(Amazon Travelogue 2)
প্রধানত ট্যুরিস্টদের আগমনেই ইয়াগুয়াদের জীবনের একঘেয়েমির রোজনামচার লেখচিত্রটা হঠাৎ করেই ঊর্ধ্বমুখী হয়। আমাজনের সেই প্রত্যন্ত আদিবাসীদের মুখে হাসি ফোটে। বলতে নেই, গ্রামের কচিকাঁচাদেরও স্বাস্থ্য বেশ ভাল। সৌজন্যে আমাজনের টাটকা মাছ। মা অন্নপূর্ণার আশীর্বাদে তারা মাছেভাতে আছে বলেই মনে হল। মুহূর্তের মধ্যেই আমাদের জনা কুড়ি ট্যুরিস্টের আগমনে সে বিকেলে সেই গ্রামের জিডিপি কিছুটা হলেও বেড়ে গেল হঠাৎ করেই। পড়ন্ত রোদের উজ্জ্বল সোনালি আলো ছড়িয়ে পড়ল তাদের চোখেমুখে।
আরও পড়ুন: আমাজনের জঙ্গলে – পর্ব ১
তাদের বিদায় জানিয়ে বাঁশের সাঁকো পেরিয়ে নৌকো করে আবারও ফিরে আসার পালা। আমাদের ইকো কটেজে। পড়ন্ত রোদের আলোয় মাঙ্কি আইল্যান্ডে হাঁটতে হাঁটতেই দেখা হল চকচকে বাদামি ভেলভেটের মতো চামড়ার একদল বিশেষ প্রজাতির বানরের সঙ্গে। এদের বলে কলম্বিয়ান ব্রাউন স্পাইডার মাঙ্কি। তারা অবলীলায় সেই আইল্যান্ডের মধ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে। কেউ গাছে দোল খাচ্ছে তো কেউ রাস্তার মধ্যিখানে বসে রোদ পোহাচ্ছে। কেউ আবার নিজের ছানাকে পিঠে চড়িয়ে নিজের জমিদারির দেখভাল করছে।

আমরা মনের আনন্দে তাদের ছবি তুলে চলেছি। তাতে কোনও হেলদোল নেই ওদের। এবার যার সঙ্গে ভেট হল, তিনি হলেন আমাজন অরণ্যের সেলিব্রিটি অ্যানাকন্ডা। ঘেরা এক চৌহদ্দির মধ্যে বেশ পালাপোষা। একজন ট্রেনার তার সামনে গিয়েই আমাদের উদ্বুদ্ধ করছেন, তাঁকে গলায় জড়িয়ে নেওয়ার জন্য। আমাদের বন্ধু ইন্দ্রনীল স্বেচ্ছায় এগিয়ে গিয়ে পেল্লায় অজগরের মালাটি সানন্দে পরে নিল। আমাদের তা দেখে ভয়ে ঢিবঢিব বুক। সেই অজগর কিছুদিন আগেই খোলস ছেড়েছে। পাশেই পড়ে রয়েছে তা।

মজার ব্যাপার হল, এখানে জঙ্গলের অধিবাসীদের ঘরে ঘরে একাধিক পোষ্য। উপজাতিরা অনেকে, স্লথকে পোষ্য হিসেবে রাখে। গাইড সেই স্লথকে গায়ের উপর ফেলে মনের আনন্দে ঘুরছে। ছোট বাচ্চারাও খেলা করছে গায়ে চড়িয়ে। স্লথ বড়ই নির্লিপ্ত আর অলস। অ্যানাকন্ডা, বিশেষ প্রজাতির বাঁদর, কচ্ছপরাও তেমনভাবেই প্রতিপালিত হচ্ছে সেই দ্বীপে। তবে বুনো ধেড়ে ইঁদুরের ছায়া পর্যন্ত মাড়াইনি সম্প্রতি হান্টা ভাইরাসের উপদ্রবের কথা শুনে। বিচিত্র এক বায়োডাইভারসিটি আমাজনের। অসংখ্য উপজাতি, পশুপাখি আর গাছপালার ফলমূল এর সম্পদ। আর আছে নদীতে অসংখ্য মাছ, জলজ প্রাণী।

ফিরে এসে ডাইনিং হলে গরম জল ও চা, কফির বন্দোবস্তটি বেশ ছিমছাম। এবার গরম কফিতে চুমুক দিয়ে রাতের অন্ধকারে আমাদের অভিযান আমাজনের গভীর জঙ্গলে। মানে নাইট ওয়াক। যে যার জুতোর সাইজের মাপে পায়ে গামবুট, আর হাতে লাঠি নিয়ে প্রস্তুত। মশার জন্য দরকারি সব সুরক্ষাকবচ, আর আপাদমস্তক মুড়ে আমাদের সেই জলজঙ্গলের মধ্যে দিয়ে পথ চলা। ভয়ঙ্কর সেই অভিজ্ঞতা। দু’পাশের কোনও গাছপালাকে ছোঁয়া যাবে না, কারণ বিষাক্ত কিছু লেগে যেতে পারে, কেটে যেতে পারে।
ঘুটঘুট্টে অন্ধকারে রক্ত হিম হয়ে এল আমার। আঙ্গীরা ও তার দুই সহকারী চলেছে সঙ্গে। পায়ের আশেপাশে ছোট ছোট গাছপালা কাটতে কাটতে। কোথাও হেলে পড়া গাছের গুঁড়ি তো কোথাও ঘন সবুজ শ্যাওলা। মাথার উপর থেকে জটবাঁধা লতা, ঝুরি নেমে ঝুলছে। রাক্ষুসে ফার্ন, দৈত্যাকার পাম চিনতে অসুবিধে হয় না। আমাদের কারওর পা গেঁথে যাচ্ছে কাদায় তো কেউ পা হড়কে পড়ছে পিচ্ছিল সেই রাস্তায়।

এভাবে চলতে চলতে হঠাৎ দেখি ম্যাজিক মাশরুমে টর্চের আলো। সে নাকি বিষাক্ত ছত্রাক। তাকে ছোঁয়া যাবে না। ধবধবে তার রঙ। ঠিক যেন ডিমের মতো। হঠাৎ সবার মুখে কুলুপ। পেঁচা উড়ে গেল বুঝি মাথার উপর দিয়ে কিন্তু চোখে দেখা গেল না সেই নিশ্ছিদ্র অন্ধকারে। আফ্রিকার জঙ্গল অপেক্ষা এখানে বন্যপ্রাণী কম। তা ভালই একদিকে। আমাদের অবস্থা ‘চাচা আপন প্রাণ বাঁচা’। বিচুটি পাতায় হাত চুলকে মরি। নিরূপায়। তবে মশা ধারেকাছে ঘেঁষছে না, কারণ প্রচুর ওডোমস ও সিট্রোনেলার প্যাচের কামান দেগেছি যে!
তারপরেই চমকে দিয়ে এক মস্ত ট্যারেন্টুলার ডেরায় হানা দিল আঙ্গীরা। একেবারে সোজা তাকে হাতে নিয়ে আমাদের চোখের সামনে ধরল। মোবাইলের আলো পড়েছে তার গায়ে। ভয়ে রক্ত হিম! তবে আঙ্গীরার সঙ্গে সেই বিষাক্ত মাকড়সার যে বেশ দোস্তি আছে, তা দিব্য বুঝলাম। জঙ্গলের মধ্যে কিছু বন্যপ্রাণী হয়তো ভাগ্যক্রমে দেখা যায়।

ইতি টানলাম সেই নৈশ বন অভিযানে। বাদুড়ের ডানা ঝাপটানোর শব্দ হয়তো ঢেকে গেছিল আমাদের সম্মিলিত কলতানে। সেই ঘুটঘুট্টে অন্ধকারে আরও সব প্রাণবন্ত ও রহস্যময় যা শব্দ শোনা গেছিল সেই রাতে, তা সারাজীবনের সঞ্চয় হয়ে রইল। ফিরে এসে রাতে স্বপ্ন দেখছি, সেই জঙ্গলে দেখা ট্যারেন্টুলা আমার ঘাড়ে নিঃশ্বাস ফেলছে। কেবল মাথায় আসছে ভেঙে পড়া গাছের গুঁড়ি বা উপরের ক্যানোপি থেকে বিষাক্ত ব্যাঙ বেরিয়ে লাফ মারত যদি! অথবা লাল পিঁপড়ের গর্তে যদি পা পড়ত! এলেও আসতে পারত নির্বিবাদী অ্যানাকন্ডা হিসহিস শব্দে এগিয়ে।

নাহ! এর কোনওটাই হয়নি তাই রক্ষে, কিন্তু সেই রাতের আমাজন জঙ্গল পরিক্রমায় সেসব জান্তব ডুমুর গাছের বিশালাকায় ঠেসমূল আমাকেও যেন ঠেসে ধরেছিল সেই মুহূর্তে, বা কোনও গাছের আপাদমস্তক কণ্টকিত কাণ্ড আমার গা ছুঁয়ে গেলে ভয়ে রক্ত হিম হয়েছিল তা আর ভুলি কেমন করে? মাথার উপর দৈত্যকার গাছের ক্যানোপি হয়তো বৃষ্টি থেকে বাঁচাত কিন্তু বাকিটা? চোখে ভাসছিল কেবলই গাছের ঝুরি ধরে অরণ্যবালক মোগলির এ গাছ থেকে ও গাছে ঝুলতে ঝুলতে যাওয়া। বিছুটি পাতা লেগে হাতটা বড়ই চুলকেছি দিনকয়েক ধরে। দুর্গা নাম জপতে জপতে সেই ভয়াল জঙ্গল থেকে ফিরে এসে বেঁচেছিলাম।
এরেই বুঝি কয় বিষাক্ত ট্রি ফ্রগ! কেবলি ভাবছিলাম জলে কেম্যান কুমির, মানুষখেকো পিরানহা আর অ্যানাকন্ডা, ডাঙায় আরও কত রকমের সাপখোপ, মাকড়শা আর বিষাক্ত পোকামাকড় নিয়ে যাদের অহোরাত্র ওঠাবসা, সেই আদিবাসীদের কথা।
সেই রাতে সুখনিদ্রায় স্বপ্ন দেখব না চিন্তা করব, ভাবছি বসে। কারণ গ্রুপের একজনের মুখে বাথরুমের বেসিনে বিশাল বুনো ব্যাঙের গল্প শুনেছি কিছু আগেই। এক লাফে সেখান থেকে ব্যাঙের দেওয়ালে আটকে যাওয়া রীতিমত ত্রাস তখন আমার কাছে। রাতে কেমন করে টয়লেট যাব, সেই চিন্তা কুরেকুরে খেতে লাগল। এরেই বুঝি কয় বিষাক্ত ট্রি ফ্রগ! কেবলি ভাবছিলাম জলে কেম্যান কুমির, মানুষখেকো পিরানহা আর অ্যানাকন্ডা, ডাঙায় আরও কত রকমের সাপখোপ, মাকড়শা আর বিষাক্ত পোকামাকড় নিয়ে যাদের অহোরাত্র ওঠাবসা, সেই আদিবাসীদের কথা। তাই জলে নেমে স্নানের আশা পরিত্যাগ করলাম।
আমাদের অলীক কল্পনা ছিল আমাজনের ধোবিঘাটে আছাড় মেরে ট্রিপের কাপড়চোপড় কেচে শুকোত দেব রোদে। তা নিছকই ঠাট্টা। এখানে জল বড় দূষিত। মধ্যবয়সে এসব রিস্ক নিয়ে খাল কেটে কুমির আনতে মন চায় না।

তবে পরদিন আবারও নৌকায় চড়ে আমাজন পরিক্রমা হবে, সেই আনন্দে উত্তেজনার পারদ হু হু করে বাড়তে লাগল। সেদিনের মুখ্য উদ্দেশ্য গোলাপি ডলফিন দেখা আর সেই সঙ্গে পাকা কাজ হল নিজের হাতে পিরানহা মাছ ধরে লজে নিয়ে এসে তা রান্না করিয়ে খাওয়া। সে এক অনবদ্য অভিজ্ঞতা। মিষ্টি জলের মাছ, তাও আবার মানুষখেকো!

তার দন্তরুচিকৌমুদী যে কী ভয়াবহ, তা ছবিতে দেখেই হার্টবিট বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়, সেই মাছকে যে নিজে হাতে ধরব, আর শুধু আমিই নয়, বাকিরাও। বিফের চার অথবা মুরগির মাংস খাইয়ে পটিয়ে পাটিয়ে আমাদের মতো মাছখেকোদের হাতে পিরানহার খাবি খেয়ে আত্মাহুতি… জাস্ট ভাবা যায় না। নদীতে পিরানহা আক্রমণের এমনিতে ভয় নেই, তবে কোনও কারণে রক্তক্ষরণ হলে রক্তের গন্ধ পেলেই ঝাঁকে ঝাঁকে মাছের দল এসে খুবলে খায় মাংস। যে কারণে ওখানে মেয়েরা ঋতুস্রাবের সময় নদীতে নামে না।

আরেক উপরি পাওনা হল সেদিন। নৌকো গিয়ে খানিক থামল এক প্রকান্ড জললিলির পাতার সামনে। পান্নাসবুজ আমাজনের জলে তার প্রকান্ড কানা উঁচু পাতা ভাসছে। এমন পদ্ম পাতা দেখেছিলাম আমাদের বটানিক্যাল গার্ডেনে। এই জায়েন্ট লিলির নাম Victoria Regia. বর্তমান বৈজ্ঞানিক নাম Victoria Amazonica।

গোলাপি ডলফিন এই অঞ্চলে প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যায়। দেখাও গেল বেশ কয়েকবার তাদের মনের আনন্দে ডাইভ মেরে জলের মধ্যে তার পালিয়ে যাওয়া। এতকিছুর মধ্যেও চোখ এড়ায় না ছোট ছোট ডিঙি নৌকো চড়ে প্রত্যন্ত আদিবাসীদের এ গ্রাম থেকে সে গ্রামে যাওয়া, হয়তো বা মাছ ধরা, ফলপাকড় নিয়ে ঘরে ফেরার রোজনামচা। তবে দুর্ভাগ্যবশত, এখানকার শিশুরা চিকিৎসা পরিষেবা থেকে বঞ্চিত এবং এক কঠিন জীবনযাপন করে। অবিশ্যি তাদের ভাবখানা, অরণ্যে পেতেছি শয্যা, জলেতে কী ভয়! নৌকোয় বসে ভাবছিলাম। এই প্রত্যন্ত জঙ্গলে ওদের রোগভোগ হলে ওরা কী করে, কোথায় যায় তখন।

আর ক’দিন থাকলে সুন্দরবনের মতো কুমিরদের দেখা মিললেও মিলত Caiman island-এ। পরমুহূর্তেই ভাবি ‘সব পেলে নষ্ট জীবন’। তবে আমাজনে না এলে দেখা হত না Ceiba pentandra বা শ্বেত শিমুলের প্রকাণ্ড ঠেসমূলের সঙ্গে। আমাদের রূপকথায় ব্যাঙ্গমা ব্যাঙ্গমী বা ইতুপুজোর ব্রতের গল্পে উমনো ঝুমনো বোধহয় এই গাছের কোটরেই রাত কাটাত…কোনও শিমুল গাছে আবার সারেসারে ঝুলছে তুলোর লাল টুকটুকে পাকা ফলও।

আমাজনের জলে যতই মাছ থাকুক না কেন, সেই ইকো কটেজে আমরা বিশেষত বাঙালি মহিলা যারা মাছ-মাংসে স্বচ্ছন্দ্য নই, তাদের জন্য গরম ভাতের সঙ্গে ডিমের অমলেট ছিল শেষ রাতের ডিনারে উপরি পাওনা, আর ছিল আমাদের কমফোর্ট ফুড মাখন, ম্যাশড পোট্যাটো আর বিটগাজর সেদ্ধ, পেঁয়াজ, টমেটো দিয়ে স্টারফ্রাই করা সেদ্ধ চিকেন। বুনো টমেটো সেখানেই ফলেছে। ফুটেছিল থোকা থোকা রেড জিঞ্জারের ফুল। তবে বনমোরগের মাংস বড়ই শক্ত সেখানে। তবুও অমন জায়গায় যা পাওয়া যায় তাতেই উদরপূর্তি করে, সেই বনবাংলোর একরত্তি মনোরম ঘরে শ্রান্তির ঘুম আর তাও আবার আমাজন নদীর থেকে সোজা বয়ে আসা ঠাণ্ডা হাওয়ার প্রলেপে। এতদিনের পড়া আমাজন রেইন ফরেস্টে যাওয়া ও থাকার স্বপ্ন বাস্তবায়িত হল।

ফেলে এলাম আমাজনের ম্যানাটি ইকো কটেজের অজস্র সবুজ গাছ-গাছালি, জাম্বো সাইজের টমেটো, গন্ধলেবু, লাল আদা, রসুনগন্ধী এক হার্ব, পেঁপে, আম, নারকেল গাছ আর সেই একমেবাদ্বিতীয় ম্যাকাও পাখিটিকে। আমাদের নিজেদের হাতে ধরা খান কুড়ি পিরানহা বাগানের টাটকা সিল্যান্ত্রো দিয়ে গার্নিশ করে যতই গরম ফিশ স্যুপ ওরা সযত্নে ধরে দিক না কেন মুখের সামনে, তা আমার মোটেও পছন্দ হয়নি। ওরা যে ভেজে দিল না কিছুতেই, তাতে সামান্য রাগ হল বটে, কিন্তু তাতে আমাজনের প্রতি অনুরাগ কমল তো নাই-ই, বরং বলে উঠলাম, তবুও তুমি সুন্দরী কত, কত, কত আমাজন! ইকো কটেজের আশেপাশে ইতিউতি ঘুরে বেড়ানো বনমোরগের তীব্র চিৎকারে ঘুম ভাঙা ভোর আর কোনওদিনও ভরতে পারব না দুচোখে— ভেবে বড় কষ্ট হল।
(চলবে)
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত