Tags Posts tagged with "Rabindranath Tagore"

Rabindranath Tagore

চেনা কবি অচেনা রবি ()

গত বছর পর্যন্ত কলকাতা মহানগরে ৪২টি আন্তর্জাতিক বইমেলা হয়ে গেছে। হৈ হৈ করে এবারে বসেছে ৪৩তম আসরটি। এ এক রাজসূয় যজ্ঞ বটে। বাঙালি কবি সাহিত্যিক লেখক প্রকাশক এবং পাঠকের এই মিলনক্ষেত্রে আর কেউ থাকুন বা না থাকুন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কিন্তু বরাবরই সজীব থাকেন। তাঁকে নিয়ে নানাবিধ রচনা বা তাঁর নানা রচনা আজও নানা আঙ্গিকে প্রকাশ পায়, এবং বাজারের একটা বড়ো অংশ রবীন্দ্রপ্রসঙ্গের বিবিধ বই এই বেচাকেনার সঙ্গে ওতঃপ্রোতভাবে জড়িত। বাংলা বইয়ের ব্যবসায়ে রবীন্দ্রনাথ আজও অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিষয়। কিন্তু কেমন করে গড়ে উঠল এই বাজার, নিশ্চয়ই উৎসুক পাঠক সে বিষয়ে জানতে আগ্রহী।

মাত্র সাতাশ বছর বয়সে রবীন্দ্রনাথের লেখা গ্রন্থ প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল। সেটা ১৮৭৮ সালের কথা। সেবছর নভেম্বর মাসে কবির লেখা ‘কবিকাহিনী’ প্রথম গ্রন্থ হিসেবে মুদ্রিত হয়েছিল। এই গ্রন্থপ্রসঙ্গে ‘জীবনস্মৃতি’তে লিখেছিলেন,

আমি যখন মেজদাদার নিকট আমেদাবাদে ছিলাম তখন আমার কোনো উৎসাহী বন্ধু এই বইখানা ছাপাইয়া আমার নিকট পাঠাইয়া দিয়া আমাকে বিস্মিত করিয়া দেন।…”

প্রসঙ্গত বলা যায় রবীন্দ্রনাথ ১৮৭৮ সালের গরমকালে অর্থাৎ এপ্রিল মে মাসে সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছে আমেদাবাদে গিয়েছিলেন। ‘কবিকাহিনী’ গ্রন্থটি কবির উৎসাহী বন্ধু প্রবোধচন্দ্র ঘোষ ৫ নভেম্বর প্রকাশ করেছিলেন। মুদ্রিত হয়েছিল ৪৯ নং মেছুয়াবাজার রোডে সরস্বতী যন্ত্রে, মুদ্রক ছিলেন ক্ষেত্রমোহন মুখোপাধ্যায়।  ১৮৭৬ সালে সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে এন্ট্রান্স ক্লাসে প্রবোধচন্দ্র সোমেন্দ্রনাথ এবং সত্যপ্রসাদের সহপাঠী ছিলেন, তখনই রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে তাঁর আলাপ ও বন্ধুত্ব হয়, যা কিনা দীর্ঘদিন স্থায়ী হয়েছিল। মুখপত্রসহ মোট ৫৬ পাতার ডিমাই আকারের এই বইটি ৫০০ কপি ছাপা হয়েছিল এবং মূল্য ধার্য করা হয়েছিল ৬ আনা। 

রবীন্দ্রনাথ আরো বলেছিলেন,

তিনি যে কাজটা ভালো করিয়াছিলেন তাহা আমি মনে করি না, কিন্তু তখন আমার মনে যেভাবোদয় হইয়াছিল, শাস্তি দিবার প্রবল ইচ্ছা তাহাকে কোনোমতেই বলা যায় না। দণ্ড তিনি পাইয়াছিলেন, কিন্তু সে বইলেখকের কাছে নহে — বই কিনিবার মালেক যাহারা তাহাদের কাছ হইতে। শুনা যায় সে বইয়ের বোঝা সুদীর্ঘকাল দোকানের শেলফ্ এবং তাঁহার চিত্তকে ভারাতুর করিয়া অক্ষয় হইয়া বিরাজ করিতেছিল।…”

স্বয়ং গ্রন্থকারের এই উক্তিই প্রমাণ করে বাজারে বইটি তেমনভাবে সাড়া ফেলতে পারেনি। এমনকী এই বইয়ের কোনো সংস্করণ বা পুনর্মুদ্রণ আর হয়নি। রবীন্দ্রনাথের  বই প্রকাশের সেই শুরু। রবীন্দ্রনাথের প্রথম বইয়ের মতো দ্বিতীয় বই, ‘বনফুল’ও ছেপেছিলেন রবীন্দ্রনাথের দাদা সোমেন্দ্রনাথ। ১৮৮০ সালের ৯ মার্চ একহাজার কপি ছাপা হয়েছিল এবং মূল্য ধার্য হয়েছিল আট আনা। রবীন্দ্রনাথ এই দ্বিতীয় বইটির প্রসঙ্গে লিখেছিলেন,

….দাদা সোমেন্দ্রনাথ অন্ধ পক্ষপাতিত্বের উৎসাহে এটি গ্রন্থ আকারে ছাপাইয়াও ছিলেন।…” 

এই কাব্যগুলি আগে জ্ঞানাঙ্কুর ও প্রতিবিম্ব পত্রিকায় ধারাবাহিক ছাপা হয়েছিল। প্রসঙ্গত বলা যেতে পারে রবীন্দ্রনাথের দ্বিতীয় গ্রন্থটিরও দ্বিতীয় সংস্করণ আর কখনও মুদ্রিত বা প্রকাশিত হয়নি। 

এরপর রবীন্দ্রনাথের আরো বই ছাপা হল। তবে প্রথম দিককার বইগুলির মধ্যে মাত্র চারটে বই দ্বিতীয় বা তৃতীয় সংস্করণ প্রকাশ পায়। এতে প্রমাণ হয় সে আমলে রবীন্দ্রনাথের প্রথম দিকের বইগুলির বাজার বা চাহিদা আশানুরূপ ছিল না। তবে বাল্মীকিপ্রতিভা বইটি জনপ্রিয়তা অর্জন করে। তিনটি সংস্করণ বেরিয়েছিল বারো বছরের মধ্যে। এই সময়ে কবির প্রথম গানের বই ‘রবিচ্ছায়া’ প্রকাশিত হয়। প্রকাশকাল ১৮৮৫ সাল, ২ জুন। ১৯০ পৃষ্ঠার এই বইটি এক হাজার কপি ছাপা হবার পর দাম রাখা হয়েছিল বারো আনা। এরপরই অবাক হবার পালা। সাত মাস কাটতে না কাটতেই তৎকালীন সাপ্তাহিক সঞ্জীবনী পত্রের বেশ কয়েকটি একটি বিজ্ঞাপন দেওয়া হল। বিজ্ঞাপনে লেখা হল,

মূল্য কমিল রবিচ্ছায়া মূল্য কমিল”।

রবীন্দ্রনাথের লেখা প্রথম গানের বইয়ের মূল্য কমানো হল? তারমানে রবিচ্ছায়া বাজারে মোটেই কাটছিল না। বিজ্ঞাপনের শেষে লেখা হয়েছিল, “সঞ্জীবনী এবং ভারত শ্রমজীবী’র গ্রাহকগণ আমার নিকট মূল্য পাঠাইলে ছয় আনা মূল্যে পাইবেন।” ভাবা যায় বইটি অর্ধেক মূল্যে ছাড়তে হয়েছিল প্রকাশকদের। 

রবীন্দ্রনাথের প্রথম যে গ্রন্থাবলী প্রকাশিত হয় ১৮৯৭ সালে, সেটি আসলে তাঁর কাব্যগ্রন্থাবলী। ৪৭৬ পাতার এই বৃহদ বইটি প্রকাশ করেন কবির ভাগ্নে সত্যপ্রসাদ গঙ্গোপাধ্যায়। এই গ্রন্থে কৈশোরক থেকে বাল্মীকি প্রতিভা, সন্ধ্যাসঙ্গীত সহ সোনার তরী, চিত্রাঙ্গদা, বিদায় অভিশাপ চৈতালি, গানের বহি প্রভৃতি কুড়িটা কাব্যই স্থান পেয়েছিল। তিন রকমের ছাপা ও বাঁধাই হয়েছিল গ্রন্থটি। সুলভ, মধ্যম এবং উৎকৃষ্ট সংস্করণের জন্য তিন রকমের মূল্যও ধার্য করা হয়। সুলভ সংস্করণের কম দাম রেখে সেদিন কিন্তু রবীন্দ্রনাথের কাব্যগ্রন্থাবলী আশানুরূপ বিক্রি হয়নি। 

আজ বাংলা বইয়ের জগতে যিনি সর্বকালের শ্রেষ্ঠ এবং সর্বোত্তম বেস্টসেলারের আসন অলংকৃত করে আছেন, সেই লেখক নোবেল পুরস্কার পাবার আগে পর্যন্ত তাঁর বইয়ের প্রকাশ এবং বাজার সম্পর্কে কতটা যে চিন্তিত এবং কাতর ছিলেন তা বোঝা যায় তাঁর একটি পত্র থেকে। শিলাইদহ থেকে প্রিয়নাথ সেনকে ১৯০০ সালের ৮ আগস্ট চিঠিতে লিখলেন,

নিজের বই এবং নিজের দেহটা ছাড়া সম্প্রতি আর কিছু বিক্রেয় পদার্থ আমার আয়ত্তের মধ্যে নেই — বই কেনবার মহাজন পাওয়া দুর্লভ, এবং নিজেকে বিক্রয় করতে গেলেও খরিদ্দার পাওয়া যেত কিনা সন্দেহ।….”

কেন এমন বলেছিলেন সে উত্তরও তাঁর সেই পত্রের ছত্রে ছত্রে পাওয়া যায়। 

আমার গ্রন্থাবলী এবং ক্ষণিকা পর্যন্ত সমস্ত কাব্যের Copyright কোনও ব্যক্তিকে ৬০০০ টাকায় কেনাতে পার? শেষের যে বইগুলি বাজারে আছে সে আমি সিকি মূল্যে তারই কাছে বিক্রি করব — গ্রন্থাবলী যা আছে সে এক তৃতীয়াংশ দামে দিতে পারব।…”

অবাক লাগে এই ভেবে যে রবীন্দ্রনাথ প্রথম জীবনে অর্থাৎ চল্লিশ বছর বয়সে নিজের বইকে সিকি মূল্যেও বিক্রি করে দিতে উদ্যোগী হয়েছিলেন কারণ তাঁর বইয়ের বাজার আশানুরূপ তো ছিলই না, বরং মন্দাই ছিল। 

আজকাল বই বিক্রির জন্য যেমন বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়, উনিশ বা বিশ শতকেও সে রকম বিজ্ঞাপনের চল ছিল ভালোই। রবীন্দ্রনাথের বই বিক্রির জন্যও প্রকাশকেরা বিজ্ঞাপন দিতেন বিভিন্ন পত্রপত্রিকায়। ১৮৮৭ সালে ভারতী পত্রিকায় রবীন্দ্রনাথের কড়ি ও কোমলের একটি বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়েছিল এমন,

নূতন কবিতাপুস্তক! নূতন কবিতাপুস্তক!

  কড়ি ও কোমল

  শ্রীযুক্ত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রণীত।

মূল্য : ডাক মাসুল সহিত এক টাকা মাত্র।

ইহাতে শতাধিক কবিতা আছে। এত বড় গীতিকাব্য বাঙ্গলায় আর প্রকাশিত হয় নাই।…”

এমনই একটি বিজ্ঞাপন ছাপা হল প্রবাসী পত্রিকায় ১৯০৯ সালে। বিজ্ঞাপনটি এমন,

গান 

 শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রণীত

কোকিলকন্ঠ কবি রবীন্দ্রনাথের গানে  বাঙলা দেশ আজ মুগ্ধ, সুতরাং আপনিও হয়ত তাঁহার দুই চারিটা জানেন কিংবা তাঁহার গানের একখানি বইও হয়ত সংগ্রহ করিয়াছেন। কিন্তু সভায় , সমাজে, সম্মিলনে যেখানে যত গান তিনি গাহিয়াছেন, তাহার একখানি উত্তম সংগ্রহ আপনার নিকটে আছে কি? যদি না থাকে, তবে এই নবপ্রকাশিত গানের একখন্ড সংগ্রহ করুন।…”

ওই বছরই প্রবাসীতে কবির দুটি উপন্যাসের বিজ্ঞাপন ছাপা হল । প্রথম বিজ্ঞাপনটি এমন

রবীন্দ্রবাবুর চোখের বালি

দ্বিতীয় সংস্করণ কাগজ মসৃণ, ছাপা অতি সুন্দর, চমৎকার সুবর্ণখচিত কাপড়ে বাঁধান, ৩৩৮ পৃষ্ঠায় সমাপ্ত।…. বিংশ শতাব্দীর সর্বশ্রেষ্ঠ লেখকের সর্বশ্রেষ্ঠ সামাজিক উপন্যাস।”

এছাড়াও রবীন্দ্রনাথের আরো অনেক বইয়েরই বিজ্ঞাপন সে আমলে নানা পত্রপত্রিকায় ছাপা হত। ফলে বোঝাই যাচ্ছে কবির বই বিক্রির জন্যও সুমধুর ভাষা ব্যবহার করে বিজ্ঞাপন দেওয়া হত। অতএব বই প্রকাশ, বই বিক্রি, বই বিজ্ঞাপন রবীন্দ্রনাথের মতো কবির ক্ষেত্রেও যে কতটা বড়ো ভূমিকা পালন করত তা আজকের যুগে বসে ভাবলে বিস্মিত হতে হয়। পরে অবশ্য নিজে বিশ্বভারতী থেকে বই প্রকাশের দায়িত্ব নেন। আজও তো কবি লেখকদের বই নিয়ে এমন কৌতুক আমরা বইমেলার সময়ে দেখে থাকি। 

[ গ্রন্থঋণঃ জীবনস্মৃতি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, চিঠিপত্র ৮ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, রবীন্দ্রপরিচয়প্রশান্তকুমার পাল

রবিজীবনী (দ্বিতীয়, তৃতীয় এবং চতুর্থ খন্ড) – প্রশান্তকুমার পাল, রবীন্দ্রপুস্তক প্রকাশনার সেকাল একাল( কোরক মেআগস্ট ২০০৯ সংখ্যা )- অমিত্রসূদন ভট্টাচার্য ]

চেনা কবি অচেনা রবি ()

তেরোটি সন্তান প্রসব করার পর গর্ভে যখন তাঁর অষ্টম পুত্র এল তখন বয়স আনুমানিক ৩৫ বছর!!

এর ঠিক তেরো বছর দশমাস পর সেই অষ্টম পুত্রটিই একটি ভয়ঙ্কর রাতের কথা লিখেছিলেন,

তখন কত রাত্রি জানি না, একজন পুরাতন দাসী আসিয়া চীৎকার করিয়া কাঁদিয়া উঠিল

ওরে, তোদের কী সর্বনাশ হল রে!!’… 

স্তিমিত প্রদীপের অস্পষ্ট আলোকে ক্ষণকালের জন্য জাগিয়া উঠিয়া হঠাৎ বুকটা দমিয়া গেল, কিন্তু কী হইয়াছে ভালো করিয়া বুঝিতেই পারিলাম না!!” 

বোঝার কথাও নয়।তাঁর তখন বয়স ভারী অল্প।

সেদিনের সেই নিশ্চুপ নির্জন রাতের প্রহর পার করে যখন পূবাকাশে প্রথম আলোর চরণধ্বনি শোনা গেল, তখন বাইরের বারান্দায় এসে তিনি দেখলেন

তাঁহার সুসজ্জিত দেহ প্রাঙ্গণে খাটের উপর শয়ান!!” 

তখনও তাঁর তেরো বছরের অনভিজ্ঞ চোখ বিশ্বাস করতে চায়নি সে দৃশ্যের ভয়ঙ্কর রূপটি!! 

মৃত্যূ যে ভয়ংকর সে দেহে তাহার কোনো প্রমাণ ছিল না…!!”

মৃত্যূর সে ভয়ঙ্কর রূপটিকে তিনি টের পেলেন যেমন করে তা বর্ণনা করলেন তাঁর সুললিত লেখনীর আঁচড়ে,

কেবল যখন তাঁহার দেহ বহন করিয়া বাড়ির সদর দরজার বাহিরে লইয়া গেল!!” 

আর সকলের সঙ্গে যখন 

তাঁহার পশ্চাৎ পশ্চাৎ শ্মশানে চলিলাম তখনই শোকের সমস্ত ঝড় যেন একেবারে এক দমকায় আসিয়া মনের ভিতরটাতে এই একটা হাহাকার তুলিয়া দিল…” 

যে হাহাকারের কথা এরপর তাঁর বালক মনে অনুরণিত হতে লাগল বারবার

এই বাড়ির এই দরজা দিয়া মা আর একদিনও তাঁহার নিজের ঘরকরনার মধ্যে আপনার আসনটিতে আসিয়া বসিবেন না!!”…. 

এই স্মৃতিচারণ রবীন্দ্রনাথ, মা’কে নিয়ে করেছেন।

কবির মা, সারদাসুন্দরী দেবীর পরিচয় দিতে গেলে জানা যায়, মাত্র ছয় বছর বয়সে জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে বিয়ে হয়ে যশোর জেলার দক্ষিণডিহি থেকে এসেছিলেন। জ্ঞানদানন্দিনী দেবী তাঁর শাশুড়ির বিয়ের কথা বলতে গিয়ে লিখেছিলেন,

তাঁর [ সারদা দেবীর ] এক কাকা কলকাতায় শুনেছিলেন যে আমার শ্বশুরমহাশয়ের জন্য সুন্দরী মেয়ে খোঁজা হচ্ছে। তিনি দেশে এসে আমার শাশুড়িকে ( তিনি তখন ছয় বৎসরের মেয়ে ) কলকাতায় নিয়ে গিয়ে বিয়ে দিলেন। তখন তাঁর মা বাড়ি ছিলেন না — গঙ্গা নাইতে গিয়েছিলেন। বাড়ি এসে মেয়েকে তাঁর দেওর না বলে কয়ে নিয়ে গিয়েছেন শুনে উঠোনে এক গাছতলায় গড়াগড়ি দিয়ে কাঁদতে লাগলেন। তার পরে সেখানে পড়ে কেঁদে কেঁদে অন্ধ হয়ে মারা গেলেন।…” 

খুবই মর্মান্তিক এ কাহিনি। সারদা দেবী যখন জোড়াসাঁকোর ভিটেতে প্রবেশ করেন তখন দ্বারকানাথের রমরমা অবস্থা। কথিত আছে পুত্রবধূর সৌভাগ্যকে ব্যবসার সাফল্য ধরে নিয়ে দ্বারকানাথ বালিকা সারদা দেবীকে এক লক্ষ টাকার হিরেমুক্তো বসানো খেলনা (?) উপহার দিয়েছিলেন। 

তা কেমন দেখতে ছিলেন জোড়াসাঁকো বাড়ির এই রত্নগর্ভা কর্তা মা?? কী বলছেন অবন ঠাকুর তাঁর ‘ঘরোয়া’তে??

কর্তাদিদিমাকে দেখেছি। তাঁর ছবিও আছে,…। ফোটো দিন দিন ম্লান হয়ে যাচ্ছে ও যাবে, কিন্তু তাঁর সেই পাকা চুলে সিঁদুরমাখা রূপ এখনও আমার চোখে জ্বলজ্বল করছে, মন থেকে তা মোছবার নয়। কর্তাদিদিমা রূপসী ছিলেন, কিন্তু ওই ছবি দেখে কে বলবে। ছবিটা যেন কেমন উঠেছে।…”

জ্ঞানদানন্দিনী দেবী তাঁর শাশুড়ি সম্পর্কে অবশ্য আরো তথ্য দিয়েছেন। 

আমার মনে পড়ে বাবামশায় যখন বাড়ি থাকতেন আমার শাশুড়িকে একটু রাত করে ডেকে পাঠাতেন, ছেলেরা সব শুতে গেলে। আর মা একখানি ধোয়া সুতি শাড়ী পরতেন, তারপর একটুখানি আতর মাখতেন। এই ছিল তাঁর রাতের সাজ।…”

এই বর্ণনা থেকে বোঝা যায় সেই আমলে স্বামীর সঙ্গে সচরাচর দেখা হওয়াটাও কত দুর্লভ ছিল স্ত্রীদের। কবির মায়ের যে বিদ্যার প্রতি অনুরাগ ছিল সেকথা জানা যায় স্বর্ণকুমারী দেবীর লেখা থেকে,

মাতাঠাকুরানী ত কাজকর্মের অবসরে সারাদিনই একখানি বই হাতে লইয়া থাকিতেন। চাণক্যশ্লোক তাঁহার বিশেষ প্রিয় পাঠ ছিল, প্রায়ই বইখান লইয়া শ্লোকগুলি আওড়াইতেন। তাঁহাকে সংস্কৃত রামায়ণ পড়িয়া শুনাইবার জন্য প্রায়ই কোনো না কোনো দাদার ডাক পড়িত।…”

রবীন্দ্রনাথও জীবনস্মৃতিতে মায়ের এই মার্বেল কাগজ মোড়া কোণ ছেঁড়া রামায়ণের কথা লিখেছেন। 

এরপর পরবর্তী দীর্ঘ ছয় দশকেরও উপর তাঁর বুকের উপর দিয়ে এমন নানা শোকের ছায়া ক্রমাগত দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয়েছে!! 

১৯০৮ সালে শান্তিনিকেতনের উপাসনা মন্দিরের এক উপদেশে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন এক স্বপ্নের কথা!! 

আমার একটি স্বপ্নের কথা বলি!! আমি নিতান্ত বালককালে মাতৃহীন!! আমার বড়ো বয়সের জীবনে মার অধিষ্ঠান ছিল না!! কাল রাত্রে স্বপ্ন দেখলুম, আমি যেন বাল্যকালেই রয়ে গেছি!! গঙ্গার ধারের বাগানবাড়িতে মা একটি ঘরে বসে রয়েছেন!! মা আছেন তো আছেনতাঁর আবির্ভাব তো সকল সময়ে চেতনাকে অধিকার করে থাকে না!! আমিও মাতার প্রতি মন না দিয়ে তাঁর ঘরের পাশ দিয়ে চলে গেলুম!! বারান্দায় গিয়ে এক মুহূর্তে আমার কী হল জানিনেআমার মনে এই কথাটা জেগে উঠল যে, মা আছেন!! তখনই তাঁর ঘরে গিয়ে তাঁর পায়ের ধুলো নিয়ে তাঁকে প্রণাম করলুম!! তিনি আমার হাত ধরে আমাকে বললেন, “তুমি এসেছ!!” এই খানেই স্বপ্ন ভেঙে গেল…..” 

সন্তানদের প্রতি তাঁর উদাসীনতার কথা পারিবারিক নানা রচনা থেকে জানা যায়। যদিও রবীন্দ্রবিশেষজ্ঞরা একে উদাসীনতা বলতে নারাজ। তাঁদের মতে এটি বনেদি বাড়ির একটা পারিবারিক প্রথামাত্র। 

প্রসঙ্গক্রমে রবীন্দ্রনাথের ভাগ্নি সরলা দেবীর একটি স্মৃতিচারণ দেখা যাক্।

মায়ের আদর কী তা জানিনে, মা কখনো চুমু খাননি, গায়ে হাত বোলাননি। মাসিদের ধাতেও এসব ছিল না। শুনেছি কর্তাদিদিমার কাছ থেকেই তাঁরা এই ঔদাসীন্য উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছিলেন।…”

রবীন্দ্রনাথও তাঁর মায়ের পরশ নাপাওয়ার যন্ত্রণাকে ব্যাখ্যা করেছিলেন এমন করে,  

মাকে আমরা জানিনি, তাঁকে পাইনি কখনো!! তিনি থাকতেন তাঁর ঘরে তক্তাপোশে বসে, খুড়ির সঙ্গে তাস খেলতেন!! আমরা দৈবাৎ গিয়ে পড়তুম সেখানে, চাকররা তাড়াতাড়ি আমাদের সরিয়ে আনতযেন আমরা একটা উৎপাত!! মা যে কী জিনিস তা জানলুম কই আর!!” 

অভিমানে তাই বলেছিলেন

তাই তো তিনি আমার সাহিত্যে স্থান পেলেন না!!” 

কী যে নিদারুণ করুণ ঘটনা!!.. 

পরবর্তীকালে তিনি একটি গান বেঁধেছিলেন এমন

আঁধার দেখে তরাসেতে //

চাহিলাম তোর কোলে যেতে // 

সন্তানেরে কোলে তুলে নিলি নে // 

ছেলের প্রাণে ব্যথা দিয়ে // 

যদি, মা, তোর জুড়ায় হিয়ে //

ভালো, ভালো, তাই তবে হোক–// 

অনেক দুঃখ সয়েছি // 

মা, আমি তোর কী করেছি….!!”

সারাজীবন এত গান কবিতা গল্প উপন্যাসের রচনা করেছেন যিনি, তিনি তাঁর সমগ্রজীবনে একটি গ্রন্থও মা’কে উৎসর্গ করে যাননি!! 

ভাবলে শুধু অবাক নয়, তাঁর অভিমানের পরশ টের পাওয়া যায়!!

শিল্পী - গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর

চেনা কবি অচেনা রবি ()

শুধু কি কবি!! তা কেন, কত বিচিত্র যে তাঁর কাজের ক্ষেত্র, সেই বিষয়েও গভীর গবেষনা হতে পারে।

অল্প বয়স থেকেই জোড়াসাঁকোর বাড়ির চৌকাঠ পেরিয়ে ব্রাহ্মসমাজের নানাবিধ উৎসবে যোগ দিতে হত। এ ছিল যেন অলিখিত এক নিয়মের বেড়াজাল। জীবনে যিনি নিয়মতে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে এসেছেন বরাবর সেই তিনিই কিন্তু পিতার আদেশকে অমান্য করেননি।

ছেলেবেলা’য় নিয়মের কথা প্রসঙ্গে বলেছিলেন, ‘নিয়মের শেখা যাদের ধাতে নেই তাদের শখ অনিয়মের শেখায়।’ আসলে জীবন গড়ার নিয়মানুবর্তিতায় তিনি ব্রাহ্মসমাজের উপাসনা বা প্রার্থনাকে কখনও দূরে সরিয়ে দেননি। ধীরে ধীরে একদিন তাঁকেই আচার্যের আসন অলংকৃত করতে হয়েছে। ইতিমধ্যেই তাঁর কাব্য এবং সংগীত বিদ্দজন সমাজে সমাদর পেতে শুরু করেছে। সভাসমিতি থেকে কবিতা পাঠ ও গান শোনানোর অনুরোধ আসছে। যে কবি বাড়ির তেতলার ছাদের ঘরে দাদা বৌদিদের দরবারেই শুধু গান এবং কবিতা চর্চায় মগ্ন থাকতেন, তিনি এখন বাইরে। অথচ এই রবিকে নিয়েই তাঁর বালক বয়সে ওই বাড়ির লোকজনদের কত দুশ্চিন্তা ছিল!! একদিন তো তাঁর বড়দিদি, সৌদামনীদেবী বলেই ফেললেন, ‘আমরা সকলেই আশা করিয়াছিলাম বড়ো হইলে রবি মানুষের মতো হইবে, কিন্তু তাহার আশাই সকলের চেয়ে নষ্ট হইয়া গেল।’ রবীন্দ্রনাথ নিজেও স্বীকার করেছেন, বলেছেন, ‘আমি বেশ বুঝিতাম, ভদ্রসমাজের বাজারে আমার দর কমিয়া যাইতেছে…!’

সেই বালকের বয়স যখন চোদ্দ বছর, বৃহত্তর জনসমাজের সামনে সেই প্রথম রবীন্দ্রপ্রতিভা বিকাশের ডাক এল। কলকাতায় তখন হিন্দুমেলার নবম বার্ষিক অধিবেশন বসেছে। তৎকালীন সার্কুলার রোড়ের পার্সিবাগানে বসেছিল এই মেলা। অধিবেশনের উদ্বোধনী দিনে বালক রবীন্দ্রনাথ একটি স্বরচিত কবিতা আবৃত্তি করেন। ‘হিন্দুমেলার ইতিবৃত্ত’এ যোগেশচন্দ্র বাগল এই প্রসঙ্গে লিখেছিলেন, ‘এবারেই সর্ব্বপ্রথম কিশোর রবীন্দ্রনাথ সাধারণ সমক্ষে দাঁড়াইয়া ‘হিন্দুমেলার উপহার’ শীর্ষক স্বরচিত একটি কবিতা আবৃত্তি করেন॥’

সেই শুরু। এরপর কবিকে জনমোহিনী চাহিদা আর ঘরে বন্দী করে রাখতে দেয়নি। কবিতাপাঠ থেকে গান, গান থেকে বক্তৃতা সবেতেই তাঁর অনায়াস বিচরণ উপভোগ করেছেন শ্রোতারা। রীতিমতো দাবি রেখেছেন তাঁর প্রতিভার অফুরান ভান্ডারে। আর তিনি বিলিয়েছেন তা অকাতরে। কবিতা বা গানের কথার চর্চা হয়েছে যত না, তাঁর বক্তৃতার কথা জনসমাজে ততটা মুখরিত হয়নি। অথচ তাঁর মতো বাগ্মী এদেশে কজনাই বা আছেন কিংবা ছিলেন। তাঁকে অনর্গল বক্তৃতা দিতে হয়েছে দেশে বিদেশের নানা পথে প্রান্তরে, এবং নানা কারনে। জানা যায় কখনও সখনও বক্তৃতা এতই দীর্ঘ হত যে তা দু ঘন্টা সময়ও অতিক্রম করে যেত। অথচ কখনওই সেই দীর্ঘ ভাষণ বিষয়চ্যূত হত না। বাঁধন ছিল ততটাই মজবুত।

আজ তাঁর একটি ব্যতিক্রমী ভাষণের গল্প হোক।

১৯২০ সালের কথা।। চৈত্র মাস।।

দীর্ঘ ৪২ বছর পর কবি আবার আমেদাবাদ সফরে গেছেন।। তাঁর এবারের সফরসঙ্গী ক্ষিতিমোহন সেন, সন্তোষচন্দ্র মজুমদার প্রমুখ অনেকেই।।

প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় রবীন্দ্রজীবনী গ্রন্থে এই সফর প্রসঙ্গে লিখেছেন,

বোম্বাই স্টেশনে একটা অভ্যর্থনার ঝড় পার হইয়া দিনটা শহরে কাটাইয়া রাত্রির ট্রেনে কবি সদলে আহমদাবাদ যাত্রা করিলেন। সেখানে তাঁহারা অম্বালাল সরাভাইএর অতিথি।অম্বালালের পিতা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথের ভক্ত ছিলেন।আহমদাবাদে পৌঁছিবার পরদিন, Easter Friday ( ২ এপ্রিল ১৯২০ ) গুজরাট সাহিত্যসম্মেলন; কবি তাঁহার ভাষণ ইংরেজিতেই পাঠ করেন।…”

এখানে গান্ধিজির আমন্ত্রণে কবি সদলবলে সবরমতী আশ্রমেও গেলেন একদিন।। আশ্রমের ছাত্ররা, শিক্ষকেরা কবিকে যথাযোগ্য সম্মাননা জানিয়ে সংবর্ধনা দিলেন।। আমেদাবাদে দিনকয়েক কাটিয়ে কবি সেখানকারই দেশীয় রাজ্য, ভাবনগরের উদ্দেশ্যে স্পেশাল ট্রেনে চেপে রওনা দিয়েছিলেন।। ভাবনগরের বৈষ্ণবসমাজের ভজনগান খুবই বিখ্যাত ছিল সেসময়ে। ভক্তনারীদের কন্ঠে মীরাবাঈয়ের ভজন ও সর্বদেহের ছন্দ কবিকে অপার আনন্দ দিত বলে প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় উল্লেখ করেছেন।

সেখানেই ৬ এপ্রিল কবিকে কাঠিওয়াড়ের ভাবনগরে একটি জনসমাবেশে বক্তৃতা দেবার জন্য আমন্ত্রণ এবং অনুরোধ করা হল। কবি সেই আমন্ত্রণ রক্ষাও করেন। সেখানে বৈষ্ণব ভাবশিষ্য ও শিষ্যাদের মাঝে কবি একটি বক্তৃতা দিয়েছিলেন, যাকে এককথায় অভিনব বলা যেতে পারে।।

সেদিন তিনি এভাবে বলতে শুরু করেন..

আপকী সেবামে খড়া হোকর বিদেশীয় ভাষা কহুঁ য়হ হম্ চাহতে নহী!! পর জিস্ প্রান্তমেঁ মেরা ঘর হৈ বহাঁ সভামে কহনে লায়েক হিন্দি কা ব্যবহার হৈ নহী!! মহাত্মা গান্ধী মহারাজকীভী আজ্ঞা হৈ হিন্দিমে কহনেকে লিয়ে!! যদি হম্ সমর্থ হোতা তব ইসসে বড়া আনন্দ ঔর কুছ হোতা নহী!! অসমর্থ হোনে পর ভি আপকি সেবামে মৈ দো চার বাত হিন্দিমে বোলুংগা!!…”

সাহসের বলিহারী!!

কারণ এটাই ছিল কবির বৈচিত্রেভরা জীবনের প্রথম হিন্দিতে বক্তৃতা!!

হিন্দিতে তিনি সে সভায় আরো বলেছিলেন

“…সারী রাহমে আপ্সভোঁকা সমাদরকা স্বাদ পাতে পাতে হম্ আয়ে হৈঁ!! হরেক স্টেশনমে বালবৃদ্ধবনিতা হমকো সৎকার কিয়ে হৈঁ!! মেরা ঘটতো পূর্ণ হোনেকো চলা হৈ, পর্ পূর্ণ ঘটসে আবাজ নিকলনে চাহতী নহী!! তৌভী নিঃশব্দমে য়ানে খামোশ রহকর আপকী প্রীতিকা অর্ঘ্য গ্রহণ করূঁ ঐসী অসভ্যতাভী সহ সকূঁ কিস্ তরহ সে??..”

ভাবা যায় রবীন্দ্রনাথ হিন্দিতে বক্তব্য রাখছেন!! যদিও উপস্থিত শ্রোতাদের এই বক্তৃতা শোনার পর কি প্রতিক্রিয়া হয়েছিল সেকথা আজ আর জানা যায় না!! এই হিন্দি ভাষণের সন্তোষচন্দ্র মজুমদারকৃত অনুলেখনটি ১৩৩১ এর পৌষ সংখ্যা শান্তিনিকেতনপত্রে প্রকাশিত হয়েছিল!!

চেনা কবি — অচেনা রবি ()

আমাদের শিশুকালে ভোগবিলাসের আয়োজন ছিল না বললেই হয়। মোটের উপরে তখনকার জীবনযাত্রা এখনকার চেয়ে অনেক বেশি সাদাসিধা ছিল। তখনকার কালের ভদ্রলোকের মানরক্ষার উপকরণ দেখিলে এখনকার কাল লজ্জায় তাহার সঙ্গে সকলপ্রকার সম্বন্ধ অস্বীকার করিতে চাহিবে। এই তো তখনকার কালের বিশেষত্ব, তাহার ‘পরে আবার বিশেষভাবে আমাদের বাড়িতে ছেলেদের প্রতি অত্যন্ত বেশি দৃষ্টি দিবার উৎপাত একেবারেই ছিল না।”

এই কথাগুলি উনিশ শতকের কথা।স্মৃতিচারণ করেছেন জোড়াসাঁকোর ছয় নং বাড়ির জগদ্বিখ্যাত বাসিন্দা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। বুড়ো বয়সে স্মৃতি রোমন্থন করতে গিয়ে নিজের ‘জীবনস্মৃতি’র ‘ঘর ও বাহির’ পর্ব শুরুই করেছিলেন এমনভাবে। পড়তে পড়তে জানতে ইচ্ছে হতেই পারে কেমন ছিল সেই আমলের জীবন এবং এই বাড়ির ছেলেমেয়েদের আটপৌরে জীবনের সৌখিনতা। 

 তাঁর ‘ছেলেবেলা’য় জানা যায় এমন কথা,

আমি জন্ম নিয়েছিলুম সেকেলে কলকাতায়। শহরে শ্যাকরাগাড়ি ছুটছে তখন ছড় ছড় করে ধুলো উড়িয়ে, দড়ির চাবুক পড়ছে হাড়বেরকরা ঘোড়ার পিঠে। না ছিল ট্রাম, না ছিল বাস, না ছিল মোটরগাড়ি। ….যাঁরা ছিলেন টাকাওয়ালা তাঁদের গাড়ি ছিল তকমাআঁকা, চামড়ার আধঘোমটাওয়ালা; কোচবাক্সে কোচমান বসত মাথায় পাগড়ি হেলিয়ে, দুই সহিস থাকত পিছনে, কোমরে চামর বাঁধা, হেঁইয়ো শব্দে চমক লাগিয়ে দিত পায়েচলতি মানুষকে। মেয়েদের বাইরে যাওয়াআসা ছিল দরজাবন্ধ পাল্কির হাঁপধরানো অন্ধকারে, গাড়ি চড়তে ছিল ভারী মজা। রোদবৃষ্টিতে মাথায় ছাতা উঠত না। কোনো মেয়ের গায়ে সেমিজ পায়ে জুতো দেখলে সেটাকে বলত মেমসাহেবি।…”

সেই সময় এবং মেয়েদের পোশাকের সামান্য নমুনা পাওয়া গেলেও তাঁর ‘ছেলেবেলা’য় ছেলেদের কথা তেমন খুব একটা চোখে পড়ে না। সেই ছেলের ছেলেবেলার পোশাকের কথা জানা যায় বরং ‘জীবনস্মৃতি’র পাতায়। 

আসলে একথা আজ সবাই জানে যে ঠাকুরবাড়ির ছেলেদের শৈশব কাটত চাকরদের অধীনেই। চাকরদের অনুশাসনে তাদের ভাগ্যদেবতা নির্ভর করতেন। ফলে অনাদরের একটা প্রমাণ অনেকের লেখাতেই পাওয়া যায়। অভিভাবকরা ছেলেমেয়েদের ব্যাপারে উদাসীনতাই দেখাতেন। তাঁদের নাগাল পাওয়াই দূরের ছিল। খাওয়ানো, পরানো, বা সাজানোর জন্য বাড়তি কোনো বালাই ছিল না বললেই চলে।

স্মৃতিচারণ এ ব্যাপারে যে সাক্ষ্য দেয় তা হল,

কাপড়চোপড় এতই যৎসামান্য ছিল যে এখনকার ছেলের চক্ষে তাহার তালিকা ধরিলে সম্মানহানির আশঙ্কা আছে। বয়স দশের কোঠা পার হইবার পূর্বে কোনোদিন কোনো কারণেই মোজা পরি নাই। শীতের দিনে একটা সাদা জামার উপরে আর একটা সাদা জামাই যথেষ্ঠ ছিল।আমাদের চটিজুতা একজোড়া থাকিত, কিন্তু পা দুটা যেখানে থাকিত সেখানে নহে। প্রতি পদক্ষেপে তাহাদিগকে আগে আগে নিক্ষেপ করিয়া চলিতাম; তাহাতে যাতায়াতের সময় পদচালনা অপেক্ষা জুতাচালনা এত বাহুল্য পরিমাণে হইত যে, পাদুকাসৃষ্টির উদ্দেশ্য পদে পদে ব্যর্থ হইয়া যাইত।…”

অবাক হতে হয় এই স্মৃতিচারণ পড়তে গিয়ে। বিশ্বাস করতে খটকা লাগে। রবীন্দ্রবিশেষজ্ঞ শ্রীপ্রশান্তকুমার পাল জানাচ্ছেন বুড়ো বেলায় ছেলেবেলার স্মৃতি রোমন্থনে সেই ছেলের নিশ্চয়ই অনিচ্ছাকৃত কিছু ভুল হয়েছিল। ঠাকুরবাড়ির হিসেবের খাতা ক্যাশবইয়ের পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে তিনি দেখেছেন, তাতে লেখা, ‘রবিবিন্দ্রবাবুর ইজের ১২টা’ বারো আনাতে কেনা হয়েছিল ১৮৬৫ সালের ৬ জানুয়ারি। আবার ওই বছরই এপ্রিল মাসের ১৯ তারিখে ক্যাশবই জানাচ্ছে, ‘রবীন্দ্রবাবুর পিরান ১২টা’ দু টাকা দশ আনায় হয়েছে। মজার ব্যাপার তার আগের মাসেই অর্থাৎ মার্চ মাসের ৩০ তারিখে ওই ক্যাশবই লিখেছে, ‘রবিইন্দ্রনাথবাবুর ১২টা পীরান’ খাতে খরচ লেগেছে পাঁচ টাকা সাড়ে পাঁচ আনা। এত অল্প সময়ের মধ্যে শুধু সেই ছেলে, রবীন্দ্রনাথের জন্যই এতগুলি পিরান এবং ইজের কেনা হয়েছিল। এবং অবশ্যই আটপৌরে ও পোশাকী দু রকমেরই জামাকাপড় অন্তত দাম দেখে তো সেটাই বোঝা যায়। আর শীতের পোশাক?? সে খবরও ক্যাশবই থেকে মেলে। ১৮৬৮ সালে শীতের দিনে জানুয়ারি মাসের  ২৬ শে ক্যাশবই থেকে জানা যায়, সোমেন্দ্রনাথ, রবীন্দ্রনাথ এবং সত্যপ্রসাদের জন্য বনাতের ( পশুলোমজাত পশমের বস্ত্র ) চাপকান তৈরি হয়েছিল। 

ছেলেবেলায় নিজের পোশাক নিয়ে রবীন্দ্রনাথ আর বিশেষ কিছু বলে যাননি। তবে প্রথমবার বিলেত যাত্রাকালে তাঁর পোশাকের বর্ণনা পাওয়া যায়। তাঁর জন্য ছটা সাদা জোব্বা, একটা চাপকান, এবং কাশ্মীরি পেন্টালুন তৈরি করানো হয়েছিল। এমনই টুকরো টুকরো করে কবির ড্রেসের কথা জানা যায়। যেমন বিয়ে করার কেমন সাজ ছিল তার একটা আভাস পাওয়া যায় জোড়াসাঁকোর পাঁচ নং বাড়ির ছেলে অবনীন্দ্রনাথের স্মৃতিকথায়। রবীন্দ্রনাথ তখন রীতিমত কবি হিসেবে খ্যাতিলাভ করেছেন। 

গায়ে হলুদ হয়ে যাবার পর আইবুড়োভাত হয়েছিল কবির। তখনকার দিনে ছয় নং বাড়ির কোনো ছেলের গায়ে হলুদ হয়ে গেলেই পাঁচ নং বাড়িতে তাকে নেমতন্ন করে আইবুড়োভাত খাওয়ানো হত। সেই মত খুব ধূমধাম করে খাওয়ানো হয়েছিল সেদিন রবীন্দ্রনাথকে।

পিসিমারা রবিকাকাকে ঘিরে বসেছেন, এ আমাদের নিজের চোখে দেখা। রবিকাকা দৌড়দার শাল গায়ে, লাল কী সবুজ রঙের মনে নেই, তবে খুব জমকালো রঙচঙের। বুঝে দেখো, একে রবিকাকা, তায় ওই সাজ, দেখাচ্ছে যেন দিল্লির বাদশা!…”

এহেন রবীন্দ্রনাথের সর্বজনপরিচিত ড্রেসটি কেমন করে তাঁর অঙ্গে উঠে এসেছিল সেই কাহিনিটিও কম চমকপ্রদ নয়। ঠাকুরবাড়ির পুরুষেরা একসময়ে লম্বা কোট এবং পিরালি পাগড়ি পরতেন। রবীন্দ্রনাথকেও সেই পোশাকে দেখা গেছে। কিন্তু  শেষ পর্যন্ত জোব্বাই লম্বা কোটকে পরাস্ত করে তাঁর প্রিয় হয়ে উঠেছিল। উনিশ শতকের গোড়ায় একবার এই অভিজাত বাড়িতে জাপানি শিল্পীরা এসেছিলেন। সেদিন তাঁদের পরনে ছিল কিমোনো জাতীয় পোশাক। এই পোশাকটি পাঁচ নং বাড়ির ছেলে গগনেন্দ্রনাথের নজর কাড়ে। শিল্পী বলে কথা! এই পোশাকটিকে কী করে, কোন ছাঁচে ফেলে দেশীয় রূপ দেওয়া যায় তিনি ভাবতে শুরু করলেন। একটার পর একটা নকশা কাটতে কাটতে শেষে একটি নকশাকে তিনি নিজেই ঠিক করলেন। একেবারে ভিনদেশী ফ্যাশনের সঙ্গে বাঙালিয়ানার মিশেল যেন। গগন ঠাকুর জোড়াসাঁকোর বাড়িতে ব্যবহৃত সেই লম্বা কোট এবং পাগড়ি একদমই পছন্দ করতেন না। তখন পাশের চিৎপুরের দর্জিপাড়া থেকে ফতেহউল্লা নামে এক দর্জি ওস্তাদের সাহায্যে জাপানি পোশাকটির মতই নিজের নকশায় দুটি নতুন পোশাক তৈরি করিয়ে নিলেন। পোশাকদুটি তৈরি হয়ে এলে চটজলদি ভাই অবনীন্দ্রনাথ এবং সমরেন্দ্রনাথকে ডেকে পোশাকদুটি পরিয়েই ছাড়লেন। ব্যস্, অবন ও সমরকে এমন অভিনব ও নতুন পোশাকে দেখে রবীন্দ্রনাথ খুবই আকৃষ্ট হন। এতটাই আকৃষ্ট হন যে তখনই কবিও গগনেন্দ্রনাথ ও ফতেহউল্লার শরণাপন্ন হন। এবং বিশেষ ধরনের জোব্বা ও টুপি গড়িয়ে নেন।তারপর থেকে সেই পোশাকেই তিনি সর্বত্র স্বচ্ছন্দ এবং পরিচিত হন। এরপরে অবশ্য জাপানি কিমোনো ব্যবহার কবি নিজের মত করে করেন। কিমোনোর সঙ্গে তিব্বতীদের বাকুর মিশ্রণে জোব্বা তৈরি করেও পরেছেন। পাহাড়ি কিংবা বাউলদের পোশাকেরও মিশ্রণ রবীন্দ্রনাথের পোশাকে দেখা যায়। ঐতিহ্য ও আধুনিকতার মিশেলে পোশাক তৈরি ও নির্বাচনে তিনি পটু শুধু নয়, নিপুণও ছিলেন। পরবর্তীকালে পোশাকে তিনি এমনই স্টাইল আনেন, যেখানে জোব্বার হাতা, কলারের ধরন, জোব্বার বোতাম, জোব্বার দৈর্ঘ্য সবেতেই নতুনত্ব ছিল।তাই নিশ্চিতভাবেই বলা যায় রবীন্দ্রনাথের প্রথম ড্রেস ডিজাইনার হলেন ইন্ডিয়ান সোসাইটি ফর ওরিয়েন্টাল আর্টের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য, তাঁরই ভাইপো, গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর।

গত পর্বের লিঙ্ক – https://banglalive.com/why-did-rabindranath-tagore-stop-using-shree-before-his-name/

চেনা কবি অচেনা রবি ( )

১৯১১। ডিসেম্বর মাস। শীতের সকাল। রবীন্দ্রনাথ শান্তিনিকেতন থেকে রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়কে চিঠিতে জানালেন, কলকাতায় এসেছেন। উপলক্ষ্য কন্যা মীরার একটি পুত্র সন্তান ভূমিষ্ঠ হয়েছে। নবাগত দৌহিত্রকে কবি আদর করে ‘নিতাই’ নামেই ডাকতে শুরু করলেন। যদিও তাঁর নামকরণ নিয়ে জোড়াসাঁকোর বাড়িতে খুব আপত্তি উঠল। নীতীন্দ্রনাথ নামটি না হলেই ভালো। কারণ, কবির বড়দাদা, দ্বিজেন্দ্রনাথের তৃতীয় পুত্রের নাম ছিল নীতীন্দ্রনাথ। পারিবারিক মতবিরোধ যখন তুঙ্গে, তখন কবি আমেরিকা থেকে জামাতা নগেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায়কে ১৯১৩ সালের ১৬ ফেব্রয়ারি মাসে নীতীন্দ্রনাথ নামকরণের সপক্ষে সরাসরি একটি চিঠি লিখে জানালেন,

মীরা লিখেছে তোমার ছেলের নাম নীতু রাখলে কেউ কেউ তার নাম উচ্চারণ করতে পারবে না। এ কথার কোনো মূল্য নেই। ওঁরা কি রবি সিংহের নাম করেন না? মেজদাদার নামের সঙ্গে সত্যর নামের যোগ আছে বলে কি মেয়েরা সত্যকে আর কিছু বলে ডাকে? বাবামশায়ের নাম তো খুব সাধারণ, সে নাম কি কেউ উচ্চারণ করে না?…”

শেষ পর্যন্ত কবির ইচ্ছেই মান পেল। ছোট্ট নীতীন্দ্রনাথকে এমন ভাবেই কবি ভালোবাসতেন। সে কতটা ভালোবাসা তা নীতীন্দ্রনাথের জীবনের ছোট ছোট নানা ঘটনার মধ্যেই লুকিয়ে আছে। সেবারই কবি যখন লন্ডনে, ঘরে নীতুর ছবি যত্ন করে রেখে, কন্যা মীরাকে লিখেছিলেন,

মীরু, তোর খোকার হাঁ করা হাবলা ছবিটা Mantel Piece –এর উপর আছে — সেটা প্রায়ই আমার নজরে পড়ে। “

শুধু এইটুকু বলেই থেমে যাননি। স্বীকার করেছেন ছোট্ট নাতিটিকে দেখতে তাঁর মন বড়ো উতলা হয়ে ওঠে। মীরাদেবীর এই ছেলেটি ছোট থেকেই রুগ্ন ছিল। তাঁর একজিমা ছিল, ফলে অল্পেতেই অসুখবিসুখ করত। কবি এই কারণে উদ্বিগ্ন থাকতেন। মীরাদেবীকে চিঠিতে চিকিৎসার পরামর্শ দিতেন। যেমন,

…Sulplur 200 আনিয়ে নিয়ে দুটো বড়ি খোকাকে খাইয়ে দিস। তারপর আবার একমাস অপেক্ষা করে আবার খাওয়াস। Eczema যদি বসে গিয়ে থাকে তবে Sulphur –এ সেই দোষ নিবারণ করবে।…”

কবির এই কনিষ্ঠ কন্যার বৈবাহিক সম্পর্কের জন্য দুশ্চিন্তার কোনো অন্ত ছিল না। মীরাদেবী এবং নগেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায়ের সম্পর্ক দিনের পর দিন জটিল থেকে জটিলতর হয়ে উঠেছিল। ফলে নীতীন্দ্রনাথের শৈশবটি খুবই অস্থিরতার মধ্যে কেটেছে। কবি তাঁকে শান্তিনিকেতনে নিজের কাছে নিয়ে এসেছিলেন। শুধু তাঁকেই নয় মীরাদেবীর কন্যা নন্দিতাকেও এনেছিলেন। কবির ইচ্ছে ছিল, শান্তিনিকেতনে ব্রহ্মচর্যাশ্রমে তাঁদের শিক্ষা হোক। সেইমতো নীতীন্দ্রনাথকে ভর্তিও করিয়ে দেন। কবির এই ইচ্ছেকে নগেন্দ্রনাথ মানতে না পেরে পুত্রকে নিজের কাছে রাখার উদ্যোগ করেন। নিজের নানা কর্মস্থলে, যেমন কলকাতা, পুনে, হায়দ্রাবাদ নানা জায়গায় নিয়ে গিয়ে থাকতে শুরু করেন। কবি তখন অসহায়। নিরুপায়। অথচ মীরা দেবী কিন্তু চাইতেন পুত্র কন্যা নিয়ে শান্তিনিকেতনে থাকতে।

বাপমায়ের এই টানাপোড়েনে নীতীন্দ্রনাথের জীবন গড়ার ভিতটি একেবারে তছনছ হয়ে যায়। অথচ তাঁর অনেক গুণ ছিল।

কবির এই নাতিটি ছোট থেকেই গানে অভিনয়ে পারদর্শী হয়ে উঠেছিল। ১৯২১ সালের ২ অক্টোবর শান্তিনিকেতনে ‘ঋণশোধ’ নাটকটি মঞ্চস্থ হয়। ‘দি ইন্ডিয়ান ডেইলি নিউজ’ পত্রিকাতে সেই নাটকে নীতীন্দ্রনাথের অভিনয় প্রশংসিত হয়েছিল,

শ্রীমান নীতীন্দ্রনাথ গাঙ্গুলি, কবির পৌত্র, উপেন্দ্রর ভূমিকায় অতি সুন্দর অভিনয় করিয়া অভিনয়ের আত্মাকে বিকশিত করিয়া তুলিয়াছিলেন। তাঁহার বয়সের পক্ষে তাঁহার অভিনয় পরিণত স্তরের হইয়াছিল।।…”

এছাড়া, তাঁর গুণের কদর করে ‘আনন্দবাজার পত্রিকা’ও, সেটি ১৩২৯ সনের ৩ আশ্বিনের খবর। ‘শারদোৎসব ‘ নাটক প্রসঙ্গে ‘আনন্দবাজার পত্রিকা’র পাতায় লেখা হয়,

…‘বিশ্বভারতী’র উদ্যোগে রবীন্দ্রনাথের ‘শারদোৎসব ‘ নাটিকা গত সোমবার পুনরায় ম্যাডন থিয়েটারে অভিনীত হইয়াছিল। এবারও রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং সন্ন্যাসীর ভূমিকায় অভিনয় করিয়াছিলেন। অভিনয় চমৎকার হইয়াছিল। রবীন্দ্রনাথ নিজে ২টি গানও গাহিয়াছিলেন। শ্রীযুক্ত জগদানন্দ রায় ও শ্রীযুক্ত অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অভিনয় খুব স্বাভাবিক হইয়াছিল। কিন্তু সকলের চেয়ে আমাদের ভাল লাগিল উপানন্দের ভূমিকায় রবীন্দ্রনাথের দৌহিত্রের অভিনয়। এমন মধুর অভিনয় আমরা খুব কমই দেখিয়াছি। বালকবালিকাদিগের ‘কোরাসের’ গানগুলিও ভাল হইয়াছিল।…”

এছাড়া বালক নীতুর কথা এল্মহার্স্টের ডায়েরির পাতাতেও আছে। ১৯২১ সালে, শান্তিনিকেতনে ২২ জানুয়ারি পিয়ারসনের বাড়ির সামনের প্রাঙ্গণে একটি সান্ধ্য চাপানের আসর বসেছিল। সেদিন ওই আসরে ছিলেন সস্ত্রীক সিলভা লেভি।শ্রীমতী মেরি ফান ইঘেন, রবীন্দ্রনাথ, রথীন্দ্রনাথ, প্রতিমা দেবী, মৃণালিনী চট্টোপাধ্যায়, পদ্মজা নাইডু প্রমুখ অনেকেই। এল্মহার্স্ট লিখেছিলেন,

সূর্যাস্তের পর মীরা দেবীর পুত্র নীতু, রবীন্দ্রনাথ ও শ্রীমতী ইঘেন সংগীত পরিবেশন করেন।…”

এই স্মৃতিচারণা থেকেই বোঝা যাচ্ছে যে বারো বছরের নীতীন্দ্রনাথের সংগীতকন্ঠ সাধারণের থেকে নিঃসন্দেহে অনেক উচ্চস্তরের ছিল। তা যদি না হত, তবে রবীন্দ্রনাথ নিজের সঙ্গে তাঁকে এক আসরে সম্মানিত অতিথিদের সামনে কিছুতেই গাইবার অনুমতি দিতেন না।

কবির এই প্রিয় নাতিটি শেষ পর্যন্ত কবির চৌহিদ্দির মধ্যে থাকতে পারেন নি। একূলে ওকূলে এঘাটে ওঘাটে ধাক্কা খেতে খেতে একসময় জার্মানিতে গেলেন মুদ্রাযন্ত্র ও প্রকাশনা শিল্প বিষয়ে পড়াশোনা করতে। সেখানে গিয়ে তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। এ খবর শোনার পর মীরাদেবীকে কবি জার্মানিতে পাঠিয়ে দেন। শেষের কটা দিন নীতীন্দ্রনাথ মায়ের সেবা পেয়েছিলেন। অবশেষে ১৩৩৯ সনের শ্রাবণ মাসে জার্মানিতে থেকে একটি শোকের খবর এসে পৌঁছাল শান্তিনিকেতনে।

তাঁর জীবনে শোকের যে অন্ত নেই!! ছেলেবেলা থেকে মৃত্যুর মিছিল আজীবন তাঁকে মৌন করে রেখেছিল! জীবনের একাত্তর বছরে নেমে এল এক চরম শোক!! অদ্ভুত ব্যাপার, সেই দিনটিও ছিল বাইশে শ্রাবণ!! হঠাৎ খবর এল তাঁর আদরের নাতিটি আর নেই!! ‘ প্রাণের পরে চলে গেলসে একেবারে না বলে, না কয়ে…!! কত অনুষ্ঠানে যে গান করার জন্য তাঁকে সঙ্গে করে নিয়ে গেছেন তিনি!! এর আগেও তো এমন অনেক অকাল প্রয়াণ তিনি দেখেছেন, সহ্য করেছেন!! তবু সকলের সামনে নিজের গভীরতম দুঃখকে ক্ষুদ্র করে লজ্জিত করেননি।

মীরাকে সান্ত্বনা দিতে গিয়ে নিজের পুত্রশোকের কথা স্মরণ করে লিখেছিলেন,

শমী যে রাত্রে চলে গেল তার পরের রাত্রে রেলে আসতে আসতে দেখলুম জ্যোৎস্নায় আকাশ ভেসে যাচ্ছে, কোথাও কিছু কম পড়েছে তার লক্ষণ নেই। মন বললে কম পড়েনি — সমস্তর মধ্যে সবই রয়ে গেছে, আমিও তারি মধ্যে। সমস্তর মধ্যে আমার কাজও বাকি রইল। যতদিন আছি সেই কাজের ধারা চলতে থাকবে।…”

পুত্রকে হারিয়েও তিনি সেদিন সামলে ছিলেন শোক, কিন্তু তা বলে নাতির প্রয়াণ?? সেই চরম শোকের মধ্যে সেদিন কবি হঠাৎ একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলেন, যা কিনা আশ্চর্যের শুধু নয়, একেবারে অভিনবও। সিদ্ধান্ত নিলেন নিজের নামের আগে আর কখনও শ্রীব্যবহার করবেন না!! ওই বছরের শ্রাবণ সংখ্যা পর্যন্ত প্রবাসীপত্রিকায় প্রকাশিত সমস্ত রচনায় শ্রীরবীন্দ্রনাথ ঠাকুরলেখা ছাপা হয়েছিল!! আশ্বিন সংখ্যা থেকে শ্রীছাড়াই লেখা প্রকাশিত হতে লাগল!! বাকি জীবনে তিনি নিজের নামের আগে আর কখনওই শ্রীব্যবহার করেননি!!

রেসিপি

error: Content is protected !!