(Japanjatri Rabindranath)
রবীন্দ্রনাথের ছিল মীন রাশি, আর মীন রাশির জাতকেরা নাকি জলকে ভালবাসেন। বারিবিহারপ্ৰিয় রবীন্দ্রনাথ দিনের পর দিন পদ্মার বুকে ভেসে বেড়িয়েছেন। ছেলেবেলায় জোড়াসাঁকো বাড়ির একটা ছোট্ট জানলা দিয়ে চেয়ে থাকতেন বিশ্বপ্রকৃতির দিকে, তারপরে শিলাইদহর নির্জন চরে আশ্চর্য নিঃসঙ্গ রবীন্দ্রনাথের কাছে বিশ্বপ্রকৃতি ধরা দিল সীমাহীনভাবে! কবির দৃষ্টি আরও পরিব্যপ্ত হল! রবীন্দ্রনাথের চিত্ত চঞ্চল ছিল কি না জানি না, কিন্তু তাঁর মন ছিল সুদূরের পিয়াসী। কবি নিজেকেই বলেছেন, ‘ওরে যাত্রী আমি’।
বিশ্বকবি তাঁর ৮০ বছরের জীবনে বহু দেশ ভ্রমণ করেছেন। তাঁর জীবনদর্শন, ভাবনা, চিন্তা নিয়ে মিলিত হয়েছেন রোমা রঁল্যা, জর্জ বার্নাড শ, আইনস্টাইন, সিলভা লেভি, গ্রিক কবি কস্টিস পালামাস, স্টেন কোনভ প্রমুখের সঙ্গে। বিশ্বপথিক রবীন্দ্রনাথ যেমন পাশ্চাত্য, পারস্য, যুক্তরাষ্ট্র, চিন, সোভিয়েত রাশিয়া ভ্রমণ করে সেইসব দেশের দার্শনিক, মনীষী এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে ভাবের আদান-প্রদান করেছেন, তেমনই স্বৈরাচারী মুসোলিনির প্রশংসা করে, বিশ্বের একটা বড় অংশের মানুষের বিরাগভাজন হয়ে কটু কথার ঝাঁজ সয়েছেন! মানবতার কবি অবশ্য অল্প সময়ের মধ্যেই ভুল সংশোধন করে সরে এসেছেন সেই বিতর্ক থেকে।
বিশ্বনাগরিক রবীন্দ্রনাথ তাঁর ভ্রমণের তালিকায় জাপান আর সে দেশের মানুষ এবং বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন একাধিকবার। জীবদ্দশায় একাধিকবার জাপান গিয়েছেন। প্রথমবার ১৯১৬, দ্বিতীয়বার ১৯১৭, তৃতীয়বার ১৯২৪, চতুর্থবার ১৯২৯ সালে। ১৩২৩ সালের বৈশাখ মাসে কলকাতার খিদিরপুর বন্দর থেকে তোসামারু জাহাজে রবীন্দ্রনাথ জাপানযাত্রা শুরু করেন। দীর্ঘ এবং ক্লান্তিকর এই সফরে কবি নিজের নির্দিষ্ট কেবিনের থেকে দিনের বেশিরভাগ সময়টাই জাহাজের ডেকেই কাটাতেন। সমুদ্রের মোহনায় পৌঁছবার পর জল আর মাটির সম্পর্কে এক অপূর্ব বর্ণনা করেছেন কবি! লিখেছেন, ‘তার কুলের বেড়ি খসে গেছে। কিন্তু, এখনো তার মাটির রঙ ঘোচে নি। পৃথিবীর চেয়ে আকাশের সঙ্গেই যে তার আত্মীয়তা বেশি, সে-কথা এখনো প্রকাশ হয় নি।’
যাত্রাকালে কবির জাহাজ পড়ল প্রবল ঝড়ের মধ্যে, সেই ঝড়ের দাপট চলল দিন দুয়েক, তারপর প্রকৃতির রুদ্ররূপ যখন শান্ত হল, ২৪ বৈশাখ কবি পৌঁছলেন ব্রহ্মদেশে। সেখানকার এক বাঙালি বন্ধুর আমন্ত্রণে রবীন্দ্রনাথ, জাহাজ থেকে একটু অবসর নিয়ে, বেরিয়ে পড়লেন রেঙ্গুন শহরের পথে। দেখতে গেলেন স্থানীয় একটি বুদ্ধমন্দির। সেবারে কবির সফরসঙ্গী ছিলেন অ্যান্ড্রুজ সাহেব, বালক মুকুল দে প্রমুখ। চিন সমুদ্রের জলপথ ধরে পিনাঙ বন্দর, সিঙ্গাপুর হয়ে ১৬ জ্যৈষ্ঠ কবি পৌঁছলেন জাপানের কোবে বন্দরে। বৃষ্টি, কুয়াশায় মাখা ঝাপসা প্রকৃতি তখন ক্রমে পরিষ্কার হয়েছে।

কবি লিখেছেন, ‘প্রকৃতির নাট্যমঞ্চে বাদলার যবনিকা উঠে গিয়েছে, ভাবলুম, এইবারে ডেকের উপরে রাজার হালে বসে সমুদ্রের তীরে জাপানের প্রথম প্রবেশটা ভালো করে দেখে নিই। কিন্তু, সে কি হবার জো আছে। আমার চারিদিকে একটু কোথাও ফাঁক দেখতে পেলুম না। খবরের কাগজের চর তাদের প্রশ্ন এবং তাদের ক্যামেরা নিয়ে আমাকে আচ্ছন্ন করে দিলে।’
একেই বোধহয় বলে খ্যাতির বিড়ম্বনা। প্রকৃতি আর কবির মাঝের ফাঁকটুকু ভরিয়ে দিল জনরণ্য। কবিকে স্বাগত জানালেন জাপানের বিখ্যাত চিত্রকর টাইক্কন। রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে তাঁর পূর্বে পরিচয় ঘটেছিল এবং ভারতে তিনি কবির অতিথি হয়ে কিছুদিন জোড়াসাঁকোর বাড়িতেও ছিলেন। জাহাজঘাটায় সেই ভিড়ের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন তাঁর আর এক চিত্রকর বন্ধু কাটাসটা, যিনি একসময় শান্তিনিকেতন আশ্রমে জুজুৎসু ব্যায়ামের শিক্ষক ছিলেন। ছিলেন আর এক পরিচিতজন কাওয়াগুচি।
জাপানের আরও একটা জিনিস কবিকে আকর্ষিত করে, সেটা হল হাইকু। দু-এক শব্দের মধ্যেই প্রকৃতি এবং পরিবেশকে তারা ব্যক্ত করে, আর তাতেই জাপানি পাঠকদের তৃপ্তি। কবিতাগুলোর মধ্যে কবি দেখেছিলেন বাকসংযম এবং ভাবসংযম।
দেশ ছাড়বার কিছু পরে জাহাজে বসে পেয়েছিলেন সমুদ্রের সাইক্লোন, আর জাপানে পৌঁছে পেলেন মানুষের সাইক্লোন। জাপানের দৈনন্দিন ঘরকন্নার মধ্যে প্রবেশ করে কবি কৌতুক অনুভব করলেন জাপানি দাসীদের দেখে। তিনি লিখেছেন, ‘মাথায় একখানা ফুলে ওঠা খোঁপা, গাল দুটো ফুলো ফুলো, চোখদুটো ছোট, নাকের একটুখানি অপ্রতুলতা, কাপড় বেশ সুন্দর, পায়ে খড়ের চটি— কবিরা সৌন্দর্যের যে রকম বর্ণনা করে থাকেন তার সঙ্গে অনৈক্য ঢের, অথচ মোটের উপর দেখতে ভালো লাগে, যেন মানুষের সঙ্গে পুতুলের সঙ্গে, মাংসের সঙ্গে মোমের সঙ্গে মিশিয়ে একটা পদার্থ আর সমস্ত শরীরে ক্ষিপ্রতা, নৈপুণ্য, বলিষ্ঠতা।’
গৃহস্বামী গুজরাটি বণিক মোরারজী কবিকে বলেন, সেই দেশের অর্থাৎ জাপানের দাসীরা কাজও যেমন নিপুণতার সঙ্গে করে, তেমনই পরিষ্কার এবং পরিছন্ন। জাপানে কবিকে মুগ্ধ করে সেখানকার মানুষের শান্ত চরিত্র। দেখেন পথে ভিড় আছে, কিন্তু গোলমাল নেই! পথ চলতি গাড়ির সামনে অন্য কোনও গাড়ি এসে পড়লে, তারা গালমন্দ বা হাঁকাহাঁকি না করে শান্তভাবে অপেক্ষা করে! কবির মনে হয়েছে এইটেই জাপানের শক্তির মূল কারণ। জাপানিরা বাজে চেঁচামেচি ঝগড়াঝাঁটি করে নিজেদের শক্তিক্ষয় করে না। কবির মনে হয়েছে, প্রাণশক্তির বাজে খরচ নেই বলেই, প্রয়োজনের সময় টানাটানি পড়ে না।

জাপানের আরও একটা জিনিস কবিকে আকর্ষিত করে, সেটা হল হাইকু। দু-এক শব্দের মধ্যেই প্রকৃতি এবং পরিবেশকে তারা ব্যক্ত করে, আর তাতেই জাপানি পাঠকদের তৃপ্তি। কবিতাগুলোর মধ্যে কবি দেখেছিলেন বাকসংযম এবং ভাবসংযম। রবীন্দ্রনাথ খুশি হয়েছিলেন জাপানি প্রথায় চা পরিবেশন দেখে। অবশ্য অনেক আগেই কবির বিশেষ পরিচিত ওকাকুরার ‘book of Tea’ পড়ে, জাপানি প্রথায় চা পরিবেশন সম্পর্কে তিনি বেশ কিছু তথ্য জেনেছিলেন, আর যখন সেখানে গেলেন তখন একজন ধনী জাপানি বাড়িতে চা-পান অনুষ্ঠানের নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে গিয়ে এই বিষয়ে কবির প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা হল।
কোবে থেকে দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে, গৃহস্বামীর বাড়িতে পৌঁছে বাগানের ছায়া, সৌন্দর্য আর শান্তি তাঁকে অভিভূত করল! বাগানের নিভৃত কোণের এক জায়গায় নীরব হয়ে বসে থাকলেন। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘মনের উপর এই ছায়াঘন নিঃশব্দ নিস্তব্ধতার সম্মোহন ঘনিয়ে উঠতে থাকে।’ এরপরে গৃহস্বামী এসে অভ্যর্থনা করেন। প্রতিটি ঘরেই অল্প আসবাব। গৃহস্বামীর কন্যা নমস্কার জানিয়ে চা তৈরিতে মন দেন। চা তৈরির সেই প্রথাকে রবীন্দ্রনাথ কবিতার ছন্দের সঙ্গে তুলনা করেছেন। চায়ের পাত্র পরিষ্কার করা, আগুন জ্বালা, চা-দানির ঢাকা খোলা, পেয়ালায় চা ঢেলে নিমন্ত্রিত অতিথিদের সামনে পরিবেশন করার মধ্যে রবীন্দ্রনাথ এক মার্জিত এবং পরিশিলিত রুচির পরিচয় পেয়েছিলেন।
ভারতবন্ধু ওকাকুরা কাকুজোর দাদা ওয়াই ওকাকুরা টোকিও থেকে কালিদাস নাগকে তাঁর ভাইয়ের লেখা ‘Book of Tea’ সহ কয়েকটি বই পাঠান পড়বার জন্য। সম্প্রতি ওয়াই ওকাকুরার লেখা একটি চিঠি আমি সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়েছি।
তিনি বলেছিলেন, ‘অতিথিদের কর্তব্য হচ্ছে, এই পাত্রগুলিকে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে একান্ত মনোযোগ দিয়ে দেখা। প্রত্যেক পাত্রের স্বতন্ত্র নাম এবং ইতিহাস।’ কত যে তার যত্ন, সে বলা যায় না। আগেই লিখেছি যে, রবীন্দ্রনাথ একাধিকবার জাপান ভ্রমণ করেছেন। তেমনই এক ভ্রমণের সময় তাঁর সঙ্গী হয়ে জাপানে গিয়েছিলেন ভারত ও এশিয়ার প্রাচীন ইতিহাসের গবেষণায় রবীন্দ্র সমকালীন বিশেষজ্ঞ ড. কালিদাস নাগ। কালিদাস নাগ, রবীন্দ্রনাথ ও রাসবিহারী বসুর ঐতিহাসিক সাক্ষাতের প্রত্যক্ষ্য সাক্ষী ছিলেন। এই ঐতিহাসিক ঘটনার কথা তিনি লিখেছিলেন মতিলাল রায়ের ‘আমার দেখা বিপ্লব ও বিপ্লবী’ শীর্ষক গ্রন্থের মুখবন্ধে।
সেবার তাঁরা জাপানের কোবে শহরেই ছিলেন। ভারতবন্ধু ওকাকুরা কাকুজোর দাদা ওয়াই ওকাকুরা টোকিও থেকে কালিদাস নাগকে তাঁর ভাইয়ের লেখা ‘Book of Tea’ সহ কয়েকটি বই পাঠান পড়বার জন্য। সম্প্রতি ওয়াই ওকাকুরার লেখা একটি চিঠি আমি সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়েছি। ওই চিঠিতে তিনি কালিদাস নাগকে লিখেছেন, কোবে থেকে দেশের উদ্দেশ্যে যাওয়ার আগে ড. নাগ যদি বইগুলি টোকিওতে ফেরত পাঠান, তাহলে তিনি বাধিত হবেন।

চিঠির শেষে এক জায়গায় তিনি লিখেছেন, ‘would it be too much to ask to get for me an inspiration of the poet on the fly pages of my brothers books so as to make them doubly dear to me.’ এই চিঠিটিতে কোনও সাল বা তারিখের উল্লেখ নেই, কিন্তু চিঠিখানা লেখা হয়েছে কোনও একটি শুক্রবারের সন্ধায় টোকিও থেকে। এখানে poet বলতে যে রবীন্দ্রনাথের কথাই বলা হয়েছে, সেটা বুঝতে কোনও অসুবিধা হওয়ার কারণ নেই।
জাপানের ফুল সাজানোর নৈপুণ্য দেখে রবীন্দ্রনাথ অবাক হয়ে যান। এই বিশেষ ধরনের পুষ্পসজ্জা সম্পর্কে তিনি লিখেছেন, ‘এর মধ্যে কত আয়োজন, কত চিন্তা, কত নৈপুণ্য আছে, তার ঠিকানা নেই। প্রত্যেক পাতা এবং প্রত্যেক ডালটির উপর মন দিতে হয়। চোখে দেখার ছন্দ এবং সংগীত যে এদের কাছে কত প্রবলভাবে সুগোচর, কাল আমি ঐ দুজন জাপানি মেয়ের কাজ দেখে বুঝতে পারছিলুম।’ আবার অন্যদিকে, জাপানি নৃত্যশৈলী দেখে রবীন্দ্রনাথের মনে হয়েছিল ‘দেহভঙ্গির সংগীত’। জাপান ত্যাগ করার আগে রবীন্দ্রনাথ সে দেশের ‘শিন্ত ধর্ম’ সম্পর্কে তাঁর অভিমত প্রকাশ করেছেন নিজস্ব ভঙ্গিতে। কিন্তু জাপানি শিল্প, চিত্রকলা এবং সংস্কৃতি যে রবীন্দ্রজীবনে বিশেষভাবে প্রভাব ফেলেছিল, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত