(Ujjhomanush 6)
মাঝ বা শেষ আশির কথা, চক্রধরপুর বা টাটানগর থেকে কলকাতা আসি ট্রেনে। ইস্পাত, স্টিল, বম্বে মেল বা গীতাঞ্জলি চেপে, যখন যা পাওয়া যায় আর কি। সেখানে আসে বালতিতে করে বরফ-জড়ানো গোল্ড স্পট বা খোপ খোপ স্টিলের থালায় ভাত, আর আমি সেই সব আসার আগে অবধি জানলার শিকে নাক ঠেকিয়ে দেখি বাইরে। লোহার ওই গন্ধগুলো তাই বোধ হয় এখনও অমন জাগ্রত। আর দেখি, এক এক করে আসা-যাওয়ার মাঝে রেল স্টেশন, কেউ একাকী, কেউ কী পরম স্নিগ্ধতা বিলিয়ে চলে, কেউ আপন খেয়ালে মগ্ন। সিন্নি, রাজখারসাঁওয়া, রাকা মাইন্স, আসানবনি, গিধনি… এ সব স্টেশনে যে সবসময় ট্রেন থামত, তা নয়, আবার থামলেও যেন কিঞ্চিৎ করুণা করেই।
অল্প চোখাচুখি, তা থেকে দু’আঁজলা আলাপ গড়ার আগেই আবার ধাক্কা দিয়ে স্থিতির তন্দ্রা কাটিয়ে দিত কে যেন।
আরও পড়ুন: উহ্যমানুষ (১), (২), (৩), (৪), (৫)
রাকা মাইন্স স্টেশনটা এখনও মনে আছে। সে কালের দেখা বলছি। একটা লম্বা প্ল্যাটফর্ম মাত্র, উপরে কোনও শেডের চিহ্ন নেই, আর প্ল্যাটফর্মখানিও যেন কয়েক ইঞ্চিই উঁচু মাত্র, আশপাশের লাল মাটির থেকে। যেন, ওই মাটিরই এক্সটেনশন, আলাদা করে কিছু নয়। সেই প্ল্যাটফর্মে কোথাও কোনও বসার জায়গারই কথা মনে পড়ে না, তো আর দোকানপাট! শুধু মনে পড়ে, দিগন্তবিস্তৃত লালধুলোর পৃথিবী, ওই সাময়িক হল্ট পেরিয়ে কোন আদিম কাল থেকে বোধহয় পাথর ভেঙে চলেছে তো চলেছেই, সহস্রাধিক ধুলো উৎপন্ন করে…
তখনকার মতো জানলার শিকে নাক ঠেকানোর সুযোগ গিয়েছে চলে, তবু আজও ভেবে মরি, কোথায় যেত এইসব ধুলো? কার ভুবনে গিয়ে জমত? আর, তারা কি তৎক্ষণাৎ ধুলোর সে পরত সাফা করে দিত? উহ্য হয়ে বেঁচে থাকা কিছু আপাত নিস্তরঙ্গ রেল স্টেশন ও তার ধুলোদের খুঁজে খুঁজে ফিরি আমি যেন আজীবন। খুঁজে ফিরি আরও কত যে এখন উহ্য হয়ে যাওয়া মুহূর্ত!

ছোটবেলায়, যখন বরবিলের সেন্ট মেরিজ়-এ পড়তাম, রচনা লিখতে দেওয়া হত না, এইম ইন লাইফ, বড় হয়ে কী করবে, বা প্রিয় পোষ্য, তো আমি একবার লিখেছিলাম, প্রিয় পোষ্য, ডলফিন। আমাদের বাড়িতে একটা চমৎকার সাইজ়ের চৌবাচ্চা ছিল, তাতে নাকি থাকবে আমার ডলফিন। ডলফিন নিয়ে যে বিশেষ কিছু জানতাম তা নয়, কিন্তু কী সব লিখে চলে এসেছিলাম। আর একবার এইম ইন লাইফ লিখলাম, কামিকাজ়ি পাইলট। না, শিশুকাল থেকেই আমি উদ্ভট রসে নিমজ্জিত ছিলাম, তা বোঝানোর জন্যে এ সব বলছি না! বিষয় হল, ছোট থেকেই কুইজ়ে বা জেনারল নলেজে আমার প্রবল, যাকে বলে আসক্তি ছিল। কলকাতার জলহাওয়া পেয়ে সে আসক্তি এমন পর্যায়ে গেল, যে লোকাল চেপে, এ শহরে নতুন আমাকে নিয়ে মা চলল রানাঘাট, সোদপুর, দমদম ক্যান্টনমেন্ট, ব্যান্ডেল আরও কত সব জায়গায়।

স্টেশন থেকে নেমে খুঁজেপেতে গিয়ে উঠতাম ছোট্ট কোনও লাইব্রেরির সামনের মাঠে বা সদ্য গজিয়ে ওঠা বিয়েবাড়ি-অন্নপ্রাসন হলের ভিতর। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা কিছু চেয়ার আর সেখানেই সই পাতিয়ে দল পাকিয়ে ফেলা। এরপর হবে ধুরন্ধর সব যুদ্ধ। মগজাস্ত্রের। মা বসে থাকবে পিছনের কোনও চেয়ারে আর আমি, সবে ক্লাস টেন, নতুন তৈরি হওয়া দলের সঙ্গে ১০ সেকেন্ডের মধ্যে খুঁজে পাওয়ার প্রাণপণ চেষ্টা করব, যে লোকাল ট্রেনে ‘লালুভুলু’ নামে কী বিক্রি করা হয় বা ‘পিটার প্যান’-এর কপিরাইট কোন হাসপাতালের কাছে রয়েছে…ইত্যাদি…হারব অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বা একবার হয়তো তৃতীয় হব, তবু আলো পড়ে আসার লগ্নে মুখ উজ্জ্বল করে মায়ের সঙ্গে ডিমের ডেভিল খেয়ে উঠব বলে দাঁড়িয়ে থাকব, আরও একটা লোকালে। কুরুক্ষেত্রের ওই ময়দানেই জেনে নেওয়া গিয়েছে, পরবর্তী কোন রবিবার কোথায় বসবে আরও এমন সব কুরুক্ষেত্র। মা অলরেডি বুঝে গিয়েছে, ফের এক বার ট্রেনের টাইমটেবিল দেখার পালা।

ক্লাব সার্কিটে, অর্থাৎ স্যাটারডে ক্লাব বা ডালহাউজ়ি ইন্সটিটিউটেও হয়ে থাকে মারকাটারি মহারণ, সেখানেও যাই, ইনফ্যাক্ট একবার তো ‘প্রতিপক্ষ’ ছিলেন খোদ কলকাতা কুইজ়িং-এর প্রাণপুরুষ নিল ও’ব্রায়েন-ও! তবু, লোকাল ট্রেনের লাইন ধরে, অল্প আলোয়, বেজায় অনাড়ম্বরে যে সব লড়াইগুলো হত, কেন যেন মনে হয় সেগুলো আরও আরও ক্ষুরধার হত। মাটি কামড়ে পড়ে থাকার মানসিকতা, কিছুটা হলেও শিখিয়েছে কিন্তু আমায় ওই সব লাইব্রেরির মাঠ, সেই সব কুইজ়মাস্টার আর সদ্য গড়ে ওঠা দলের বাকিরা। হ্যাঁ, কয়েকজনের সঙ্গে অন্য ময়দানেও দেখা হয়ে যেত, কিন্তু বেশির ভাগের সঙ্গে তো হত না, কিন্তু যখন সেতু বাঁধছি আমরা, তখন তো বিশ্বাস করছি যে শুধু আজ নয়, কাল-ও, পরশু-ও দেখা হবেই, এই দল থাকবেই। এই যে, এই আশ্চর্য বিশ্বাস গড়ে উঠেছিল সেই সব নিশ্চল বিকেলগুলোয়।

তারপর তো এক সময় বুঝতে শিখলাম, দেখা আসলে শেষমেশ হয় না কিন্তু আশা-ও করে যেতে হয়। উহ্য থেকে গিয়েছে ওই প্রায় মজে আসা সরু নদীর মতো লড়াকু কুইজ় সার্কিট, রাকা মাইন্স বা গিধনি নামে রেল স্টেশনের মতোই, কিন্তু মজ্জায় ঢুকিয়ে দিয়েছে কখন যেন আশ্চর্য এক বিপরীতমুখী সহাবস্থান। বানিয়ে তুলেছে আমায় একই সঙ্গে ঘোর পেসিমিস্ট ও জাত অপ্টিমিস্ট।
সেই আশার সলতে পাকিয়ে এক সময়ে হয়ে উঠবে আমাদের ব্যান্ড। নাম রাখব প্রথমে, ‘ত্রিপিটক’, তারপর ‘ব্যান্ডেজ’, শেষে ‘তূণীর’। মৃগাঙ্ক, ইন্দ্রনীল, কিছু দিন অরিজিৎ, কিছু দিন মহারত্নদা এবং আমি মিলে এরপর লিখব রাতভর স্বপ্ন। আমি হায়দরাবাদে হোটেল ম্যানেজমেন্ট পড়ার সুযোগ পাব, কিন্তু দল ভেঙে যাবে বলে ছেড়ে দেব, মায়ের বিরুদ্ধে গিয়ে, সেই পড়ার কোর্স, আর তারপর প্ল্যানেট এম-এ আমাদের প্রথম (ও শেষ) অ্যালবাম বেরোবে, ক্যাসেট ও সিডি। আমি আর মৃগাঙ্ক র্যাকে আমাদের অ্যালবাম দেখে প্রতিজ্ঞা করব, যে যাই হয়ে যাক, কখনওই আমাদের অ্যালবাম পেছনের র্যাকে যাবে না…তারপর একদিন অন্য এক বন্ধুর সঙ্গে এক না-হওয়া সিনেমার মিটিং করতে মুম্বইয়ে বসে রাতের বেলা শুনব, ব্যান্ডটা ভেঙে গেল।

জীবনের উহ্য মানুষ-না-মানুষের দলে আরও এক নাম যোগ হবে। আমার প্রাণের চেয়ে প্রিয় দুই স্বপ্ন, কুইজ় ও ব্যান্ড র্যাকের পেছনে চলে যাবে, আমি বাড়ি ফেরার পথে, গাড়ির কাচে আলতো হয়ে নামা সূর্যের আলোয় ছাপ খুঁজব সেইসব উহ্যগীতের আর রাকা মাইন্স আর রানাঘাটের সেই নাম ভুলে যাওয়া লাইব্রেরি, নিশ্চিতভাবেই উহ্যের তালিকায় নাম লেখানো সদ্যজাতদের গায়ে স্নিগ্ধ এক মায়ার পশম জড়াবে। আশা এইটুকুই যা…রহিয়া যায়…
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত