(Ong Bong Chong 8)
বাঙালি কি বই আর পড়ে? এর উত্তর কঠিন। বাঙালি একদা বই পড়ত। তবে সেই বই পড়ার অভ্যেস সহজে তৈরি হয়নি। অনেক কাঠ-খড় পুড়িয়ে অভ্যেস তৈরি করতে হয়েছিল। তৈরি করার কাজে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন। তখনও বঙ্গদর্শন পত্রিকা প্রকাশিত হয়নি। ১৮৭০ সাল। বঙ্কিম মনে মনে নিশ্চয়ই ভাবছিলেন বঙ্গদর্শন প্রকাশের কথা। তবে ভাবা আর কাজে নামা এক নয়। পরিকল্পনা করে কাজে নামা চাই। বঙ্কিমচন্দ্র ভাবতে বসলেন কারা বাংলা পড়েন? এর সদুত্তর না পেলে তো বাঙালির পাঠকসংখ্যা বৃদ্ধি করা যাবে না।
বঙ্কিম নিজে ইংরেজি শিক্ষিত ভদ্রলোক বাঙালি। তাঁর মনের খিদে বাংলা ভাষায় তখনকার ছাপা সাহিত্যে মেটে না। বুঝতে পারলেন কৃতবিদ্য শিক্ষিত ভদ্রলোক বাঙালি বাংলা ছাপা-সাহিত্য পড়েন না। তাহলে কারা পড়েন? নিরক্ষর বাঙালিও পড়েন না। তাঁরা পড়তে পারেন না, তাই পড়েন না। নিরক্ষর বাঙালি আর শিক্ষিত কৃতবিদ্য ভদ্রলোক বাঙালি এই দুই প্রান্তের মাঝখানে যে বাঙালি তাঁরাই বাংলা বই পড়েন।
আরও পড়ুন: অংবংচং ১, ২, ৩, ৪, ৫, ৬, ৭
বাংলা বই বলতে তখন আর তেমন আয়োজন কোথায়। বটতলা আপন মহিমায় বিরাজমান। বাংলা ভাষায় কিছু কিছু সাময়িক পত্র প্রকাশ পেয়েছে। বাংলা ভাষার গদ্যের মোটের উপর দু’রকম চাল। পণ্ডিতি বাংলা লেখেন একদল। সে বাংলা সুখপাঠ্য নয়। তৎসম প্রধান শব্দে দাঁত বসানো কঠিন। তার পাশাপাশি একটু সহজ মুখের বাংলার কাছাকাছি বাংলা লেখার চেষ্টা চলছে। হুতোমের বাংলা, আলালের বাংলা তার নমুনা। সমাজ সংস্কারমূলক গদ্য রামমোহন-বিদ্যাসাগর রচনা করেছেন। তত্ত্ববোধিনীর পাতায় অক্ষয়কুমার দত্ত এসেছেন। কবিতার জগতে নানা কাজ চলছে। মধুসূদনের আত্মপ্রকাশ হয়েছে। বাংলায় ছাপা বইয়ের মাধ্যমে পড়াশোনার চল শুরু হল। বিদ্যাসাগরের পাঠ্যবইগুলি এসেছে।

এই রকম এক সময়ে বঙ্কিমের মনে হয়েছিল মুদির দোকানের মালিক, মফস্সলের আইনজীবী, কেরানি এমন শ্রেণির মানুষেরা যাঁরা পড়তে পারেন, হয়তো খানিক ইংরেজিও জানেন, কিন্তু সেই ইংরেজি জানা এমন নয় যে, ইংরেজি বই পড়ে মনের খিদে মেটাতে পারেন, তাঁরাই কেবল বাংলা পড়েন। নিরক্ষর আর কৃতবিদ্য দুয়ের মাঝখানে থাকা মানুষগুলিই বাংলা বইয়ের সংখ্যাগরিষ্ঠ পাঠক। শিক্ষিতরা কেউ কেউ বই লিখছেন, তবে তার আর কাটতি কতটুকু। কতজন শিক্ষিত, ইংরেজি জানা ভদ্রলোকই বা বাংলা বই পড়েন! ১৮৭০ সালে ‘বঙ্গদর্শন’ প্রকাশের আগে এইভাবে বঙ্কিমচন্দ্র পাঠক-সুমারি নিচ্ছেন। ভাবছেন তখনই বাংলা সাহিত্যের প্রকৃত আদর হবে যখন শিক্ষিত লোকেরা বাংলা লিখবেন-পড়বেন। আর সেজন্যই প্রকাশ করছেন ‘বঙ্গদর্শন’।
তাঁর উদ্দেশ্য ‘বঙ্গদর্শন’ একদিকে যেমন শিক্ষিত বাঙালি পড়বেন, তেমনই নিরক্ষর আর কৃতবিদ্য দুয়ের মাঝখানের বাঙালিও পড়বেন। তবেই তো বাঙালি রিডিং পাবলিকের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা পাবে। কেবল পাঠকের সংখ্যাগত বিচারই উদ্দেশ্য নয়, গুণগত বিচারও উদ্দেশ্য। বঙ্কিম তাঁর ‘লোকরহস্য’ গ্রন্থে ‘বাঙ্গালা সাহিত্যের আদর’ নামে একটি রচনা লিখেছিলেন। তাতে এক শিক্ষিত ভদ্রলোক বলেছিলেন তাঁর স্ত্রীকে যে, তিনি ‘বাঙ্গলা-ফাঙ্গলা’ পড়েন না। তবে সে লেখায় একটি বাংলা কবিতার মর্মোদ্ধার করতে তিনি ব্যর্থ।

বঙ্কিম বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, বাংলা ভাষায় এমন মেধাবী লেখাও শুরু হয়েছে, যা শিক্ষিত ভদ্রলোকদের অধিগম্য নয়। ইংরেজি ভাষার সাহিত্য পড়ার জন্য যেমন শিক্ষা লাগে, কান তৈরি করতে হয়; তেমনই বাংলা ভাষার সাহিত্য পড়তেও কান তৈরি করতে হয়, শিখতে হয়। কথাটা মিথ্যে নয়। মধুসূদনের মেঘনাদবধকাব্য সেকালে ক’জন আর পড়ে বুঝেছিলেন? সেই কাব্য পড়ার কান তৈরি হয়নি। বঙ্কিম মধুকবিকে জাতীয় কবির শিরোপা দিয়েছিলেন। বঙ্গদর্শন পত্রে তাঁর প্রয়াণের পর সে লেখাটি বড় মনোময়।
এই যে বাঙালি পাঠক তৈরি হচ্ছিল, তার আগে যখন ছাপাখানা ছিল না, তখন বাঙালি সাহিত্য শ্রবণ করত। সে সাহিত্য আসর সাহিত্য। কথকেরা সেই সাহিত্যের প্রচারক। কলকাতাতেও একদিকে যেমন ছাপাবই অন্যদিকে তেমন কবিওয়ালা। এই কবিওয়ালারা শোনার কবিতা নির্মাণ করেন। বঙ্কিমের এক অর্থে কবিগুরু ঈশ্বর গুপ্ত তাঁর সাহিত্যসেবা শুরু করেছিলেন এই কবিওয়ালাদের দলে, পরে চলে এলেন ছাপা কবিতার জগতে। ঈশ্বর গুপ্তের তেমন ইংরেজি শিক্ষা ছিল না। বঙ্কিমচন্দ্র ঈশ্বর গুপ্তকে খাঁটি বাঙালি কবি বলে চিহ্নিত করেছিলেন। তবে একথাও জানাতে ভোলেননি যে ঈশ্বর গুপ্তের মতো খাঁটি বাঙালি কবি আর হয় না, খাঁটি বাঙালি কবি আর চাই না। তিনি বুঝতে পারছিলেন, এবার কানে শোনার বদলে চোখে দেখার জগৎ বড় হয়ে উঠবে। মানুষ পড়বে।

তবে পড়ার সাহিত্য এল বলেই যে শোনার সাহিত্য হারিয়ে গেল, তা কিন্তু নয়। উনিশ শতকে বঙ্কিমের নভেল পড়তেন একজন, শুনতেন অনেকে। রবীন্দ্রনাথের ‘চোখের বালি’ উপন্যাসে বঙ্কিমের উপন্যাস পড়ে শোনানো হচ্ছে। সেখানে আশা-মহেন্দ্র-বিনোদিনী বঙ্কিমের উপন্যাস পড়ে-শোনে। একা পড়ার পাঠক তারা নয়। তবে এই শোনার জগৎ ধীরে ধীরে মুছে গেল। নানা মাপের ছাপা বই নানারকম পাঠক, নানরকম চাহিদা। যে বটতলা থেকে বঙ্কিম পাঠকদের ভাল ছাপা বইয়ের জগতে নিয়ে আসতে চাইলেন, সেই বটতলা কি অন্যভাবে নিজের অভিযোজন ঘটায়নি?
সজনীকান্ত তাঁর ‘আত্মস্মৃতি’তে বাঙালির বই পড়ার যে হিসেব দিয়েছেন, তাতে বসুমতী সাহিত্য মন্দির রহস্য রোমাঞ্চ সিরিজ ছেপে ভদ্রলোকের বাইরের বাঙালির মন দখল করল। তাঁরা গোগ্রাসে এই সব পড়তেন। পাঁচকড়ি দে’র কাটতি কম নয়। অবশ্য এই লড়াইয়ে ব্যোমকেশকে এনে শরদিন্দু তৈরি করলেন ভদ্রলোকের গোয়েন্দা সাহিত্য। একইভাবে শিশু-কিশোর পর্ব থেকেই ভাল সাহিত্য পড়ার অভ্যেস তৈরি করার জন্য চিন্তাশীল ব্রাহ্মরা উঠে পড়ে লাগলেন। বালক, সখা, মুকুল ডিঙিয়ে সন্দেশ। সন্দেশেই ক্রমে উপেন্দ্রকিশোর, সুকুমার, লীলা মজুমদার, সত্যজিৎ। আবার পাশাপাশি চলল দেব সাহিত্য কুটীর। চাহিদা, আর সেই অনুযায়ী জোগান। ততদিনে ক্রমে ভদ্রলোক পরিবারের ছেলেমেয়েদের জন্য বাংলা মাধ্যম বিদ্যালয় তৈরি হয়েছে।

সুতরাং বাঙালি বই পড়ে কি না, এই প্রশ্নের জবাব পেতে এভাবে বস্তুগত ইতিহাসের দিকে চোখ রাখতে হয়। এখন বাঙালির বই পড়ার পাশাপাশি আবার শোনার জগতের নতুন হাতছানি। প্রযুক্তি বড় বালাই। প্রযুক্তির কল-কৌশলকে অস্বীকার করার উপায় নেই। কথকদের দিন ছাপাখানা ফুরিয়ে দিয়েছিল। তেমনি চোখে দেখার বইকে কানে শোনার বই করে তুলছে নতুন প্রযুক্তি। কানে শোনার বইয়ের নানা রূপ। তা তো কেবল অডিও বুকে আটকে থাকবে না। নানা ফর্মে দেখার বই কানে ঢুকবে। ঢুকুক। হাহাকার করে লাভ নেই। আমরা চোখ দিয়ে পড়ি যেমন, কান দিয়েও না হয় তেমন পড়ব। শোনা আর পড়া, পড়া আর শোনা, শোনা আর পড়া। চাকা ঘুরছে। বাঙালি ঠিক মানিয়ে নেবে। ভয় করে দরজা জানলা বন্ধ করে লাভ নেই। খোলা দরজা জানলা দিয়ে হাওয়া ঢুকুক। যা থাকার, তাই থাকবে।
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত