(Purba Dam)
রবীন্দ্রসংগীতের স্বর্ণযুগের এক শ্রদ্ধেয়া শিল্পী ছিলেন পূর্বা দাম। তাঁর দাদা সুরজিৎ সিংহ একসময়ে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপচার্য ছিলেন। অনেক দিক থেকেই পূর্বা দাম আমাদের পরিবারের অতি আপনজন। আমার মায়ের দিক থেকেও তিনি পরিচিত ছিলেন, আবার পূর্বাদির স্বামী অরুণ দাম ছিলেন আমার বাবার বন্ধু। আমার ছোটোপিসির শ্বশুরবাড়ির সঙ্গেও পূর্বাদির ভীষণরকম ঘনিষ্ঠতা ছিল।
সুচিত্রা মিত্রের ছাত্রী, পূর্বাদির গান সম্পর্কে বলার অধিকার বা স্পর্ধা আমার নেই বলেই আমি মনে করি। তাই কিছু ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণ করব বিগত ২৫ বৈশাখ উপলক্ষ্যে। একাধিক অবকাশে তাঁকে দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল। এই প্রসঙ্গে বলে রাখি, পূর্বাদি থাকতেন অবন মহলের পাশেই শিবনাথ ভবন নামের এক বহুতল আবাসনে। তবে নব্বইয়ের দশকে তাঁর সঙ্গে প্রথম পরিচয়।
আরও পড়ুন: ছাপা-সুন্দরীর সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ
ঢাকুরিয়া ব্রিজ সংলগ্ন অবন মহল, যা সিয়েলটি নামেই বেশি পরিচিত, সেখানে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের স্মরণে একটা অনুষ্ঠানের আয়োজন করছিলাম। সেই সূত্রেই পূর্বাদির কাছে গান গাইবার অনুরোধ বা আবদার নিয়ে যাই। মনে আছে, সেই অনুষ্ঠানে এসেছিলেন সবিতাব্রত দত্ত, কলকাতা মহানগরীর তৎকালীন উপ-মহানাগরিক মনি সান্যাল প্রমুখ। অনুষ্ঠানে গান গাইবার জন্য আরও একজন শিল্পীকে অনুরোধ জানিয়েছিলাম। তিনিও কথা দেন, কিন্তু একেবারে শেষ মুহূর্তে গাড়ির চালক মারফত চিঠি লিখে দুঃখপ্রকাশ করেন আসতে পারবেন না বলে, সঙ্গে ছিল ওই শিল্পীর পরের একটি একক অনুষ্ঠানের আমন্ত্রণপত্র।

একেবারে শেষ মুহূর্তে বিষয়টা জানতে পেরে খুব বিচলিত হই। পূর্বাদিকে ব্যাপারটি জানালে তিনি বেশ কয়েকটি সাবধানবাণী শুনিয়েছিলেন সেই শিল্পীর সম্পর্কে। উক্ত শিল্পীর পিতৃদেবও ছিলেন বিগত দিনের একজন বিখ্যাত রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী। সৌজন্য বজায় রেখেই তাঁদের নাম উল্লেখ থেকে বিরত থাকছি। পরে পূর্বাদির কাছে শিল্পীর পিতৃদেবের বিষয়েও কিছু সমস্যার কথা শুনেছিলাম। যাক সে কথা, সেদিনের অনুষ্ঠানে পূর্বাদি অনেকগুলো গান করেছিলেন। তার মধ্যে একদম প্রথম গানটির কথা মনে আছে, ‘সীমার মাঝে অসীম তুমি বাজাও আপন সুর’। বাকি গানগুলো আর এত বছর পরে মনে নেই।
পাঠকদের মনে করিয়ে দিই, আগের পর্বে যখন পূরবী মুখোপাধ্যায়ের কথা লিখেছিলাম তখন বলেছিলাম, সেই সময়ের শিল্পীরা খুবই সাধারণ জীবনধারণ করতেন। এই কথাটা পূরবীদির মতো পূর্বাদির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। কোনও মিথ্যে পরিচয়ের আবরণে নিজেকে ঢেকে অহংবোধ নিয়ে আজকের মতো তথাকথিত সেলেব্রেটি হয়ে ওঠেননি।

পূর্বাদির আরও একটি ঘটনা মনে পড়ে। সেই থেকে ওঁর প্রতি আমার শ্রদ্ধা আরও কয়েক গুণ বেড়ে গিয়েছিল! ঠিক কত সাল মনে নেই, সেই দিনটা ছিল ২৫ বৈশাখ, রবীন্দ্রসদনে গিয়েছি সুপ্রীতি ঘোষকে নিয়ে। কবিপ্রণামের প্রভাতী অনুষ্ঠানে সুপ্রীতিদিও গান গাইবেন। তারপরে আরও কয়েকটি অনুষ্ঠানে ওঁর যাওয়ার কথা। কিন্তু, সংগঠকদের মধ্যে একজন, যিনি নিজেও একজন রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী, তিনি অন্যান্য শিল্পীদের গানেই সময়ে বইয়ে দিচ্ছিলেন, কিন্তু কিছুতেই সুপ্রীতিদিকে ডাকছিলেন না!
বয়সের কারণে সুপ্রীতিদি অসুস্থবোধ করছিলেন। ব্যাপারটা দেখে পূর্বাদি ভীষণ রেগে যান, এবং সেই সংগঠককে ডেকে বেশ কড়াভাবে ধমক দেন। তার পরেই সুপ্রীতিদির নাম ঘোষিত হয়। বলাই বাহুল্য, যে শিল্পী এবং সংগঠক ব্যক্তি পূর্বাদির থেকে বয়সে অনেকটাই কনিষ্ঠ ছিলেন, তাই পূর্বাদির বকুনি এবং কারণটাও সঙ্গত মনে হয়েছিল আমার।

একদিন কোনও একটি বিশেষ কারণে পূর্বাদির বাড়ি গিয়েছিলাম। কাজের কথা শেষ হলে কিছুতেই ছাড়লেন না, খেয়ে যেতে বললেন। তার একটু আগে ওঁর গান শেখানো শেষ হয়েছে। ছাত্র-ছাত্রীরা একে একে চলে যাচ্ছেন। সবাই চলে গেলে আমি পূর্বাদির কাছে অত্যন্ত ছেলেমানুষের মতো একটা আবদার করে বসি! ‘আমারে যদি জাগালে আজি নাথ’ গানটা শোনাবার জন্য অনুরোধ করি আর উনিও নির্দ্বিধায় গান আরম্ভ করেন! আজ অনেক বছর পরে সেইসব দিনের কথা ভাবলে বিষণ্ণতা এবং ভাললাগা, দুটোই গ্রাস করে।
আমাদের বাড়ির বিভিন্ন অনুষ্ঠানে নিয়মিত এসেছেন ওঁর স্বামী অরুণ দামকে নিয়ে। আমার ছোট পিসির বিয়ে, আমার বিয়ে, আমার কন্যার অন্নপ্রাশন ইত্যাদিতে। অনেক বছর পরে যখন আমার এক বন্ধুকে গান শেখাতে পূর্বাদিকে অনুরোধ করি, তখন বললেন, ‘আর পারব না রে, গলাটা একদম খারাপ হয়ে গেছে, এটা আমার কাছে খুব দুঃখের।’

মেঘালয়ে বাড়ি, জন্ম পাবনায় মামারবাড়িতে, আর কলকাতায় পূর্বাদির সংগীতজীবন। এক বিচিত্র মিশ্রণ! মামা, ভারতীয় গণনাট্য সংঘের জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্রের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েই গান শেখার শুরু। পরিবার কলকাতায় আসার পরে পূর্বা দাম গান শিখতে শুরু করেন সুচিত্রা মিত্রের কাছে, ততদিনে সুচিত্রা মিত্রের সংগীত শিক্ষায়তন আর দ্বিজেন চৌধুরীর সংগীত শিক্ষায়তন এক হয়ে গিয়েছে। ড. কালিদাস নাগ নতুন শিক্ষায়তনের নামকরণ করেছেন ‘রবিতীর্থ’।
সেখানেই গান শেখা শুরু, আবার পরবর্তীকালে ওখানেই গান শিখিয়েছেন পূর্বাদি। প্রথম রেকর্ড করেছিলেন পূর্বা সিনহা নামে। পরবর্তী রেকর্ডগুলো প্রকাশ পেয়েছিল পূর্বা দাম নামে। সবগুলোই পরিচালনা করেছিলেন সুচিত্রা মিত্র। কবির গানই তাঁকে এনে দিয়েছিল সম্মান, পরিচিতি কিন্তু আটপৌরে সাজে পূর্বাদি সব সময় মাটির মানুষ! তাঁর উদাত্ত কণ্ঠের রবীন্দ্রসংগীত শুনে আজীবন মুগ্ধ হয়েছি। ২০২০ সালে করোনাকালে অনেক ভালবাসার মানুষের প্রস্থান ঘটল। তাঁদের মধ্যে পূর্বাদি আর তাঁর স্বামী অরুণ দামও ছিলেন, কিন্তু রেকর্ডবদ্ধ হয়ে রয়েছে, ‘মম দুঃখের সাধন’, ‘আঁধার এল বলে তাইতো ঘরে উঠল আলো জ্বলে’, ‘এ ভারতে রাখো নিত্য প্রভূ তব শুভ আশীর্বাদ’-এর মতো অগণিত গান।
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
One Response
খুব আন্তরিক স্মৃতিচারণ।
অনুরাগ ও শ্রদ্ধার সুন্দর মিশ্রণ।