(Deshvikharir Jamijiret 3)
ভদ্রেশ্বর আমার ভাল লাগেনি৷ তবে ভাল না-লাগার মতো নয় ভদ্রেশ্বর৷ এখানে যাঁরা বড় হয়েছেন, তাঁদের প্রিয় জায়গা স্বাভাবিকভাবেই৷ বিরাট বিরাট পুকুর তোলপাড় সারা দুপুর৷ তখন ছিল, উন্নয়নে ভ্যানিশ৷ মাঝগঙ্গা পর্যন্ত ভেসে যাওয়া অক্লেশে৷ লিচুবাগান, আমবাগান, পালবাগান, কুণ্ডুবাগান, পোদ্দারবাগান তখন সত্যি বাগান৷ গরম জুড়ে হাওয়া ছিল, ছায়া ছিল৷ ফল পেড়ে খাওয়া ছোটদের অধিকার ছিল৷ খেলার মাঠ ছিল৷ সেনপাড়ার গলির রোয়াকে চড়া গলায় পাড়াসংবাদের বিকেল সন্ধে৷
আরও পড়ুন: দেশভিখারির জমিজিরেত পর্ব ১, পর্ব ২
সোনা ঠাকুরপোর পানের দোকানে সব খবর পাবে৷ এবার কী পালা ধরেছে বিশে গায়েন? নকুল নাকি জুটমিলে ঢুকল? রাধার জন্য বড় ঘরের পাত্র দেখেছে অরুণখুড়ো৷ বহু বছরের ঐতিহ্যবাহী জগদ্ধাত্রী পুজোগুলোর কমবেশি ফিউডাল মেজাজ ছিল৷ ১৯৭২-এ এসে আমি যা দেখেছি৷ আধা-গ্রাম আধা-মফসসল৷ আমার বড় হয়ে ওঠার ব্যস্ত ও বিচিত্র শহর থেকে এই পরিবেশ অনেকটাই আলাদা৷

যে কলোনিতে থেকেছি সেখানে রাত আটটা কি সাড়ে আটটায় অন্ধকারে দুলে দুলে হেঁটে যায় হ্যারিকেন৷ রাত নটা নাগাদ কুলকুচো করে উঠোনের ধারে জল ছুড়ে দিলে চারদিকে ডেকে ওঠে শেয়াল৷ এখানে স্কুল পেরোতে না-পেরোতেই জুট মিলের গেটে ঘোরাঘুরি শুরু করে কৈশোর, কিংবা বাবার সঙ্গে বাজারে সবজি নিয়ে বসে৷ সুবলের বাপ নিজে মোয়া বেচে, সুবলরে লাগাইছে স্টেশনবাজারের মুদিখানায়, তবেই তো পাতে দুই পদ তরকারি হয়৷ মনসার বিয়া হইল অর ডবল বয়সের বুইড়ার লগে৷ সারা বিকাল বাড়ির সামনে গামছা পইড়া খাড়াইয়া হরি-পুলিশের মাইয়ারে দ্যাখতে দ্যাখতে মাথাখারাপ হইল ট্যারা কানাইয়ের৷
এখানে কথা বলার মানুষ পাই কোথায়? আর যেটুকু কথা হয়, তাতে শরীরে বড় হতে থাকে যৌনতার লুকোনো কামরাঙা৷ তন্দ্রা বলেছিলেন, থাকতে পারবেন? কথা বলবেন কার সঙ্গে? কী জবাব দিয়েছিলাম, এখন আর মনে পড়ে না৷ আমার রাজনীতি করা দিনগুলোর ভাষা এখানে বোবা হয়ে গিয়েছিল৷ কলোনির একমাত্র কলেজে পড়া মেয়ে তন্দ্রা৷ সিলেবাসের বাইরে অনেক জানা ছিল তাঁর৷ গান জানতেন, নাটক জানতেন, হয়তো নাচও৷ সাংস্কৃতিক মানুষ৷ তাঁদের বাড়ির বারান্দায় বসে গেয়েছিলেন ‘পুরোনো সেই দিনের কথা’৷ গলা মেলাতে বলেছিলেন৷ পারিনি৷ কে যেন গলা টিপে ধরেছিল৷
তন্দ্রারা কলোনিতে এসেছেন অনেক আগে৷ অভিজ্ঞতা ছিল৷ তন্দ্রারই উদ্যোগে রবীন্দ্র জয়ন্তী হল৷ কলোনিতে ওই প্রথম৷ আবৃত্তি গান নাটক৷ তিন-চারজন তরুণকে নিয়ে খুব খেটেছিলেন৷ কলোনির বড় ঘরের কয়েকজনের তারিফ পেয়েছিল অনুষ্ঠান৷ আমার ‘সঞ্চয়িতা’ কে যেন ঝেড়ে দিয়েছিল৷

সক্রিয় রাজনীতি থেকে সরে এসেছি৷ শুধু পালানো আর পালিয়ে থাকা রাজনীতি হতে পারে না কখনও৷ ১৯৭০-এ গৃহহীন হওয়ার পর থেকে দু’বছর কী করেছি? গোবরার বস্তিতে পার্টি ক্লাস আর ‘দেশব্রতী’র খবর আর পুস্তিকা পড়া৷ গ্রামে যাবার জন্য তৈরি ছিলাম৷ নির্দেশ আসেনি৷ গণসংগঠনের কাজ বাতিল হয়েছে সংশোধনবাদী ঝোঁক বলে চিহ্নিত হয়ে৷ একজন-দুজন ধরা পড়ে, পালিয়ে থাকার প্রয়োজন বাড়ে আর পালিয়ে থাকার পরিসর কমে৷
মাঝখান থেকে লেখাপড়াটা ভণ্ডুল হল৷ আমাদের মতো হতদরিদ্র ঘরে, প্রান্তিক পরিবারে প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়াটা ভীষণ জরুরি৷ একটা ভারী ডিগ্রি থাকা ভীষণ ভীষণ জরুরি৷ ভদ্রেশ্বরে একটু থিতু হয়ে এমএ পরীক্ষার প্রস্তুতি নিলাম৷ ইতোমধ্যে দু’বার ড্রপ গিয়েছে৷ প্রস্তুতি একেবারেই ভাল হয়নি, তবু বলব ভদ্রেশ্বরে এলাম বলে পরীক্ষায় বসা হল৷ পুলিশের ভয় ছিল, কোনও অজ্ঞাত কারণে আর ধাওয়া করেনি৷ জীবনযাপন পালটে নিয়েছি৷ এতদঞ্চলে নকশালপন্থী তৎপরতার কথা কানে এসেছে অল্পস্বল্প৷ দূরে থেকেছি৷
দ্বিতীয় প্রেম সারদাপল্লীর বিবেকানন্দ পাঠাগার৷ নৃপেন্দ্রমোহন বিশ্বাসের সঙ্গে ছায়াময় পথে হাঁটতে হাঁটতে কয়েক হাজার বইয়ের সামনে দাঁড়াই৷ হাতের কাছে একখণ্ড পৃথিবী৷ বইয়ের আকাল স্কুলবেলা থেকে৷ কলেজে ভর্তি হবার পর গোটা তিনেক বিশাল গ্রন্থাগার পেয়েছি৷ সেখানে নিয়মের কড়াকড়ি ছিল৷
ধীরে ধীরে একটা প্রেম তৈরি হতে থাকে৷ তখন তেমন বুঝিনি৷ মালগাড়ি লাইনের গায়ে লম্বা নয়নজুলি, মাইলটাক হবে, চওড়া বিশফুটের মতো, সারা বছর জলসচ্ছল, বিলি কাটে হাওয়া দূর দূর পথ পেরিয়ে, মালগাড়ি লাইনের ঢালে গাছের মেলায় নিরবধি সবুজ। নয়নজুলির পাড়কে আমি বলতাম ‘জুড়ানিয়া’, ট্রেন থেকে নেমে ঘেমো শরীর এইখানে জুড়িয়েছে কতদিন, সেই জলের পৃথিবী ছিন্নভিন্ন শব হয়ে পড়ে আছে আজ আমাদের উন্মাদ উন্নয়ন লালসায়, তবু আজও যেতে যেতে দাঁড়াই, যেন দেখি ঝড়বৃষ্টির মাতলামি জলের শরীর জুড়ে, যেন দেখি জ্যোৎস্নাশিহরিত জলের গভীর থেকে আকাশের দিকে উড়ে যেতে চায় বিশাল মাছ, মালগাড়ির শব্দে ছোটাছুটি করে, বিশ কি পঁচিশ কেজির স্বাস্থ্য তাদের, তখন কলকারখানা চালু ছিল, ইঞ্জিনের শব্দ প্রায় সারাদিন রাতভর, এখন সবই গেছে, স্মৃতিটা আছে প্রথম প্রেমের৷

দ্বিতীয় প্রেম সারদাপল্লীর বিবেকানন্দ পাঠাগার৷ নৃপেন্দ্রমোহন বিশ্বাসের সঙ্গে ছায়াময় পথে হাঁটতে হাঁটতে কয়েক হাজার বইয়ের সামনে দাঁড়াই৷ হাতের কাছে একখণ্ড পৃথিবী৷ বইয়ের আকাল স্কুলবেলা থেকে৷ কলেজে ভর্তি হবার পর গোটা তিনেক বিশাল গ্রন্থাগার পেয়েছি৷ সেখানে নিয়মের কড়াকড়ি ছিল৷ বিবেকানন্দ পাঠাগারে নিয়ম ছিল, ব্যতিক্রমও ছিল৷ পাঠক গড়ার কারিগর নৃপেন্দ্রমোহন বিশ্বাস আমাকে প্রায় নিজের একটা পাঠাগার দিয়েছিলেন৷
তৃতীয় প্রেম সারদাপল্লীর বন্ধুরা৷ এঁদের ভাবনাচিন্তা কথাবার্তা চলাফেরা সবটাই বলিষ্ঠ সাংস্কৃতিক৷ এঁরা ‘রক্তকরবী’ করার কথা ভাবতে পারেন৷ অনেকটা এগিয়েছিলেন৷ ছুটির দুপুরগুলিতে মহড়া হত, আজ এঁর বাড়িতে, কাল ওঁর৷ শেষ পর্যন্ত অবশ্য মঞ্চস্থ হতে পারেনি সমাধানহীন এক সমস্যায়৷ কথা বলার ও শোনার বিরাট উঠোন পেয়ে গেলাম এইখানে৷ আমাদের কলোনি থেকে জুড়ানিয়ার পাশ দিয়ে হেঁটে সারদাপল্লীতে আসি মনখুশির নেশায়৷ এইখানে থাকেন শিশির বন্দ্যোপাধ্যায়, সবার ‘রামুদা’, অশোকতরু বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছাত্র, ‘রক্তকরবী’তে যাঁর বিশু পাগল করার কথা ছিল, তাঁর মুখে গানের গল্প শোনা মনে রাখার মতো অভিজ্ঞতা৷ সেসব দিন হারিয়ে গেছে, রামুদা আছেন৷

সম্প্রতি সারদাপল্লীর কথা একটি পুস্তিকায় লিপিবদ্ধ করেছেন সেখানকার প্রায় প্রথম যুগের বাসিন্দা শ্রী অশোক বিশ্বাস৷ এই পল্লীর রূপকার স্বামী ত্যাগীশ্বরানন্দ (হেম) মহারাজের কথা, বাস্তু পরিকল্পনা, পল্লী উন্নয়ন, স্কুল ও পাঠাগার নির্মাণ, কারা এলেন এখানে, কোথা থেকে এলেন, তাঁদের অবদান, পরিচয় ইত্যাদি তথ্যসহ লিখিত৷ ১৯৫৭ সালে সারদাপল্লী কন্যা বিদ্যাপীঠের ছাত্রীদের মেরাপ বেঁধে ‘কালমৃগয়া’ মঞ্চস্থ করার সংবাদ আছে এখানে৷ বাংলার ও বাংলার বাইরের কলোনিগুলির ইতিহাস যদি লেখা হত, বাঙালির ইতিহাস সম্পূর্ণতা পেতে পারত৷ সেটা হতে পারল না আমাদের উদাসীনতা ও অদূরদর্শিতায়৷
শান্তিপল্লী স্পোর্টিং ক্লাবের ঘরে লাঠি বল্লমের সমারোহ দেখে অবাক হয়েছিলাম৷ জিজ্ঞাসা করে জানতে পারি, কলোনি হবার সময় এবং পরে বেশ কিছুকাল স্থানীয় বাসিন্দা অর্থাৎ ঘটিদের সঙ্গে বাঙালদের মাঝে মাঝেই লড়াই হত৷ সরকারি অধিগ্রহণে ঘটিরা বিঘে বিঘে জমি হারিয়েছে৷
আমার যেখানে ঠাঁই হল, অর্থাৎ শান্তিপল্লী, সেখানকার সাংস্কৃতিক আইটেম ছিল যাত্রা প্রতিযোগিতা৷ দারুণ পপুলার৷ অনুষ্ঠানের সাতদিন কলোনির ঘরে ঘরে যাত্রার জমাটি ডায়ালগ৷ মেয়েবৃত্তে কলকল আলোচনা৷ এখানে বলে রাখা দরকার, শান্তিপল্লীর বেশিরভাগ বাসিন্দা রিকশাচালক, ভ্যানচালক, সবজি বিক্রেতা, রাজমিস্ত্রি, রংমিস্ত্রি, জোগাড়ে, জেলে, ঘরামি, দোকান কর্মচারী, দিনমজুর, নাপিত, গোয়ালা, চুল্লুখোর, গাঁজাখোর ইত্যাদি৷ আক্ষরিক অর্থে গতরজীবী, শ্রমজীবীর মর্যাদা এঁরা পেতেন না৷ এঁদের বড় অংশ এসেছেন হাওড়ার সদর বক্সি লেন ও গুঁই ট্যান্ডাল লেন থেকে৷ ওখানে রিফিউজি ক্যাম্প ছিল৷ ছোট একটা অংশ এসেছেন বিভিন্ন জায়গা থেকে৷ এঁরা তুলনামূলকভাবে সম্পন্ন৷ পূর্ববাংলায় সোনার বা কাপড়ের দোকান ছিল এঁদের৷ এই সম্পন্নদের দেড়-দামড়া কয়েকজন যাত্রার পেশাজীবী মেয়েদের সঙ্গে কথা বলবার জন্য আকুলিবিকুলি করতেন, ঘন ঘন সিগারেট ফুঁকতেন, দেখেছি৷
শান্তিপল্লীর আরও দুটো আইটেম ছিল৷ এক, ব্যায়ামাগারে শরীর চর্চা৷ দুই, বক্সিং৷ ব্যায়ামের সব উপকরণ ছিল৷ বেশি ওজনের ডাম্বেল, প্লেটও ছিল৷ বাদল রায় ও সমরেশ দে (ঝুনু) সারা বাংলা দেহশ্রী প্রতিযোগিতায় প্রথম বা দ্বিতীয় স্থান পেয়েছিলেন বলে শুনেছি৷ পল্লীর যুবকরা অনেকেই ব্যায়াম করতেন৷ লক্ষ্য, সরকারি চাকরি৷ বক্সার হিসেবে দুজন রেলে চাকরি পান বলে জানা যায়৷

শান্তিপল্লী স্পোর্টিং ক্লাবের ঘরে লাঠি বল্লমের সমারোহ দেখে অবাক হয়েছিলাম৷ জিজ্ঞাসা করে জানতে পারি, কলোনি হবার সময় এবং পরে বেশ কিছুকাল স্থানীয় বাসিন্দা অর্থাৎ ঘটিদের সঙ্গে বাঙালদের মাঝে মাঝেই লড়াই হত৷ সরকারি অধিগ্রহণে ঘটিরা বিঘে বিঘে জমি হারিয়েছে৷ ক্রোধ তো থাকবেই৷ আর সবখোয়ানো বাঙালরা শেষ আশ্রয়টুকু বাঁচাতে মারকুটে হবেই৷ তবে ঘটি-বাঙাল লড়াই আমি দেখিনি, অস্ত্রাগার দেখেছি৷
এইরকম একটা পল্লীতে ক্লাবের উন্নতিকল্পে চ্যারিটি শো করেছি৷ তটিনী সিনেমা হলে, মর্নিং শো৷ ছবির নাম ‘হাঁসুলি বাঁকের উপকথা’৷ তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাসটি পড়া ছিল৷ সিনেমা দেখিনি৷ তটিনী হলের মালিক শম্ভু ঘোষ মৌলালিতে ডিস্ট্রিবিউটরের ঘরে আমাকে নিয়ে ছবিটি নির্বাচন করেন৷ সস্তায় হবে৷ আমি ‘রাজদ্রোহী’র কথা বলেছিলাম৷ শুনলাম, ওটা নাকি মামলায় আটকে আছে৷ পাওয়া যাবে না৷ অগত্যা ‘হাঁসুলি বাঁকের উপকথা’ই হল৷ সুপার ফ্লপ৷ প্রায় সব আসন শূন্য৷ পল্লীর কয়েকজন সমবয়সি প্যাঁক দিল৷ একজন বয়স্ক এসে বললেন, কী সব ছাতামাতা বই আনছ৷ কিছুই বুঝলাম না৷ পয়সা গেল, সময়ও গেল৷ কলোনিতে এই বয়স্ক লোকটির রুগ্ন মুদি দোকান ছিল৷
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত