, যখন আশ্চর্য এক ঘুম ভেঙেছিল কারও। দীর্ঘ অপেক্ষার পর। ঘুম ভেঙেছিল এডি ভার্ননের। সেই যে ’৭৫ সালে, যার সাক্ষ্য থেকে ‘প্রমাণিত’ হয়েছিল, রিকি ও বাকিরা ‘হত্যা’ করেছিল হ্যারল্ডকে, সেই ভার্নন আর পারেননি ওই অত বছর ধরে পিঠ ভেঙে দেওয়া সেই ব্যথা বহন করতে।

কুঁকড়ে যেতে যেতে নিশ্চয়ই একান্ত এক ভোরে শেষমেশ ‘বড়’ হয়ে গিয়েছিলেন ভার্নন। সর্বসমক্ষে স্বীকার করেছিলেন, ছোটবেলায় তিনি পুলিশের চাপে বলেছিলেন, বলে ফেলেছিলেন, রিকি’র নাম, ব্রিজম্যন ভ্রাতৃদ্বয়ের নাম। ছোট ভার্নন রিকি ও অন্যান্যদের নাম শুনেছিল মাত্র এক বন্ধুর কাছে, তাই পুলিশ যখন খুঁজছিল, কিছু কৃষ্ণাঙ্গ সফ্ট টার্গেট, ভার্নন এ নামগুলো আওড়ে দেয়।
কিন্তু ওই যে অগাধ মিথ্যে এডি এত বছর ধরে বয়ে বেড়াচ্ছিলেন, ওই যে অন্তর থেকে ক্ষয় ধরানো প্রতিনিয়ত, তা এডিকে আত্মহননের পথেও বার কয়েক নিয়ে গিয়েছিল। এডির মনে হয়েছিল, রিকি নয়, জেলে তো থাকার কথা তাঁর নিজের। অন্তে, এডি সারেন্ডার করেন সত্যের সমীপে। মিথ্যের মন ভোলানো পোশাক ছেড়ে এডি বহু কষ্টে উলঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন, স্বাধীনতার পোশাক রিকির হাতে তুলে দিয়ে।

ওই ৩৯ বছরে রিকির জীবন কী রূপ তোলপাড় হয়েছিল, তা আমরা চার জন্মেও হয়তো নাগালে পাব না, নাগাল পাব না এডির ওই ৩৯ বছরের তোলপাড়েরও। ছাড়া পাওয়ার পর রিকি দেখা করতে চেয়েছিলেন এডির সঙ্গে, সে দেখা হয়েওছিল।
এত দিন যে রিকি জেলের অন্দরে বসে বসে ভেবে মরতেন, কীভাবে একদিন এডিকে শেষ করবেন, সেই রিকিই, যে দিন মুক্ত হাওয়ায় এডিকে সম্মুখে পান, জড়িয়ে ধরে, সান্ত্বনা দেন, পিঠে অনেকক্ষণ হাত বুলিয়ে।
আর এত দিন যে রিকি জেলের অন্দরে বসে বসে ভেবে মরতেন, কীভাবে একদিন এডিকে শেষ করবেন, সেই রিকিই, যে দিন মুক্ত হাওয়ায় এডিকে সম্মুখে পান, জড়িয়ে ধরে, সান্ত্বনা দেন, পিঠে অনেকক্ষণ হাত বুলিয়ে। হ্যাঁ, রিকি হাত বুলিয়ে দিয়েছিলেন এডির পিঠে। পিঠে ছুরি মারার পর কোন দিন জানি না এমন শীতলপাটি পেয়েছিল কোনও ‘ঘাতক’…
উহ্যমানুষ, উহ্যমানুষের অতলান্ত বেদনা, চেতনা এভাবেই কখন যে কী করিয়ে নেয় একে অপরকে দিয়ে, বিধাতাই বোঝেন…।
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত