(Rani Chanda)
বাংলার বৈশাখ আর ইংরেজির মে মাস বাঙালির কাছে রবীন্দ্রনাথের মাস। পঞ্জিকায় ২৫ বৈশাখের বিশেষ কোনও গুরুত্ব না থাকলেও বাঙালির জীবনে ওই দিনটি আর পাঁচটা সাধারণ দিনের মতো নয়! বঙ্গবাসীর জীবনে ২৫ বৈশাখ বারো মাসে চতুর্দশতম উৎসব আর সেই কারণেই ‘স্মৃতির আকাশ থেকে’ শিরোনামে এবার এমন একজন মানুষকে নিয়ে লিখব, যিনি রবীন্দ্রনাথের প্রান্তবেলার দৈনন্দিন সব ঘটনার সাক্ষী।
তিনি রাণী চন্দ, একাধারে চিত্রশিল্পী ও সুলেখিকা! শুধু রবীন্দ্রনাথ নয়, অবনীন্দ্রনাথের অজানা সব গল্প আর কথাকে ধরে রেখেছিলেন নিজের কাছে। রাণী চন্দ না থাকলে আমরা পেতাম না, ‘ঘরোয়া’, ‘জোড়াসাঁকোর ধারে’ ইত্যাদি বইগুলি, যা থেকে আমরা ঠাকুরবাড়ির বৈচিত্র্যময় সব চরিত্র আর কাজের সঙ্গে পরিচিত হয়েছি।
খুব অল্প বয়সে দাদুর আলমারি থেকে রাণী চন্দর লেখা ‘গুরুদেব’ বইটি পড়ে এতই মুগ্দ্ধ হয়েছিলাম যে, স্কুলের টিফিনের পয়সা বাঁচিয়ে গরমের ছুটির সময় মামাবাড়ি থেকে হাঁটা পথে গোলদিঘি (এখন যার পোশাকি নাম কলেজ স্কোয়ার) সংলগ্ন বিশ্বভারতীর গ্রন্থন বিভাগের দোকান থেকে একে একে কিনে ফেলেছিলাম ‘আলাপচারি রবীন্দ্রনাথ’, ‘সব হতে আপন’, ‘হিমাদ্রি’, ‘জেনানা ফটক’, ‘আমার মায়ের বাপের বাড়ি’-র মতো বইগুলি। শুধু কেনা নয়, স্কুলের পড়া বেশ কিছুটা ফাঁকি দিয়ে সেগুলো খুব কম দিনের মধ্যে পড়েও ফেলেছিলাম।
সব থেকে ভাল লেগেছিল, ‘সব হতে আপন’! ওই বইটার মধ্যে দিয়ে যেন বাঙালির জীবনদেবতা রবীন্দ্রনাথকে জীবন্ত প্রত্যক্ষ করছিলাম! পড়তে গিয়ে মনে হয়েছিল, রাণী চন্দ নামক মানুষটি কতই না সৌভাগ্যের অধিকারী! কবিকে কত ভূমিকাতেই না দেখেছেন! শিক্ষক রবীন্দ্রনাথ, চিত্রকর রবীন্দ্রনাথ, কবি রবীন্দ্রনাথ, গায়ক রবীন্দ্রনাথ, অভিভাবক রবীন্দ্রনাথ, বিশ্বনায়ক রবীন্দ্রনাথ, পর্যটক রবীন্দ্রনাথ, সংগঠক রবীন্দ্রনাথ, আশ্রমগুরু রবীন্দ্রনাথ আর চার দেয়ালের মধ্যের ঘরোয়া রবীন্দ্রনাথকেও।

রাণী চন্দ যেন দেখেছিলেন নানা রবীন্দ্রনাথের একখানা মালাকে। এমন মানুষকে যে চোখের সামনে কোনওদিনও দেখতে পাব আর তাঁর স্নেহলাভ করব ভাবিনি, কিন্তু ভাগ্যবিধাতার ইচ্ছায় তা সম্ভব হয়েছিল। জীবনে প্রথম যখন শান্তিনিকেতনে গিয়েছিলাম, তখন আমার বয়স ছয় কি সাত। সেই সময় অত বুঝতামও না, আর শান্তিনিকেতনে তখনও যে রবীন্দ্রস্নেহধন্য কত মানুষ ছিলেন, সেই সম্পর্কে কোনও ধারণাই ছিল না।
পারিবারিক যোগাযোগের ফলে মনে আছে চিত্রশিল্পী মুকুল দে’র বাড়িতে গিয়েছিলাম! দিনটা ছিল দোল পূর্ণিমা। সেদিন বাবা-মা ছাড়াও সঙ্গে ছিলেন আমার বাবার ছোটবেলার দুই বন্ধু অনন্তরাম চট্টোপাধ্যায় আর কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছোটভাই পান্নালাল মুখোপাধ্যায়। মুকুল দে আর তাঁর স্ত্রী বীণা দে বসেছিলেন ওঁদের বাড়ি, ‘চিত্রলেখা’-র বাগানে। মুকুল দে কে, কেনইবা দেশজোড়া তাঁর নাম, কিছুই জানতাম না! আরও একটা কথা জানতাম না যে, রাণী চন্দ তাঁরই ছোটবোন।
আমার সব আকর্ষণ গিয়ে পড়ল বাড়িটার উপর, কারণ ‘সব হতে আপন’ বইটা পড়ার সুবাদে ‘জিতভূম’ নামটার সঙ্গে পরিচিত ছিলাম। বোঝা গেল, এই বাড়ির গৃহকত্রী রাণী চন্দ।
মনে পড়ে মুকুল দে’র বাড়ির বাগানে সেদিন অনেক ছবি তোলা হয়েছিল। সেইসব ছবির মধ্যে আজও একটা ছবি আমার কাছে মহামূল্যবান সম্পদ হয়ে রয়ে গিয়েছে, যেখানে আমি মুকুল দে’র কোলে বসে আছি। একদিন শান্তিনিকেতনের শ্যামবাটির রাস্তা দিয়ে ক্যানেল পেরিয়ে প্রান্তিকে যেতে গিয়ে চোখে পড়ল প্রশস্ত বাগানঘেরা একটা সুন্দর বাড়ি। বাড়ির গেটে ফলকে লেখা, ‘জিতভূম’। আমার সব আকর্ষণ গিয়ে পড়ল বাড়িটার উপর, কারণ ‘সব হতে আপন’ বইটা পড়ার সুবাদে ‘জিতভূম’ নামটার সঙ্গে পরিচিত ছিলাম। বোঝা গেল, এই বাড়ির গৃহকত্রী রাণী চন্দ।
নাহ, কিন্তু সেবার আমার সৌভাগ্য হয়নি ওঁর সঙ্গে দেখা করার এবং প্রণাম জানাবার। অনেক বছর পরে একবার শান্তিনিকেতনে যখন একা যাই তখন ওঁর লেখা, ‘সব হতে আপন’ বইটা সঙ্গে করে নিয়ে গিয়েছিলাম। একদিন সকালে দেখা করলাম, তখন ওঁর অনেকটা বয়স হয়ে গেছে, তবু বাড়ির কাজ নিজেই করেন। রান্না করতে করতেই এসে দরজা খুলে বসতে বললেন। পরিচয়পর্বের পরে অল্প কিছু কথা আর বইতে সই। ওইটুকু সময়ের মধ্যে পুরোনো শান্তিনিকেতনের অল্প দু-এক কথা!

এরপরে ১৯৮৯ সালে জওহরলাল নেহেরুর জন্মশতবর্ষ উপলক্ষ্যে শান্তিনিকেতন আর পণ্ডিত নেহেরুর যোগাযোগ নিয়ে কলকাতা দূরদর্শন একটা অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা করে। এই প্রসঙ্গে বলে রাখি, সেই সময় কিন্তু শান্তিনিকেতনে দূরদর্শন ছিল না। অনুষ্ঠানের সংকলন ও বিন্যাসের দায়িত্ব ছিল আমার ওপর। উপদেষ্টা ছিলেন প্রখ্যাত শিশুসাহিত্যিক এবং ‘রামধনু’ পত্রিকার সম্পাদক ক্ষিতীন্দ্রনারায়ণ ভট্টাচার্যের জামাই কবি-অধ্যাপক ড.পলাশ মিত্র।
আমরা ঠিক করেছিলাম পণ্ডিত নেহেরুকে দেখেছেন, এমন আশ্রমিকদের মধ্যে যাঁরা তখনও জীবিত রয়েছেন, তাঁদের স্মৃতিকথা রেকর্ড করব। তালিকায় ছিলেন শান্তিদেব ঘোষ, অধ্যাপক ক্ষিতীশ রায় (যিনি ইন্দিরা গান্ধীর মাষ্টারমশাইও বটে), কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়, কানাই সামন্ত, দিনকর কৌশিক এবং রাণী চন্দ। সবাই জানেন, পণ্ডিত নেহেরু কবির অত্যন্ত প্ৰিয় মানুষ ছিলেন এবং বিশ্বভারতীর আচার্যও ছিলেন। এখনকার মতো দীর্ঘ বেশ কয়েক বছরের ব্যবধানে তখন বিশ্বভারতীর সমাবর্তন হত না! প্রতি বছর সমাবর্তন হত, এবং আচার্য তথা প্রধানমন্ত্রীও প্রতি বছর আসতেন।
দূরদর্শনের অনুষ্ঠান বিষয়ে কথা বলতে আবারও রাণী চন্দর বাড়িতে গেলাম।
পরেরদিন আবারও গেলাম প্রথমেই বললেন, ‘রোজ আসছ কিন্তু কিছু না খেয়েই চলে যাচ্ছ, আজ আগে খাওয়া তারপরে কাজের কথা।’ পায়েস করে রেখেছিলেন।
সব কথা বলে রেকর্ডিং করার জন্য তাঁর অনুমতি চাইতে তিনি এক কথায় রাজি হয়ে গেলেন। কথা প্রসঙ্গে ওই দিনই পণ্ডিতজির বিষয়ে কিছু অভিজ্ঞতার কথা বললেন। এ কথাও জানলাম যে ওঁর স্বামী অনিল চন্দ নেহেরু মন্ত্রীসভায় রাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন। সেদিন ঠিক হল, পরেরদিন আবারও সকালে জিতভূমে গিয়ে অনুষ্ঠানের বিষয়ে আরও কিছু কথা বলব। উনি জানালেন নেহেরুজির সঙ্গে যোগাযোগ ছিল, এমন আর কেউ শান্তিনিকেতনে আছেন কি না ভেবে বলবেন।
পরেরদিন আবারও গেলাম প্রথমেই বললেন, ‘রোজ আসছ কিন্তু কিছু না খেয়েই চলে যাচ্ছ, আজ আগে খাওয়া তারপরে কাজের কথা।’ পায়েস করে রেখেছিলেন। সেদিন কাজের শেষে জিজ্ঞেস করেছিলেন ক’দিন থাকব। আমাদের পরিকল্পনা শোনার পরে একদিন রাতে খেতে আমন্ত্রণ জানালেন। যেদিন ওঁর বাড়িতে রাতে যাওয়ার কথা, সেইদিন সকালে দেখি শান্তিনিকেতন পোস্ট অপিস মোড়ের কাছে উনি রিকশায় চড়ে নিজের বাড়ির দিকে চলেছেন। উনিও আমাদের দেখে রিকশা থামিয়ে রাতে ওঁর বাড়িতে আহারের কথা মনে করিয়ে দিলেন। ওইদিন সন্ধায় আহার আর ওঁর দেখা অতীতের শান্তিনিকেতনের স্মৃতি নিয়ে গল্পের কথা মনে থাকবে চিরদিন। পরে আবার যখন শান্তিনিকেতন যাই, এবং ওঁর সঙ্গে দেখা করতে গেলে ওঁর পুত্র অভিজিৎ চন্দর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন।
এই প্রসঙ্গে একটা কথা জানিয়ে রাখি, সাম্প্রতিককালে ফেসবুকে প্রায়ই একটি ছবি দেখা যায়, রবীন্দ্রনাথের লেখার টেবিলের পাশে দাঁড়িয়ে একটি বালক। যে বা যাঁরা ছবিটি পোস্ট করেন, তাঁরা ভীষণভাবে প্রচার করতে চেষ্টা করেন, ওই বালকটি আর কেউ নন সত্যজিৎ রায় স্বয়ং!
কিন্তু সত্যিটা হল, কবির পাশে দাঁড়িয়ে থাকা বালকটি রায়মশাই নন, তিনি রাণী চন্দর পুত্র অভিজিৎ চন্দ। একবার কলকাতায় ফেরার সময় ঠিক হল, কোনও একটি বিশেষ কাজে রাণী চন্দ কলকাতা আসবেন এবং আমার সঙ্গেই ট্রেনে হাওড়া পর্যন্ত আসবেন। তারপরে ওঁকে পরিচিত কোনও ব্যক্তি স্টেশন থেকে নিয়ে যাবেন। আসার দিন ছেলে অভিজিৎ চন্দ এসে ট্রেনে তুলে দিয়ে গেলেন। সেদিন একই সঙ্গে কলকাতায় আসছিলেন নিমাইদা মানে বিশ্বভারতীর তৎকালীন উপচার্য ড.নিমাইসাধন বসু, কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়, গোরাদা অর্থাৎ সংগীতশিল্পী গোরা সর্বাধিকারী এবং আমাদের সবার অতি আপনজন বিশ্বভারতীর কেন্দ্রীয় গ্রন্থগারের কর্মী স্বপন কুমার ঘোষ।
তাঁর সব পেয়েছির দেশ শান্তিনিকেতনেই কেটে গেছে জীবনের বেশিরভাগ সময়টা আর এই শান্তিনিকেতনের মাটিতেই মিশে যান ১৯৯৭ সালের এক বর্ষার দিনে।
ট্রেন যখন অজয় নদ পেরোচ্ছে তখন চোখে পড়ল রাণী চন্দ উদাস দৃষ্টিতে অজয়ের দিকে তাকিয়ে আছেন! পূর্বাচলের দিকে ফিরে গিয়ে কোনও পুরাতন কথা ভাবছিলেন কি না কে জানে! কবির ‘বাঁশি’ কবিতায় বর্ণিত ধলেশ্বরী নদীর কথা একটি বইতে লিখেছিলেন, তখন কি তিনি জানতেন পূর্ববঙের ধলেশ্বরীর ঢেউ তাঁকে একদিন রাঢ় বঙ্গের কোপাই নদীর তীরে এনে ফেলবে! তাঁর সব পেয়েছির দেশ শান্তিনিকেতনেই কেটে গেছে জীবনের বেশিরভাগ সময়টা আর এই শান্তিনিকেতনের মাটিতেই মিশে যান ১৯৯৭ সালের এক বর্ষার দিনে।
তাঁর ‘সব হতে আপন’ বইয়ের একদম শেষ কটি লাইন আজও মনের মধ্যে গেঁথে আছে, ‘জীবনভোর যে ভিড় ছিল, আজ তা সরে গেছে, জিতভূমে শুয়ে আছি একা, রাত্রিকাল, ঝড় উঠল। সুখনো পাতাগুলো উড়ে চলল। এ ঝড়ের ভাষা জানি, থাকবে না বেশিক্ষণ। ঝড় থামল বৃষ্টি নামল। পাতাগুলো ভিজে গেল। ভিজে পাতা সাড়া তোলে না, চুপ হয়ে যায়।’
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত