(Mati O Kolomer Sanglap)
একটা বয়সের পর সন্তানদের নিজস্ব জগৎ তৈরি হয়, তখন তাদের জীবনে মা-বাবার প্রয়োজন কমতে থাকে। মনে পড়ে জিশানের তখন ক্লাস ফাইভ। সে তার পড়াশোনার চাপে জর্জরিত। প্রতীকও সর্বক্ষণ ওর মিটিং, কনফারেন্স নিয়ে ব্যস্ত থাকত। প্রতীক চিরকালই রসকসহীন মানুষ, কেমন ছাপোষা ধরনের। অফিস থেকে বাড়ি ফিরে মুড়ি খায়, টিভিতে খবর গেলে, রাত হলে ডিনার খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। বিয়ের প্রথম কয়েক বছর ঊর্জার অভিমান হত, মুখ গুমড়ে বসে থাকত। ও চাইত প্রতীক ওকে সময় দিক, সপ্তাহান্তে একটু ঘুরতে নিয়ে যাক, কিংবা পছন্দের ফুল এনে উপহার দিক। কিন্তু ওই যে, প্রতীক চিরকালই ম্যাদামারা গোছের, স্ত্রীর অন্তরের অলিগলি বোঝার সাধ্য তার নেই।
বিয়ের এত বছর পর এখন আর ঊর্জার অভিমান হয় না, বরং একঘেয়ে আর বিরক্তি মিশিয়ে এক জ্বালাধরা অনুভূতি হয় প্রতীককে দেখলে।
আরও পড়ুন: আঁধারে মিলায়ে যায়
ঊর্জা যা চায়, প্রতীক তা দিতে পারে না। ওর মনে হয়, এর থেকে নিজের মতো জীবনটাকে উপভোগ করা বেটার। নতুন কিছু একটা করতে হবে। ভাবতে ভাবতে অনলাইন আর্ট অ্যান্ড ক্রাফট কোর্সে ভর্তি হল।
ঊর্জা বরাবরই ছবি আঁকা, হাতের কাজ এগুলো করতে ভীষণ পছন্দ করত। তাই একটা অ্যাডভান্সড কোর্সে রেজিস্ট্রেশন করল। প্রথম প্রথম এই লার্নিংটা ওকে বেশ বুস্ট আপ করত। সারাদিনের খাটাখাটনির মাঝে ওইটুকু সময়, রং, তুলি, কাঁচি, পেপার নিয়ে যেন এক টুকরো জানালা, যা দিয়ে কুলকুল করে হাওয়া বয়, এক চিলতে আলো আসে, ভোরের স্নিগ্ধ বাতাসের মতো। ঝুমা বাসন মাজতে মাজতে একদিন বলল ‘বৌদি তুমি এত ভাল ভাল সব কাজ কর, এগুলো বিক্কিরি করতে পারো তো’।

ঊর্জাও মনে মনে ভাবল, ঝুমা তো ভুল কিছু বলেনি, এগুলো নিয়ে তো কিছু একটা ভাবনা চিন্তা করা যেতে পারে এই যেমন একটা প্রদর্শনীর ব্যাবস্থা? মন্দ হয় না কিন্তু। এতদূর অবধি ব্যাপারটা ঠিকঠাকই ছিল।
– এরপর হয়তো মনে হবে, একটা প্রেম বোধহয় এবার টুক করে ঢুকে পড়ল। তারপর ধরুন একটু ইন্টু-পিন্টু…
– না বস, আপনি ভুল পথে হাঁটছেন।
– আপনি বুঝতে পারছেন না, আজকাল এসব কন্টেন্ট-ই পাবলিক বেশি করে খায়।
– আচ্ছা পাঠক কী পথে হাঁটবে, সেটা কি আপনি ঠিক করে দেবেন মশাই? পাবলিক কী খাবে, সেই ভেবে আমাকে উপন্যাসের কন্টেন্ট তৈরি করতে হবে? লেখক হিসেবে আমার এইটুকু স্বাধীনতা থাকবে না?
অলরেডি এই সিরিজটা প্রকাশ হওয়া শুরু হয়ে গিয়েছে, ভাল রেসপন্সও আসছে। এখন মাঝপথে লিখব না বললেই হল
– আপনি আমায় ভুল বুঝবেন না, লিখুন নিজের মতো। কিন্তু একটা প্রথম সারির পত্রিকায় লিখতে গেলে তার ব্যবসায়িক দিকটিও আপনাকে মাথায় রাখতে হবে।
– ছাড়ুন, আমি লিখব না।
– অলরেডি এই সিরিজটা প্রকাশ হওয়া শুরু হয়ে গিয়েছে, ভাল রেসপন্সও আসছে। এখন মাঝপথে লিখব না বললেই হল? আপনি আমাদের এতদিনের পুরনো লেখক, কত কাজ হয়েছে আমাদের একসাথে, যার জন্য কন্ট্রাক্ট পেপারটাও এবার করানো হল না, আর এখন এইসব বলছেন?
– আমাকে দিয়ে লেখাতে হলে, আমাকে আমার মতো লিখতে দিতে হবে।
– একটা জিনিস মনে করাতে বাধ্য হচ্ছি, আজ না হয় আপনার অনেক নামডাক হয়েছে, পরিচিতি হয়েছে, বড় বড় আন্তর্জাতিক পত্রিকায় লেখা বেরোয়, ‘তমাল মজুমদার’ বলতে লোকে এক ডাকে চেনে, লেখার তারিফ করে। কিন্তু এক সময় যখন স্ট্রাগেলিং পিরিয়ডে ছিলেন, তেমন নামডাক হয়নি, তখন কিন্তু এই আমরাই, এই ‘আশ্রয়’ পত্রিকাই আপনাকে লেখার জন্য একটা হিউজ স্পেস দিয়ে দিত, আপনাকে স্টারডম এনে দিয়েছিলাম এই আমরাই।
– এখন এগুলো মনে করানোর অর্থ কি? ঠিক আছে আমি লিখব। আপনি যখন চাইছেন, আমি কিছুটা যৌন কন্টেন্ট ঢুকিয়ে স্ট্রাকচারটাকে রিমডিফাই করে পাঠাচ্ছি দু’দিনের মধ্যে।
বুকের অংশে দেখা যাচ্ছে অসংখ্য ক্ষত, গলার অংশে শিল্পী করেছেন রক্তাক্ত লাল রং আর মস্তিষ্কে তৈরি করে রেখেছেন অপার শূন্যতা। ভাষ্কর্যটির কোণায় ছোট্ট করে টাইটেলের জায়গায় লেখা- ‘দ্য রিলিজ’ অর্থাৎ ‘মুক্তি’।
বলতে বলতে সিগারেটে টান দিল তমাল। একরাশ বিরক্তি যেন গলায় দলা পাকিয়ে উঠছে। এই প্রখর রোদে শরীরের সাথে সাথে মস্তিষ্কটাও যেন পুড়ছে। সিগারেটটা মুখ থেকে ফেলে পা দিয়ে পিষে মনে মনে গজরাচ্ছে তমাল। একটা কালো মলমলের পাঞ্জাবি, আর ফেডেড জিন্স পরনে। এই বয়সেও সুঠাম সুপুরুষ লাগে তাকে। গোলপার্কের এই দিকটায় একটা কাজেই এসেছিল, ফেরার সময় একটা ব্যানার চোখে পড়ল, স্কাল্পচার আর্টের প্রদর্শনী চলছে সামনের আর্ট গ্যালারিটায়। হাতে যখন খানিক সময় আছে, একবার ঢুঁ মেরে আসাই যায়। লেখালেখি যেমন একটা শিল্প, ভাস্কর্যটাও তো একটা শিল্প এবং প্রত্যেক শিল্প, তার গঠনের চিন্তন, মনন, প্রত্যেকে প্রত্যেকের সাথে কোথাও যেন ইন্টারকানেক্টেড হয়ে থাকে বলে মনে করে তমাল। তাই লেখালেখির বাইরেও বিভিন্ন শিল্পের প্রতি ওর এত ঝোঁক।
বেশ ছিমছাম গ্যালারি। দুপুরের দিকে এসব গ্যালারিতে লোকজনের ভিড়টাও কম। ঘুরে দেখতে সুবিধে হয়। ঘুরতে ঘুরতে ওর চোখ আটকালো একটা ভাষ্কর্যের দিকে। একটি সেরামিকের শায়িত নারীদেহ, দূর থেকে দেখলে মনে হবে, অত্যন্ত সহজ সাধারণ কাজ, কোনও অভিনবত্ব নেই, অথচ কাছে গিয়ে দেখলে দেখা যায়, উদর থেকে নিম্নাঙ্গে ছড়িয়ে রয়েছে পাহাড়, পাখি, জঙ্গল, আকাশ। বুকের অংশে দেখা যাচ্ছে অসংখ্য ক্ষত, গলার অংশে শিল্পী করেছেন রক্তাক্ত লাল রং আর মস্তিষ্কে তৈরি করে রেখেছেন অপার শূন্যতা। ভাষ্কর্যটির কোণায় ছোট্ট করে টাইটেলের জায়গায় লেখা- ‘দ্য রিলিজ’ অর্থাৎ ‘মুক্তি’। শিল্পীর নাম লেখা ‘ঊর্জা সেন’।

‘হোয়াট অ্যান ইনট্রিকেসি!’ নিজের মনেই বলে উঠল তমাল। স্কাল্পচারটি দেখে তমালের মনে হল, শিল্পী হয়তো বোঝাতে চাইছেন নারীর অন্তরের যন্ত্রণার কথা, সমাজের যাবতীয় শেকল উপেক্ষা করে সে উড়ে বেড়াতে চায়, মুক্তি পেতে চায়, মুক্তি দিতে চায় নিজেকে, মেলে ধরতে চায় অনন্তের কাছে। তাই হয়তো ভাস্কর্যটির এমন নাম। অবাক চোখে খানিকক্ষণ চেয়ে থাকে তমাল। এই শিল্পী তো যে সে শিল্পী নয়, এঁর কাজ আমাকে মুগ্ধ করছে শুধু নয়, ভাবাচ্ছে। লেখার অনেক ক’টা নতুন দিক মাথায় খেলে গেল। যাই বাড়ি যাই চটপট সেগুলো মাথা থেকে খাতায় নামাতে হবে।
পরেরদিন আবার তমালের মাথায় ভূত চাপল। ‘ওই কাজটা, ওই কাজটা আমায় ভাবাচ্ছে, আমাকে একবার ওই শিল্পীর সঙ্গে দেখা করতেই হবে। আগের দিন ছিলেন না, আজ নিশ্চয়ই থাকবেন।’
আহা সে কী লাবণ্য! তমাল দূর থেকে ঊর্জাকে দেখছে, হাবেভাবে আন্দাজ করেছে ইনিই নিশ্চয়ই সেই মানুষ হবেন, যিনি আমায় তাড়িয়ে নিয়ে এসেছেন এখানে।
বিকেলের দিকে আবার ওখানে যায় তমাল। আজ ঊর্জা একটা অফ হোয়াইট লিনেন তসর পরেছে, সঙ্গে গ্লাস হাতা ব্লাউজ আর পার্ল জুয়েলারি। কী যে এলিগ্যান্ট লাগছে, দেখে মনেই হয় না ওর অত বড় ছেলে আছে! নিজেকে ভীষণ মেইনটেইন্ড রেখেছে। শরীর থেকে যেন একটা সম্মোহন করা সুগন্ধ চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে। আহা সে কী লাবণ্য! তমাল দূর থেকে ঊর্জাকে দেখছে, হাবেভাবে আন্দাজ করেছে ইনিই নিশ্চয়ই সেই মানুষ হবেন, যিনি আমায় তাড়িয়ে নিয়ে এসেছেন এখানে। কিন্তু যেচে আলাপ করতে যাওয়ার সাহসটুকু পাচ্ছে না। চোখাচোখি হতে ঊর্জাই স্মিত হেসে বলল, ‘কিছু বলবেন?’
– নমস্কার, আমি…
– তমাল মুখার্জি, তাই তো?
– আপনি কী করে…?
– আমায় আগের দিন সুদীপবাবু, মানে এখানকার যিনি রেজিস্টার, তিনি বলেছেন আপনি আমার খোঁজ করছিলেন। বলুন কী বলবেন?
– প্রথমেই বলি, আপনার কাজ আমার খুব ভাল লেগেছে। আই অ্যাম জাস্ট মেসমারাইজড অ্যাট ইওর ওয়ার্ক।
– থ্যাঙ্ক ইউ…
– আমি লেখালেখি করি টুকটাক…
– টুকটাক কেন বলছেন? আমি তো আপনার অনেক গল্প, উপন্যাস পড়েছি। আপনি তো নামকরা লেখক।
আপনার কাজগুলো আমি খুব খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে লক্ষ করেছি, অধিকাংশ পিসগুলোয় নারীর লড়াই, যন্ত্রণা, আতঙ্ক এই দিকগুলো কোমলতা এবং দৃঢ়তার সংমিশ্রণে একটা অদ্ভুত ইলিউশনারি মোটিফ রচনা করছে, যেগুলো আমায় ভাবাচ্ছে, লেখার রসদ যোগাচ্ছে।
– এবাবা লজ্জা দেবেন না, লিখি, ভাল লাগে ওইটুকুই। আমাদের এই পোড়া দেশে লিখে কিছু হয় নাকি? পেট চালাতে গেলে অন্য প্রফেশন খুঁজতে হয়, যদিও আমি চিরকালই শুধু লিখতেই চেয়েছি। তাই শত প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও একটি এক্সপোর্ট-ইম্পোর্টের ব্যবসার পাশাপাশি লিখে গেছি নিয়ম করে। আপনার কাজগুলো আমি খুব খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে লক্ষ করেছি, অধিকাংশ পিসগুলোয় নারীর লড়াই, যন্ত্রণা, আতঙ্ক এই দিকগুলো কোমলতা এবং দৃঢ়তার সংমিশ্রণে একটা অদ্ভুত ইলিউশনারি মোটিফ রচনা করছে, যেগুলো আমায় ভাবাচ্ছে, লেখার রসদ যোগাচ্ছে।
– মাই প্লেজার তমালবাবু।
– তাই আপনি যদি অনুমতি দেন, আমি আপনার শিল্প এবং আমার শিল্পের যুগলবন্দীতে একটি নতুন কাজ করতে চাই, ‘জয়েন্ট ভেঞ্চার’ বলতে পারেন।
– আপাতদৃষ্টিতে তো প্রস্তাবটা ভালই লাগছে শুনে… তবু আমায় একটু ভাবার সময় দিন। যোগাযোগ নম্বর দিয়ে যান, আমি যোগাযোগ করে নেব।

দিন দশেক বাদে তমালের ফোনে একটা হোয়াটসঅ্যাপ টেক্সট ঢোকে, ‘নমস্কার, আমি ঊর্জা সেন।’
– হ্যাঁ বলুন, কিছু ভাবলেন?
– আমি রাজি আপনার প্রস্তাবে…
– বাহ্ বেশ তবে একদিন বসা যাক, এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে।
– আচ্ছা টাইম অ্যান্ড ডেস্টিনেশন জানিয়ে দেবেন। পৌঁছে যাব।
ঊর্জার চল্লিশোর্ধ শরীরের ভাঁজে ভাঁজে যৌবন যেন আলতো আঙ্গিকে মেলে ধরছে ওকে। দরজা ঠেলে ঢুকেই অনতিদূরের কর্নারের টেবিলটায় দেখল তমাল হাত নাড়ছে।
‘ট্রাফিক পুলিশগুলোর কী অবস্থা দেখেছেন দিদি, খালি ধরে ধরে গাড়িগুলোকে কেস দিচ্ছে। পুজো আসছে না… আপনি জানেন স্টেট গভর্মেন্টও এখান থেকে কমিশন খায়।’
চালকের কাজ করেও কতটা সচেতনতা! রাজুর কণ্ঠে এসব সামাজিক কথাবার্তা শুনে খানিক অবাক হয় ঊর্জা। রাস্তায় খুব জ্যাম। মাইকে বাজছে ‘সয় না সয় না সয় না ওগো/ সয় না এত জ্বালা সয় না’। আশা ভোঁসলের ওই সুরেলা কণ্ঠও এই জ্যামে দাঁড়িয়ে কানে হুল ফোটাচ্ছে। সামনেই বিধানসভার ভোট, ফলে শাসক দল, বিরোধী দলের প্রচারের ঠেলায় সাধারণ মানুষের জীবন ওষ্ঠাগত। ঝিরিঝিরি বৃষ্টিও পড়ছে। ক্যাফের বাইরেটায় অন্ধকার নামছে নরম রঙে।
ঊর্জার চল্লিশোর্ধ শরীরের ভাঁজে ভাঁজে যৌবন যেন আলতো আঙ্গিকে মেলে ধরছে ওকে। দরজা ঠেলে ঢুকেই অনতিদূরের কর্নারের টেবিলটায় দেখল তমাল হাত নাড়ছে। এগিয়ে গিয়ে চেয়ারটা টেনে বসতে গিয়ে তমালের সৌজন্য জিজ্ঞাসা, ‘চিনে আসতে অসুবিধা হয়নি তো?’ সে তার মোস্ট ফেভারিট ক্র্যানবেরি ব্রিউতে চুমুক দিতে দিতে প্রাথমিক পরিচয়ের চেষ্টা শুরু করেছে ‘এদিকটা তো খুব একটা আসা হয় না, এই সাদার্ন অ্যাভেনিউর দিকটা কিন্তু অনেক নতুন নতুন ক্যাফে হয়েছে।’

ঊর্জা খানিক সংযত স্বরে, ‘হ্যাঁ বলুন, কাজটা ঠিক কী?’
– রাশিয়ার মস্কো, ওখানকার সেন্ট পিটার্স গ্যালারিতে একটি প্রদর্শনী হবে, যেখানে স্কাল্পচার এবং প্রোস অর্থাৎ গদ্যের মেলবন্ধনে ওরা একটা ইনোভেটিভ কাজ করতে চায়। সেখানে অ্যাজ় এ অ্যাসোসিয়েট অথর অফ ইন্ডিয়া, আমায় ওঁরা ইনভাইট করেছেন। এবার আপনাকে আমি আমন্ত্রণ জানাচ্ছি, আপনি যদি সহযোগী ভাস্কর হিসেবে আমার সঙ্গে কাজ করেন, আমি খুব আনন্দ পাব। তাছাড়া এটা আপনার কেরিয়ারের দৃষ্টান্তমূলক ছাপ ফেলবে বলে আমার ধারণা।
ঊর্জা একটি করে ভাস্কর্য নির্মাণ করে, তমাল তার মেলবন্ধনে গদ্য রচনা করে; এভাবে তদ্বিপরীতে তাদের যুগ্ম প্রজেক্ট এগিয়ে যেতে থাকে।
– আর যদি রাজি না থাকি?
– তাহলে আর কী অন্য স্কাল্পচারিস্ট খুঁজতে হবে।
– না না, কাজটা খুব ইন্টারেস্টিং, আমি করব। এই কাজটায় ভারত থেকে আর কোন কোন ভাস্কর অংশগ্রহণ করছেন, আমায় পরে একটু জানাবেন।
– আসলে কী জানেন, আপনার যেটুকু কাজ দেখেছি, আমার মনে হয়েছে, আমি যেন কোথাও আমার লেখা কিংবা নিজের না বলতে পারা কথাগুলো আপনার শিল্পের ভেতর খুঁজে পেয়েছি। লেখার রসদ পেয়েছি। তাই মনে হয়েছে, উই কুড কানেক্ট ইচ আদার অ্যাট আওয়ার ওয়ার্কপ্লেস।
জীবন কখন কাকে কোন পথে মোড় ঘুরিয়ে দেয় আগে থেকে কেউ বুঝে উঠতে পারে না। ঊর্জাও বোঝেনি। কাজের সূত্রে ওদের এবার ঘন ঘন দেখা হওয়া শুরু হল। ব্যাপারটা প্রাথমিকভাবে ফর্মাল দেখা-সাক্ষাৎ হলেও, ধীরে ধীরে ফর্মালিটি কমে দু’জনে দু’জনের কাছে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতে শুরু করল। শিল্পের ছন্দ, তার অন্তরাত্মা, তার বলতে চাওয়া কথারা দু’জন শিল্পীকে পরস্পরের কাছে নিয়ে আসতে লাগল। ঊর্জা একটি করে ভাস্কর্য নির্মাণ করে, তমাল তার মেলবন্ধনে গদ্য রচনা করে; এভাবে তদ্বিপরীতে তাদের যুগ্ম প্রজেক্ট এগিয়ে যেতে থাকে।
এমনি এক বর্ষার বিকেলে ওরা এসে পৌঁছায় পুরুলিয়ার এক প্রত্যন্ত গ্রামে, ওখানকার মৃৎশিল্পীদের নিয়ে একটি গবেষণামূলক কাজে। বর্ষার পুরুলিয়া চিত্তাকর্ষক সুন্দর, সবুজের চাদর আর ঝর্ণার কলতানে মুখরিত গোটা পুরুলিয়া। প্রকৃতি যেন উজার করে দেয় নিজেকে, বলে কাছে এস, আলিঙ্গন কর। তমাল আর ঊর্জাও যেন সেদিন নিজেদের বেঁধে রাখতে পারেনি। রেসর্টের সন্ধ্যায় প্রণয়সেতু কাছে এনেছিল দুটি নারীপুরুষের দেহমনকে।
প্রতীকের পর এই প্রথম কোনও পুরুষ, যার ছোঁয়ায় এভাবে শিহরিত হয়ে উঠেছিল ঊর্জা। তারপর সময়ের সাথে সাথে সম্পর্কের পরিধি মজবুত হয়েছে, দু’জনের দু’জনের ওপর ডিপেন্ডেন্সি বেড়েছে, যৌথ কাজের পরিমাণ বেড়েছে।
বাইরে তখন মুষলধারে বৃষ্টি। কোনও এক দুর্বল মুহূর্তে ঘনিষ্ঠতা গাঢ় হয় পরস্পরের মধ্যে। তমাল ঊর্জার গলায় মুখ গুঁজে বলেছিল ‘এত সঙ্কোচ কোরো না, জাস্ট গো উইথ দ্য ফ্লো’। প্রতীকের পর এই প্রথম কোনও পুরুষ, যার ছোঁয়ায় এভাবে শিহরিত হয়ে উঠেছিল ঊর্জা। তারপর সময়ের সাথে সাথে সম্পর্কের পরিধি মজবুত হয়েছে, দু’জনের দু’জনের ওপর ডিপেন্ডেন্সি বেড়েছে, যৌথ কাজের পরিমাণ বেড়েছে।
দেখতে দেখতে সেই প্রতীক্ষিত সময় প্রায় চলে এল। ওদের কাজও শেষের পথে। পরের মাসে আজকের দিনে ওরা দু’জনে একসাথে পাড়ি দেবে মস্কোর প্রদর্শনীর উদ্দেশ্যে। সেই জন্যই আজ টুকটাক কিছু শপিংয়ে বেরিয়েছে দু’জনে। কিন্তু তমালকে আজ কেমন বিমর্ষ লাগছে ঊর্জার।

– কী হয়েছে গো? মুখটা এমন শুকনো কেন?
– তন্বীর হেলথ কন্ডিশন ভাল না। ডাক্তার বলছে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ভেলোরে নিয়ে যেতে।
– নিয়ে যাও তবে, কেন কী নিয়ে ভাবছ?
– হুম, সামনের মাসে ঘুরে আসি আগে মস্কোর কাজটা মিটিয়ে তারপর দেখছি।
– তন্বীর এত ক্রিটিক্যাল কন্ডিশন, অথচ তুমি কেমন ঠান্ডা গলায় উত্তর দিচ্ছ, আমি অবাক হয়ে যাচ্ছি…
– না গো আসলে একটা সময় এত দুর্ব্যবহার করেছে, ওর জন্য কিছু করতেও ইচ্ছে করে না।
– অসুস্থ মানুষকে নিয়ে এমন বলতে নেই তমাল। আফটার অল সী ইজ় ইওর ওয়াইফ। আমি যদি অসুস্থ হই, তুমি কি আমাকেও ফেলে দেবে?
আজকাল তমাল যেন কেমন তিরিক্ষি হয়ে থাকে। মানুষের মন এক জটিল তরঙ্গের মতো, কতরকম শেডস, কতরকম ওঠানামা, দুটো মানুষ পরস্পর পরস্পরকে বুঝতে চেয়েও হয়তো তাই বুঝে ওঠা হয় না।
– বোকা বোকা কথা বলো না, তুমি নিজেই কনফিউসড, একবার বলছ মুখ শুকনো লাগছে, একবার বলছ ঠান্ডা গলায় উত্তর দিচ্ছি, অ্যাকচুয়ালি তোমারই আমায় আর পোষাচ্ছে না এই জন্য নানা ধানাইপানাই, ঝামেলা ঝঞ্ঝাট করে কাটার ধান্দা করছ, বুঝে গেছি।
– এ আবার কী ধরনের মুখের ভাষা, তমাল?
– ছাড় ছাড় বাদ দাও, এই জন্যই তোমায় কিছু বলতে চাইনি, তুমি বুঝবে না।
আজকাল তমাল যেন কেমন তিরিক্ষি হয়ে থাকে। মানুষের মন এক জটিল তরঙ্গের মতো, কতরকম শেডস, কতরকম ওঠানামা, দুটো মানুষ পরস্পর পরস্পরকে বুঝতে চেয়েও হয়তো তাই বুঝে ওঠা হয় না। ঊর্জাও আর বিশেষ ঘাঁটায় না। বুঝতে পারে, স্ত্রীর অসুস্থতা নিয়ে তমাল হয়তো ঘেঁটে থাকে।
ইদানিং তমাল নিজে থেকে খুব একটা যোগাযোগ রাখে না। ফোন করলে ফোন ধরে, খানিক দায়সারা গোছের কথা বলে রেখে দেয়। ঊর্জা টের পায় বাঁধন আলগা হচ্ছে। বুকের মধ্যে যেন একটা দম বন্ধ করা চাপা যন্ত্রণা। অথচ অসম্মানিত হতে হতে মনে হয়, আর চোখ দিয়েও জল পড়ে না। কেমন একটা প্রতিশোধস্পৃহা কাজ করে, রাগ হয় অসম্ভব মানুষটার উপর, দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে যেমন হয়।
কোথা থেকে যেন ভেসে আসছে ‘দূরে কোথায়, দূরে দূরে’। ব্যালকনির অন্ধকারে চুপটি করে বসে আছে ঊর্জা, ভেতর ভেতর ফুঁসছে। চোখ স্থির, দূরের আকাশে। একা হতে হতে আর কত একা হওয়া যায়? অথচ এই একা হয়ে যাওয়াই বোধহয় ঊর্জার নিয়তি। মনে হয় সবকিছু ছেড়ে ছুঁড়ে দূরে কোথাও চলে যাই। নিজের জীবন নিয়ে এখন এমনটাই ভাবনা মাথায় ঘুরপাক করে তার। কিন্তু যাবে কোথায়? যে মানুষটাকে ছেড়ে ও এক মূহুর্তও থাকতে পারে না, তাকে সে পুরোপুরি মুছে দেবে জীবন থেকে? এটা অসম্ভব। অথচ ওর সঙ্গে এই সম্পর্কটা যত দিন যাচ্ছে, ক্রমশ টক্সিক হয়ে উঠছে। কতবার মনে হয়েছে, এই জীবনটাকে শেষ করে ফেলি। তবেই একমাত্র শান্তি। মৃত্যুর কাছে গিয়ে বসেছে রাতের পর রাত। তারপর ভেবেছে জীবন তো একটাই। এবার আমায় বাঁচতে হবে।
কী গো মা, কখন থেকে ডাকছি, সাড়া দিচ্ছ না, খেতে দাও না, কাল তো আবার ভোরে উঠতে হবে। তোমায় বললাম না ম্যাথস টেস্ট আছে, সকালের ব্যাচে যেতে বলেছেন স্যার।
মাইক্রোওয়েভটা সেই কখন থেকে ‘টু টু’ করে আওয়াজ করেই যাচ্ছে। সেই শব্দ কান অবধিও পৌঁছচ্ছে না ঊর্জার। হুঁশ এল, যখন জিশান এসে ডাকতে লাগল।
– কী গো মা, কখন থেকে ডাকছি, সাড়া দিচ্ছ না, খেতে দাও না, কাল তো আবার ভোরে উঠতে হবে। তোমায় বললাম না ম্যাথস টেস্ট আছে, সকালের ব্যাচে যেতে বলেছেন স্যার।
– এই নে, তোর বাবার আর তোর খাবারটা নিয়ে যা। বলিস একটু টিভির সাউন্ডটা কমাতে। সেই অফিস থেকে আসা থেকে রিমোট নিয়ে বসে থাকে, অসহ্য!
– তুমি খাবে না মা?
– তোরা খা, আমি একটু পর খাচ্ছি, খিদে নেই।

মাথা ধরে থাকে, গা বমি বমি লাগে। খিদে পায় না, ঘুম আসে না। শুধু রোবটের মতো সংসারের সব কাজ মুখ বুজে করে যায়। বাইরে থেকে দেখলে মানুষ ভাবে স্বামী-সন্তান নিয়ে এত ভাল সুখের সংসার ক’জন মেয়ের কপালে জোটে। কিন্তু সেই লোক দেখানো সুখের সংসারের ভিতরেই কখন যে দানবীয় হাঙর সবটুকু সুখ গ্রাস করতে শুরু করেছিল, টের পায়নি ঊর্জা।
আজ তেরোই আগস্ট। বিকেল চারটে কুড়ির ফ্লাইট। কলকাতা টু ডোমোডেডোভো এয়ারপোর্ট, সময় লাগবে প্রায় ঘণ্টা পনেরো। মাঝে আবু ধাবিতে একটা লে-ওভার। বাড়ি থেকে এই প্রথম ঊর্জা একা একা এতদূর যাচ্ছে। তাই প্রতীক, জিশান দু’জনেই এসেছে ওকে ছাড়তে। ঊর্জারও মনটা একটু আকুল। ছেলেটাকে ছেড়ে এতদিনের জন্য এর আগে কখনও থাকেনি। তবু এত বড় একটা কাজ, যা ওর একদম নিজের চেষ্টায় পাওয়া, এর আনন্দই আলাদা। তাছাড়া, তমাল আছে সঙ্গে, সেটাও একটা ভাললাগা কাজ করছে ওর। তবু মাঝেমধ্যেই বিষণ্ণতা গ্রাস করছে ঊর্জাকে। তমাল কি সত্যিই ওকে ভালবাসে? ভালবাসলে কি মানুষ এমন দুর্ব্যবহার করতে পারে? একটা মানুষের ভেতর এতটা ফ্লাকচুয়েশন কী করে সম্ভব?
নতুন শহর, নতুন মানুষ, ঝাঁ চকচকে সব বিল্ডিং। তবু মনটা যেন সেই জিশান আর প্রতীকের কাছেই পড়ে আছে। ওরা ঠিক মতো খাবার বেড়ে খাচ্ছে তো, অফিস থেকে ফিরে চা করে খাচ্ছে কি? কত সব চিন্তা।
একটু এদিক থেকে ওদিক হলেই মানুষটা কেমন অচেনা হয়ে যায়। সত্যিই কি তমালের সাথে ও ভাল থাকে? নাকি সাময়িক সুখ পেতে গিয়ে জীবনটাকে আরও জটিল করে ফেলল? নতুন শহর, নতুন মানুষ, ঝাঁ চকচকে সব বিল্ডিং। তবু মনটা যেন সেই জিশান আর প্রতীকের কাছেই পড়ে আছে। ওরা ঠিক মতো খাবার বেড়ে খাচ্ছে তো, অফিস থেকে ফিরে চা করে খাচ্ছে কি, ছেলেটা নিজের জামাকাপড় কাচতে পারছে তো? কত সব চিন্তা।
– কী হয়েছে, আজ এত ভাল কাজ হল, মুখটা এরম করে এখানে বসে আছ?
– কী বলব তমাল, ইদানিং ভাল করে কথা বল না, কাছে আস না…
– আবার সেই ঘ্যানঘ্যান শুরু করলে?
– এটা তোমার ঘ্যানঘ্যান মনে হচ্ছে?
– ইয়েস, আমার মনে হচ্ছে তুমি বড্ড বেশি সিরিয়াস আর পসেসিভ হয়ে যাচ্ছ এই সম্পর্কটা নিয়ে। দ্যাখো এত নিয়ম মেপে মেনটেন করা আমার পক্ষে পসিবল নয়। নিজের ওয়াইফকেই সেই জায়গাটা দিলাম না, আর তুমি তো… তাছাড়া আমার দৌলতে তো এখানে এসছ, নইলে কখনও ভাবতে পেরেছিলে এতদূর আসতে পারবে?
খিলখিল করে ব্যাঙ্গাত্মক হাসি হাসতে থাকে তমাল। যার হাসিতে একসময় মন মজেছিল, এখন তার হাসিটাই যেন অসহ্য লাগে ঊর্জার। তমাল যখন ওর জীবনে আসে, প্রথম প্রথম এত অ্যাটেনশন, এত কেয়ার পেত; ওর মনে হত, প্রতীক তো কখনও এমনভাবে আমার দিকে তাকায়নি, এমন যত্ন করে পিঠের ভাঁজে আঁচড় কাটেনি। সব কিছুই যেন রঙিন স্বপ্নের মতো মনে হত। আর প্রতীককে ততোধিক অসহ্য লাগতে শুরু করেছিল ঊর্জার।
এয়ারপোর্টে যথারীতি প্রতীক আর জিশান দাঁড়িয়ে। দূর থেকে ওদের দেখে চোখে জল চলে এল ঊর্জার। ছুটে গিয়ে জড়িয়ে ধরে আদর করল ছেলেকে। তারপর প্রতীকের হাত ধরে উঠে গেল গাড়িতে। আর ফিরেও তাকাল না।
তবে ঊর্জা বুঝতে পারছে, তমাল তার স্ত্রীর সম্পর্কে দুর্ব্যবহার করার অভিযোগ এনে যে সিমপ্যাথি কুড়োনোর চেষ্টা করেছিল, তা পুরোটাই মিথ্যা, পুরোটাই সাজানো। শেষ কবে প্রাণখোলা হাসি হেসেছিল, মনেও পড়ে না ঊর্জার। সর্বক্ষণ মনে হয়, বুকের ভিতর কে যেন হাতুড়ি পেটাচ্ছে, এত যন্ত্রণা এত অপমান জীবনে কখনও পায়নি সে। প্রতীক হয়তো নিজের কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকত, অ্যাটেনশন দিত না, কিন্তু এইরকম দুর্ব্যবহার কখনও করেনি। প্রতীকের জন্য কি তবে মন কেমন করছে ঊর্জার? স্বামী হয়তো স্বামীই হয়। তার জায়গা কেউ নিতে পারে না। জীবন ঊর্জাকে পদে পদে এমন শিক্ষাই শিখিয়ে দিচ্ছে।
আজকেই এখানকার প্রদর্শনীর শেষ দিন। ভীষণ ভাল রেসপন্স পেয়েছে। তারা জানিয়েছে, পরবর্তীতে আবার ওঁদের ইনভাইট করবেন। আগামীকাল ফেরার ফ্লাইট। সন্ধ্যেয় তাই শহরটা একাই ঘুরতে বেরিয়েছে ঊর্জা। সন্ধ্যের মস্কো যেন এক মায়াবী শহর। কত আনন্দ, কত গতি এখানে মানুষের। এই ট্রিপটায় না এলে জীবনের বিবিধ অভিজ্ঞতা, বিবিধ শেডস অদেখাই রয়ে যেত।
পয়লা সেপ্টেম্বর। দিন পনেরো-র সফর শেষে আজ ঘরে ফিরছে ঊর্জা। এয়ারপোর্টে যথারীতি প্রতীক আর জিশান দাঁড়িয়ে। দূর থেকে ওদের দেখে চোখে জল চলে এল ঊর্জার। ছুটে গিয়ে জড়িয়ে ধরে আদর করল ছেলেকে। তারপর প্রতীকের হাত ধরে উঠে গেল গাড়িতে। আর ফিরেও তাকাল না। জীবন এমনই, কিছু কিছু আগাছা জীবন থেকে এমন করেই বোধহয় ছেঁটে ফেলতে শেখায় জীবন, তবেই সহজ সরল গতিতে আবার হেঁটে এগিয়ে যাওয়া যায়। তমাল উঠে যায় অন্য গাড়িতে। দু’জনের গাড়ি এগিয়ে চলে দু’দিকে।
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত