(Ranen Ayan Dutt)
বর্তমান সময়ে বাংলা তথা ভারতীয় চিত্রকলার জগতে বর্ষীয়ান কয়েকজন চিত্রকর আজও রয়েছেন, শুধু রয়েছেন নয়, রয়েছেন সৃষ্টিশীলতার মধ্যে। বয়স হার মেনেছে তাঁদের ইতিবাচক মনোভাব আর মননশীল নন্দনজগতের কাছে। তবু পৃথিবীর মাটিতে থাকার একটা নির্ধারিত সময় আমাদের সকলের জন্যই ধার্য করা, আর সেই নিয়ম মেনে বিগত বছরগুলিতে আমরা বহু গুণী মানুষদের হারিয়েছি।
আরও পড়ুন: স্মৃতির আকাশ থেকে (১), (২), (৩), (৪), (৫), (৬), (৭), (৮), (৯), (১০), (১১), (১২), (১৩), (১৪), (১৫), (১৬), (১৭), (১৮), (১৯), (২০), (২১), (২২), (২৩), (২৪), (২৫), (২৬), (২৭), (২৮), (২৯), (৩০), (৩১), (৩২), (৩৩), (৩৪), (৩৫), (৩৬), (৩৭), (৩৮)
অন্যান্য জগতের মতো চিত্রকলার জগতেও ঘটেছে ইন্দ্রপতন। সেই ক্ষেত্রে প্রবাদপ্রতিম চিত্রকর ও কমার্শিয়াল আর্টের অন্যতম স্তম্ভ রণেন আয়ন দত্তের কথা না বললেই নয়। মাখন দত্তগুপ্ত, সত্যজিৎ রায়, অন্নদা মুন্সী, রঘুনাথ গোস্বামীর মতো শিল্পীদের সঙ্গেই তাঁর নাম উচ্চারিত হয়।

তাঁর শিল্প নিয়ে আলোচনা করা আমার পক্ষে ধৃষ্টতামাত্র। তার থেকেও বড় কথা, আমি শিল্পজগতের সঙ্গে তেমনভাবে যুক্ত নই। সময় কাটাতে সাদা কাগজের ওপর আঁকি-বুকি কাটলেও, ছবি আঁকার ক্ষেত্রে আমার কোনও প্রথাগত শিক্ষা নেই। পারিবারিক বৃত্ত আর কয়েক বছর সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত থাকার কারণে সাহিত্য সংস্কৃতি, শিল্পকলার জগতের একাধিক ব্যক্তিত্বের সান্নিধ্যলাভ করেছি। তাঁদের স্নেহ, ভালবাসা আর প্রশ্রয়ে সমৃদ্ধ হয়েছি। সেই তালিকায় আছেন রণেন আয়ন দত্ত। যত বড় শিল্পী ঠিক ততটাই উদার মনের একজন মানুষ! মূলত মুরাল শিল্পী এবং গ্রাফিক ডিজাইনার হয়েও পোর্ট্রেট, অয়েল-সহ বিভিন্ন মাধ্যমে তাঁর কাজ যাঁরা দেখেছেন, মুগ্ধ না হয়ে পারেননি!

আমি ব্যক্তিগতভাবে মুগ্ধ হয়েছি ওয়েস্টার্ন আর্ট প্রভাবিত তাঁর ছবিগুলি দেখে! রণেনদার আঁকা কয়েকটি ঘোড়ার ছবিতে যে গতি দেখেছি, তাতে মনে হয়েছে ঘোড়াগুলি জীবন্ত হয়ে ক্যানভাস থেকে ছুটে বেরিয়ে যাবে! শৈশবে দারিদ্র্যতার সঙ্গে লড়াই করা বালক রণেন আয়ন দত্তকে তাঁর বাবা মাঝে মধ্যে আবিষ্কার করতেন খাটের তলা থেকে! হাতে থাকত ছবি আঁকার খাতা। গ্রীষ্মের মধ্যাহ্নে কাঠফাটা রোদ্দুরে, রাস্তার কলের জল খেয়ে, মধ্য কলকাতার কেশব চন্দ্র সেন স্ট্রিটে কোনও বাড়ির রকে বসে চারপাশের চলমান দৃশ্যগুলিকে স্কেচবন্দি করতেন। এসব কথা দক্ষিণ কলকাতার ডোভার লেনে শিল্পীর সঙ্গে বিভিন্ন অবকাশে গল্প করতে গিয়ে শোনা।

আমার একটি রবীন্দ্রনাথ বিষয়ক ডায়েরিতে কবির অবয়ব আঁকাতে গিয়ে রণেনদার সঙ্গে প্রথম পরিচয়। তারপর যখন শুনলেন আমার আত্মীয় রঘুনাথ গোস্বামী, তখন আমার প্রতি তাঁর স্নেহের মাত্রা যেন আরও একটু বেড়ে গেল। খুব খুশি হতেন যখন রঘুনাথ গোস্বামীর প্রসঙ্গ উঠত। কত যে গল্প করতেন সব আর মনে নেই!

তপন সিংহর প্রসঙ্গ উঠলে আরও উচ্ছ্বসিত হয়ে গল্প শুরু করতেন। গল্প করেছিলেন ‘কাবুলিওয়ালা’ ছবির পোস্টার ডিজাইন করা নিয়ে। শিল্পী রণেন আয়ন দত্ত পরবর্তীকালে অন্নদা মুন্সী, সত্যজিৎ রায় প্রমুখের সঙ্গে কাজ করেছেন। বিভিন্ন বইয়ের প্রচ্ছদ, জবাকুসুম তেল ইত্যাদি কাজ করার পাশাপাশি বেশ কিছু ছায়াছবির পোস্টার তৈরির কাজ করেছিলেন। সেগুলির মধ্যে ছিল, উত্তম-সুচিত্রা অভিনীত ‘সপ্তপদী’, ‘হাঁসুলীবাঁকের উপকথা’, ‘ছুটি’ ইত্যাদি। সবুজ চার্ট পেপারের উপর ব্লেড দিয়ে কীভাবে ‘হাঁসুলী বাঁকের উপকথা’ ছবির পোস্টার ডিজাইন করেছিলেন, সেই গল্প শুনে বেশ অবাক হয়েছিলাম! দেশপ্রিয় পার্কের কাছে আমার বাড়ি থেকে ওঁর ডোভার লেনের বাড়ির দূরত্ব ছিল অল্পই, আর তাই বেশ ঘন ঘন যোগাযোগ হয়ে উঠত।

সেই সময় কলকাতার বিশিষ্ট সংগ্রাহক পরিমল রায় এবং কাজী নজরুলের পৌত্র কাজী অনির্বাণ পপুলার আর্টের বিষয় একটি গ্রন্থ প্রকাশের পরিকল্পনা করছিলেন। একদিন দু’জনকে নিয়েই গেলাম রণেনদার বাড়ি। একটা ডামি বই নিয়ে গিয়েছিলেন ওঁরা। রণেনদা অনেকটা সময় নিয়ে পাতাগুলি উল্টে কিছুক্ষণ নীরব থেকে গ্রন্থটির জন্য একটি ভূমিকা লিখে দিলেন। পরে কোনও অজানা কারণে সেই পরিকল্পিত বইটি আর দিনের আলো দেখেনি।

যখনই যেতাম, তখনই দেখতাম ছবি সংক্রান্ত গল্পের সঙ্গে চায়ের সঙ্গে ‘টা’ সহ আপ্যায়নের কোনও ত্রুটি হত না। ছোটোখাটো মানুষটি পরিচ্ছন্ন গিলে করা পাঞ্জাবী আর পাজামা পরে ওঁর নিভৃত স্টুডিয়োতে নিমগ্ন থাকতেন কাজে। সাত-আট ফিট দূর থেকে লম্বা তুলির সাহায্যে ছবি আঁকতেন! তাঁর ‘ছুটি’ ছবির বুকলেট ডিজাইন দেখে ছবির নির্মাতা অরুন্ধতী দেবী বলেছিলেন, বুকলেটের কভারেই প্রকাশ পেয়েছে ছবির গল্পটা।

বাঙালির জবাকুসুম মানেই রণেনদার অসাধারণ সব শিল্পকর্ম! সাম্প্রতিককালে জবাকুসুমের একাধিক পুরনো আর হারিয়ে যাওয়া বিজ্ঞাপন সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করতে সক্ষম হয়েছি। সেগুলো উল্টে পাল্টে যতই দেখছি, ততই অবাক হচ্ছি!

বঙ্গের মানবীরা কতরকমভাবে তাঁদের কেশপরিচর্যা করছেন, তার হরেকরকম নমুনা রণেনদার ছবিতে, কোথাও আবার রবীন্দ্রনাথের কৃষ্ণকলি মুক্ত কেশে ময়নাপাড়ার মাঠের দিকে তাকিয়ে রয়েছে! তাঁর লাইন ড্রইংও আকর্ষণ করে। আমার কন্যার স্কুলের ড্রইং খাতায় এঁকে দেখিয়েছিলেন মাটির নিচে গাছের শেকড় কেমন হতে পারে, তার কয়েকটি নমুনা! এমন শিল্পীর কপালে কোনও রাষ্ট্রীয় সম্মান জোটেনি! বিভূষণ বা শ্রী তো দূরের কথা। বেঁচে থাকতে তাঁকে নিয়ে কোনও আলোচনা বা মূল্যায়ন চোখে পড়েনি! অবশ্য এটাই আমাদের দেশের রীতি।
শেষ কথা হয়েছিল দূরাভাষে। আমার পিতৃবিয়োগের খবর শুনে ফোন করে সান্ত্বনা দিতে গিয়ে ভাগ করে নিয়েছিলেন নিজের পিতৃবিয়োগের স্মৃতি। সেদিন কথা হয়েছিল ঘণ্টাখানেকের কাছাকাছি। এরপর এল করোনাকাল, পশুপাখি ব্যতীত মানব সভ্যতা গৃহবন্দী। স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে ফিরতে লাগল বছরখানেক। ততদিনে রণেনদার বয়স আরও কিছুটা বেড়েছে এবং শরীরও অশক্ত হয়ে পড়েছে। একদিন ওঁর প্রস্থানের খবর পেলাম। স্বল্প পরিসরে ওঁর স্মরণসভা হল। আমরা অনেক প্রশংসা করে দুঃখপ্রকাশ করলাম। কিন্তু, আজও তাঁর শিল্পীসত্তার সঠিক এবং পরিপূর্ণ মূল্যায়ন হল না!

আগামী বছর তাঁর জন্মশতবর্ষ। দেখা যাক, বাংলার শিল্পীরা নিজেদের আমিত্ব থেকে বেরিয়ে তাঁকে শ্রদ্ধা জানান কি না।
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত