Generic selectors
Exact matches only
Search in title
Search in content
Post Type Selectors

আমাজনের জঙ্গলে – পর্ব ১

Amazon Travelogue
Bookmark (0)
Please login to bookmark Close
(Amazon Travelogue)

২০২৬-এর মে মাস। লাতিন আমেরিকা ট্রিপের সফরসূচি সাজিয়েছিলেন আমাদের এক ভ্রামণিক বন্ধু ইন্দ্রনীল। তাঁর সংস্থার সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধে একদল মধ্যবয়সী বাঙালি দম্পতির কলকাতা থেকে দিল্লি ও সেখান থেকে আমস্টারডাম যাত্রা। তারপর সূদুর মেক্সিকোয় সপ্তাহখানেক কাটিয়ে সেখান থেকে এবারের ট্রিপে অন্যতম মুখ্য উদ্দেশ্য হল আমাজন, যে জন্য এই দুর্ভেদ্য জলজঙ্গলের কাব্য লিখতে বসা।

Amazon Travelogue
আমাজনে ডিঙিনৌকাই ভরসা সাধারণের

বাংলাসাহিত্যে আমাজন নদী ও তার দুর্ভেদ্য অরণ্যের রোমাঞ্চকর পটভূমিতে কিশোর অ্যাডভেঞ্চার, তথ্যচিত্র প্রচুর পড়েছি ও দেখেছি। তাই কোথা দিয়ে সে ভ্রমণ বৃত্তান্তের শুরু আর শেষ হবে, তা ভেবে কুল পাচ্ছিলাম না।

Amazon Travelogue
মোটোরাইজড বোটে আমাদের চলা আমাজনের উদ্দেশ্যে

আন্দিজ পর্বতমালাই হল আমাজন নদীর উৎপত্তিস্থল। এর মূল স্রোতধারাটি পশ্চিম থেকে পূর্বে ৩,০০০ মাইলেরও বেশি পথ পাড়ি দিয়ে মূলত ছুঁয়েছে দক্ষিণ আমেরিকার পেরু, কলম্বিয়া আর তার সিংহভাগই ব্রাজিলের উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে অবশেষে আটলান্টিক মহাসাগরে গিয়ে তার সুখের আত্মসমর্পণ।

বিশাল নদী অববাহিকা দক্ষিণ আমেরিকার আরও কয়েকটি দেশ পর্যন্ত বিস্তৃত। এর উপনদীগুলো বলিভিয়া, ভেনেজুয়েলা এবং ইকুয়েডরের উপর দিয়েও প্রবাহিত হয়েছে। তবে আমাজন নদী মানেই তার বিশালতা, আমাজন মানেই তার কোল ঘেঁষে দুর্ভেদ্য, দুর্গম রেইন ফরেস্ট, আমাজন মানেই আন্দিজ থেকে আটলান্টিক জুড়ে তার কোল ঘেঁষে ছত্রে ছত্রে বায়োডাইভারসিটির ঝলক।

রহস্যময় আমাজন আর তার কোল ঘেঁষে বৃষ্টি অরণ্য। উত্তেজনার পারদ থইথই। দু’ঘণ্টার ফ্লাইট। এয়ারপোর্টে চেক-ইন করে ধীরেসুস্থে গরম ক্যাপুচিনোতে চুমুক দিয়ে হোটেলের প্যাকড ব্রেকফাস্টের সদ্গতি হল সবাই মিলে।

ক্যারিবিয়ান সমুদ্রের ধারে মেক্সিকোর কানকুন শহর ছেড়ে আমাদের গন্তব্য ছিল পেরুর রাজধানী লিমায়। প্লেনে করে পৌঁছলাম বেশ রাতে। প্রশান্ত মহাসাগরের খুব কাছেই সাদামাটা হোটেল। হোটেল থেকে মিনিট পাঁচেক পায়ে হেঁটে গেলে সমুদ্র দর্শন হয়, তবে জল ছুঁতে গেলে অনেকটাই নিচে নামতে হয়। হাওয়ায় বেশ শীতের নাচন। শীতপোশাক জড়িয়ে নিয়েই ছুটে একঝলক দেখে আসি রাতের উত্তাল প্রশান্ত মহাসাগরকে। রাতের আলোয় ঝলমলে লিমা নগরীর প্লাজা সান মার্টিন টাউন স্কোয়ারের জনকোলাহলের উত্তাপের আঁচও পাওয়া গেল।

কেএফসি থেকে ক্যাসিনো, পিৎজেরিয়া থেকে স্যান্ডুইচ জয়েন্ট, সবেতেই শীতের রাতে ভিড়। পথে নামীদামী গাড়ি। কিন্তু পথঘাট বড়ই পরিচ্ছন্ন। কোথাও এক ফোঁটা আবর্জনা নেই। এসব জায়গায় হোটেলে জল দেওয়া হয় না। পথের ধারে ডিপার্টমেন্টাল স্টোর থেকে জল কিনে নেওয়া হল। এক হোটেলের ক্যাসিনো পার্লারে ঢুকে এটিএম থেকে পেরুর কারেন্সি সল মিলল।

Amazon Travelogue
প্রশান্ত মহাসাগরের ঝলক লিমা থেকে

একরাত লিমায় থেকে মাত্র কয়েক ঘণ্টা ঘুমিয়েই উঠে পড়া মাঝরাতে, কারণ ভোরের ফ্লাইটে বহুপ্রতীক্ষিত আমাজন রেইন ফরেস্ট অভিযান। লিমার হোটেলে অবাঞ্ছিত জামাকাপড়ের স্যুটকেস গচ্ছিত রেখে শুধুই দু’রাতের জিনিসপত্র, ওষুধ সঙ্গে নিয়ে আমাজনের উদ্দেশ্যে রওনা দেওয়া, কারণ জনা প্রতি মাত্র ৮ কেজি ও হাতের একটি ব্যাগ নেওয়া যেতে পারে। পেরুর ছোট্ট শহর ইকিটোসের বিমানবন্দরে অবতরণ হল।

সেখান থেকে বাসে চড়ে ও তারপর নেমে বন্দরে গিয়ে আমাজন নদীর উপরেই মোটরচালিত নৌকোবিহারে রোমাঞ্চকর অভিযান। জলপথই সেখানে হাইওয়ে। রহস্যময় আমাজন আর তার কোল ঘেঁষে বৃষ্টি অরণ্য। উত্তেজনার পারদ থইথই। দু’ঘণ্টার ফ্লাইট। এয়ারপোর্টে চেক-ইন করে ধীরেসুস্থে গরম ক্যাপুচিনোতে চুমুক দিয়ে হোটেলের প্যাকড ব্রেকফাস্টের সদ্গতি হল সবাই মিলে। রাতের ঘুমের ক্লান্তি কিছুটা কমল যেন।

Amazon Travelogue
আমাজন অভিযান শুরু

ইকিটোস (Iquitos) বিমানবন্দরে অবতরণ থেকে প্রতি মুহূর্তই যেন রহস্যময়তায় আচ্ছন্ন করে রেখেছিল। না জানি কী অপেক্ষা করে আছে আমাদের জন্য। বাস ছুটে নিয়ে চলল পোর্টের দিকে। সেখানেই প্রথম দেখা আমাজনের সঙ্গে। আমাজন নদী দুই থেকে আড়াই কিমি প্রশস্ত ও তার গভীরতা এক এক স্থানে এক এক রকম শুনেছি। না জানি সে কী ভীষণা, কী সুন্দরী… এসব ভাবতে ভাবতেই দেখি রাজকীয় সে আমাজন নদী আমার চোখের সামনে। ফলপাকুড় বিক্রি হচ্ছে চারিদিকে।

সে এক অসামান্য অভিজ্ঞতা! জেটির উপর দিয়ে যেতে যেতেই আমাজন দর্শন। গায়ের লোম পর্যন্ত শিহরিত সেই মুহূর্তে। আমার ভূগোল, ইতিহাস সব চোখের সামনে জ্বলজ্যান্ত হয়ে উঠেছে ততক্ষণে। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ নদী কথা বলে উঠল যেন। মনে মনে বলে উঠি আমার জীবনের এই দুটোদিন তোমাকেই দিলাম আমাজন। আশেপাশে তাকাতেই নদীর পাড়ের অরণ্যময়তা চোখ এড়াল না। জল দেখি না জঙ্গল? কে কার অলংকার? সুন্দরবন প্রথম দর্শনেও ঠিক এমন হয়েছিল।

আমাজন যাত্রায় নৌকাবিহারে আমাদের বয়স্ক গাইডবন্ধু আঙ্গীরা। লাইফ জ্যাকেট গায়ে চড়িয়ে তখন ছবি তুলব না জঙ্গল দেখব না নদীর বিশালতায় চোখ রাখব, ভেবে কুল পেলাম না।

জঙ্গলের কারণেই কলকাতায় আমাদের ইয়েলো ফিভার ভ্যাক্সিন নেওয়া হয়েছিল আসার আগে। প্রচুর মশা সে দেশে। আর রেইন ফরেস্টের জলজঙ্গলে মশককুল আরও শক্তিশালী। যদিও ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গির দেশের জনগণ আমরা। তবুও এ দেশ ঘুরে আমাদের দেশে গেলে প্রথমেই দেখা হবে, আমরা ভ্যাক্সিন নিয়ে গেছিলাম কী না। সেখানে কাঁচা স্যালাড এমনকি বাথরুমের জলও মুখে দেওয়া বারণ।

অবশ্যই আমাদের সঙ্গী ওডোমস, মশক নিবারক সিট্রোনেলা প্যাচ আর ফুল হাতা জামাপ্যান্ট। মনে পড়ল টিনটিনের ‘প্রিজনার অফ দ্যা সান’-এর সেই ইয়েলো ফিভার কবলিত জাহাজের কথা। আটকে পড়েছিল যাত্রীবাহী সেই জাহাজ। অতএব শয়নে, স্বপনে, জাগরণে মশার গুনগুন তথা গুণগান কানে আসতেই থাকল সবের অলক্ষ্যে। আমাজন যাত্রায় নৌকাবিহারে আমাদের বয়স্ক গাইডবন্ধু আঙ্গীরা। লাইফ জ্যাকেট গায়ে চড়িয়ে তখন ছবি তুলব না জঙ্গল দেখব না নদীর বিশালতায় চোখ রাখব, ভেবে কুল পেলাম না।

গভীর জঙ্গলের ভিতরে ম্যানিটি ইকোট্যুরিজম লজে ২ রাত ৩ দিন থাকার বন্দোবস্ত। নৌকোবিহারে সেখানে পৌঁছতে পৌঁছতে বেলা গড়িয়ে দুপুর। সেখানে ওয়াইফাই আছে। সুইমিং পুলও আছে। উঁচু খুঁটির উপর কাঠের পাটাতন ও মাথায় খড়ের ছাউনি দেওয়া হ্যামক দড়ির দোলনায় বসে বিচিত্র সব পাখির ডাক শুনতে শুনতে বই পড়া বা আড্ডা দেওয়ার জায়গাও আছে। নৌকো থেকে নামতে নামতে আবারও মনে পড়ছিল সুন্দরবনের কথা। কাঠের পাটাতন পাতা জলকাদাময় বৃষ্টিস্নাত জঙ্গুলে রাস্তা। তবে চারিদিক শুধু সবুজ আর সবুজ। দূরে ঘন সবুজ আর সামনে হালকা সবুজের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান। এহেন বাস্তুতন্ত্রের সাক্ষী জলের মাছ, ডাঙার সাপখোপ আর হাজারও রকমের পশুপাখি। 

Amazon Travelogue
বিশেষ প্রজাতির বাঁদর

আঙ্গীরা তখন ব্যস্ত সেই ইকোরিসর্ট এর চৌহদ্দি দেখাতে। সবকিছুই বেশ উঁচুতে সেখানে। কাঠের সিড়ি ভেঙে উঠি গিয়ে বিশাল ডাইনিং হলে। আমাদের হেসে কলকল, গেয়ে খলখল কোলাহল মুখরতার মধ্যে আচমকা স্বাগতম জানাল এক রাজকীয় ম্যাকাও। ‘হোলা, হোলা’ বলে চেঁচাতে ব্যস্ত সে। বিধ্বস্ত সেই জলজঙ্গলের কাব্যে সংযোজিত মানুষ ছাড়া সেখানে আমাদের দেখা প্রথম জীব। সে যত বকবক করে, আমরাও তত বকবক করি তার সঙ্গে। সে মোটেও বিব্রত নয়, বরং খুশিতেই ডানা ঝাপটায়। বুঝলাম অতিথিসমাগমে সেই লোকময়ী পক্ষী বিগলিত।

Amazon Travelogue
ম্যাকাও এর সাথে ওয়েলকাম পর্ব

ইকোকটেজগুলিতে আমাদের থাকবার আয়োজন। উঁচু সিঁড়ি দিয়ে উঠে সারেসারে ঘর। সঙ্গে একফালি বাথরুম। সেখানে বেসিন, কমোড সব আছে, কিন্তু জল মুখে দেওয়া যাবে না। স্নানের সিদ্ধান্ত দূরে সরিয়ে রেখে আপাতত সেই ঘরের দিকে তাকিয়ে দেখি আধখানা পাঁচিলের উপর সূক্ষ্ম জাল ও তার উপর দিয়ে ফিনফিনে পর্দা টাঙানো।

Amazon Travelogue
আমাজনের ইকোহাট, যেখানে ছিলাম

মশককুলের হানা থেকে রক্ষা করার জন্য এমন ব্যবস্থা। ইলেক্ট্রিসিটি অতি ক্ষীণ। বিচিত্র সব পাখির ডাক, রাতে বুনো পোকামাকড়ের দাপুটে কনসার্ট আর রাত ৯টার পর বিদ্যুৎহীনতা থাকলেও ঘরটির মধ্যে আমাজন নদীর ঠাণ্ডা হাওয়া খেলে বেড়ায়, তাই রাতটা বড়ই মনোরম।

ঘরের মধ্যে জিনিসপত্র রেখে লাঞ্চ সেরেই আঙ্গীরা আমাদের নিয়ে চলল পাশের এক আদিবাসী গ্রামে। মধ্যাহ্নভোজে আমাজনের টাটকা ফলপাকুড় ছিল অতি সুস্বাদু। গাছপাকা পেঁপের অমন স্বাদ শহরে পাই না। তেমনি মিষ্টি পেল্লায় আমের চিরে মুখ ভরে রস নিতে নিতে মনে হল এ যেন আমাদেরই দেশ। গরম আছে, আমও আছে। আছে আনারস ও কাঁচকলার বড়া। তার মাথায় একটা খেজুরের টুকরো। সেই ট্রপিকাল খেজুরের নাম Ita Palm (Moriche)। স্তূপাকারে ঝুড়ির মধ্যে বিক্রি হতে দেখেছিলাম বন্দরে।

Amazon Travelogue
বিশেষ প্রজাতির খেজুর

চোখের সামনে আদিগন্ত পেরুর আমাজন রেইন ফরেস্ট। আর আমরা জলের উপর দিয়েই বাঁশের সাঁকো পেরিয়ে প্রবেশ করছি সেই অরণ্যের এক জনজাতির আবাসস্থলে। একেবারে সোজা গিয়ে ঢুকে পড়ি আদিম ইয়াগুয়া উপজাতির গ্রামে। তারা যে অত্যন্ত প্রান্তিক আদিবাসী জনগোষ্ঠী তা বোঝাই গেল তাদের পোশাক দেখে। খড়ের আচ্ছাদন নিম্নাঙ্গে। মেয়েদের গায়ে সব বীজের গয়নাগাটি। ঊর্ধ্বাঙ্গে লাল কাঁচুলি। মাথায় পালক। আমাদের স্বাগতম জানাতে তারা প্রস্তুত বাদ্যযন্ত্র হাতে নিয়ে। গানবাজনা ও নাচের জন্য। মূলত ধাতব বর্শা আর ঐতিহ্যবাহী ফুঁক-বন্দুক ব্যবহার করে পশু শিকার এবং কাঠ, বাঁশ, পালক, সাপের চামড়া, পাথর ও বীজের মতো স্থানীয় প্রাকৃতিক উপকরণ দিয়ে হস্তশিল্পই তাদের রুটিরুজি।

Amazon Travelogue
ইয়াগুয়াদের গ্রামে চলেছি জলকাদার ওপর বাঁশের সাঁকো পেরিয়ে

‘যেথাই দেখিবে ছাই, উড়াইয়া দেখ তাই’। আমাজনের সেই জনজাতিদের ডেরায় ঢুকতে ঢুকতেই পুরুলিয়ায় প্রথম দেখা ফলন্ত লিপস্টিক বা সিঁদুর গাছের সঙ্গে দেখা। কেউ বলে সিঁদুর গাছ, ইংরেজিতে Annatto বা লিপস্টিক ট্রি। বৈজ্ঞানিক নাম Bixa orellana, মূলতঃ ট্রপিকাল অঞ্চলের গুল্মজাতীয় গাছ। এর ফলগুলো কাঁটাযুক্ত এবং লালরঙের হয়, যার ভিতরের বীজগুলো গুঁড়ো করে প্রাকৃতিক লাল রঙ বা ডাই তৈরি হয়। আমাজনের প্রত্যন্ত অরণ্যের অধিবাসীদের প্রসাধন বা কাপড় ছোপানোর একমাত্র হাতিয়ার এই সিঁদুর ফল, যার টুকটুকে লাল পেস্টকে ওরা বলে urucum।

আমরা অনেকেই ডিসকাভারি বা ন্যাশানাল জিওগ্রাফিক চ্যানেলে এ অঞ্চলের আরেক প্রান্তিক উপজাতি Yanomami-দের জীবনযাত্রার গল্প শুনেছি। ইয়াগুয়া তেমনিই আরেক দল।

তাদের সেখানে ওষুধপত্র নেই। গায়ে মেখে রাখলে মশা বা পোকামাকড়ের কামড় খেতে হয় না এবং একই সঙ্গে তা সানস্ক্রিনেরও কাজ করে। টিপ/তিলক/ওষ্ঠরঞ্জনীর কাজই শুধু করে না এই সিঁদুর ফল।

Amazon Travelogue
লিপ্সটিক গাছের সাথে

খাদ্যদ্রব্যে রঙ আনতেও এটি সিদ্ধহস্ত। মানে এডিবল ফুড কালার। তাও আবার আমাজনের প্রকৃতিতে। গাছ থেকে পেড়ে টুক করে ফলের খোসা ছাড়িয়ে হাতে ঘষতেই কেল্লাফতে। দেখি তারা নারীপুরুষ নির্বিশেষে সেই লাল রঙ মেখেছে মুখে। এই রঙ দিয়েই ছোপানো তাদের পরনের লাল পোশাক। সেই জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সম্মিলিত নৃত্যে অংশ নিলাম আমরা।

আমরা অনেকেই ডিসকাভারি বা ন্যাশানাল জিওগ্রাফিক চ্যানেলে এ অঞ্চলের আরেক প্রান্তিক উপজাতি Yanomami-দের জীবনযাত্রার গল্প শুনেছি। ইয়াগুয়া তেমনিই আরেক দল। এরা ছাড়াও Kayapó অথবা Ticuna-রাও আছে এখানে, যারা বিশেষত আমাজন নদী এবং তার উপনদীগুলোর অববাহিকায় বসবাস করে। 

তারা এক ধরনের বিশেষ তালগাছের শুকনো পাতা ও তন্তু দিয়ে স্কার্ট, বুকের চাদর এবং গলার মালা তৈরি করে। পুরুষরা এই তন্তুর তৈরি স্কার্ট ও মাথায় বিশেষ মুকুট পরে। তবে আধুনিক সভ্যতার বিস্তার, বন উজাড় এবং পর্যটনের কারণে ইয়াগুয়া উপজাতির ঐতিহ্যবাহী জীবনযাত্রা অনেকটাই হুমকির মুখে। বর্তমানে পেরুর ইকিটোস (Iquitos) শহরের আশেপাশে থাকা কিছু ইয়াগুয়া গ্রাম পর্যটকদের জন্য উন্মুক্ত, ঠিক আমাদের দেখা এই বাদাবনের গ্রামটির মতো, যেখানে তারা তাদের নাচ, ব্লো-গান চালানো এবং হস্তশিল্প প্রদর্শন করে নিজেদের সংস্কৃতিকে টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করতে মরিয়া।

এই মুখোশগুলি মূলত তাদের আমাজনী পুরাণের জঙ্গলদেবতা। বিপদসঙ্কুল তিনিই খাইয়েপরিয়ে, সুরক্ষা দিয়ে, অরণ্যের অধিকারের লড়াই নিয়ে বাঁচিয়ে রাখেন প্রতিনিয়ত।

সেখানে সুন্দর স্বাস্থ্য সবার। ঈশ্বরের কৃপায় আমাজনের মিষ্টিজলের মাছেভাতে আছে সব পরিবার। কচিকাঁচাদের দেখে মনে পড়ে গেল সেই ছড়া? ‘ধন ধন ধন নধর গঠন, এ ধন ঘরে নেই যার কীসের জীবন?’ আমাদের ঘরে এমন স্বাস্থ্যবান ছোটদের খালি গায়ে রাখলে বলবে নজর লাগবে, জামা পরা একটা। কিন্তু হায় রে ঈশ্বর! তারা হতদরিদ্র। সেই জঙ্গলের জমিতে চাষাবাদ আর নদীর মাছ, বনের ফলপাকুড় ছাড়া আর কিছুই নেই ওদের। পরনের কাপড় যৎসামান্য। অভ্যেস নেই তেমন জামাকাপড় পরার।

Amazon Travelogue
প্রত্যন্ত গ্রামের শিশুরা

ইয়াগুয়ারা হাতে কুঁদে যে বালসা কাঠের (Balsa wood) হালকা মুখোশ তৈরি করে, সেগুলো মূলত তাদের বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী আচার-অনুষ্ঠান, আধ্যাত্মিক উৎসব এবং নৃত্যকলার জন্য তৈরি করা হয়। এই মুখোশগুলি মূলত তাদের আমাজনী পুরাণের জঙ্গলদেবতা। বিপদসঙ্কুল তিনিই খাইয়েপরিয়ে, সুরক্ষা দিয়ে, অরণ্যের অধিকারের লড়াই নিয়ে বাঁচিয়ে রাখেন প্রতিনিয়ত।

গাছের বীজের গয়নাগাটি হাতে বানিয়ে পরতে ও বিক্রি করতে অভ্যস্ত তারা। ঘরের সামনে এক টুকরো দোকানে সেসব বানিয়ে ঝুলিয়ে রেখেছে। বালসা কাঠের অপূর্ব হালকা মুখোশ দেখেই কিনে ফেলি দুটো। দরদাম করতেও মন চায় না তাদের সঙ্গে।

Amazon Travelogue
ইয়াগুয়া জনজাতির সঙ্গে

(চলবে)

মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

Picture of ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়

ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়

বিগত ২০ বছর ধরে পূর্ণ সময়ের লেখক। প্রথমে বেথুন কলেজ ও পরে রাজাবাজার সায়েন্স কলেজের অরগ্যানিক কেমিস্ট্রিতে ফার্স্ট ক্লাস সেকেন্ড। সাহিত্যের সব শাখায় সমান বিচরণ তাঁর। উপন্যাস, ছোটগল্প, ভ্রমণ কাহিনি, রম্যরচনা, প্রবন্ধ, ফিচারের পাশাপাশি বায়োনভেলা, খাদ্য সংস্কৃতি, লোকসংস্কৃতি নিয়ে নিয়মিত লেখেন। প্রথম ছোট গল্প দেশ পত্রিকায় ও প্রথম উপন্যাস সানন্দা শারদীয়ায় প্রকাশিত। প্রথম শ্রেণির পত্রিকার পাশাপাশি বিভিন্ন লিটল ম্যাগাজিন এবং ওয়েব পত্রিকায় নিয়মিত লেখেন। এ যাবৎ বিভিন্ন প্রকাশনা থেকে প্রকাশিত নানা স্বাদের বইয়ের সংখ্যা তিরিশ ছাড়িয়েছে। টুকটাক পুরস্কারও পেয়েছেন সেই সূত্রে। শখ বলতে ঘুরে বেড়ানো, রান্নাবান্না, পুরাণ-লোকসংস্কৃতি চর্চা এবং অবশ্যই গান। কলকাতা দূরদর্শনসহ বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলে এবং আকাশবাণীর মহিলামহলে একাধিকবার আমন্ত্রিত হয়েছেন বক্তা হিসেবে।
Picture of ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়

ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়

বিগত ২০ বছর ধরে পূর্ণ সময়ের লেখক। প্রথমে বেথুন কলেজ ও পরে রাজাবাজার সায়েন্স কলেজের অরগ্যানিক কেমিস্ট্রিতে ফার্স্ট ক্লাস সেকেন্ড। সাহিত্যের সব শাখায় সমান বিচরণ তাঁর। উপন্যাস, ছোটগল্প, ভ্রমণ কাহিনি, রম্যরচনা, প্রবন্ধ, ফিচারের পাশাপাশি বায়োনভেলা, খাদ্য সংস্কৃতি, লোকসংস্কৃতি নিয়ে নিয়মিত লেখেন। প্রথম ছোট গল্প দেশ পত্রিকায় ও প্রথম উপন্যাস সানন্দা শারদীয়ায় প্রকাশিত। প্রথম শ্রেণির পত্রিকার পাশাপাশি বিভিন্ন লিটল ম্যাগাজিন এবং ওয়েব পত্রিকায় নিয়মিত লেখেন। এ যাবৎ বিভিন্ন প্রকাশনা থেকে প্রকাশিত নানা স্বাদের বইয়ের সংখ্যা তিরিশ ছাড়িয়েছে। টুকটাক পুরস্কারও পেয়েছেন সেই সূত্রে। শখ বলতে ঘুরে বেড়ানো, রান্নাবান্না, পুরাণ-লোকসংস্কৃতি চর্চা এবং অবশ্যই গান। কলকাতা দূরদর্শনসহ বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলে এবং আকাশবাণীর মহিলামহলে একাধিকবার আমন্ত্রিত হয়েছেন বক্তা হিসেবে।

One Response

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Subscribe To Newsletter

কথাসাহিত্য

দীপান্বিতা রায়
বিতস্তা ঘোষাল
অর্ঘ্য কমল পাত্র

সংস্কৃতি

আহার

অমৃতা ভট্টাচার্য
শমিতা হালদার

বিহার

ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়
ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়

কলমকারী

ফোটো স্টোরি

নির্মাল্য চ্যাটার্জি
দেবার্চন চ্যাটার্জি

উপন্যাস

[adning id="384325"]
[adning id="384325"]

Banglalive.com/TheSpace.ink Guidelines

Established: 1999

Website URL: https://banglalive.com and https://thespace.ink

Social media handles

Facebook: https://www.facebook.com/banglaliveofficial

Instagram: https://www.instagram.com/banglalivedotcom

Twitter: @banglalive

Needs: Banglalive.com/thespace.ink are looking for fiction and poetry. They are also seeking travelogues, videos, and audios for their various sections. The magazine also publishes and encourages artworks, photography. We however do not accept unsolicited nonfiction. For Non-fictions contact directly at editor@banglalive.com / editor@thespace.ink

Time: It may take 2-3 months for the decision and subsequent publication. You will be notified. so please do not forget to add your email address/WhatsApp number.

Tips: Banglalive editor/s and everyone in the fiction department writes an opinion and rates the fiction or poetry about a story being considered for publication. We may even send it out to external editors/readers for a blind read from time to time to seek opinion. A published story may not be liked by everyone. There is no one thing or any particular feature or trademark to get published in the magazine. A story must grow on its own terms.

How to Submit: Upload your fiction and poetry submissions directly on this portal or submit via email (see the guidelines below).

Guidelines:

  1. Please submit original, well-written articles on appropriate topics/interviews only. Properly typed and formatted word document (NO PDFs please) using Unicode fonts. For videos and photos, there is a limitation on size, so email directly for bigger files. Along with the article, please send author profile information (in 100-150 words maximum) and a photograph of the author. You can check in the portal for author profile references.
  2. No nudity/obscenity/profanity/personal attacks based on caste, creed or region will be accepted. Politically biased/charged articles, that can incite social unrest will NOT be accepted. Avoid biased or derogatory language. Avoid slang. All content must be created from a neutral point of view.
  3. Limit articles to about 1000-1200 words. Use single spacing after punctuation.
  4. Article title and author information: Include an appropriate and informative title for the article. Specify any particular spelling you use for your name (if any).
  5. Submitting an article gives Banglalive.com/TheSpace.ink the rights to publish and edit, if needed. The editor will review all articles and make required changes for readability and organization style, prior to publication. If significant edits are needed, the editor will send the revised article back to the author for approval. The editorial board will then review and must approve the article before publication. The date an article is published will be determined by the editor.

 

Submit Content

For art, pics, video, audio etc. Contact editor@banglalive.com