(Sachindranath Bandyopadhyay)
সমুদ্রের জলরাশি, নাবিকজীবন, বন্দরের কোলাহল, এইসব নিয়ে অনেক অনেক আগে যিনি বাংলা সাহিত্যকে এক নতুন পথ দেখিয়েছিলেন তিনি কথাসাহিত্যিক শচীন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়। সংবাদপত্রের সুসজ্জিত ঠাণ্ডা ঘরে বসে কাল্পনিক গল্প লিখে সাদা পাতা ভরাট করেননি।
আরও পড়ুন: স্মৃতির আকাশ থেকে (১), (২), (৩), (৪), (৫), (৬), (৭), (৮), (৯), (১০), (১১), (১২), (১৩), (১৪), (১৫), (১৬), (১৭), (১৮), (১৯), (২০), (২১), (২২), (২৩), (২৪), (২৫), (২৬), (২৭), (২৮), (২৯), (৩০), (৩১), (৩২), (৩৩), (৩৪), (৩৫), (৩৬), (৩৭), (৩৮), (৩৯), (৪০), (৪১), (৪২), (৪৩)
জীবনের অনেকটা সময় অন্ধ্রের বিশাখাপত্তনমের বন্দরে কর্মরত থেকে প্রত্যক্ষ করেছিলেন সাগরপারের কর্মব্যস্ততা আর জলের মানুষদের সুখদুঃখ। চব্বিশ ঘণ্টার কর্মব্যস্ত জীবনের মধ্যেও সময় খুঁজে নিয়ে কলম চালিয়ে লিখে গেছেন, ‘বন্দরে বন্দরে’, ‘ভাসানযাত্রা’, ‘তীরভূমি’, ‘মাসতু’, ‘জনপদ বধূ’ ইত্যাদি।

সাহিত্যের অন্যান্য শাখাতেও ছিল অবাধ বিচরণ! মন্মথ রায়ের একটি পোস্টকার্ড বদলে দিল তাঁর পথ চলা। দক্ষিণ ভারতের নাবিক জীবন থেকে কলকাতায় বিধান রায়ের প্রতিষ্ঠা করা লোকরঞ্জন শাখার সংস্কৃতি অঙ্গন! কবে, কখন, কোন শুভক্ষণে তিনি হলেন আমাদের প্রিয় মেসোমশাই! তাঁকে আবিষ্কার করলাম আরেক তীরভূমিতে। সেই তীরভূমি কোনও সাগরপারে নয়, আদিগঙ্গার ধারে চেতলার এক কানাগলির শেষ প্রান্তে। জামগাছের ছায়ায় ঢাকা একটা ছোট্ট একতলা বাড়ি। চারিদিকে শান্ত পরিবেশ।

মেসোমশাই মানে শচীন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে পরিচয় আমার মা সদ্য প্রয়াত মধুশ্রী মৈত্রর সূত্রে। ১৯৭৫ থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত কলকাতা দূরদর্শনে কর্মরত ছিলেন মা। সেই সূত্রে শচীন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কনিষ্ঠ পুত্র শুভেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় নানা অনুষ্ঠানের সংকলন ও বিন্যাসের কাজ করতে নিয়মিত দূরদর্শনে যাতায়াত করতেন। সেই সূত্রেই পঙ্কজকাকু মানে পঙ্কজ সাহা আর মায়ের সঙ্গে ওঁর গভীর পারিবারিক যোগাযোগ গড়ে ওঠে।

কাজের পরিধি ছাড়িয়ে পারিবারিক সম্পর্ক এমন পর্যায়ে পৌঁছয় যে খুব ঘন ঘন ওঁদের চেতলার বাড়ি ‘তীরভূমি’তে যেতাম, আর মেসোমশাই-মাসিমার স্নেহ-সান্নিধ্য পেয়ে আপ্লুত হতাম। এই প্রসঙ্গে পাঠকদের জানিয়ে রাখি, মাসিমা মানে শচীন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সহধর্মিণী উমা দেবী বাংলা সাহিত্যের অন্যতম মহীরুহ বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাগ্নি ছিলেন। সেই সম্পর্কের সূত্রে ঘাটশিলায় বিভূতিভূষণ আর শচীন্দ্রনাথের মিলন বাংলা সাহিত্যকে আরও সমৃদ্ধ করেছে। এ যেন রাজযোটক!

কোনও কাজে হয়তো শুভেন্দ্রদার বাড়িতে গিয়েছি, তখন হয়তো উনি বাড়িতে ছিলেন না বা কিছুক্ষণের মধ্যেই ফিরবেন, এমন কথা শোনার পরে ফিরে আসার কথা বললেই মেসোমশাই আটকে দিতেন। নিজের লেখার কাজ থামিয়ে রেখে গল্প করতে বসতেন। সেইসব গল্পে জাহাজ আর জলকে কেন্দ্র করে কতরকম অভিজ্ঞতার কথা শোনাতেন। সেরকমই এক গল্প শোনার দিনে বলেছিলেন, বিভূতিভূষণ কীভাবে নিজের জীবনাবসানের আগে নিজেরই মৃতদেহ প্রত্যক্ষ করেন!

গল্পের মাঝে উঠে গিয়ে পাশের ঘর থেকে হাতে করে মিষ্টির প্লেট আনতে কখনও ভুল হত না। আরেকটা দিনের স্মৃতি মনে পড়ে যেদিন দুপুর-বিকেলের মধ্যে কোনও এক সময় বিভূতিভূষণের, ‘তালনবমী’ গল্পটা পড়ে শুনিয়েছিলেন। মাঝে মাঝে মাসিমাও যোগ দিতেন আমাদের সঙ্গে।
একটা সময় প্রতি বছর নিয়ম করে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের প্রয়াণের দিনে অনুষ্ঠান করতাম। প্রথম অনুষ্ঠানটা করেছিলাম ঢাকুরিয়া ব্রিজের পাশে অবন মহলে, যার চলতি নাম সিএলটি। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে মেসোমশাইয়ের যোগাযোগের কথা শুনে ওঁকে অনুরোধ করি অনুষ্ঠানে যেতে। তিনি সানন্দে রাজি হন এবং সেদিনের সান্ধ্য অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে স্মৃতিচারণ করেন।

মনে আছে, সেদিন ওঁর সঙ্গে কলকাতার উপ-মহানাগরিক মণি সান্যাল, সবিতাব্রত দত্ত প্রমুখ ছিলেন। পরে আবারও দক্ষিণ কলকাতার বিড়লা একাডেমিতে আয়োজিত হেমন্ত স্মরণ অনুষ্ঠানে এসেছিলেন। শুধু যাওয়া আসা নয়, স্মরণ পুস্তিকার জন্য একটা স্মৃতিচারণমূলক লেখাও লিখে দিয়েছিলেন।

অতি সাধারণ জীবনযাপনে বিশ্বাসী মেসোমশাই বাড়ির কাছে মাঝেমধ্যে দোকান-বাজার নিজেই করতেন। পোশাকের মধ্যেও কোনও বাহুল্য ছিল না। সালটা এই মুহূর্তে মনে করতে পারছি না, কিন্তু দিনটা ছিল কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোর আগের দিন। সেদিন মেসোমশাই বাড়ি ছিলেন না। মাসিমার সঙ্গে বসে গল্প করছি, এমন সময় মেসোমশাই একটা থলে নিয়ে বাড়ি ঢুকলেন, থলে থেকে বার করলেন ছোট্ট আকারের একটি লক্ষ্মীপ্রতিমা কাগজে যত্ন করে মোড়া। বাড়ির পুজোর জন্য নিয়ে আসা। সবাইকে দেখিয়ে আনন্দ পাচ্ছিলেন। মুখে ছিল শিশুর সারল্য!

যেদিন মেসোমশাই চলে গেলেন, তার পরেরদিন কোথা থেকে ঠিক মনে নেই খবরটা পেয়ে তৎক্ষণাৎ বাড়িতে এসে মাকে সংবাদটা দিই। খুব বিচলিত বোধ করছিলাম। আমার অবস্থা দেখে মা একটা কথা বলেছিল যা আজও মনে আছে, সেটা হল ‘সাহিত্য সৃষ্টির পাশাপাশি মেসোমশাই যে ভাল মানুষ ছিলেন, সেটা তোর মন কেমন করা দেখে বুঝতে পারছি। একজন বৃদ্ধ মানুষের চলে যাওয়া একটা ছেলেমানুষের মনে ছাপ ফেলেছে দেখে খুব সহজেই বোঝা যায় তিনি কেমন সংবেদনশীল মনের মানুষ ছিলেন।’

ওঁর লেখা ‘মেমোরিয়ালের পরী’ আজকের প্রজন্মের শিশুরা পড়েছে কি না জানা নেই, কিন্তু পড়ার সুযোগ পেলে তারা নিম্নগামী সংস্কৃতি আর কঠিন-কলুষিত বাস্তব থেকে কিছুক্ষণের জন্য হলেও মুক্তি পাবে।আমার সংগ্রহের নেশা অনেক কিছুই আমার জীবনে এনেছে, তার মধ্যে পঙ্কজ মল্লিককে উপহার দেওয়া এবং মেসোমশাই ও পঙ্কজ মল্লিক, দুজনেরই সাক্ষর করা ‘বিদিশার নিশা’ বইটি আমার কাছে একটি সম্পদ হয়ে আছে।
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত