(Ujjhomanush 11)
থকাওয়ট, অর্থাৎ অসীম ক্লান্তি বসত করে তাঁদের মনে, দেহে, ঘরে-উঠোনে, তবুও তাঁদের অনেকেই এসে জড়ো হন, হয়তো এখনও, শ্রীনগরের লাল চৌক-এ, বেছে নেওয়া মুহূর্তে। এসে, চুপ করে বসেন তাঁরা, হাতে হয়তো কিছু প্ল্যাকার্ড, বা ছবি, বা স্রেফ কিছুই না হাতে, স্রেফ শূন্যতা মুখে আর ওই জীবন জুড়ে অনন্ত থকাওয়ট। কে লক্ষ করল, তাঁদের কিছুই তেমন এসে যায় না, কারণ প্রায় ৩০ বছরের উপর, কেউই তো তাঁদের লক্ষ করেনি। আর করেনি বলেই, তাঁরা এখনও ফিরে আসেন লাল চৌক-এ, প্রাণে নিরুদ্দেশ সম্পর্কে ঘোষণা নিয়ে।
আরও পড়ুন: সাত গোল ও অবনী জ্যেঠুর মৃত্যু
তাঁরা এপিডিপি বা অ্যাসোসিয়েশন অফ পেরেন্টস অব ডিস্যাপিয়ার্ড পারসনস-এর অংশ। অর্থাৎ হারিয়ে গিয়েছে যাঁদের প্রিয় জন। তাঁদের অনেকেরই বিশ্বাস, হারিয়ে ফেলা হয়েছে, হারিয়ে যায়নি কেউ। তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে/হয়েছিল আসলে তাঁদের সেই প্রিয় জনদের, জঙ্গি ‘হওয়ার’ বা জঙ্গিকে মদত দেওয়ার অভিযোগে। তারপর থেকে তাঁরা, অর্থাৎ তুলে নিয়ে যাওয়া মানুষদের বাড়ির লোক, মাথা ঠুকে মরেননি, হেন কোনও দেওয়াল নেই, তবুও একটা সহজ উত্তর পাননি, যে আসলে যে গেল, সে গেলটা কোথায়।

ব্যাপারটা কাকে সাপোর্ট করলাম, না করলাম, এ সবের নয় কিন্তু, বিষয় একটা উত্তরের। নিয়ে যাওয়াটা ঠিক না বেঠিক তা নিয়ে কথা ওঠেনি, সে অন্য আলোচনা, কী ভাবেই বা নিয়ে যাওয়া হল, তার বৈধতা, নিয়মকানুন, সে-ও আলোচনার বিষয় আপাতত নয়। কথা হচ্ছে, নিয়ে যাওয়ার পর কী হল তাঁদের, কোথায় নিয়ে যাওয়া হল, কেন আর কোনও খবর পাওয়া গেল না, প্রশ্ন এই একটাই। প্রশ্ন বা আর্তি, তাঁদের এই একটাই, কী হল অতঃপর আর এই মুহূর্তেই বা কী অবস্থা। উত্তরের নিরেট সে বন্দরে কোনও নাও ভাসে না।
’৯৪ সালে পরভিনা তাই তৈরি করলেন এপিডিপি বা অ্যাসোসিয়েশন অফ পেরেন্টস অব ডিস্যাপিয়ার্ড পারসনস। যেন এক অনন্ত অপেক্ষার ব্যূহ, যেখানে তিলে তিলে গড়ে ওঠে জমায়েতের থকাওয়ট, সেই অসীম ক্লান্তি, যা আসলে আশ্চর্য এক বর্ম নাকি শক্তিশেলই?
যাঁর স্বামীকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, তাঁকে তো ‘হাফ উইডো’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে। অবশ্যই আর কিছু দেওয়া হয়নি, অর্থাৎ, স্বামীর পরিবার অধিকাংশ ক্ষেত্রে আর ডাঙায় তুলতে চায়নি, স্টেট, সে-ও বা আর কী দিল! মাঝদরিয়ায় আরও খানিকটা তাঁকে, তাঁর সন্তানকে, ভাসিয়ে দেওয়া ছাড়া? ওই সেখান থেকেই তাঁরা ক্ষীণ তবু দৃঢ় স্বরে প্রশ্ন করে যান, কোথায় প্রিয়জন, কোন জেল-এ বা কোন বন্ধ ঘরে, বা কোন হাসপাতালে বা কোন মর্গে বা এ সব কিছুই যদি না হয়, দেখিয়ে দিন না দয়া করে তাঁর কবর…

আলাদা করে বলতে হবে কি, যে কোনও দিশাই তাঁরা পান না… এ ব্যবস্থার সঙ্গেই তো সেই ১৯৯০ সালের ১৮ অগস্টের পর থেকে ঘর করে যাচ্ছেন পরভিনা আহাঙ্গার। তাঁর ছোট ছেলে, জাভেদকে, অন্য এক জঙ্গি জাভেদ ‘মনে করে’, তুলে নিয়ে গিয়েছিল কম্যান্ডোরা। পরভিনা তারপর প্রাণপাত করেছেন, প্রায় উন্মাদও হয়ে গিয়েছিলেন, ছেলেকে খুঁজতে খুঁজতে। পাননি তিনি ১৬ বছরের জাভেদকে, কিন্তু দেখা পেয়েছিলেন তাঁর মতোই আরও অনেকের। যাঁদের ভবিতব্য হয়ে উঠেছিল, কোনও উত্তর না পাওয়া, হদিশ তো নয়ই।
তারপর বাঁধ ভেঙে গেল শেষমেশ, ছাত্ররা মাটিতে বসে ভাইস চ্যান্সেলর-কে আঙুল উঁচিয়ে, গলা আরও উঁচিয়ে ক্রমাগত বলতে লাগল, পহলে জ়মিন পে ব্যায়ঠিয়ে।
’৯৪ সালে পরভিনা তাই তৈরি করলেন এপিডিপি বা অ্যাসোসিয়েশন অফ পেরেন্টস অব ডিস্যাপিয়ার্ড পারসনস। যেন এক অনন্ত অপেক্ষার ব্যূহ, যেখানে তিলে তিলে গড়ে ওঠে জমায়েতের থকাওয়ট, সেই অসীম ক্লান্তি, যা আসলে আশ্চর্য এক বর্ম নাকি শক্তিশেলই? এই যে ঠায় বসে থাকা, শত চেষ্টা সত্ত্বেও আশা না ছাড়া, সব গিয়েছে বা যাবেই যে ভেসে জেনেও, এই যে অনবদ্য অপেক্ষার অবস্থান, উহ্য করে দেওয়া কিছু মানুষকে যে এভাবেও জিইয়ে রাখা যায়, তা যদি এ স্বাধীনতাকালে অন্তত একবার আওড়ে না নিই, কীসের মানে, বলুন তো? না, মানে আত্মস্থ হবে বা করতে বলছি, তা তো নয়, জাস্ট ওইটুকুই মনে করা একবার। বুড়ি ছুঁয়ে যাওয়াই না হয় হোক, হোক তবু… এভাবেই… ক্ষণিকের কলরব।

এই অন্তরের তোলপাড়কে শোনার অভ্যেসই আমি করে যাই। অন্য বিস্ফোরণ পারি না পারি। নিষ্ক্রিয়তার জলাভূমি যেভাবে গিলে নিয়েছে, নিচ্ছে ক্রমাগত আমায়, আমাদের, সে অবস্থায় এই অন্তরের তোলপাড়কে বুঝে, অ্যাকনলেজ করার মধ্যেও তো একটা বিদ্রোহ আছে। এক বেগদাই সই, তবুও তো ঘুম ভাঙা, এক। তাই তো সকালে উঠে ইন্সটাগ্রাম-এ বারে বারে অ্যালগরিদম আমায় পাঠায় ফেটে পড়ার ছবি। যেমন সদ্য দেখলাম, বিনোদ বিহারী মাহাতো কোয়লাঞ্চল বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্র প্রতিবাদের ভিডিয়ো।
এই ‘অব ঠিক হ্যায়’-এর পর শুরু হবে ডায়লগ। শুরু করবে ছাত্ররাই। যাবতীয় রাগ, ক্ষোভের মোমেন্টাম ভেঙে। স্বাধীনতা দিবসের হাওয়ায় নতুনের এই মোমেন্টাম ভাঙা, নাকি বলি ব্রিজ তৈরিই থাক ইন্সটা ফিড জুড়ে, হৃদয় জুড়েও।
ডাফলি হাতে কিছু ছাত্র, প্রতিবাদ জানাচ্ছিলেন, যেমন অন্য ক্ষেত্রেও হয়, আমল দেয়নি তাঁদের কর্তৃপক্ষ, বসে যে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ করবে, সে জো-ও নেই, তারপর বাঁধ ভেঙে গেল শেষমেশ, ছাত্ররা মাটিতে বসে ভাইস চ্যান্সেলর-কে আঙুল উঁচিয়ে, গলা আরও উঁচিয়ে ক্রমাগত বলতে লাগল, পহলে জ়মিন পে ব্যায়ঠিয়ে। অর্থাৎ মুখ না খুলে, চুপচাপ আগে আমাদের সমকক্ষ হন, মাটিতে বসুন, বসে দেখুন, বোঝার চেষ্টা করুন, মাটিতে বসতে কেমন লাগে, তারপর কথা হবে।

ভিডিয়োর সে ছাত্রনেতা সাংঘাতিক তেজ নিয়ে ভাইস চ্যান্সেলরের একরকম মাজা দেন ভেঙে, বাধ্য করেন মাটিতে বসতে, এবং তারপরই অদ্ভুত এক কাণ্ড ঘটল। কর্তৃপক্ষ উপায় না দেখে ‘মাথা ঝোঁকাতেই’, আগুনে সে ছাত্র নেতা গলা নামালেন ও তৎক্ষণাৎ বললেন— অব ঠিক হ্যায়…
এই ‘অব ঠিক হ্যায়’-এর পর শুরু হবে ডায়লগ। শুরু করবে ছাত্ররাই। যাবতীয় রাগ, ক্ষোভের মোমেন্টাম ভেঙে। স্বাধীনতা দিবসের হাওয়ায় নতুনের এই মোমেন্টাম ভাঙা, নাকি বলি ব্রিজ তৈরিই থাক ইন্সটা ফিড জুড়ে, হৃদয় জুড়েও। যেন ওই নতুনের স্লোগান বুনে নিই বুকে— নিত্য যেথা ভয়শূন্য, উহ্য ফালতু ভিড়…
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত