(Korpur O Mahakal)
“রাম নাম সত্য হে, রাম নাম সত্য হে” আওড়াতে আওড়াতে কয়েকজন লোক মৃতদেহটি নিয়ে ঘাটের দিকে এগিয়ে চলল। হলুদ কাপড় আর লাল চেলিতে পুরো দেহটি মোড়া। দালানে বসে এক অঘোরী বাবা “হর হর মহাদেব” বলতে বলতে হুঁকো টানছে। চারিদিকে সাদা ধোঁয়া আর মরা পোড়ার গন্ধে ছেয়ে গেছে। কাদা আর গোবরে সরু সরু গলিগুলো যেন নিজেদের সাজিয়ে রেখেছে। কারওর কোনও আক্ষেপ নেই, বিরক্তি নেই, ঘেন্না নেই। সবারই ধারণা ‘বাবা কা ধাম অ্যায়সাই হোতে হ্যায়’। তারই মধ্যে আদ্রিতি একটা রং বেরঙের সাধু সন্ন্যাসীর মুখ আঁকা দেওয়াল খুঁজে দাঁড়িয়ে পড়েছে “কী গো এখানটা একটা ছবি তুলে দাও না”।
এরকম কয়েকটা ‘এ্যাসথেটিক’ ছবি তুলে সোশ্যাল মিডিয়ায় না দিতে পারলে যেন ট্যুরটাই ঠিক কমপ্লিট হয় না। একটা অফ হোয়াইট ট্যাঙ্ক টপ, আর ফ্লেয়ারড স্কার্টে আদ্রিতিকে এখনও পঁচিশের যুবতী লাগে। ওদিকে কিমি ঘ্যানঘ্যান করেই যাচ্ছে “পা ব্যাথা করছে বাবা, কোলে নাও”। কর্পূর খানিক বিরক্তি প্রকাশ করল, “এইজন্য সব জায়গায় তোমাদের আনতে চাই না”।
আসার আগে সে ভাল করে জায়গাটা সম্বন্ধে রীতিমতো পড়াশোনা করে, গুগল বাবার সাহায্য নিয়ে খুঁটিনাটি তথ্য সংগ্রহ করে তবেই এখানে এসেছে। ফলে তিলক কেটে কমলা বসন জড়িয়ে ভুলভাল বলে হাত পাতলেই, কর্পূরের পকেট থেকে যে কিছু খসবে না, এ ব্যাপারে আদ্রিতি নিশ্চিত। ইটিরিনারি বানানো থেকে ট্রেনের টিকিট কাটা, হোটেল বুক থেকে ক্যাব বুক, কোথায় কোন অথেন্টিক খাবার ভাল পাওয়া যায়, সবটাই নখদর্পণে কর্পূরের। তাই ওর সঙ্গে কোথাও ঘুরতে এলে আদ্রিতি বেশ রিল্যাক্স মোডেই থাকে।
সকালে প্রাতঃরাশ সেরে ওরা এখন যাচ্ছে মণিকর্ণিকা ঘাটের দিকে। কী আছে এমন মণিকর্ণিকা ঘাটে, কী এমন মহাশ্মশান যেখানে চিতার আগুন কখনও নেভে না। মণিকর্ণিকা ঘাট নিয়ে মানুষের মনে রহস্যের অন্ত নেই। এই ঘাটের ইতিহাস, পৌরাণিক সমস্ত গল্প পড়ে, শুনে প্রথম থেকেই কর্পূর ঠিক করে রেখেছিল এখানে একবার আসতেই হবে। তাই আজ ভোর ভোর বেরিয়ে আগে বিশ্বনাথ মন্দিরে পুজো দিয়েছে ওরা।

কর্পূরের অফিসে অনেকদিন ধরে ঝুলে থাকা একটা প্রোমোশন সদ্য পেয়েছে, তাই আসার থেকেই ওরা ঠিক করে রেখেছিল এখানে এলে একেবারে রুদ্রাভিষেক করে বাবার পুজো দেবে। যেমন ভাবনা, তেমন কাজ। মন্দিরের পাশেই মন্দির কমিটির অফিস থেকে টিকিট কাটার সঙ্গে সঙ্গে, ওদের জন্য একজন পুরোহিত নিয়োগ করে দেওয়া হল ওখানকার অফিস থেকে।
পুরোহিত বা পাণ্ডারা যাতে দর্শনার্থীদের টুপি পরিয়ে অর্থাৎ ঠকিয়ে টাকা নিতে না পারে, তাই এখানকার কর্তৃপক্ষ কঠোরভাবে সব নিয়মকানুন তৈরি করে রেখেছেন। সেই শাস্ত্রী একাধারে যেমন পুজো দিচ্ছেন, তেমন গাইডের দায়িত্ব পালন করছেন, কোথা থেকে জল-দুধ-পুজোর উপকরণ নিতে হবে, কোথায় জুতো-গুরুত্বপূর্ণ সামগ্রী রাখতে হবে, আবার অনুরোধ করলে ফটোও তুলে দিচ্ছেন তিনি।
মানুষ জীবনে ভাবে এক, আর হয় আর এক। বছর পাঁচেকের প্রেম ছিল আদ্রিতির সঙ্গে প্রীতমের। হাই স্কুলের প্রেম যেমন হয়। কচি বয়সের টাটকা ইমোশন।
কত কত মানুষ, কত কত তাদের মনস্কামনা। সবাই নিষ্ঠাভরে বাবার পায়ে দুধ-জল ঢালছে, সবাই চাইছে তাদের মনস্কামনা পূরণ হোক। আদ্রিতি ভাবছে বাবা কি সবার মনস্কামনা পূর্ণ করেন? বাবার কাছে আলাদা করে কীই বা চাইব, উনি তো সবটাই দেখছেন, গুছিয়ে দিচ্ছেন, এই যে কর্পূরের মতো স্বামী পেয়েছি, তা কি কম ভাগ্যের? সবটাই তো ওঁর কৃপায় হয়েছে। নাহলে আজ আমার জীবন অন্য এক খাতে বওয়ার কথা ছিল।
মানুষ জীবনে ভাবে এক, আর হয় আর এক। বছর পাঁচেকের প্রেম ছিল আদ্রিতির সঙ্গে প্রীতমের। হাই স্কুলের প্রেম যেমন হয়। কচি বয়সের টাটকা ইমোশন। একবার স্কুল পালিয়ে গঙ্গার ঘাটে ঘুরতে গেছিল দুজনে, প্রীতমের সাইকেলের সামনে বসে। আর ধরা পড়বি তো পড়, পড়ল গিয়ে কাকার হাতে, ওর কাকা কোনও একটা কাজে ওদিকেই গেছিল, হঠাৎ ওঁর বাইকের সঙ্গে প্রীতমের সাইকেলের ধাক্কা, ব্যস, বাড়ি গিয়ে বকা কাকে বলে, সব জানাজানি হয়ে গেল।

ফলে ওদের মেলামেশায় খানিক বাঁধা পড়ল।
– এখন আমরা কদিন যোগাযোগ বন্ধ রাখব, বুঝলি।
– কিন্তু আমি তোর সঙ্গে কথা না বলে, দেখা না করে থাকব কী করে?
– আরে পাগল, কলেজে দেখা হবে তো!
এমন উথালপাথাল প্রেম নিয়ে কলেজের গণ্ডি পার হল। যখন ইউনিভার্সিটিতে ঢুকল, দু’জনের মধ্যে ধীরে ধীরে দূরত্ব বাড়তে শুরু করল। টুকটাক কমন বন্ধুদের মারফত শুনত, প্রীতমকে নাকি ইদানিং রিখিতার সঙ্গে একটু বেশিই ঘুরতে দেখা যাচ্ছে। দু’জনে একসঙ্গে ইউনিভার্সিটিতে আসে, একসঙ্গে বেরিয়ে যায়। প্রথমটায় আদ্রিতি অতটা গুরুত্ব দেয়নি, এতটাই বিশ্বাস করত প্রীতমকে। ধীরে ধীরে প্রীতমের দেখা করা, কথা বলা কমতে লাগল। এই নিয়ে ওদের ভিতর প্রায়ই ঝামেলা লেগে থাকত।
ফেক প্রোফাইল থেকে প্রীতমকে স্টক করে দেখল, কয়েকদিনের মধ্যেই ওর প্রোফাইলে প্রীতম আর রিখিতার যৌথ ছবি। সঙ্গে আপডেটেড স্টেটাস “ইন আ রিলেশনশিপ উইথ রিখিতা সেন”। ওর মাথায় যেন বাজ ভেঙে পড়েছিল।
তারপর এল সেই ভয়ঙ্কর দিন। প্রীতম এসে বলল, ও নাকি আর এই সম্পর্কটায় থাকতে পারছে না। সে বেরিয়ে যেতে চায় এই সম্পর্কটা থেকে। স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল আদ্রিতি, এই-ই কি সেই প্রীতম যে ওকে ছাড়া এক মুহূর্তও থাকতে পারত না! কিচ্ছু বলতে পারেনি, ফিরে এসেছিল চুপচাপ। তবু মনের কোণে কোথাও হয়তো ক্ষীণ আশা ছিল, যে প্রীতম ঠিক আজ না হোক কাল ফিরবে। কতদিন থাকবে আর ওকে ছাড়া। এর আগেও কতবার এমন ঝগড়া হয়েছে, আবার তো ঠিকঠাক হয়ে গেছে সব। কিন্তু এবার আর কিছুই ঠিক হল না। প্রীতম ফিরল না।
বরং ফেক প্রোফাইল থেকে প্রীতমকে স্টক করে দেখল, কয়েকদিনের মধ্যেই ওর প্রোফাইলে প্রীতম আর রিখিতার যৌথ ছবি। সঙ্গে আপডেটেড স্টেটাস “ইন আ রিলেশনশিপ উইথ রিখিতা সেন”। ওর মাথায় যেন বাজ ভেঙে পড়েছিল। নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিল না আদ্রিতি, শরীর অবশ হয়ে আসছিল। তাহলে এতদিন সবাই যা বলেছিল, সেটাই সত্যি? প্রীতম এভাবে আমায় ঠকাতে পারল? কী খামতি ছিল আমার মধ্যে, যে কারণে ও এভাবে আমায় ছেড়ে গেল।
এই ধাক্কা সামলাতে পারল না আদ্রিতি, ডিপ্রেশনে চলে গেল। তারপর বহু বছর সাইকোথেরাপিতে ছিল। পুরুষ জাতটার প্রতিই ওর একটা অদ্ভুত ঘৃণা, রাগ, বিতৃষ্ণা জন্মে গেছিল। নতুন সম্পর্ক তো দূর, আশেপাশে কোনও পুরুষকে ঘেঁষতে অবধি দিত না। সদগুরু ওরফে জগদীশ বাসুদেব নামে এক আধ্যাত্মিক যোগীর কাছে দীক্ষা নিয়ে ওখানকার সদস্য হয়ে গিয়েছিল। ওখানে আদিযোগী’র সামনে গিয়ে বসলে অদ্ভুত একটা শান্তি অনুভব করত আদ্রিতি।
ক্যাম্পাসে ছুটি পেলেই ছুটে যেত কোয়েম্বাটোরে, ইশা যোগা সেন্টারে, সেখানে গুরুজির ইঞ্জিনিয়ারিং প্রোগ্রামে নিজেকে অন্তর্ভুক্ত করে, জীবনের নতুন দিগন্ত খুঁজে পেয়েছে আদ্রিতি।
বছর ছয়েকের কন্যা কিমি ওদের জীবনটাকে যেন আলোয় ভরে রেখেছে। আসার আগে ট্রাভেল ভ্লগারদের ভিডিও থেকে জেনে এসেছে, আজ প্রাতঃরাশ করার ঠিকানা নির্ধারিত হয়েছে বেনারসের বিখ্যাত রাম ভান্ডারে।
সেই সময় থেকেই মহাদেবের প্রতি তার অগাধ বিশ্বাস, ভক্তি। জীবনে কিছু টালমাটাল হলেই ছুটে আসে সদগুরুর কাছে। ওর বিশ্বাস মহাদেবই ওর কাছে কর্পূরকে পাঠিয়েছেন, ওর টালমাটাল জীবনটাকে শক্ত হাতে গুছিয়ে দেওয়ার জন্য কর্পূরের থেকে পারফেক্ট আর কেউ হত না। সেবার কনভোকেশনে মীরাদি ওর সঙ্গে কর্পূরের আলাপ করিয়ে দেয়। কর্পূর তখন সদ্য জেআরএফ পাশ করে মুর্শিদাবাদ কলেজে ঢুকেছে। বয়স তখন ওর সাতাশ-আঠাশ হবে, সুন্দর সুঠাম সুপুরুষ বলতে যা বোঝায়, এক্কেবারে ওইরকম। চোখে রিমলেস চশমা, পরিমিত হাসি, প্যাস্টেল ব্লু শার্টে কর্পূর, একটু হলেও আদ্রিতির নজরে এসেছিল।
কর্পূরই প্রথম ‘হ্যালো’ বলে হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল, তারপর ধীরে ধীরে কথা শুরু হল, বন্ধুতা বাড়তে লাগল। ‘আমায় বিয়ে করবে দিতি?’ লং ড্রাইভে ঘুরতে গিয়ে অঝোর এক বৃষ্টির দিনে এমন প্রস্তাব রেখেছিল কর্পূর। ড্রাইভিং সিটের পাশের সিটে বসে থাকা মেয়েটির মুখ তখন লজ্জায় লাল। যেন ‘মৌনং সম্মতি লক্ষণম’।

কর্পূর কখনও কোনও কিছুতে আদ্রিতিকে জোর করেনি, কোনও সিদ্ধান্ত জোর করে চাপিয়ে দেয়নি। বলেছে তোমার যতদিন সময় লাগে, সময় নাও, আমার কোনও তাড়া নেই। ধীরে ধীরে একটু একটু করে আদ্রিতি টের পায় সে আবার কাউকে ভরসা, বিশ্বাস, নির্ভর করতে শুরু করছে। ভাল লাগছে ওর কর্পূরের সঙ্গে সময় কাটাতে। পৃথিবীতে কোনও অনুভূতিই চিরস্থায়ী নয়, আজ যাকে ভালবেসে পাগল হচ্ছি, কাল তার প্রতি ভালবাসা না থাকতেও পারে। এটাও যেমন ঠিক, তেমন সারা জীবন তো মানুষ একটা মানুষের হাত ধরেই গোটা জীবন কাটিয়ে দেয়। কাটিয়ে দিতে পারে বলেই, কাটায়।
আদ্রিতির এখন এমনটাই মনে হয়, কর্পূরের সঙ্গে একটা গোটা জীবন হেসে খেলে কাটিয়ে দেওয়া যায়। আট বছর কেটে গেল দেখতে দেখতে। বছর ছয়েকের কন্যা কিমি ওদের জীবনটাকে যেন আলোয় ভরে রেখেছে। আসার আগে ট্রাভেল ভ্লগারদের ভিডিও থেকে জেনে এসেছে, আজ প্রাতঃরাশ করার ঠিকানা নির্ধারিত হয়েছে বেনারসের বিখ্যাত রাম ভান্ডারে। কিন্তু এত যে সবাই প্রশংসা করে, কচুরিটা খেয়ে মনে হল জায়গাটা ওভারহাইপড। এর থেকে আমাদের কলকাতায় পাড়ার দোকানের কচুরি অনেক ভাল।
হোটেলে ফিরে স্নান-টান করে ফ্রেশ হয়ে ওরা বেরিয়ে গেল সাইট সিনের উদ্দেশ্যে। দুর্গা মন্দির, সঙ্কটমোচন মন্দির, বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়, রামনগর ফোর্ট, সারনাথ আরও কত কী দেখে ফিরতে ফিরতে সন্ধে হয়ে গেল।
কিমি বলে “ইসস আটা দিয়ে লাল লাল কচুরী, একদম ভাল না মাম্মা। দিদানের হাতের কড়াইশুটির কচুরী ইজ ইয়াম্মী। বাই দ্য ওয়ে পাপা, আমরা কি এরপর মণিকর্ণিকা ঘাটে যাব? কী আছে ওখানে?” ও নিজের ইচ্ছে মতো কখনও বাবা ডাকে, কখনও পাপা কখনও বিজু; যখন যা মনে চায়। বিজু, কর্পূরের ডাক নাম।
“চল গেলেই দেখতে পাবি!”
কিন্তু ওখানে যাওয়ার পর এত এত মৃতদেহ পোড়ানো হচ্ছে দেখে, আদ্রিতি বলে উঠল “বিজু, আমাদের কি এখানে এখন বাচ্চাটাকে নিয়ে আসা উচিত হল? বাচ্চাটার মনে যদি অন্য রকম কিছু এফেক্ট পড়ে…”
কর্পূর বলল “ঠিকই বলেছ, এখন চলো তাহলে অন্যান্য জায়গাগুলো ঘুরে নিই, সন্ধ্যের দিকে আমি একা একবার আসব, তখন কিন্তু বারণ কোরো না।”
“আচ্ছা এসো, আমি মেয়েকে নিয়ে রুমে থাকব”
হোটেলে ফিরে স্নান-টান করে ফ্রেশ হয়ে ওরা বেরিয়ে গেল সাইট সিনের উদ্দেশ্যে। দুর্গা মন্দির, সঙ্কটমোচন মন্দির, বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়, রামনগর ফোর্ট, সারনাথ আরও কত কী দেখে ফিরতে ফিরতে সন্ধে হয়ে গেল। দুপুরের দিকে রামনগর ফোর্টে পৌঁছে খুব খিদে পাওয়ায় ওখানকার একটা দোকান থেকে দু’গ্লাস লস্যি খেয়ে নেয় কর্পূর। আদ্রিতি বারণ করেছিল, শুনল না।
কর্পূরের বাবা বছর দুয়েক আগে ওই একই সেরিব্রাল স্ট্রোকে মারা গিয়েছিলেন, ভাগ্যের কী পরিহাস, ছেলের মৃত্যুও ওই একইভাবে দেখতে হবে বৃদ্ধা মা’কে।
সন্ধ্যা থেকে শুরু হল অসহ্য পেট ব্যথা। ব্যথায় ছটফট করতে শুরু করল কর্পূর। সঙ্গে যেসব হজমের ওষুধ এনেছিল, খেল, কিন্তু কিছুতেই কিছু কাজ হচ্ছে না, পেট ব্যথা কমল না, এদিকে রাত বাড়তে লাগল। অগত্যা হোটেলের ম্যানেজারকে বলে স্থানীয় হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হল কর্পূরকে। ভর্তির সঙ্গে সঙ্গেই স্যালাইন দেওয়া থেকে যাবতীয় চিকিৎসা শুরু হয়ে গেল।
হাসপাতালে বসে আদ্রিতি শুধু মহাদেবকে ডেকে যাচ্ছে, অন্য আর কোনও দিকে ওর হুঁশ নেই। কিন্তু এবার বোধহয় আর মহাদেব তার ডাকে সারা দিলেন না। ডাক্তার এসে জানালেন, পেটের ইনফেকশনের সঙ্গে সঙ্গে ওঁর খানিক আগে উচ্চ রক্তচাপের কারণে ব্রেনের টিস্যু ছিঁড়ে সেরিব্রাল অ্যাটাক হয়েছে। আদ্রিতি জানত, কর্পূরের হাই ব্লাড প্রেশার ছিল, তার জন্য রেগুলার ওষুধ খেত। তবে সেইদিন ভোর থেকে এত হেকটিক ঘোরাঘুরির মাঝে ভুলে গিয়েছিল ওষুধটা খেতে। সেই জন্যই কি তবে? ডাক্তার এসে সাদা চাদর দিয়ে মুখটা ঢেকে দিল “সরি, উই কুডন’ট সেভ হিম”।

“মানে!” একটা সুস্থ মানুষ খানিক আগেই হেঁটে চলে দৌঁড়ে বেড়াচ্ছিল, হঠাৎ করেই এরকম ‘নেই’ হয়ে যাওয়া সম্ভব? এই দুঃসংবাদ সহ্য করতে না পেরে সেন্সলেস হয়ে যায় আদ্রিতি। জ্ঞান ফেরার পর ডাক্তাররা দেখেন, আদ্রিতি বাকশক্তি হারিয়েছে। ডাক্তারদের ধারণা, এই আঘাতটা সহ্য করতে না পেরে সে সাময়িকভাবে কথা বলার শক্তি হারিয়েছে। কী হবে এখন বাচ্চাটার? এইটুকু শিশু দেখছে বাবা চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছে, মা কথা বলছে না, নিথর চোখদুটো থেকে শুধু জল গড়িয়ে পড়ছে।
হোটেলের স্টাফরা ইনিশিয়েটিভ নিয়ে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে, জানায় সবটা। কর্পূরের বাবা বছর দুয়েক আগে ওই একই সেরিব্রাল স্ট্রোকে মারা গিয়েছিলেন, ভাগ্যের কী পরিহাস, ছেলের মৃত্যুও ওই একইভাবে দেখতে হবে বৃদ্ধা মা’কে। আদ্রিতির মা, বাবাও ছুটে এসেছেন। মেয়ের এমন বিপদের দিনে কোন বাবা-মা ঘরে বসে থাকতে পারেন?
শ্মশান ঘাটের সঙ্গে লাগোয়া একটা শিবমন্দির ছিল, অঘোরী সাধুরা ছাই মেখে সেখানে ধ্যান করছিলেন, একটি শিবলিঙ্গের সামনে। ঢোকার মুখেই একটা সিঁদুর লেপা ইয়া বড় বলি যন্ত্র, দেখলেই গা ছমছম করবে।
ওঁরা এসে পৌঁছতে পৌঁছতে সকাল হয়ে গেল, তখন সবে ভোরের আলো ফুটছে, অথচ আদ্রিতির জীবনে এ কোন অন্ধকার মহাদেব নিয়ে এলেন? সবাই আসার পর ঠিক হল, দাহকার্য মণিকর্ণিকা ঘাটেই হবে। কর্পূরের শেষ ইচ্ছে ছিল মণিকর্ণিকা ঘাটে আর একবার যাওয়ার, তখন কি সে ভেবেছিল পরের বার তাঁকে এইভাবে মণিকর্ণিকা ঘাটে যেতে হবে, অন্তিম যাত্রায়, শায়িত অবস্থায়।
“রাম নাম সত্য হ্যায়, রাম নাম সত্য হ্যায়” আগের দিন সকালে যে মন্ত্র আদ্রিতি শুনেও শোনেনি, এখন যেন সেই মন্ত্রই বুকের ভিতর এসে ছিন্ন বিচ্ছিন্ন করে যাচ্ছে আদ্রিতির অন্তর। “না, এ কিছুতেই হতে পারে না, আমার বিজু আমায় ছেড়ে এত তাড়াতাড়ি চলে যাবে, এমনটা তো কথা ছিল না” ওর কান্না যেন এসবই বলতে চাইছে। শ্মশানে পৌঁছনোর পর ডোমেরা যখন কাঠ প্রস্তুত করতে লাগল, হঠাৎ উঠে দাঁড়াল আদ্রিতি, বলিষ্ঠ কণ্ঠে বলে উঠল “রুকিয়ে ভাইয়া, হামে কুছ করনা হ্যায়”। “এই তো, এই তো, মেয়ের আমার স্বর ফুটেছে” আদ্রিতির বাবা বলে উঠলেন।

শ্মশান ঘাটের সঙ্গে লাগোয়া একটা শিবমন্দির ছিল, অঘোরী সাধুরা ছাই মেখে সেখানে ধ্যান করছিলেন, একটি শিবলিঙ্গের সামনে। ঢোকার মুখেই একটা সিঁদুর লেপা ইয়া বড় বলি যন্ত্র, দেখলেই গা ছমছম করবে। আদ্রিতি তার স্বামীর দেহ সামনে রেখে তার কপালে বেদীর ছাই মাখিয়ে “ওঁ ত্র্যম্বকং যজামহে সুগন্ধিং পুষ্টিবর্ধনম্।/ উর্বারুকমিব বন্ধনান্ মৃত্যোর্মুক্ষীয় মাঽমৃতাৎ।।” একমনে বলা শুরু করল। আদ্রিতির মা কাতর কণ্ঠে বললেন
“দিতি, ওরে ওঠ মা আমার, এভাবে কাউকে বাঁচানো যায় না, ওকে শান্তিতে যেতে দে…” আদ্রিতি শোনে না, প্রাণপন মহামৃত্যুঞ্জয় মন্ত্র জপ করে যাচ্ছে।
খানিক বাদে কর্পূর বলল “অঘোরী বাবা কোথায় গেলেন, আমি ওঁকে একবার প্রণাম করতে চাই।” সকলে কর্পূরকে নিয়ে এতটাই ব্যস্ত হয়ে গেছিল কয়েক মুহূর্তের জন্য, যে খেয়ালই করেননি উনি নেই।
এমতাবস্থায় এক অঘোরী বাবা কর্পূরের কানের কাছে এসে ফিসফিস করে কীসব মন্ত্র বলতে লাগলেন, কেউ শুনতে পেল না। মিনিট কয়েকের মধ্যে সকলে স্তম্ভিত হয়ে গেল এমন দৃশ্য দেখে। দেখল মৃতদেহটি নড়ছে, কর্পূর চোখ মেলল ধীরে ধীরে। এমনটাও হতে পারে? মৃত মানুষ জেগে উঠতে পারে? আদ্রিতিকে অঘোরী বাবা বললেন “তোমার ডাকে বাবা সাড়া দিয়েছেন মা”। আদ্রিতির চোখে মুখে তখন আনন্দ, শান্তি, বিস্ময়। কর্পূরকে জড়িয়ে কেঁদেই চলেছে মেয়েটা, আর বলছে “আমি জানতাম আমার মহাদেব আমায় এভাবে নিঃস্ব করে দিতে পারে না।”
খানিক বাদে কর্পূর বলল “অঘোরী বাবা কোথায় গেলেন, আমি ওঁকে একবার প্রণাম করতে চাই।” সকলে কর্পূরকে নিয়ে এতটাই ব্যস্ত হয়ে গেছিল কয়েক মুহূর্তের জন্য, যে খেয়ালই করেননি উনি নেই। কোথায় গেলেন উনি হঠাৎ করে, কেমন উধাও হয়ে গেলেন যেন কর্পূরের মতো। কে যেন বলে উঠল “অঘোরীরা এমনই হন- নির্মোহ, শক্তির উপাসক, চাইলে অসম্ভবকে সম্ভব করতে পারেন।” আদ্রিতি বলল “আমরা সকলে কাল আবার বিশ্বনাথের চরণে পূজো দেব, সকলে বলো- হর হর মহাদেব! ওম নমঃ শিবায়!”
এবার হোটেলে ফেরার পালা।
পরবর্তী পর্বে সমাপ্ত
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্য়মে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত